ইতোপূর্বে একথা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে, হযরত আবু বকর (রা:) ও হযরত উসমান (রা:) এর খেলাফতকালে বিচারকার্যের দায়িত্ব হযরত আলী
(রা:) এর উপরে ন্যস্ত ছিল। অনুরূপভাবে হযরত
উসমান (রা:) এর খেলাফতকালে মামলার নিষ্পত্তির কাজ হযরত আলী (রা:) এর সাহায্য
নেওয়া হত। বেশ কয়েকবার শরয়ী আইন প্রয়োগ
ও শাস্তি বিধানের দায়িত্ব হযরত আলী (রা:) এর উপর অর্পিত হয় এবং তিনি তা সুচারুরূপে সম্পাদন করেন।
বিচারকার্যে হযরত আলী (রা:) এর অংশগ্রহণ
আল্লামা বায়হাকী (রাহ:) হযরত উসমান (রা:) এর খেলাফতকালে দায়েরকৃত মামলার নিষ্পত্তি ও বিচারের কার্যপদ্ধতি সম্বন্ধে বিবরণ সূত্রসমেত দিয়েছেন --
আমর বিন উসমান থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার দাদা বলেছেন, যখন উসমান (রা:) বিচার করার জন্য এজলাসে আসন গ্রহণ করতেন তখন
বাদী উপস্হিত হত। তিনি একজনকে বলতেন, আলী ইবনে আবী তালিব (রা:) কে ডেকে নিয়ে এস। অপরজনকে বলতেন, তালহা, যুবাইর (রা:) সহ একদল সাহাবাকে খবর দাও। এরপর বাদী -বিবাদীকে বলতেন, তোমাদের অভিযোগ জানাতে পার। অভিযোগ শোনার পর উপস্হিত সাহাবাগণকে লক্ষ্য করে বলতেন,এই মোকদ্দমায়
আপনাদের রায় কী? হযরত উসমান (রা:) এর অভিমতের সাথে তাদের ঐকমত্য হলে তখনই তিনি রায় ঘোষণা করে তা কার্যকর করতেন। নচেৎ আরো চিন্তা -ভাবনা করতেন। অবশেষে উভয় পক্ষই তাঁর সিদ্ধান্ত সন্তুষ্টিচিত্তে মনে নিত।
শীয়া আলিমগণ লিখেছেন, তিন খলীফার শাসনামলে শরয়ী হদ প্রয়োগের দায়িত্ব হযরত আল (রা:) এর উপর অর্পিত হত। উদ্ধৃতি --
মদ্যপানের শাস্তি -ওয়ালীদ বিন উকবার ঘটনা
বুখারী শরীফের প্রথম খণ্ডে উসমান (রা:) এর মর্যাদা শীর্ষক পরিচ্ছেদে এই ঘটনাটি সংক্ষেপে
এরূপ বিবৃত হয়েছে।
( প্রথম খণ্ডে,পৃষ্ঠা:৫২২,হাদীস: ৩৬৯৬)
হুসাইন বিন সাসান রুকাশী বলেন,আমি একদা হযরত উসমান (রা:) এর কাছে উপস্হিত ছিলাম।
এমতাবস্হায় সেখানে মদ্যপানের অপরাধে ওয়ালীদ বিন উকবাকে হাজির করা হল। হুমরান
বিন আবান ও জনৈক ব্যক্তি তার বিরুদ্ধে সাক্ষী দেওয়ায় হযরত উসমান (রা:) আলী ( রা:) কে
বললেন, ওকে শাস্তি দাও। হযরত আলী (রা:)
ভ্রাতুষ্পুত্র আবদুল্লাহ বিন জাফরকে বেত্রাঘাতের
নির্দেশ দিলেন। তিনি বেত্রাঘাত শুরু করলেন। সঙ্গে সঙ্গে হযরত আলী চল্লিশ পর্যন্ত গুণলেন।
চল্লিশ পূর্ণ হলে আবদুল্লাহকে বেত্রাঘাত বন্ধের নির্দেশ দিলেন। অতঃপর বললেন, মহানবী (সা:)
চল্লিশটি বেত্রাঘাত করতেন। হযরত আবু বকর (রা:) ও অনুরূপ চল্লিশটি বেত্রাঘাত করেছেন। হযরত উসমান (রা:) খেলাফতের প্রথম দিক চল্লিশটি বেত্রাঘাত করলেও পরবর্তীতে সংখ্যাবৃদ্ধি
করে আশিতে উন্নীত করেন। এর সবটাই সুন্নাহ
নবীজীর আদর্শভিত্তিক কর্মপন্হা এবং এটি আমার নিকট অধিকতর পছন্দ।
বুখারীর বর্ণনা থেকে জানা যায়, হযরত উসমান (রা:) হযরত আলী (রা:) কে বেত্রাঘাতের নির্দেশ দিল তিনি ওয়ালীদকে আশিটি বেত্রাঘাত করেন।
পাঠকবন্দকে মনে রাখতে হবে যে, এসব ঘটনা শীয়া আলিমগণের নির্ভরযোগ্য গ্রন্হরাজিতে বিদ্যমান। জনাব কালিনী স্ব -গ্রন্হ 'ফূরুয়ে কাফী' -এ মদ্যপানের শাস্তি শীর্ষক পরিচ্ছেদে, ইবনে শাহর আশোব মানাকেব গ্রন্হে এবং 'ইবনে আবিল হাদীদ' শরহু নাহজিল বালাগাহ' গ্রন্হে লেখেন -
মুহাম্মাদ বাকির বলেন, ওয়ালীদ বিন উকবার মদ্যপানের ব্যাপারে সাক্ষ্য পাওয়া গেলে হযরত উসমান (রা:) আলী (রা:) কে ডেকে বিচার করে দিতে বললেন। তখন আলী (রা:) ওয়ালীদ কে চল্লিশটি বেত্রাঘাত করেন। বেতটি দুখণ্ডে বিভক্ত ছিল।
একটি পর্যালোচনা
আমিরুল মুমিনীন হযরত উমর (রা:) মদ্যপানের শাস্তিতে যেটুকু বৃদ্ধি করেছেন সেটি ছিল সেই সময়ের এবং তৎকালীন যুগে এই কঠোরতা আরোপের প্রয়োজন ছিল। সাহাবাগণের উপস্হিতিতে তাদের সম্মতিক্রমে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এ থেকে বোঝা যায়, হযরত উসমান (রা:) এর খেলাফতকালেও এটি কার্যকর ছিল। হযরত আলী ( রা:) কথা ও কাজে তার সমর্থন করেছেন। তিনি বলেন --
সাহাবীগণের মাঝে ( হাশেমী -অহাশেমী) কেউ এই বৃদ্ধিকে সুন্নাহপরিপন্হী বলে আখ্যা দেননি।
শিয়াদের কথিত 'নিষ্পাপ' ইমামগণও মদ্যপানের
শাস্তি আশিটি বেত্রাঘাত বলে উল্লেখ করেছেন।
নিম্নোক্ত উদ্ধৃতিটি লক্ষ্য তরুন --
অপর একটি বর্ণনা -- --
জাফর সাদিক (রা:) বলেন, স্বল্পমাত্রা কি অধিক মাত্রা, সর্বক্ষেত্রে মদ্যপানের শাস্তি আশি বেত্রাঘাত। নাবীয পানের শাস্তিও পূর্ববৎ।
এ বক্তব্য দ্বারা জানা যায় যে, প্রয়োজনবশত: মদ্যপানের শাস্তির মাত্রা বর্ধিত হয়েছিল। বিদআতরূপে প্রবর্তিত হয়নি । মুসনাদে ইমাম
আহমদ -এর প্রথম খণ্ডে হযরত আলী (রা:) এর বর্ণিত হাদীসমুহ'র অধীনে নিম্নোক্ত ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে --
একবার য়াহনাস ও সাফিয়্যাহ (নামে দুই নারী -পুরুষ) স্বামী -স্ত্রী যুদ্ধবন্দীরূপে মদীনায় নীত হয়।
সাফিয়্যাহ জনৈক বন্দির সাথে অবৈধভাবে মিলিত হয় এবং পরবর্তীতে সন্তান প্রসব করে। ভূমিষ্ট সন্তানের দাবীতে য়াহনাস (স্বামী) ও ব্যভিচারী পুরুষ হযরত উসমান (রা:) এর কাছে মোকদ্দমা
দায়ের করেন। হযরত উসমান ( রা:) নিষ্টত্তির উদ্দেশ্যে তাদের উভয়কে হযরত আলী ( রা:) এর
নিকট পাঠিয়ে দিলেন। হযরত আলী (রা:) ঘোষণা করলেন, আমি রাসূল (সা:) এর রীতি অনুযায়ী তাদের মাঝে ফয়সালা করব। বিবাহিত পুরুষ পাবে সন্তান, আর ব্যভিচারীর জুটবে শাস্তি। অতঃপর ব্যভিচারী নারী -পুরুষ উভয়কে পঞ্চাশ ঘা করে চাবুক মারা হল।
সমকামিতার শাস্তি বিধান
সালেম ইবনে আবদুল্লাহ, আবান বিন উসমান ও যায়েদ বিন হাসান থেকে বর্ণিত, একবার হযরত উসমান (রা:) এর নিকট এক লোককে হাজির করা হল। সে কুরাইশ বংশীয় জনৈক বালকের সাথে কুকর্মে লিপ্ত হয়েছে। ওখানে হযরত আলী
(রা:) উপস্হিত ছিলেন। হযরত উসমান (রা:) জানতে চাইলেন, লোকটি বিবাহিত কি -না? লোকেরা বলল, সে বিবাহ করেছে বটে, কিন্তু এখনো বাসর হয়নি। একথা শুনে হযরত আলী (রা:) বললেন,সে স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হয়ে থাকলে তাকে রজম (প্রস্তরাঘাতে হত্যা) করা আবশ্যক হত। যেহেতু মিলিত হয়নি তাই বেত্রাঘাত করা হোক। হযরত আবু আয়্যুব আনসারী (রা:) বলতে লাগলেন, আবুল হাসান যেমন সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। তেমনটিই আমি রাসূল (সা:) কে বলতে শুনেছি।
অতঃপর হযরত উসমান (রা:) আদেশে একশত
বেত্রাঘাত করা হল।
চক্ষু বিনষ্টের মামাল
শীয়া আলিমগণ ফূরূয়ে কাফী গ্রন্হে ইমাম জাফর সাদিক (রা:) এর বরাত ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন -
জাফর সাদিক বলেন, হযরত উসমান (রা:)এর
নিকট কায়েস গোত্রীয় এক লোক তার ক্রীতদাসকে ধরে এনে অভিযোগ করল, দাসটি তার চক্ষু ফুঁড়ে দিয়েছে। চোখের কোটায় পানি জমে গেছে। চোখের মণি স্বস্হানে বিদ্যমান থাকলেও সে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। হযরত উসমান (রা:) মীমাংসা করার জন্য বললেন, আমি তোমাকে চোখের বদলে 'দিয়াত' (ক্ষতিপূরণ) দিতে চাই। লোকটি দিয়াত নিতে অস্বীকার করল। জাফর সাদেক ( রা:) বলেন, উসমান (রা:) তাদের উভয়কে হযরত আলী ( রা:) এর নিকট পাঠিয়ে
( আলীকে) আদেশ করলেন,আপনি তাদের মাঝে ফয়সালা করে দিন। হযরত আলী (রা:) ও লোকটিকে প্রথমে দিয়াত দিতে চাইলেন। কিন্ত
লোকটি অস্বীকার করল। অতপর তাকে দ্বিগুণ দিয়াত নিতে অনুরোধ করাহল। তথাপি সে কিসাস ছাড়া অন্য কিসাস ছাড়া অন্য কিছুতে সম্মত হল না।।
No comments:
Post a Comment