Saturday, 6 July 2019

হযরত উসমান (রা:) সম্পর্কে হাশেমীগণের বর্ণনা

এতক্ষণ শুধু হযরত আলী (রা:) এর মন্তব্য এবং
হযরত উসমান (রা:) এর সাথে তাঁর বিভিন্ন ঘটনা
বর্ণনা করা হয়েছে। এখন হযরত আলী (রা:) এর সন্তানাদি এবংচাচাত ভাইদের থেকে এমন কিছু বর্ণনা তুলে ধরা হবে, যদ্বারা হযরত উসমান (রা:)
এর ফযিলত, মর্যাদা ও অবদান সম্বন্ধে ধারণা লাভ করা যাবে।
       হযরত আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা:) এর বর্ণনা এবং আরও কয়েকটি কিতাবে হযরত ইবনে
আব্বাস (রা:) এর এই রেওয়ায়েতটি এসেছে।।
 "হযরত আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা:) বলেন, হযরত আবু বকর (রা:) এর আমলে একবার অনাবৃষ্টি হেতু দুর্ভিক্ষ দেখা দিল। তখন লোকেরা সমবেত হয়ে হযরত আবু বকর (রা:) এর কাছে এসে  বলল, হুযূর, আকাশ থেকে বৃষ্টিপাত না হওয়ার ফলে জমি থেকে কিছু উৎপন্ন হয়নি। যার কারণে জনসাধারণ অত্যন্ত অভাবে ও দুর্গতির মাঝে রয়েছে। আশা করি,  সন্ধ্যার মধ্যে দয়াময়
আল্লাহ'র পক্ষ থেকে কোন সমাধান এসে যাবে।
      এর একটু পরেই শাম থেকে হযরত উসমান
(রা:) এর কর্মচারীরা এসে পড়ল। তার ১০০ উট বোঝাই করে গমের একটি চালান নিয়ে এল। খবর পেয়ে মদীনার লোকজন হযরত উসমান (রা:) এর
বাড়িতে উপস্হিত হয়ে দরজার কড়া নাড়লো। হযরত উসমান (রা:) ঘর থেকে বেরিয়ে দেখলেন যে, একদল লোক (ব্যবসায়ী) তাঁর ঘরের সামনে
উপস্হিত হয়েছে। তাদের দেখে তিনি বললেন,তোমরা কী চাও? তারা বলল: , অনাবৃষ্টির কারণে ফসল উৎপন্ন না হওয়ায় নগরীতে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। ফলে লোকজন গভীর খাদ্য সংকটে পড়েছে। আমরা শুনলাম যে, আপনার কাছে পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য আছে। ( সেগুলো আমরা কিনতে চাই) সুতরাং আপনি আমাদের কাছে সেগুলো বিক্রি করুন, যাতে আমরা গরীব মুসলমানদের খাদ্য সংকট দূর করতে পারি। একথা শুনে হযরত উসমান (রা:) অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে বললেন, আসুন ( দেখে শুনে)
কিনে নিন। ব্যবসায়ীরা বাড়ির ভেতরে ঢুকে দেখল যে, সেখানে প্রচুর  খাদ্যশষ্য মজুত আছে।
( তারা দেখার পরে)  হযরত উসমান (রা:) বললেন, আপনারা আমার ক্রয়মূল্যের উপরে কী
পরিমান লাভ দিতে পারবেন? তারা বললেন, আমরা দশ টাকায় বারো টাকা দিব। হযরত উসমান (রা:) বললেন, আমি তো এরচেয়ে বেশি লাভ পাচ্ছি। তখন তারা বললেন, তাহলে দশ টাকায় চৌদ্দ টাকা করে লাভ দিই। তিনি বললেন, আমি তো অন্যত্র এরচেয়ে বেশি লাভ পাচ্ছি। তখন তারা আবার বলর,তাহলে আমরা দশ টাকায় ১৫ টাকা করে দিতে পারি। তিনি বললেন,আমি তো অন্যত্র এরচেয়ে বেশি লাভ পাচ্ছি। একথা শুনে ব্যবসায়ীরা বলল,হে আবু আমর, মদীনায় তো আমরা ছাড়া আর কোন ব্যবসায়ী নেই, তাহলে আপনাকে এরচেয়ে বেশি লাভ কে দিচ্ছে? তিনি বললেন, আল্লাহপাক আমাকে এক টাকায় দশ টাকা দেয়ার ওয়াদা করেছেন, তোমরা কি এমন লাভ দিতে পারবে? তারা বলল,আরে আল্লাহ! তাই কি পারে? তখন হযরত উসমান (রা:) বললেন, আমি আল্লাহ পাককে সাক্ষী রেখে ঘোষণা করছি যে, আমি এসব খাদ্যশস্য গরীব মুসলমানদের জন্য বিনামূল্যেই দান করে দিলাম।
হযরত ইবন আব্বাস (রা:) বলেন, সে রাতেই আমি নবীজী (সা:) কে স্বপ্নে দেখলাম, তিনি নূরের পোশাক পরিহিত অবস্হায় একটি সাদা কালো ডোরাকাটা তুর্কী ঘোড়ায় চড়ে দ্রুতগতিতে কোথাও যাচ্ছেন। আমি বললাম,  হুযূর, আপনাকে দেখতে এবং আপনার সাথে দু'টি কথা বলতে আমার বহুদিন ধরে মনে চায়, তা আপনি ব্যস্ত হয়ে কোথায় যাচ্ছেন? গুযূর (সা:) বললেন, (আজ) উসমান এমন একটি দান করেছে, যেটি আল্লাহপাক কবুল করেছেন এবং এ উটলক্ষ্যে
জান্নাতে একটি আনন্দ -উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। আমাকে ও সেখানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
        হযরত হাসান ইবন আলী (রা:) এর বর্ণনা
হযরত উসমান (রা:) এর ফযিলত ও মর্যাদা সম্পর্কে হযরত হাসান (রা:) এর একটি বর্ণনা উলামায়ে কেরাম উল্লেখ করেছেন। হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দেসে দেহলভী'র ইযালাতুল খাফাসহ আরও কয়েকটি কিতাবে বর্ণনাটি উদ্ধৃত
হয়েছে।
       বর্ণনাসমূহের সার -সংক্ষেপঃ
একবার কুফায় হযরত হাসান বিন আলী (রা:)
দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করেন। তিনি বলেন, হে লোক সকল! আমি রাতে আশ্চর্য এক স্বপ্ন দেখেছি।
আল্লাহ তাআলা আরশে আযীমে সমাসীন। মহানবী (সা:) এসে আরশের একটি পায়ার নিকট দণ্ডায়মান হলেন। অতপর হযরত আবু বকর (রা:) আগমন করলেন। তিনি মহানবী (সা:) এর কাঁধে হাত রাখলেন। অতপর হযরত উমর (রা:) এলেন তিনি হাত রাখলেন হযরত আবু বকর (রা:) এর কাঁধে। অতঃপর  এলেন হযরত উসমান বিন আফফান (রা:)। তিনি হযরত উমর (রা:) এর কাঁধে হাত রাখলেন। এ সময় হযরত উসমান (রা:)
স্বীয় কর্তিত মস্তক ধারণপূর্বক আরজ করলেন, হে আল্লাহ! আপনি আপনার বান্দাদেরকে জিজ্ঞাসা
করুন, তারা কী করণে আমাকে হত্যা করেছে?
অতঃপর হযরত হাসান (রা:) বলতে লাগলেন, আকাশ হতে পৃথিবীর দিকে রক্তের দুটি ধারা প্রবাহিত হতে দেখা গেল। বলা হল, এটি উসমানের রক্ত, এর প্রতিশোধ নেওয়া হবে। এরপর হযরত আলী (রা:) কে সম্বোধন  করে
লোকেরা বললেন, হযরত হাসান (রা:) যা বলেছেন
তা কি আপনি শুনেছেন? প্রত্যুত্তরে হযরত আলী
(রা:) বললেন, সে যা দেখেছে তাই বিবৃত করেছে।
 এ বিষয়ের সমর্থনে 'আত -তামহীদ ওয়াল বয়ান ফী মাকতালিশ শহীদ উসমান' (পৃষ্ঠা:২৩৫) গ্রন্হে হযরত হাসান বিন আলী (রা:) এর বক্তৃতা প্রসঙ্গ
বিস্তারিত বিধৃত হয়েছে। সেখানে হযরত উসমান (রা:) এর মর্যাদার বিবরণেন পাশাপাশি স্বপ্নটির কথারও উল্লেখ রয়েছে। আগ্রহী পাঠক দেখে নিতে পারেন। 'কিতিবুত তামহীদ'এর রচয়িতা স্পেনের প্রসিদ্ধ আলেম মুহাম্মাদ বিন ইয়াহইয়া বিন আবি বকর (মৃত্যু: ৭৪১হি:) নিম্নে মূলগ্রন্হের উদ্ধৃতি
উল্লেক করা হল --
হযরত যাইনুল আবিদীন বিন হযরত হুসাইন (রা:) এর বক্তব্য হযরত যাইনুল আবিদীন এর নিম্নোক্ত
বর্ণনিটি আবু নাঈম ইস্পাহানী স্বীয়গ্রন্হ "হিলয়াতুল আউলিয়া' তৃতীয় খন্ডে যাইনুল আবিদীন রাহ: এর আলোচনায় উল্লেখ করেছেন এবং বিখ্যাত শীয়ামতাবলম্বী আলেম আলী বিন ঈসা আরবিলী (মৃত্যু : ৬৮৭হি:) স্বীয় গ্রন্হ 'কাশফুল গুম্মাহ ফী মা'রাফাতিল আইম্মাহ' দ্বিতীয় খণ্ডে যাইনুল আবেদীন রাহ: এর আলোচনায় বিধৃত করেন। কাশফুল গুম্মাহ
থেকে মূূল উদ্ধৃতি --
একবার যাইনুল আবিদীন রাহ: এর নিকট ইরাকী
দল এসে হযরত আবুু বকর, উমর ও উসমান (রা:) এর সম্বন্ধে নিন্দা ও সমালোচনা করল। তাদের কথাবার্তা শেষ হলে যাইনুল আবিদীন রাহ:
তাদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, তোমরা কি সে সকল প্রথম স্হানীয় মুহাজিরগণের অন্তর্ভূক্ত, যাদের সম্বন্ধে কুরআন মজীদে  এসেছে,  'তাদেরকে তাদের ঘর -বাড়ি ও সহায় -সম্পত্তি
থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে শুধু এ কারণে যে, তারা আল্লাহর সন্তোষ ও অনুগ্রহের অন্বেষী ছিল এবং আল্লাহ ও রাসূলুল্লাহ (সা:) কে সহযোগিতা করত।
বস্তুত: তারাই সত্যবাদী। ইরাকীগণ উত্তর দিলেন,
আমরা তাদের দলভূক্ত নই। পুনরাই যাইনুল আবিদীন রাহ: জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কি
তাদের অন্তর্ভূক্ত, যারা মুহাজিরদের পূর্বে মদীনায়
বসবাস করত এবং তাদের পূর্বে ঈমান আনয়ন করেছিল। তারা মুহাজিরদের ভালবাসে এবং মুহাজিরদের যা প্রদান করা হয়েছে তজ্জন্যে মনে
ঈর্ষ পোষণ করে না। অভাব -অনটন সত্ত্বেও তারা
নিজেদের উপর মুহাজিরদের প্রাধান্য দেয়।  ইরাকীগণ উত্তর দিল, না।
যাইনুল আবিদীন রাহ: বললেন, তোমরা এই দুটি দলের অন্তর্ভূক্ত হতে অস্বীকৃত হয়েছে। কাজেই আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি,তোমরা কখনোই তাদের অন্তর্ভূক্ত নও, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 'আর যারা তাদের পরে আগমন করেছে, তারা বলে হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকেও অগ্রনী ঈমানদার ভাইদেরকে ক্ষমা
করুন এবং আমাদের অন্তরে ঈমানদারদের প্রতি বিদ্বেষ রাখবেন না। তোমরা এখান থেকে বের হয়ে যাও। তোমরা যেমন আল্লাহ তোমাদের প্রতি তেমন আচরণ করুন।

No comments:

Post a Comment