এ অধ্যায়ে হযরত সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর সাথে হযরত আলী (রা:) এর মধ্যকার উত্তম সম্পর্ক ও চমৎকার বোঝাপড়ার বিষয়গুলো প্রামান্যপুস্তক থেকে নেওয়াহবে। আশাকরি সুধী পাঠকের এতে তৃষ্ণা মেটবে।
( এক )
প্রথমতঃ সিদ্দীকে খেলাফতে ফেকহী মাসয়ালা বয়ান করা ও ফতোয়া দানে হযরত আলী (রা:) এর চোখে পড়ার মত অংশীদারিত্ব।
( দুই )
দ্বিতীয়ত: যুদ্ধকার্যে, সৈন্যপ্রহরা সর্বোপরি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে তাঁর কার্যকারী অংশগ্রহণ।
( তিন )
সমকালীন খলীফা থেকে হাদীয়া গ্রহণ -প্রদানে হযরত আলী (রা:) এর অংশগ্রহণ ছিল অন্যান্য সাহাবাদের মত সমান্তরাল।
( চার )
খেলাফতে সিদ্দীকে ও খেলাফতে ফারুকীতে অন্যান্য সাহাবোদের মত ইসলামী দন্ডবিধান ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় কার্যে হযরত আলী (রা:) সমানে অংশগ্রহণ করেছেন।
উপরিউক্ত চারটি বিষয় আল্লাহ পাক নেক বান্দাদের পারস্পারিক সম্পর্কের দিকটাকে প্রকটাকারে কী ফুটিয়ে তোলে নয় কি?
ফতোয়া প্রদানে আলী (রা:)
খেলাফতে সিদ্দীকিতে হযরত আলী (রা:) এর
অবস্হান ফতোয়া দানের ক্ষেত্রে অন্যান্য সাহাবাদের চেয়ে অগ্রগামীই ছিল। ঐতিহাসিক ইবনে সায়াদের ভাষ্য --
"আবদুর রহমান ইবনে কাসেম তার বাবা কাসেমের সূত্রে বর্ণনা করেন যে, আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) যখন বিদগ্ধজন ও চিন্তাশীল লোকদের থেকে পরমর্শের জরুরত মনে করতেন
তখন মুহাজির -আনসারদের মাঝে বিশেষ করে
হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা:) ,হযরত ওসমান গণী (রা:) , হযরত আলী (রা:) , হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা:) , হযরত মায়াজ ইবনে জাবাল (রা:) , হযরত উবাই ইবনে কায়াব (রা:) ও হযরত জায়েদ ইবনে ছাবেত (রা:) কে ডেকে পাঠাতেন। এরা খেলাফত যুগের সেরা মুফতি ছিলেন। ফতোয়াপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে জনগণ এদের কাছেই ধর্ণা দিতেন। আবূ বকর (রা:) এর খেলাফতের শেষ পর্যন্ত এ ধারা চালু ছিল। ওমর
(রা:) ও মশওয়ারার এ ধারাটি চালু রাখেন এবং সকলকে এ কাজে ডেকে পাঠাতেন।
এভাবে শীয়া ঐতিহাসিকদের গ্রন্হেও হযরত আলী (রা:) এর ফতোয়া দানের ক্ষেত্রে অগ্রগামিতার উল্লেখ বিদ্যমান --
"আবূ বকর (রা:) এর খেলাফতযুগে নিম্নোক্ত ব্যক্তিবর্গকে ফেকহী মাসায়েলে ডেকে পাঠানো হত। এরা যথাক্রমে -হযরত আলী ইবনে আবূ তালেব, ওমর ইবনে খাত্তাব, মুয়ায ইবনে জাবাল,
উবাই ইবনে কায়াব, যায়দ ইবনে ছাবিত ও আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযিআল্লাহু আনহুম।
সংক্ষিপ্তসার
১। গুরুত্বপূর্ন কাজে সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর
মাশওয়ারা করার অভ্যাস ছিল। খেলাফতকার্যে তিনি স্বেচ্ছাচারী ছিলেন না।
২। সিনিয়র মুহাজির ও আনসারীরা খলীফায়ে ইসলামের সাথে সদাচার করতেন।
৩। বিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞা মুহাজির আনসারীদের মাঝে
হযরত আলী (রা:) ছিলেন অন্যতম।
৪। সিদ্দীকি ও ফারুকী খেলাফতে হযরত আলী (রা:) মজলিসে শুরার অন্যতম সদস্য ছিলেন।
উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা প্রতীয়মান হলো হযরত আবূ বকর (রা:) আলী মুরতাযা (রা:) এর প্রতি
নেহায়েত আস্হাবান ছিলেন। তাদের মাঝে চমৎকার বোঝাপড়া ছিল। ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক।
সিদ্দীকে খেলাফত যুদ্ধাবস্হতার সম্মুখীন হলে হযরত ইবূ বকর সিদ্দীক (রা:) বড় বড় সাহাবা নিয়ে পরামর্শ করতেন। এক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরাম আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) এর সঙ্গ দিতেন। বিশেষ করে হযরত আলী (রা:) সকল কাজে খলীফার সাহায্যে অগ্রজ থাকতেন। এ সম্পর্কে আমরা কিছু ঐতিহাসিক প্রমাণাদি তুলে ধরব, উপরিউক্ত দাবী আদায়ে যা আমাদের দাবীকে প্রমাণপুষ্ট করবে।
হাফজ মুহিবুদ্দিন আহমাদ ত্ববারী (মৃ: ৬৯৪ হি:) তাঁর 'যাখাইরুল মুরতাযা ফী মানাকিবী যাবিল কুরবা' -এ কলেণ -
"হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) মুরতাদবিরোধী অভিযানে অন্যান্য সাহাবাদের পরামর্শ নেওয়ার পরে হযরত আলী (রা:) এর কাছে প্রশ্ন করেন, হে আবূল হাসান! আলী (রা:) এর উপমান আপনি এ বিষয়ে কী বলেন? হযরত আলী (রা:) বলেন, মুরতাদ ও যাকাত অস্বীকারকারীদের থেকে নবী
করীম (সা:) যা যা আদায় করতেন আপনি যদি এর অন্যথা করেন তাহলে আপনি রাসূল (সা:) এর বিরোধীতা করলেন। এ কথা শুনে সিদ্দীকে আকবার (রা:) বললেন, আপনি যেহেতু এই পরামর্শ দিলেন সেহেতু যাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে যাকাতের উটতো দুরের কথা উটের রশিও আমি ছাড়ব না। বাদ সাধলে যুদ্ধ ঘোষণা করব।
যুল কিচ্ছার ঘটনা
"হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা:) থেকে বর্ণিত, আমার বাবা হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) ভাঙ্গা তলোয়ার হাতে যিল কিসসায় যাচ্ছিলেন।
হযরত আলী (রা:) ও এ সময় তাঁর সাথে ছিলেন। তিনি খলীফার লাগাম হাতে নিয়ে বললেন, রাসূলের খলীফা হে! কোথায় যাচ্ছেন আপনি? এক্ষণে আমি আপনাকে ওই কথাই বলব স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা:) উহুদ প্রান্তরে আপনাকে যা বলেছিলেন। আপনি তলোয়ার কোষবদ্ধ করুন।
আপনার সত্বা নিয়ে আমাকে উদ্বিগ্ন করে তুলবেন না। কসম খোদার! আপনার ওপর কোনও মুসিবত আপতিত হলে তাহলে আপনার পরে ইসলামের প্রশাসন একেবারেই ভেঙ্গে পড়বে। সিদ্দীকে আকবার এই পরামর্শ কবুল করে ফিরে এলেন এবং চলমান সৈনিকদের রওয়ানা করিয়ে দিলেন। এক্ষণে শীয়া বন্ধুদের কিতাব থেকে দেখব যেখানে সিদ্দীকি খেলাফতে হযরত আলী মুরতাজা (রা:) এর অংশীদারিত্বের স্বীকৃতি বিদ্যমান। স্বয়ং হযরত আলীর নিজস্ব জবানবন্দি সে সব জায়গায় সবিস্তরে উল্লেখ আছে। যেমন : ওই সময় আমরা একজোট হয়ে বিরুদ্ধবাদীদের রুখে দাঁড়িয়েছিলাম। যদ্দরুণ ইসলাম ভারসাম্যপূর্ণ হয়েছিল। দেশে শান্তি -স্হিতি কায়েম হয়েছিল। নাহজুল বালাগাহ' র ভাষ্য --
"হযরত আলী (রা:) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) এর পর আরব্য মুরতাদেরা মাথা উচুঁ করে দাঁড়ালে তাদেরকে রুখে দাঁড়ানো হয়। এতে ফেৎনা খতম হয় এবং দ্বীন ইসলামে শান্তি ফিরে আসে। দ্বীন ছিল এ সময় বিক্ষিপ্ত ও দোদুল্যমান। এক সময় এই মারাত্মক অবস্হা কেটে যায়।
সংক্ষিপ্ত সার :
হযরত আবূ বকর (রা:) এর খেলাফতে প্রকৃতিই হযরত আলী (রা:) একজন নিষ্ঠাবান সহকর্মী ছিলেন। আদৌ তিনি এ খেলাফতের বিরোধী ছিলেন না। যদি এই খেলাফত বিদ্রোহাত্মক ও জবরদখলকৃত হত তাহলে শেরে খোদা অতি অবশ্যই বাহুবলে তা পুনরুদ্ধার করতেন। যেভাবে
বাহুবলে তিনি এই খেলাফতের নাযুক মুহুর্তে হায়দারী হাঁক থেকে তাতে শান্তি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছিলেন। নাযুক ওই মুহুর্তে আলী হায়দারের তলোয়ার খলীফার পক্ষেই কাজ করেছিল সেদিন।
উপরোক্ত বিষয় দ্বারা আরো জানা গেল, খোলাফায়ে রাশেদীনের সাথে হযরত আলী (রা:) এর খুবই হৃদ্যতা ও আন্তরিক যোগােযগ ছিল। যদিও পরবর্তীতে লোকেরা তাদের মাঝে অনৈক্য ও শত্রুতার কল্পকাহিনী ফেঁদেছিল।
এমনিভাবে শীয়া -সুন্নীদের কিতাবেই রোম ও সিরিয়া সম্পর্কিত সুসংবাদবাহী একটি ঘটনা বিদ্যমান। সুধী পাঠকের খেদমতে সেই ঘটনাটি উল্লেখ করা থেকে লোভ সামলাতে পারছি না।
ঐতিহাসিকগণ লিখেছন, হযরত আবদুল্লাহ ইবন আবি আওফা থেকে বর্ণিত, রোমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে গিয়ে হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) প্রবিন আনসার ও মুহাজির বিষেষ করে বদরী সাহাবীদের ডেকে পাঠালেন। তিনি যাঁদেরকে ডেকে পাঠালেন, তাদের মাঝে সর্বজনাব হযরত ওমর (রা:) ,হযরত ওসমান (রা:) ,হযরত আবদু রহমান ইবনে আওফ (রা:) ,হযরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা:),হযরত সাইদ ইবনে সায়েদ (রা:) ও হযরত আবূ ওবায়দা (রা:)। তাঁরা এলে তিনি তাদের কাছে পরামর্শ চাইলেন, তারা পরামর্শ দিলেন --
"হযরত আলী (রা:) ওই দলের মাঝে খামোশ হয়ে বসেছিলেন। সিদ্দীকে আকবার (রা:) এ সময় বললেন, আবূল হাসান! আপনার মতামত কী ? বলুন! হযরত আলী বললেন, বললেন, আপনি স্ব -সৈন্যেে রোম আক্রমণ করেন কিংবা আপনি ছাড়াই সৈন্য প্রেরীত হোক না কেন -উভয় অবস্হায়ই জয় আপনার পদচুম্বন করবেই। আবূ বকর (রা:) বললেন, আল্লাহপাক আপনার আশাকে সুসংবাদে রূপান্তরিত করুন। তা আপনার এই আশাবাদের উৎস কী? আলী (রা:) বললেন, আমি নবী করীম (সা:) থেকে শুনেই বলছি। তিনি ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি এই দ্বীনের সাথে প্রতিদ্বন্দিতায় নামবে তাদের ওপর এই দ্বীন বিজয়ী হবেই। এমনকি দ্বীনদারগণও বিজয়ী হবেন। পক্ষান্তরে যারা দ্বীনকে মিসমার করার ইচ্ছা করবে, পরিনামে তারাই ধ্বংস হয়ে যাবে। দ্বীন স্বরূপে দৃঢ়পদ হবে। বিরোধিরা হবে পরাস্ত।
হযরত আলী (রা:) এর নবীজীর এই ফরমান শোনার পর সিদ্দীকে আকবার (রা:) বললেন, আলী! আপনি আমাকে খুশী করলেন। আল্লাহ পাক আপনাকে খোশ করেন।
শীয়া বন্ধুদের কিতাবেও আমরা উপরিউক্ত ঘটনার
শব্দচিত্র খুঁজে পাই --
"আবূ বকর রোম আক্রমনের পরিকল্পনা করলে
সাহাবীদের নিয়ে পরামর্শে বসেন। হযরত আলী
(রা:) এর কাছে খলীফা আবূ বকর (রা:) মত চাইলে তিনি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অনুরোধ জানান। বলেন, আপনি এ কাজ করলে বিজয়ী
হবেন। হযরত আবূ বকর (রা:) বলেন, আপনি বডড একটি ভাল কথা বললেন। একটি সুসংবাদ দিলেন।
সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর যুগে একবার মদীনা মুনওয়ারায় শত্রুর আক্রমনের সম্ভাবনার কথা জানা গেল। নায়ক ওই মুহুর্তে মদীনা তাইয়েবার সুরক্ষায় সৈন্য প্রহরার জরুরী হয়ে পড়ল। হযরত
আলী (রা:) এ সময় সেনাদলে শামিল হয়ে প্রহরাকার্য চালিয়ে গেলেন। সিদ্দীকে আকবার (রা:) ই এসব পরিকল্পনার রূপকার ছিলেন। আলী (রা:) উৎসাহে এসব মহতি কাজে এগিয়ে এলেন।
ইবনে জারীর তাবারীর ভাষ্য --
"হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) মদীনা শরীফ
হেফাজতকল্পে এর রাস্তাসমূহের ওপর সেনাবাহিনী প্রেরণ করলেন। সেনাদলের পুরোভাগ হযরত আলী (রা:) ইবনে মাসউদ (রা:) ,যুবায়ের (রা:), তালহা (রা:) কে রাখলেন। বাদবাকী সকলকে মদীনার মসজিদে জমায়েত করে খলীফা আবূ বকর (রা:) বললেন, মুসলিম ভ্রাতাগণ! এলাকার
লোকজন ইসলাম ত্যাগ করা শুরুকরে দিয়েছে।
ওদের প্রতিনিধিরা দিন রাত্রীর যে কোনও সময়
তোমাদের ওপর আক্রমণ করে বসবে। ১২ -১৪ মাইল দূরে এই মুহুর্তে ওদের অবস্হান।
উপরোক্ত ঘটনাসমূহ দ্বারা প্রতীয়মান হচ্ছে, খেলাফতে সিদ্দীকী যদি অবৈধ ও বাতিল হত তাহলে বিপক্ষের সাথে যোগ দিয়েই হযরত আলী
(রা:) এর প্রতিশোধ নিতেন। উল্টো তিনি মদীনা
রক্ষাসহ সকল অভিযানে খেলাফতের সঙ্গ দিলেন। শুধুই কী সঙ্গ! সবার আগে সিদ্দীক (রা:)
এর সাথে পুরোভাগে এ এক অন্য আলী (রা:)। এ এক সুখ-দুঃখের সাথী, সহকর্মী ও সহমর্মী।
Monday, 27 May 2019
Sunday, 26 May 2019
দ্রুত বায়াত প্রসঙ্গে তাবেয়ীদের অভিমত
হযরত আবূ বকর (রা:) এর হাতে হযরত আলী (রা:) এর সসন্তুষ্টিতে দ্রুত বায়াত প্রসঙ্গে ইতোপূর্বে বিশদ আলোচনা হয়েছে। বক্ষ্যমান পরিচ্ছেদ পেছনের বর্ণনাসমূহকে আরো প্রমাণপুষ্ট ও শক্তিধর করবে। প্রতীয়মান হবে, হযরত আলীর বায়াতটি ছিল চাপমুক্ত, স্বতঃস্ফুর্ত সর্বোপরি দ্রুত। ১. সাঈদ ইইবনুল মুসাইয়িব (রা:) এর ভাষ্য
"হযরত আলী (রা:) সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর হাতে বায়াত নিতে ঘর থেকে বেরোলেন। পথিমধ্যে কতিপয় আনসারী থেকে বায়াত প্রসংগে কিছু কথা শুনে বললেন, যে ব্যক্তিকে স্বয়ং নবী করীম (সা:) অগ্রজ করেছেন তাকে অনুজ করবে কে? সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব বলেন, হযরত আলী (রা:) এমন একটা ভারী (সারগর্ব) কথা বললেন, আর কোন লোক এমন কথা বলতে পারে নি।
২. হাসান বসরী (রা:) এর ভাষ্য
দ্রুত বায়াত প্রসংগে কায়েস ইবনে উবাদাহর সূত্রে হাসান বসরী (রহ:) বর্ণনা করেন --
"কায়েস বলেন, হযরত আলী (রা:) আমাকে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলোতে অসুস্হ ছিলেন। সে সময় তিনি বলেছিলেন, আবূ বকর (রা:) কে সামায পড়াতে বল। (সুতরাং অন্তিম মুহুর্তে তিনিই নামায পড়িয়েছিলেন, তিনি ইন্তেকাল করার পর আমি একটি বিষয়ে ভেবে দেখেছি যে, 'নামায ইসলামের প্রতীক এবং দ্বীন প্রতিষ্ঠার মাধ্যম। সুতরাং দ্বীনের গুরুত্বপূর্ন কাজে আল্লাহর রাসূল (সা:) যাকে নির্বাচিত করেছেন, পার্থিব কাজে আমরাও তাঁকে নির্বাচিত করতে পারি। পরে আমরা হযরত আবূ বকর (রা:) এর হাতে বায়াত হই।
৩. তাবেয়ী আবু জুহাফ (রা:) এর ভাষ্য
আবূ জুহাফ (রহ:) এর একটি ভাষ্য এখানে প্রনিধানযোগ্য। তিনি বলেন --
"আবূূ জুহাফ (রহ:) বলেন, হযরত আবূূ বকর (রা:) খলীফা নিযুক্ত হলে জনগণের সামনে তিনবার আওয়াজ দিয়ে বলেন, উপস্হিত জনতা আমি তোমাদের বায়াত ফিরিয়ে দিচ্ছি (তোমরা অন্য কাউকে খলীফা নাযুক্ত কর) ওই সময় হযরত আলী (রা:) বলেন, আমরা নিজেরা না এই বায়াত ফিরিয়ে নেব, না আপনাকে ফেরৎ দিতে দেব। রাসূলুল্লাহ (সা:)আপনাকে নামায পড়াতে আদেশ করেছিলেন। এক্ষণে কে আপনাকে ওই পদমর্যাদা থেকে সড়াবে?
৪. ইমাম যায়দ ইবনে আলী (রহ:) এর ভাষ্য
দ্রুত বায়াত প্রসংগে যায়দ ইবনে আলী (রহ:) বলেন --
"ইমাম যায়দ ইবনে আলী (রা:) তাঁর বাপ -দাদাদের সূত্রে বলেন, একদা হযরত আবূ বকর (রা:) মসজিদে নববীর মিম্বারে দাঁড়িয়ে বলেন, কেউ যদি আমার খেলাফতকে অপছন্দ করেন তাহলে আমি এই খেলাফতকে ফিরিয়ে দিতে প্রস্তুত আছি। কথাটি তিনি তিনবার উচ্চারণ করলেন। কথাটির জবাবে হযরত আলী (রা:) বললেন, কসম আল্লাহর! আমরা যেমন আমাদের বায়াত ফেরৎ নেব না তেমনি আপনাকে বলব না ফেরৎ দিতেও। আল্লাহর রাসূল (সা:) আপনাকে অগ্রজ করেছেন -- একে পশ্চাতে ফেলতে পারে কে?
৫.আবদুর রহমান ইবনে আবূ বকরাহ (রা:) এর ভাষ্য
আবূ তালেব আশারী তার 'ফাযায়েলে গ্রন্হে সনদসহ বর্ণনা করেন --
"আবদুর রহমান ইবনে আবূ বকরাহ (রহ:) বর্ণনা করেন, আলী (রা:) একদা আমার অসুস্হকালীন খোঁজ খবর নিতে এলেন। ওইসময় তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) ইন্তেকাল করলে হযরত আবূ বকরকে জনগণ খলীফা করে নেয়ায় আমিও তাঁর হাতে বায়াত হই এবং তাঁর প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করি। আবূ বকর (রা:) ইন্তেকাল করলে হযরত উমর (রা:) খলীফা নিযুক্ত হন। আমি তাকে খলীফা মেনে নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করি। পরে হযরত উমর (রা:) ইন্তেকাল করার পূর্বে একটি মজলিসে শুরা কায়েম করে যান। এ সময় মানুষেরা হযরত ওসমান (রা:) এর হাতে বায়াত নেন। আমিও সকলের দেখাদেখি তাঁকে খলীফা সাব্যস্ত করে তাঁর প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করি।
"কায়েস ইবনে আব্বাদ বলেন, হযরত আলী (রা:) বলেন,যিনি শস্য -দানা ও প্রাণ পয়দা করেছেন সেই সত্তার কসম! যদি সরওয়ায়ে কায়েনাত (সা:) খেলাফত বিষয়ে আমার ব্যাপারে কোনও সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকতেন তাহলে আমি সেই শক্তিবলে দণ্ডায়মান থাকতাম এবং আবূ বকর (রা:) কে মেম্বারে নববীর কোনও সিড়িতে চড়তে দিতাম না।
উপরোক্ত বর্ণনাসমূহের পর আরো বিস্তারিত জানার জন্য জঙ্গে জামালকালীন বর্ণনাসমূহও দেখা যেতে পারে। যেমন --
৬ . "হযরত আলী (রা:) থেকে বর্ণিত জঙ্গে জামালের দিনে তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) তাকে ক্ষমতা ও খেলাফত বিষয়ে কোনও অসিয়ত করেননি। নেননি আমাদের থেকে কোনও প্রতিশ্রুতিও। তবে আমাদের মনে গাওয়া দিত খেলাফতের অধিকারী আমরা। যদি এই ব্যাপারটি যথার্থ হত তাহলে আল্লাহ পাক তা করিয়ে দেখাতেন। যাহোক আবূ বকর (রা:) খলীফা হলেন। তাঁর প্রতি আল্লাহ পাক দয়াপরবশ হোন। তিনি ধর্মের গতিপথ সঠিক রেখেছেন এবং নিজেই ধর্মের ওপর ইস্পাত কঠিন থেকেছেন। তারপরে হযরত উমর (রা:) খলীফা হলেন। আল্লাহপাক তাঁর প্রতি দয়াপরবশ হোন। তিনি ধর্মকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং নিজেও ধর্মের প্রতি অটল থেকেছেন।
৭ . বিশিষ্ট তাবেয়ী হযরত সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব (রহ:) এর আরেকটি ভাষ্য:
" হযরত আলী (রা:) খলীফা নিযুক্ত হলে জনৈক ব্যক্তি তাঁকে বলেছিল, মুহাজির -আনসারীরা আপনাকে বাদ দিয়ে আবূ বকর (রা:) কে খলীফা করতে গেল কেন? অথচ ইযযত সম্মানে আপনি সবার চেয়ে সেরা। ইসলাম গ্রহণের দিক দিয়েও আপনি সর্বপ্রাচীন। তিনি বললেন, যদি আমীরুল মুমিনীনের হাত থেকে আল্লাহ তোমাকে না বাঁচাতেন তাহলে এতক্ষণে তুমি মারা পড়তে। আর যদি তুমি জীবিতই থাকো তাহলে আমার ভয় সর্বদা তোমাকে তাড়া করে ফিরবে। (যা তোমাকে এই বিপথগামী চিন্তা থেকে বাঁচাবে) তুমি কি জানোনা হযরত আবূ বকর (রা:) চারটি বিষয়ে আমার চেয়ে সেরা। যা আমি না করতে পারব, না এর বিনিময়ে আমি কিছু করেছি। ১.গাছে ছৌরে হিজরতকালীন তাঁর সঙ্গদান। ২. হিজরতে অগ্রগামিতা। ৩. আমার শৈশবে ইসলাম গ্রহণ আর তাঁর বার্ধক্যে। ৪. স্হলাভিষিক্ত হিসেবে নবীজীর স্হানে নামাযে ইমামতি।
৮. ইমাম হাসান (রা:) এর ভাষ্য --
"ইমাম হাসান (রা:) থেকে বর্ণিত, হযরত তালহা ও তার দলবলের ব্যাপারে হযরত আলী (রা:) বসরা আগমন করলে আব্দুল্লাহ কাওয়া ও ইবনে আব্বাদ তার খেদমতে হাজির হন। তারা বলেন, আমীরুল মুমিনীন! আপনি এই সফর সম্পর্কে বলুন! নবী করীম (সা:) কী আপনাকে এই সফর সম্পর্কে কিছু বলেছিলেন? কোন ওয়াদা-অঙ্গীকার নিয়েছিলেন? কিংবা আপনার অভিমত কী? এখন উম্মতের মাঝে বিক্ষিপ্ততা ও হতাশা ছড়িয়ে পড়ছে। ঐক্য ও সংহতিতে ফাটল ধরছে। হযরত আলী (রা:) বলেন, আমি রাসূল (সা:) সম্পর্কে কোন মিথ্যাচার করব না। কসম আল্লাহর! সরওয়ারে কায়েনাত (সা:) এর মৃত্যু আচমকাই হয়নি। কেউ তাঁকে শহীদও করেনি। রাসূল (সা:)
রোগভোগে পড়েছিলেন। মোয়াজ্জিন এসে তাকে নামাযের সংবাদ দিলে তিনি বললেন, আবূ বকরকে বলো নামায পড়িয়ে দিতে। তিনি আমাকে ছেড়ে আবূ বকরকেই এই মহৎ কাজটি করতে বললেন। অথচ আমার পদমর্যাদা তোমাদের অজানা নয়। সত্যিই তিনি যদি আমাকে নিয়ে কোনও ওয়াদা -অঙ্গীকার করতেন তাহলে অতি অবশ্যই আমি তা পূরণ করতে দাঁড়াতাম।
রাসূলুল্লাহ (সা:) ইন্তেকাল করলে মুসলমানেরা তাদের ভূত -ভবিষ্যত নিয়ে ভাবল। তিনি তাদের ভবিষ্যৎটি আবূ বকর (রা:) এর ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। ধর্মীয় ব্যাপারে আবূ বকর (রা:) কেই মুতাওয়াল্লী বানালেন। মুসলমানরাও তার হাতে বায়াত নিয়েছিল। তিনি জেহাদের জন্য তৈরী হলে আমিও তার সাথে জেহাদে শরীক হতাম। তিনি আমাকে কোন হাদীয়া দিলে তা গ্রহণ করতাম। হযরত আবূ বকর (রা:) শরয়ী কোনও দন্ডবিধান কায়েম করলে আমাকে এতে শরীক করতেন। পরে তিনি ইন্তেকাল করলে তাঁর সন্তানেরা যে কোনও কাজে আমাকে তাদের সঙ্গে রাখতেন। কিন্তু খলীফা হিসেবে তিনি মৃত্যুর আগে হযরত উমর (রা:) এরই নাম ঘোষনা করে যান। এ কাজে হযরত আবূ বকর (রা:) বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করেননি। মুসলমানেরা হযরত উমর (রা:) এর হাতে বায়াত হয়েছিল। আমিও তাদের দেখাদেখি তার হাতে বায়াত হয়েছিলাম। তিনি আমাকে জেহাদে উৎসাহিত করলে আমি তাতে সাড়া দিয়েছিলাম। তিনি আমাকে হাদীয়া -তোহফা দিলে তা সানন্দে গ্রহণ করতাম। কোনো দন্ডবিধান কায়েম করলে তাতেও তার সাথে থাকতাম।
পরবর্তিতে হযরত ওমর ইচ্ছা করলে যে কাউকে তার বংশ হতে খলীফা করে যেতে পারতেন কিন্তু তিনি তা করেননি। বরং মৃত্যুকালে তিনি ৬ সদস্যের একটি অন্তবর্তী সাব -কমিটি নির্বাচন করে যান। আমও ওই ৬সদস্যের এক সদস্য ছিলাম। এই কমিটি মনোনয়নের উদ্দেশ্য ছিল উম্মতের মধ্য হতে একজনকে খলীফা নিযুক্ত করা। এই ৬ জন হতে আমরা আবদুর রহমান ইবনে আওফকে আমীর নিযুক্ত করি। তিনি হযরত ওসমান (রা:) এর হাতে হাত রেখে বায়াত হন। ওই সময় আমি ভেবে দেখলাম আমি যে ওয়াদা ওই কমিটির কাছে করেছি তাতে এখনি আমাকে ওসমনের হাতে বায়াত নিতে হয়। কাল বিলম্ব না করে আমি বায়াত নিয়ে ফেলি। পরবর্তীতে তিনি
আমাকে যখন যে জিহাদে প্রেরণ করেন আমি স্বেচ্ছায় সেখানে প্রেরীত হই। তিনি যখন যেমন আমাকে হাদিয়া দেন তখন তা আমি সানন্দে গ্রহণ করে যেতে থাকি। ইসলামী দন্ড বিধান কার্যকারিতার প্রতিটিতে আমি তার সাথে অংশগ্রহণ করি। হযরত ওসমান (রা:) ও শহীদ হলে আমি খেলাফতবিষয়ে চিন্তা ভাবনা করতে থাকি। ভেবে দেখেছি আবূ বকর ও উমর (রা:) কে নিয়ে আমি যে ওয়াদা -অঙ্গীকার করেছি তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি। ওসমান (রা:) কে নিয়ে যে অঙ্গীকার করেছিলাম তাও পুরা করেছি (কাজেই খেলাফত বিষয়ে এক্ষণে আমিও যথোপুুক্ত)
"হযরত আলী (রা:) সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর হাতে বায়াত নিতে ঘর থেকে বেরোলেন। পথিমধ্যে কতিপয় আনসারী থেকে বায়াত প্রসংগে কিছু কথা শুনে বললেন, যে ব্যক্তিকে স্বয়ং নবী করীম (সা:) অগ্রজ করেছেন তাকে অনুজ করবে কে? সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব বলেন, হযরত আলী (রা:) এমন একটা ভারী (সারগর্ব) কথা বললেন, আর কোন লোক এমন কথা বলতে পারে নি।
২. হাসান বসরী (রা:) এর ভাষ্য
দ্রুত বায়াত প্রসংগে কায়েস ইবনে উবাদাহর সূত্রে হাসান বসরী (রহ:) বর্ণনা করেন --
"কায়েস বলেন, হযরত আলী (রা:) আমাকে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলোতে অসুস্হ ছিলেন। সে সময় তিনি বলেছিলেন, আবূ বকর (রা:) কে সামায পড়াতে বল। (সুতরাং অন্তিম মুহুর্তে তিনিই নামায পড়িয়েছিলেন, তিনি ইন্তেকাল করার পর আমি একটি বিষয়ে ভেবে দেখেছি যে, 'নামায ইসলামের প্রতীক এবং দ্বীন প্রতিষ্ঠার মাধ্যম। সুতরাং দ্বীনের গুরুত্বপূর্ন কাজে আল্লাহর রাসূল (সা:) যাকে নির্বাচিত করেছেন, পার্থিব কাজে আমরাও তাঁকে নির্বাচিত করতে পারি। পরে আমরা হযরত আবূ বকর (রা:) এর হাতে বায়াত হই।
৩. তাবেয়ী আবু জুহাফ (রা:) এর ভাষ্য
আবূ জুহাফ (রহ:) এর একটি ভাষ্য এখানে প্রনিধানযোগ্য। তিনি বলেন --
"আবূূ জুহাফ (রহ:) বলেন, হযরত আবূূ বকর (রা:) খলীফা নিযুক্ত হলে জনগণের সামনে তিনবার আওয়াজ দিয়ে বলেন, উপস্হিত জনতা আমি তোমাদের বায়াত ফিরিয়ে দিচ্ছি (তোমরা অন্য কাউকে খলীফা নাযুক্ত কর) ওই সময় হযরত আলী (রা:) বলেন, আমরা নিজেরা না এই বায়াত ফিরিয়ে নেব, না আপনাকে ফেরৎ দিতে দেব। রাসূলুল্লাহ (সা:)আপনাকে নামায পড়াতে আদেশ করেছিলেন। এক্ষণে কে আপনাকে ওই পদমর্যাদা থেকে সড়াবে?
৪. ইমাম যায়দ ইবনে আলী (রহ:) এর ভাষ্য
দ্রুত বায়াত প্রসংগে যায়দ ইবনে আলী (রহ:) বলেন --
"ইমাম যায়দ ইবনে আলী (রা:) তাঁর বাপ -দাদাদের সূত্রে বলেন, একদা হযরত আবূ বকর (রা:) মসজিদে নববীর মিম্বারে দাঁড়িয়ে বলেন, কেউ যদি আমার খেলাফতকে অপছন্দ করেন তাহলে আমি এই খেলাফতকে ফিরিয়ে দিতে প্রস্তুত আছি। কথাটি তিনি তিনবার উচ্চারণ করলেন। কথাটির জবাবে হযরত আলী (রা:) বললেন, কসম আল্লাহর! আমরা যেমন আমাদের বায়াত ফেরৎ নেব না তেমনি আপনাকে বলব না ফেরৎ দিতেও। আল্লাহর রাসূল (সা:) আপনাকে অগ্রজ করেছেন -- একে পশ্চাতে ফেলতে পারে কে?
৫.আবদুর রহমান ইবনে আবূ বকরাহ (রা:) এর ভাষ্য
আবূ তালেব আশারী তার 'ফাযায়েলে গ্রন্হে সনদসহ বর্ণনা করেন --
"আবদুর রহমান ইবনে আবূ বকরাহ (রহ:) বর্ণনা করেন, আলী (রা:) একদা আমার অসুস্হকালীন খোঁজ খবর নিতে এলেন। ওইসময় তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) ইন্তেকাল করলে হযরত আবূ বকরকে জনগণ খলীফা করে নেয়ায় আমিও তাঁর হাতে বায়াত হই এবং তাঁর প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করি। আবূ বকর (রা:) ইন্তেকাল করলে হযরত উমর (রা:) খলীফা নিযুক্ত হন। আমি তাকে খলীফা মেনে নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করি। পরে হযরত উমর (রা:) ইন্তেকাল করার পূর্বে একটি মজলিসে শুরা কায়েম করে যান। এ সময় মানুষেরা হযরত ওসমান (রা:) এর হাতে বায়াত নেন। আমিও সকলের দেখাদেখি তাঁকে খলীফা সাব্যস্ত করে তাঁর প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করি।
"কায়েস ইবনে আব্বাদ বলেন, হযরত আলী (রা:) বলেন,যিনি শস্য -দানা ও প্রাণ পয়দা করেছেন সেই সত্তার কসম! যদি সরওয়ায়ে কায়েনাত (সা:) খেলাফত বিষয়ে আমার ব্যাপারে কোনও সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকতেন তাহলে আমি সেই শক্তিবলে দণ্ডায়মান থাকতাম এবং আবূ বকর (রা:) কে মেম্বারে নববীর কোনও সিড়িতে চড়তে দিতাম না।
উপরোক্ত বর্ণনাসমূহের পর আরো বিস্তারিত জানার জন্য জঙ্গে জামালকালীন বর্ণনাসমূহও দেখা যেতে পারে। যেমন --
৬ . "হযরত আলী (রা:) থেকে বর্ণিত জঙ্গে জামালের দিনে তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) তাকে ক্ষমতা ও খেলাফত বিষয়ে কোনও অসিয়ত করেননি। নেননি আমাদের থেকে কোনও প্রতিশ্রুতিও। তবে আমাদের মনে গাওয়া দিত খেলাফতের অধিকারী আমরা। যদি এই ব্যাপারটি যথার্থ হত তাহলে আল্লাহ পাক তা করিয়ে দেখাতেন। যাহোক আবূ বকর (রা:) খলীফা হলেন। তাঁর প্রতি আল্লাহ পাক দয়াপরবশ হোন। তিনি ধর্মের গতিপথ সঠিক রেখেছেন এবং নিজেই ধর্মের ওপর ইস্পাত কঠিন থেকেছেন। তারপরে হযরত উমর (রা:) খলীফা হলেন। আল্লাহপাক তাঁর প্রতি দয়াপরবশ হোন। তিনি ধর্মকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং নিজেও ধর্মের প্রতি অটল থেকেছেন।
৭ . বিশিষ্ট তাবেয়ী হযরত সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব (রহ:) এর আরেকটি ভাষ্য:
" হযরত আলী (রা:) খলীফা নিযুক্ত হলে জনৈক ব্যক্তি তাঁকে বলেছিল, মুহাজির -আনসারীরা আপনাকে বাদ দিয়ে আবূ বকর (রা:) কে খলীফা করতে গেল কেন? অথচ ইযযত সম্মানে আপনি সবার চেয়ে সেরা। ইসলাম গ্রহণের দিক দিয়েও আপনি সর্বপ্রাচীন। তিনি বললেন, যদি আমীরুল মুমিনীনের হাত থেকে আল্লাহ তোমাকে না বাঁচাতেন তাহলে এতক্ষণে তুমি মারা পড়তে। আর যদি তুমি জীবিতই থাকো তাহলে আমার ভয় সর্বদা তোমাকে তাড়া করে ফিরবে। (যা তোমাকে এই বিপথগামী চিন্তা থেকে বাঁচাবে) তুমি কি জানোনা হযরত আবূ বকর (রা:) চারটি বিষয়ে আমার চেয়ে সেরা। যা আমি না করতে পারব, না এর বিনিময়ে আমি কিছু করেছি। ১.গাছে ছৌরে হিজরতকালীন তাঁর সঙ্গদান। ২. হিজরতে অগ্রগামিতা। ৩. আমার শৈশবে ইসলাম গ্রহণ আর তাঁর বার্ধক্যে। ৪. স্হলাভিষিক্ত হিসেবে নবীজীর স্হানে নামাযে ইমামতি।
৮. ইমাম হাসান (রা:) এর ভাষ্য --
"ইমাম হাসান (রা:) থেকে বর্ণিত, হযরত তালহা ও তার দলবলের ব্যাপারে হযরত আলী (রা:) বসরা আগমন করলে আব্দুল্লাহ কাওয়া ও ইবনে আব্বাদ তার খেদমতে হাজির হন। তারা বলেন, আমীরুল মুমিনীন! আপনি এই সফর সম্পর্কে বলুন! নবী করীম (সা:) কী আপনাকে এই সফর সম্পর্কে কিছু বলেছিলেন? কোন ওয়াদা-অঙ্গীকার নিয়েছিলেন? কিংবা আপনার অভিমত কী? এখন উম্মতের মাঝে বিক্ষিপ্ততা ও হতাশা ছড়িয়ে পড়ছে। ঐক্য ও সংহতিতে ফাটল ধরছে। হযরত আলী (রা:) বলেন, আমি রাসূল (সা:) সম্পর্কে কোন মিথ্যাচার করব না। কসম আল্লাহর! সরওয়ারে কায়েনাত (সা:) এর মৃত্যু আচমকাই হয়নি। কেউ তাঁকে শহীদও করেনি। রাসূল (সা:)
রোগভোগে পড়েছিলেন। মোয়াজ্জিন এসে তাকে নামাযের সংবাদ দিলে তিনি বললেন, আবূ বকরকে বলো নামায পড়িয়ে দিতে। তিনি আমাকে ছেড়ে আবূ বকরকেই এই মহৎ কাজটি করতে বললেন। অথচ আমার পদমর্যাদা তোমাদের অজানা নয়। সত্যিই তিনি যদি আমাকে নিয়ে কোনও ওয়াদা -অঙ্গীকার করতেন তাহলে অতি অবশ্যই আমি তা পূরণ করতে দাঁড়াতাম।
রাসূলুল্লাহ (সা:) ইন্তেকাল করলে মুসলমানেরা তাদের ভূত -ভবিষ্যত নিয়ে ভাবল। তিনি তাদের ভবিষ্যৎটি আবূ বকর (রা:) এর ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। ধর্মীয় ব্যাপারে আবূ বকর (রা:) কেই মুতাওয়াল্লী বানালেন। মুসলমানরাও তার হাতে বায়াত নিয়েছিল। তিনি জেহাদের জন্য তৈরী হলে আমিও তার সাথে জেহাদে শরীক হতাম। তিনি আমাকে কোন হাদীয়া দিলে তা গ্রহণ করতাম। হযরত আবূ বকর (রা:) শরয়ী কোনও দন্ডবিধান কায়েম করলে আমাকে এতে শরীক করতেন। পরে তিনি ইন্তেকাল করলে তাঁর সন্তানেরা যে কোনও কাজে আমাকে তাদের সঙ্গে রাখতেন। কিন্তু খলীফা হিসেবে তিনি মৃত্যুর আগে হযরত উমর (রা:) এরই নাম ঘোষনা করে যান। এ কাজে হযরত আবূ বকর (রা:) বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করেননি। মুসলমানেরা হযরত উমর (রা:) এর হাতে বায়াত হয়েছিল। আমিও তাদের দেখাদেখি তার হাতে বায়াত হয়েছিলাম। তিনি আমাকে জেহাদে উৎসাহিত করলে আমি তাতে সাড়া দিয়েছিলাম। তিনি আমাকে হাদীয়া -তোহফা দিলে তা সানন্দে গ্রহণ করতাম। কোনো দন্ডবিধান কায়েম করলে তাতেও তার সাথে থাকতাম।
পরবর্তিতে হযরত ওমর ইচ্ছা করলে যে কাউকে তার বংশ হতে খলীফা করে যেতে পারতেন কিন্তু তিনি তা করেননি। বরং মৃত্যুকালে তিনি ৬ সদস্যের একটি অন্তবর্তী সাব -কমিটি নির্বাচন করে যান। আমও ওই ৬সদস্যের এক সদস্য ছিলাম। এই কমিটি মনোনয়নের উদ্দেশ্য ছিল উম্মতের মধ্য হতে একজনকে খলীফা নিযুক্ত করা। এই ৬ জন হতে আমরা আবদুর রহমান ইবনে আওফকে আমীর নিযুক্ত করি। তিনি হযরত ওসমান (রা:) এর হাতে হাত রেখে বায়াত হন। ওই সময় আমি ভেবে দেখলাম আমি যে ওয়াদা ওই কমিটির কাছে করেছি তাতে এখনি আমাকে ওসমনের হাতে বায়াত নিতে হয়। কাল বিলম্ব না করে আমি বায়াত নিয়ে ফেলি। পরবর্তীতে তিনি
আমাকে যখন যে জিহাদে প্রেরণ করেন আমি স্বেচ্ছায় সেখানে প্রেরীত হই। তিনি যখন যেমন আমাকে হাদিয়া দেন তখন তা আমি সানন্দে গ্রহণ করে যেতে থাকি। ইসলামী দন্ড বিধান কার্যকারিতার প্রতিটিতে আমি তার সাথে অংশগ্রহণ করি। হযরত ওসমান (রা:) ও শহীদ হলে আমি খেলাফতবিষয়ে চিন্তা ভাবনা করতে থাকি। ভেবে দেখেছি আবূ বকর ও উমর (রা:) কে নিয়ে আমি যে ওয়াদা -অঙ্গীকার করেছি তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি। ওসমান (রা:) কে নিয়ে যে অঙ্গীকার করেছিলাম তাও পুরা করেছি (কাজেই খেলাফত বিষয়ে এক্ষণে আমিও যথোপুুক্ত)
Saturday, 25 May 2019
প্রসঙ্গ হযরত আলীর বায়াতঃ দৃষ্টিভঙ্গি ওলামায়ে কেরামের
হযরত আলী (রা:) এর বায়াতে বিলম্বজনিত যে বক্তব্য আল্লামা যুহরী দিয়েছেন। এদের কিছু উদ্ধতি এক্ষণে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করব।
এক.
বিদগ্ধ মুহাদ্দিস দিকপাল ইমাম বায়হাকী তার 'সুনানে কোবরা ' শীর্ষক গ্রন্হে বলেন -
"যুহরীর (যিনি একজন মহান তাবেয়ী) এ ভাষ্য যে, সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর হাতে বায়াত হতে হযরত আলী (রা:) ফাতেমা (রা:) এর মৃত্যুঅবধি যে দেরী করেছেন তা সনদের দৃষ্টিকোণ থেকে মুনকাতি (বিচ্ছিন্ন)। পক্ষান্তরে সকীফায়ে বনী সায়েদার ঘটনায় বর্ণিত আবূ সাঈদ খুদরী (রা:) এর বর্ণনা বিশেষ করে যখন সাধারণ মুসলমান যে ব্য়াত করেছিলেন তার সনদ মুত্তাসিল ও সহীহ।
এই ইমাম বায়হাকীই তার জগদ্বিখ্যাত আরেক কিতাব 'আল -ইতিকাদ' এ ব্যাপারটি আরো পরিস্কার করে উল্লেখ করেছেন। যেখানে তিনি বলেছেন, 'বিলম্বিত বায়াত' কথাটি খোদ ইমাম যুহরীর নিজস্ব বক্তব্য। এটি হযরত আয়েশা (রা:) এর বক্তব্য নয়। তাঁর ভাষ্য --
"হযরত আলী (রা:) সম্পর্কে বলা হয়, তিনি সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর হাতে বায়াত হতে ৬ মাসদেরী করেছিলেন - তা যুহরীর বক্তব্য, হযরত আয়েশা (রা:) এর নয়। অনেকে এ কথাকে আয়েশা (রা:) এর কথা বলে চালিয়ে দিয়েছেন। মা'মার ইবনে রাশেদ এটি বিস্তারিত বর্ণনা করেন এবং বর্ধিত অংশকে যুহরীর বক্তব্য বলে মত ব্যক্ত করেন। আমরা আবূ সাঈদ খুদরী (রা:) বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ করেছি যার সাথে বিজ্ঞ মাগাযী লেখকগণ একমত পোষণ করেন যে, জনগণের
সাথে সাকীফার দিনেই হযরত আলী (রা:) বায়াত হয়েছিলেন"।
শায়খুল ইসলাম হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ:) ফতহুল বারীতে খায়বার যুদ্ধের শেষ পর্বে বায়াত প্রসংগের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন -
"অর্থাৎঃ ইবনে হিব্বানসহ প্রমুখ ওলামায়ে কেরাম হযরত আবূ সাঈদ (রা:) এর ওই বর্ণনাকে বিশুদ্ধ (সহীহ) সাব্যস্ত করেছেন যাতে সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর হাতে হযরত আলী (রা:) কালবিলম্ব না করে জনতার সাথে দ্রুত বায়াত গ্রহণ করার কথা আছে। পক্ষান্তরে মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে যে, আল্লামা যুহীকে জিজ্ঞাহসা করা হয়েছিল, ফাতেমা (রা:) এর জীবদ্দশায় হযরত আলী (রা:) সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর হাতে বায়াত নেননি বুঝি? যুহরী জবাবে বলেন, ফাতেমা (রা:) এর জীবদ্দশায় আলী (রা:) তো দূরে থাক বনি হাশেমেরও কেউ বায়াত নেননি। যুহরীর এই বক্তব্যকে ইমাম বায়হাকী দুর্বল সাব্যস্ত করেছেন। এ জন্য যে, যুহরীর এ ভাষ্য মজবুত ও নিরবচ্ছিন্ন নয়। পক্ষান্তরে আবূ সাঈদ খুদরী (রা:)
এর সূত্র (পরিপক্করূপে প্রাপ্ত) ও নিরবচ্ছিন্ন সুতরাং যুহরীর ভাষ্যের চেয়ে ওই রেওয়ায়েত অধিক বিশুদ্ধ।
তিন:
ইমাম কস্তালানী তাঁর 'ইরশাদুস সারী' গ্রন্হে ফতহুল বারীর হুবহু সমালোচনা ও বিশ্লেষণটি তুলে ধরেন।
মোটকথা ইবনে হাজার আসকালানীর বিশ্লেষণকে আল্লামা কস্তালানী হুবহু সত্যায়ন করেছেন। অর্থাৎ বায়হাকী একাই নন তার সাথে বহু ওলামা ও মোহাদ্দেস রয়েছেন।
আল্লামা ইবনে কাছীর (রহ:) এর বিশ্লেষণ
উপরোক্ত নানা বিজ্ঞানের মতামত শেষে আমরা হাফেজ ইবনে কাছীরের একটি মত পেশ করছি। এর দ্বরা বায়াত প্রসংগটি পরিস্কার হয়ে আসবে। ইতোপূর্বে উদ্ধৃত এ বর্ণনাটি আমরা বিজ্ঞ পাঠকবর্গের পুনঃস্মরণের নিমিত্তে পেশ করছি --
"নবী করীম (সা:) মৃত্যুর ১দিন কিংবা ২দিনের মাথায় হযরত আলী (রা:) হযরত আবূ বকর (রা:)
এর হাতে বায়াত নিয়েছিলেন। এ কথাটিই সত্য।
কেননা --
১. হযরত আলী (রা:) হযরত আবূ বকর (রা:) থেকে কখনোই পৃথক হননি। পরামর্শদানে সর্বদা
নিকটেই থাকতেন।
২. আবূ বকর (রা:) এর পেছনে নামায পড়া থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন হননি। প্রতিটি নামাযেই তাঁর পেছনে একতেদা করতেন।
৩. মোরতাদবিরোধী অভিযানে সিদ্দীকে আকবার (রা:) খোলা তরবারী হাতে নিয়ে বেরুলে হযরত আলী (রা:) তাঁর সঙ্গ দেন।
উপরোক্ত সকল কথা এ কথার সত্যায়ন করে হযরত আলীর বায়াতটি ঝামেলাহীন ছিল। কোন প্রকার কালক্ষেপণ ছিল না। হযরত আলী (রা:) যদি দ্রুত বায়াত নাই নেবেন তাহলে মোরতাদবিরোধী অভিযানে সিদ্দীকে আকবারের সাথে তার বেরোনোর কী অর্থ থাকে ?
আরেকটি বর্ণনা
বিলম্বিত বায়াতের ৬ মাসধর্মী বর্ণনা নিয়ে আমরা বিজ্ঞ ও খ্যাতিমান মুহাদ্দিসবৃন্দের কথা বর্ণনা করেছি। এক্ষণে বিলম্বহীন দ্রুত বায়াত প্রসংগে হযরত সাঈদ ইবনে যায়েদ (রা:) এর একটি ভাষ্য উল্লেখ করব। ভাষ্যটিতে প্রতীয়মান, সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর বায়াতে কোন সাহাবীই বিলম্ব করেন নি। বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন ইতিহাসবেত্তা ইবনে জারীর ত্ববারী --
"বর্ণনাটির সারকথা --
১. সাহাবী হযরত সাঈদ ইবনে যায়েদ (রা:) নবীজীর মৃত্যুর সময় উপস্হিত ছিলেন ।
২. সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর হাতে ওইদিন সমগ্র সাহাবীই বায়াত নিয়েছিলেন।
৩. আমীরহীন এক মুহুর্তও সাহাবায়ে কেরাম থাকতে পছন্দ করেননি। সুতরাং ৬ মাসের প্রশ্ন এখানে অবান্তর।
৪. মুরতাদ বা ধর্মত্যাগী ছাড়া কেউই এ বিষয়টিতে বিরোধীতা করেন নি।
৫. দলাদলি ও বিশৃঙ্খলার হাত থেকে আল্লাহ তাআলা সাহাবায়ে কেরামকে হেফাজত করেছেন।
৬. মুহাজিরবৃন্দ দ্রুতই বায়াত হয়েছিলেন। বায়াত হওয়ার ক্ষেত্রে কেউই বিলম্ব করেননি।
৭. সাঈদ ইবনে যায়েদ (রা:) এর বর্ণনা হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা:) বর্ণনাকে সমর্থনপুষ্ট করে।
তিন:
ইমাম কস্তালানী তাঁর 'ইরশাদুস সারী' গ্রন্হে ফতহুল বারীর হুবহু সমালোচনা ও বিশ্লেষণটি তুলে ধরেন।
মোটকথা ইবনে হাজার আসকালানীর বিশ্লেষণকে আল্লামা কস্তালানী হুবহু সত্যায়ন করেছেন। অর্থাৎ বায়হাকী একাই নন তার সাথে বহু ওলামা ও মোহাদ্দেস রয়েছেন।
আল্লামা ইবনে কাছীর (রহ:) এর বিশ্লেষণ
উপরোক্ত নানা বিজ্ঞানের মতামত শেষে আমরা হাফেজ ইবনে কাছীরের একটি মত পেশ করছি। এর দ্বরা বায়াত প্রসংগটি পরিস্কার হয়ে আসবে। ইতোপূর্বে উদ্ধৃত এ বর্ণনাটি আমরা বিজ্ঞ পাঠকবর্গের পুনঃস্মরণের নিমিত্তে পেশ করছি --
"নবী করীম (সা:) মৃত্যুর ১দিন কিংবা ২দিনের মাথায় হযরত আলী (রা:) হযরত আবূ বকর (রা:)
এর হাতে বায়াত নিয়েছিলেন। এ কথাটিই সত্য।
কেননা --
১. হযরত আলী (রা:) হযরত আবূ বকর (রা:) থেকে কখনোই পৃথক হননি। পরামর্শদানে সর্বদা
নিকটেই থাকতেন।
২. আবূ বকর (রা:) এর পেছনে নামায পড়া থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন হননি। প্রতিটি নামাযেই তাঁর পেছনে একতেদা করতেন।
৩. মোরতাদবিরোধী অভিযানে সিদ্দীকে আকবার (রা:) খোলা তরবারী হাতে নিয়ে বেরুলে হযরত আলী (রা:) তাঁর সঙ্গ দেন।
উপরোক্ত সকল কথা এ কথার সত্যায়ন করে হযরত আলীর বায়াতটি ঝামেলাহীন ছিল। কোন প্রকার কালক্ষেপণ ছিল না। হযরত আলী (রা:) যদি দ্রুত বায়াত নাই নেবেন তাহলে মোরতাদবিরোধী অভিযানে সিদ্দীকে আকবারের সাথে তার বেরোনোর কী অর্থ থাকে ?
আরেকটি বর্ণনা
বিলম্বিত বায়াতের ৬ মাসধর্মী বর্ণনা নিয়ে আমরা বিজ্ঞ ও খ্যাতিমান মুহাদ্দিসবৃন্দের কথা বর্ণনা করেছি। এক্ষণে বিলম্বহীন দ্রুত বায়াত প্রসংগে হযরত সাঈদ ইবনে যায়েদ (রা:) এর একটি ভাষ্য উল্লেখ করব। ভাষ্যটিতে প্রতীয়মান, সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর বায়াতে কোন সাহাবীই বিলম্ব করেন নি। বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন ইতিহাসবেত্তা ইবনে জারীর ত্ববারী --
"বর্ণনাটির সারকথা --
১. সাহাবী হযরত সাঈদ ইবনে যায়েদ (রা:) নবীজীর মৃত্যুর সময় উপস্হিত ছিলেন ।
২. সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর হাতে ওইদিন সমগ্র সাহাবীই বায়াত নিয়েছিলেন।
৩. আমীরহীন এক মুহুর্তও সাহাবায়ে কেরাম থাকতে পছন্দ করেননি। সুতরাং ৬ মাসের প্রশ্ন এখানে অবান্তর।
৪. মুরতাদ বা ধর্মত্যাগী ছাড়া কেউই এ বিষয়টিতে বিরোধীতা করেন নি।
৫. দলাদলি ও বিশৃঙ্খলার হাত থেকে আল্লাহ তাআলা সাহাবায়ে কেরামকে হেফাজত করেছেন।
৬. মুহাজিরবৃন্দ দ্রুতই বায়াত হয়েছিলেন। বায়াত হওয়ার ক্ষেত্রে কেউই বিলম্ব করেননি।
৭. সাঈদ ইবনে যায়েদ (রা:) এর বর্ণনা হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা:) বর্ণনাকে সমর্থনপুষ্ট করে।
Saturday, 18 May 2019
হযরত আলী (রা:) এর বায়াত
রাসূলুল্লাহ (সা:) এর ইন্তেতালের পরপরই হযরত
আলী (রা:) হযরত আবূ বকর (রা:) এর হাতে বায়াত নিয়েছিলেন। তিনদিনের মধ্যেই এই বায়াতটি সংঘটিত হয়েছিল। অতএব নিম্নেবর্ণিত
কথাগুলো সত্য নয় --
১। হযরত আলী (রা:) হযরত আবূ বকর (রা:)এর
বায়াত হননি।
২। বায়াত হয়েছেন তবে ছ'মাস পরে। হযরত ফাতেমা (রা:) এর জীবদ্দশায় তো নয়ই।
৩। লোকদের চাপাচাপি ও পীড়াপীড়িতে কতকটা বাধ্যহয়ে বায়াত হলেও তাতে আন্তরিকতা ছিলনা।
উপরিউক্ত তিনটি কথাই অসত্য ও বাস্তবতাবিবর্জিত। এগুলো সবই বর্ণনাকারদের
অঅন্তঃসারশূন্য কথা । এবার আমরা হাদীস ও ইসলামী ইতিহাসের প্রামাণ্য গ্রন্হিগুলো দেখব যা
বিজ্ঞাজন দলিলস্ববরূপ পেশ করে থাকেন । হাফেজ ইবনে কাছীর (রহ:) তার ভূবনবিখ্যাত
কিতাব 'বেদায়াহ নেকহায়াহ ' গ্রন্হের ৫ম ও ৬ষ্ঠ খন্ডের বিভিন্ন স্হানে বর্ণনা করেন । দেখা যাক তাঁর বর্ণনা --
"রাসূলুল্লাহ (সা:) এর ইন্তেতালের পর হযরত আলী (রা:) ও হযরত যুবায়ের (রা:) ঐকমত্য পোষণ করলেন ।এ দাবির প্রমাণে আমরা নিম্নবির্ণত প্রমাণ ও সুস্পষ্টরূপে পেশ করছি।
১। ইমাম বায়হাকী (রহ:) স্ব-সনদে হযরত আকূ সাঈদ খুদরী (রা:) এর সূত্রে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা:) এর ইন্তেকালের পর সকল সাহাবী হযরত সায়াদ ইবনে উবাদাহ (রা:) (সকীফায়ে বনী সায়েদাহ ) এর বাড়ীতে সমবেত হন । এদের মাঝে হযরত আবূ বকর ও ওমর (রা:)
ও ছিলেন । আনসারীদের মাঝে হযরত জনৈক বক্তা (হযরত যায়েদ ইবনে ছাবেত (রা:) দাঁড়ালেন । বললেন, তোমাদের অজানা নয় যে, রাসূলুল্লাহ
(সা:) মুহাজির ছিলেন আর আমরা সর্বদা রাসূলুল্লাহ (সা:) এর আনসার অর্থাৎ সাহায্যকারী
ছিলাম। এক্ষণে যিনি খলীফা হবেন আমরাও তাঁর
আনসার বা সাহায্যকারী থাকব যেভাবে আমরা রাসূলুল্লাহ (সা:) এর সাহায্যকারী ছিলাম । এরপর হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা:) উঠে দাঁড়ালেন ।
বললেন, তোমাদের ভাষ্যকারের অনুভূতি যথার্থ।
তাঁর বর্ণিত প্রস্তাব ছাড়া এ মুহূর্তে বিকল্প কিছু ভাববার সুযোগ নেই খুব একটা । পরে হযরত আবূ বকর (রা:) এর হাত ধরে হযরত ওমর (রা:) বললেন, উপস্হিত জনমন্ডলী! সকলে তার হাতে
বায়াত হও। হযরত ওমর (রা:) সহ উপস্হিত মুহাজির -আনসারগণ তাঁর হাতে বায়াত হলেন। এ সময় হযরত আবূ বকর (রা:) মসজিদে নববীর মেম্বারের ওপর ভাষণ দেয়ার উদ্দেশ্যে দাঁড়ালেন।
হামদ ছানা শেষে সমবেত শ্রোতাদের দিকে তাকালেন। তাঁর দৃষ্টি যুুবায়ের ইবনুল আওয়াম (রা:) কে খুঁজে ফিরছিল । তাকে না পেয়ে ডেকে পাঠালেন। তিনি উপস্হিত হলে বললেন, প্রিয়নবী (সা:) এর ফুপাত ভাই এবং তাঁর একান্ত সঙ্গী, আপনি মুসলিম ঐক্যে চিড় ধরাতে চান বুঝি?
যুবায়ের (রা:) প্রতি উত্তরে বললেন, 'আল্লাহর রাসূলের খলীফা হে! আমার প্রতি এলজাম কিংবা ভর্ৎসনা দেবেন না। আমি আপনাকে খলীফা করার ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করছি। তিনি তৎক্ষনাৎই সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর হাতে বায়াত নিলেন। এবার সিদ্দীকে আকবারের দৃষ্টি
আরেক জনকে খুঁজে ফিরল। তিনি হযরত আলী (রা:)। তাকে না পেয়ে ডেকে পাঠালেন। তিনি এলে বললেন, আপনি নবী করীম (সা:) এর চাচাত ভাই এবং তাঁর মেয়ের জামাতা। আপনিও মুসলিম ঐক্যে চিড় ও ফাটল ধরাতে চান বুঝি? হযরত আলী (রা:) জবাবে বললেন, খলীফা নামদার? আমার প্রতি বিন্দুমাত্র কুধারণাপ্রসূত অভিযোগ করবেন না। অতঃপর হযরত আলী (রা:) সিদ্দীকে
আকবার (রা:) এর হাতে বায়াত হলেন।
দুই:
"হাফেজ আবূ আলী নিশাপুরী বলেন, আমি ইবনে খুযায়মা (রহ:) কে বলতে শুনেছি। একদা
ইমাম মুসলিম আমার কাছে এসে বললেন, আমাকে (সাবেক রেওয়ায়েতের) সনদটি লিখে দাও। আমি আবূ সাঈদ খুদরী (রা:) এই বর্ণনাটি তাকে একটি কাগজে লিখে শুনিয়ে দিলাম। তিনি (সানন্দে) বললেন, বর্ণনাটি (কুরবাণীর উট -গরুর মত) মূল্যবান। আমি বললাম, তা কেন বরং উহা
এক হাজার স্বর্ণমুদ্রাভর্তি থলের চেয়েও উত্তম "।
তিনঃ
নিম্নোক্ত বর্ণনায় হযরত আলী (রা:) এর বায়াত প্রসংগটি আরো পরিস্কার ভাবে ফুঠেছে। বর্ণনাটি
ইবনে কাছীরের -
"মাহামিলির এই সনদখানা সহীহ ও মাহফুয। আবূ নাযরাহ হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা:) এর সুত্রে বর্ণনা করেন। এ সনদে বড় গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়
পাওয়া গেছে। হযরত আলী (রা:) নবীজীর ইন্তিকালের একদিন অথবা দুদিনের মাঝেই সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর হাতে বায়াত নিয়েছেন। এটিই সর্বাধিক বিশুদ্ধ ও যথার্থ। হযরত আলী (রা:) কখনোই সিদ্দীকে আকবার (রা:) থেকে পৃথক থাকেননি। কোন এক ওয়াক্ত নামাযও তাঁর ইমামত ছাড়া পড়েননি। মুরতাদবিরোধী অভিযানে বেরোলে খোলা তরবারী হাতে তিনি সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর সহকর্মী ও সহযাত্রী ছিলেন। বিস্তারিত বর্ণনা সামনে আসছে "।
চারঃ
অর্থঃ হাফেজ ইবনে কাছীর (রহ:) বর্ণনা করেন, মূসা ইবনে ওকবা তার 'যুদ্ধপর্বে সহীহ সনদে আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা:) এর সূত্রে বায়াত প্রসংগে বর্ণনা করেন, তিনি ও মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাহ (রা:) হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা:) এর সাথে ছিলেন। মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা
(ফেৎনা ছড়িয়ে না পড়ে এ ভয়ে যুবায়ের (রা:) থেকে তলোয়ার নিয়ে ভেঙ্গে ফেললেন। পরে হযরত আবূ বকর (রা:) জনতার উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। ওজর পেশপূর্বক বলেন, 'কসম খোদার! খেফাফতের মসনদ দখল করার লোভ দিনে -রাতে, প্রকাশ্যে -অপ্রকাশ্যে কখনোই হয়নি আমার। মুহাজিরগণ তার এই মন্তব্যে সাধুবাদ জানান, যথার্থ সাব্যস্ত করেন। হযরত আলী (রা:) ও যুবায়ের (রা:) (নিজস্ব মত প্রকাশ করতে গিয়ে চলেন) আমাদের (সাময়িক) টানাপোড়েন ও (ক্ষণিকের) উষ্মা স্রেফ এজন্য যে, আমরা ঘটনার শুরু দিকের পরামর্শে উপস্হিত ছিলাম না। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, খেলাফতের মসনদে আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) কেই আমরা সর্বাধিক যোগ্য ব্যক্তি বলে মনে করি। নিঃসন্দেহে তিনি তাঁর হিজরতকালীন গুনার সাথী। কুরআন তাঁকে উপাধি দিয়েছে "দু'জনার দ্বিতীয় জন"। তাঁর মর্যাদা ও পূণ্যত্বের স্বীকৃতি দিই আমরা। সমগ্র সাহাবাদের মাঝে নবীজীর জীবদ্দশায় একমাত্র তিনিই নামাযের ইমাম নির্বাচিত হয়েছিলেন। বর্ণনাসূত্রটি উত্তম।
আল্লামা ইবনে কাছীর এরপর হযরত আলী (রা:) এর কিছু কর্মনীতি উল্লেখ করেন। হযরত আলী (রা:) এর মত ব্যক্তিত্বের জন্য যা মানানসইও -
১। হযরত আলী (রা:) সিদ্দীকে আকবরের করা ইমামতের প্রতিটি নামাযেই হাজির থাকতেন।
২। নবীজীর ইন্তেতালের পর মুরতাদবিরোধী অভিযানে সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর সফরসঙ্গী হিসাবে তিনি মদীনার বাইরে বেরিয়েছিলেন।
৩। সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর প্রতিটি কাজেই তিনি হিতাকাংখী ও কল্যাণকামি ছিলেন।
পাঁচঃ
উপরিউক্ত রেওয়ায়েতসমূহের পর আল্লামা বালাযুরী (রহ:)এর 'একটি বর্ণনা দেখব। হযরত আলী (রা:) এর দ্রুত বায়াতসম্বলিত ঘটনার যা একটি প্রকৃষ্ট দলিলও বটে।
"জনতা যখন হযরত আবূ বকর (রা:)এর হাতে বায়াত নিচ্ছিল তখন হযরত আলী (রা:) ও যুবায়ের (রা:) বায়াতকর্ম থেকে দূরত্বে অবস্হান করছিলেন। হযরত আবূ বকর (রা:) তাঁদের দু'জনাকে দেখতে না পেয়ে হযরত ওমর (রা:) ও যায়দ ইবনে ছাবেত (রা:) কে তাঁদের দ্বারা ডেকে পাঠালেন। এরা হযরত আলী (রা:) এর দরোজার কড়া নাড়লেন। হযরত যুবায়ের (রা:) দরোজার ওপাশ থেকে দৃষ্টি ফেলে এদের দেখে হযরত আলী (রা:) এর কাছে গিয়ে বললেন, তাঁরা দু'জনা জান্নাতী বুযুর্গ। তাঁদের সাথে আমাদের ঝগড়া বচসা চলে না। হযরত আলী (রা:) এর অনুমতিক্রমে তিনি দরোজা খুলে দিলের। বাইরে এসে তাদেরকে সাদর অভ্যর্থনা জানালেন। তাঁরা সকলে এক সময়ে খলীফা আবূ বকর (রা:) এর দরবারে এলেন। সিদ্দীকে আকবার (রা:) হযরত আলী (রা:) কে লক্ষ্য করে বললেন, আলী (রা:)! আপনি আল্লাহর রাসূল (সা:) এর চাচাত ভাই এবং তাঁর জামাতাও। আপনি খেলাফতবিষয়ে নিজেকে অধিক যোগ্য মনে করেন বলে শুনেছি অথচ আপনার অজানা নয় আমিও এ পদের সর্বাধিক যোগ্য। হযরত আলী (রা:) বললেন, খলীফায়ে রাসূল হে! আমার প্রতি বিরাগভাজন হবেন না। হাত বাড়ান আমি বায়াত নিচ্ছি। সিদ্দীকে আকবার (রা:) হাত বাড়ালেন, হযরত আলী বায়াত হলেন।
এবার সিদ্দীকে আকবার (রা:) হযরত যুবায়ের (রা:) কে লক্ষ্য করে বললেন, 'যোবায়ের! আপনি হুযুর (সা:) এর ফুফাত ভাই এবং রাসূলুল্লাহ (সা:) এর সহকর্মী (হাওয়ারী)। তাছাড়া আপনি ইসলামের এক শাহ সওয়ারও। আপনি খেলাফতবিষয়ে নিজকে অধিকযোগ্য মনে করেন অথচ খেলাফতের মসনদে আপনার অপেক্ষা আমিই অধিকযোগ্য। হযরত যুবায়ের ইবনুল আওয়াম (রা:) বলেন, আল্লাহর রাসূলের খলীফা!
খোদারদিকে চেয়ে আমাকে ভর্ৎসনা করবেন না। আপনার হাত বাড়ান। তিনি হাত বাড়ালে হযরত যুবায়ের (রা:) তার হাতে বায়াত হন।
উপরোক্ত বর্ণনাসমূহ দ্বারা প্রতীয়মান হচ্ছে, হযরত আলী (রা:) কোনরূপ কালক্ষেপণ না করে দ্রুতই সিদ্দীকে আকবারের হাতে বায়াত নিয়েছিলেন। ৬ মাস দেরীতে বায়াত নেয়ার ব্যাপারটি একান্তই বর্ণনাকারদের ধারনাপ্রসূত ও বাস্তবতাবিবর্জিত। দ্রুত বায়াত হওয়া বর্ণনাসমূহের
সূত্রে ইবনে শিহাব যুহরী (রহ:) নেই। দেরীতে বায়াত হওয়া বর্ণনাসমূহের সবগুলোতেই যুহরী বিদ্যমান। ব্যাপারটি আসলে কী তা বোধকরি সুধী পাঠকদের সম্মুখে এতক্ষণে পরিস্কার হয়ে গেছে।
আরো বিস্তারিত সামনে আসছে। বোদ্ধা পাঠকদের সুবিধার্থে এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা থেকে লোভ সামলাতে পারছিনা যে, মূসা ইবনে ওকবার (রা:) 'যুদ্ধপর্বে' বর্ণিত রেওয়ায়েতটি শীয়া
ওলামারাও তাদের কিতাবে উল্লেখ করেছেন। এর ওপর তারা কোনপ্রকার সমালোচনাও করেন নি।
প্রখ্যাত শীয়া ভাষ্যকার ইবনে আবিল হাদীদ তার
'শরহে নাহজুল বালাগাহ ' -এ যা বর্ণনা করেন তা নিম্নোক্ত শব্দচিত্রে প্রকাশ পেয়েছে --
"হযরত আলী (রা:) ও যুবায়ের (রা:) উভয়েই বর্ণনা করেন, আমাদের এই সাময়িক দুঃখ -বেদনা ও টানাপড়েনন নিছক পরামর্শে শামিল না হবার দরুনই হয়েছিল। নচেত আমরা খুব ভাল করেই জানতাম খেলাফতের মসনদে আবূ বকর বকর (রা:) ই সর্বাধিক যোগ্য ব্যক্তি। হিজরতকালীন রাসূলের সাথে গুহায় অবস্হানের
মহা ফজিলতটিতো একমাত্র তাঁরই। আমরা তাঁর বুযুর্গীর অকৃপণ স্বীকৃতি দিই। নবীজী (সা:) তাঁকে জীবদ্দশায় মুসলমানদের জামাতে নামায পড়ার আদেশ করেছিলেন।
এক্ষণে সকল বর্ণনা আসার পর বেশ জোর গলায়ই বলা যাচ্ছে, নবীজীর ইন্তেতালের এক/দু'দিনের মধ্যেই হযরত আলী (রা:) হযরত আবূূ বকর (রা:)এর হাতে বায়াত হয়েছিলেন। শুধু কী তাই। সিদ্দীকে আকবারের সর্বজনস্বীকৃত ফজিলত ও মর্যাদার স্বীকৃতিও দিয়েছিলেন।
এখানে ৬ মাসে বিলম্বে বায়াতের ব্যাপারটি আদৌ ঘটেনি।
আলী (রা:) হযরত আবূ বকর (রা:) এর হাতে বায়াত নিয়েছিলেন। তিনদিনের মধ্যেই এই বায়াতটি সংঘটিত হয়েছিল। অতএব নিম্নেবর্ণিত
কথাগুলো সত্য নয় --
১। হযরত আলী (রা:) হযরত আবূ বকর (রা:)এর
বায়াত হননি।
২। বায়াত হয়েছেন তবে ছ'মাস পরে। হযরত ফাতেমা (রা:) এর জীবদ্দশায় তো নয়ই।
৩। লোকদের চাপাচাপি ও পীড়াপীড়িতে কতকটা বাধ্যহয়ে বায়াত হলেও তাতে আন্তরিকতা ছিলনা।
উপরিউক্ত তিনটি কথাই অসত্য ও বাস্তবতাবিবর্জিত। এগুলো সবই বর্ণনাকারদের
অঅন্তঃসারশূন্য কথা । এবার আমরা হাদীস ও ইসলামী ইতিহাসের প্রামাণ্য গ্রন্হিগুলো দেখব যা
বিজ্ঞাজন দলিলস্ববরূপ পেশ করে থাকেন । হাফেজ ইবনে কাছীর (রহ:) তার ভূবনবিখ্যাত
কিতাব 'বেদায়াহ নেকহায়াহ ' গ্রন্হের ৫ম ও ৬ষ্ঠ খন্ডের বিভিন্ন স্হানে বর্ণনা করেন । দেখা যাক তাঁর বর্ণনা --
"রাসূলুল্লাহ (সা:) এর ইন্তেতালের পর হযরত আলী (রা:) ও হযরত যুবায়ের (রা:) ঐকমত্য পোষণ করলেন ।এ দাবির প্রমাণে আমরা নিম্নবির্ণত প্রমাণ ও সুস্পষ্টরূপে পেশ করছি।
১। ইমাম বায়হাকী (রহ:) স্ব-সনদে হযরত আকূ সাঈদ খুদরী (রা:) এর সূত্রে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা:) এর ইন্তেকালের পর সকল সাহাবী হযরত সায়াদ ইবনে উবাদাহ (রা:) (সকীফায়ে বনী সায়েদাহ ) এর বাড়ীতে সমবেত হন । এদের মাঝে হযরত আবূ বকর ও ওমর (রা:)
ও ছিলেন । আনসারীদের মাঝে হযরত জনৈক বক্তা (হযরত যায়েদ ইবনে ছাবেত (রা:) দাঁড়ালেন । বললেন, তোমাদের অজানা নয় যে, রাসূলুল্লাহ
(সা:) মুহাজির ছিলেন আর আমরা সর্বদা রাসূলুল্লাহ (সা:) এর আনসার অর্থাৎ সাহায্যকারী
ছিলাম। এক্ষণে যিনি খলীফা হবেন আমরাও তাঁর
আনসার বা সাহায্যকারী থাকব যেভাবে আমরা রাসূলুল্লাহ (সা:) এর সাহায্যকারী ছিলাম । এরপর হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা:) উঠে দাঁড়ালেন ।
বললেন, তোমাদের ভাষ্যকারের অনুভূতি যথার্থ।
তাঁর বর্ণিত প্রস্তাব ছাড়া এ মুহূর্তে বিকল্প কিছু ভাববার সুযোগ নেই খুব একটা । পরে হযরত আবূ বকর (রা:) এর হাত ধরে হযরত ওমর (রা:) বললেন, উপস্হিত জনমন্ডলী! সকলে তার হাতে
বায়াত হও। হযরত ওমর (রা:) সহ উপস্হিত মুহাজির -আনসারগণ তাঁর হাতে বায়াত হলেন। এ সময় হযরত আবূ বকর (রা:) মসজিদে নববীর মেম্বারের ওপর ভাষণ দেয়ার উদ্দেশ্যে দাঁড়ালেন।
হামদ ছানা শেষে সমবেত শ্রোতাদের দিকে তাকালেন। তাঁর দৃষ্টি যুুবায়ের ইবনুল আওয়াম (রা:) কে খুঁজে ফিরছিল । তাকে না পেয়ে ডেকে পাঠালেন। তিনি উপস্হিত হলে বললেন, প্রিয়নবী (সা:) এর ফুপাত ভাই এবং তাঁর একান্ত সঙ্গী, আপনি মুসলিম ঐক্যে চিড় ধরাতে চান বুঝি?
যুবায়ের (রা:) প্রতি উত্তরে বললেন, 'আল্লাহর রাসূলের খলীফা হে! আমার প্রতি এলজাম কিংবা ভর্ৎসনা দেবেন না। আমি আপনাকে খলীফা করার ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করছি। তিনি তৎক্ষনাৎই সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর হাতে বায়াত নিলেন। এবার সিদ্দীকে আকবারের দৃষ্টি
আরেক জনকে খুঁজে ফিরল। তিনি হযরত আলী (রা:)। তাকে না পেয়ে ডেকে পাঠালেন। তিনি এলে বললেন, আপনি নবী করীম (সা:) এর চাচাত ভাই এবং তাঁর মেয়ের জামাতা। আপনিও মুসলিম ঐক্যে চিড় ও ফাটল ধরাতে চান বুঝি? হযরত আলী (রা:) জবাবে বললেন, খলীফা নামদার? আমার প্রতি বিন্দুমাত্র কুধারণাপ্রসূত অভিযোগ করবেন না। অতঃপর হযরত আলী (রা:) সিদ্দীকে
আকবার (রা:) এর হাতে বায়াত হলেন।
দুই:
"হাফেজ আবূ আলী নিশাপুরী বলেন, আমি ইবনে খুযায়মা (রহ:) কে বলতে শুনেছি। একদা
ইমাম মুসলিম আমার কাছে এসে বললেন, আমাকে (সাবেক রেওয়ায়েতের) সনদটি লিখে দাও। আমি আবূ সাঈদ খুদরী (রা:) এই বর্ণনাটি তাকে একটি কাগজে লিখে শুনিয়ে দিলাম। তিনি (সানন্দে) বললেন, বর্ণনাটি (কুরবাণীর উট -গরুর মত) মূল্যবান। আমি বললাম, তা কেন বরং উহা
এক হাজার স্বর্ণমুদ্রাভর্তি থলের চেয়েও উত্তম "।
তিনঃ
নিম্নোক্ত বর্ণনায় হযরত আলী (রা:) এর বায়াত প্রসংগটি আরো পরিস্কার ভাবে ফুঠেছে। বর্ণনাটি
ইবনে কাছীরের -
"মাহামিলির এই সনদখানা সহীহ ও মাহফুয। আবূ নাযরাহ হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা:) এর সুত্রে বর্ণনা করেন। এ সনদে বড় গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়
পাওয়া গেছে। হযরত আলী (রা:) নবীজীর ইন্তিকালের একদিন অথবা দুদিনের মাঝেই সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর হাতে বায়াত নিয়েছেন। এটিই সর্বাধিক বিশুদ্ধ ও যথার্থ। হযরত আলী (রা:) কখনোই সিদ্দীকে আকবার (রা:) থেকে পৃথক থাকেননি। কোন এক ওয়াক্ত নামাযও তাঁর ইমামত ছাড়া পড়েননি। মুরতাদবিরোধী অভিযানে বেরোলে খোলা তরবারী হাতে তিনি সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর সহকর্মী ও সহযাত্রী ছিলেন। বিস্তারিত বর্ণনা সামনে আসছে "।
চারঃ
অর্থঃ হাফেজ ইবনে কাছীর (রহ:) বর্ণনা করেন, মূসা ইবনে ওকবা তার 'যুদ্ধপর্বে সহীহ সনদে আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা:) এর সূত্রে বায়াত প্রসংগে বর্ণনা করেন, তিনি ও মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাহ (রা:) হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা:) এর সাথে ছিলেন। মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা
(ফেৎনা ছড়িয়ে না পড়ে এ ভয়ে যুবায়ের (রা:) থেকে তলোয়ার নিয়ে ভেঙ্গে ফেললেন। পরে হযরত আবূ বকর (রা:) জনতার উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। ওজর পেশপূর্বক বলেন, 'কসম খোদার! খেফাফতের মসনদ দখল করার লোভ দিনে -রাতে, প্রকাশ্যে -অপ্রকাশ্যে কখনোই হয়নি আমার। মুহাজিরগণ তার এই মন্তব্যে সাধুবাদ জানান, যথার্থ সাব্যস্ত করেন। হযরত আলী (রা:) ও যুবায়ের (রা:) (নিজস্ব মত প্রকাশ করতে গিয়ে চলেন) আমাদের (সাময়িক) টানাপোড়েন ও (ক্ষণিকের) উষ্মা স্রেফ এজন্য যে, আমরা ঘটনার শুরু দিকের পরামর্শে উপস্হিত ছিলাম না। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, খেলাফতের মসনদে আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) কেই আমরা সর্বাধিক যোগ্য ব্যক্তি বলে মনে করি। নিঃসন্দেহে তিনি তাঁর হিজরতকালীন গুনার সাথী। কুরআন তাঁকে উপাধি দিয়েছে "দু'জনার দ্বিতীয় জন"। তাঁর মর্যাদা ও পূণ্যত্বের স্বীকৃতি দিই আমরা। সমগ্র সাহাবাদের মাঝে নবীজীর জীবদ্দশায় একমাত্র তিনিই নামাযের ইমাম নির্বাচিত হয়েছিলেন। বর্ণনাসূত্রটি উত্তম।
আল্লামা ইবনে কাছীর এরপর হযরত আলী (রা:) এর কিছু কর্মনীতি উল্লেখ করেন। হযরত আলী (রা:) এর মত ব্যক্তিত্বের জন্য যা মানানসইও -
১। হযরত আলী (রা:) সিদ্দীকে আকবরের করা ইমামতের প্রতিটি নামাযেই হাজির থাকতেন।
২। নবীজীর ইন্তেতালের পর মুরতাদবিরোধী অভিযানে সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর সফরসঙ্গী হিসাবে তিনি মদীনার বাইরে বেরিয়েছিলেন।
৩। সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর প্রতিটি কাজেই তিনি হিতাকাংখী ও কল্যাণকামি ছিলেন।
পাঁচঃ
উপরিউক্ত রেওয়ায়েতসমূহের পর আল্লামা বালাযুরী (রহ:)এর 'একটি বর্ণনা দেখব। হযরত আলী (রা:) এর দ্রুত বায়াতসম্বলিত ঘটনার যা একটি প্রকৃষ্ট দলিলও বটে।
"জনতা যখন হযরত আবূ বকর (রা:)এর হাতে বায়াত নিচ্ছিল তখন হযরত আলী (রা:) ও যুবায়ের (রা:) বায়াতকর্ম থেকে দূরত্বে অবস্হান করছিলেন। হযরত আবূ বকর (রা:) তাঁদের দু'জনাকে দেখতে না পেয়ে হযরত ওমর (রা:) ও যায়দ ইবনে ছাবেত (রা:) কে তাঁদের দ্বারা ডেকে পাঠালেন। এরা হযরত আলী (রা:) এর দরোজার কড়া নাড়লেন। হযরত যুবায়ের (রা:) দরোজার ওপাশ থেকে দৃষ্টি ফেলে এদের দেখে হযরত আলী (রা:) এর কাছে গিয়ে বললেন, তাঁরা দু'জনা জান্নাতী বুযুর্গ। তাঁদের সাথে আমাদের ঝগড়া বচসা চলে না। হযরত আলী (রা:) এর অনুমতিক্রমে তিনি দরোজা খুলে দিলের। বাইরে এসে তাদেরকে সাদর অভ্যর্থনা জানালেন। তাঁরা সকলে এক সময়ে খলীফা আবূ বকর (রা:) এর দরবারে এলেন। সিদ্দীকে আকবার (রা:) হযরত আলী (রা:) কে লক্ষ্য করে বললেন, আলী (রা:)! আপনি আল্লাহর রাসূল (সা:) এর চাচাত ভাই এবং তাঁর জামাতাও। আপনি খেলাফতবিষয়ে নিজেকে অধিক যোগ্য মনে করেন বলে শুনেছি অথচ আপনার অজানা নয় আমিও এ পদের সর্বাধিক যোগ্য। হযরত আলী (রা:) বললেন, খলীফায়ে রাসূল হে! আমার প্রতি বিরাগভাজন হবেন না। হাত বাড়ান আমি বায়াত নিচ্ছি। সিদ্দীকে আকবার (রা:) হাত বাড়ালেন, হযরত আলী বায়াত হলেন।
এবার সিদ্দীকে আকবার (রা:) হযরত যুবায়ের (রা:) কে লক্ষ্য করে বললেন, 'যোবায়ের! আপনি হুযুর (সা:) এর ফুফাত ভাই এবং রাসূলুল্লাহ (সা:) এর সহকর্মী (হাওয়ারী)। তাছাড়া আপনি ইসলামের এক শাহ সওয়ারও। আপনি খেলাফতবিষয়ে নিজকে অধিকযোগ্য মনে করেন অথচ খেলাফতের মসনদে আপনার অপেক্ষা আমিই অধিকযোগ্য। হযরত যুবায়ের ইবনুল আওয়াম (রা:) বলেন, আল্লাহর রাসূলের খলীফা!
খোদারদিকে চেয়ে আমাকে ভর্ৎসনা করবেন না। আপনার হাত বাড়ান। তিনি হাত বাড়ালে হযরত যুবায়ের (রা:) তার হাতে বায়াত হন।
উপরোক্ত বর্ণনাসমূহ দ্বারা প্রতীয়মান হচ্ছে, হযরত আলী (রা:) কোনরূপ কালক্ষেপণ না করে দ্রুতই সিদ্দীকে আকবারের হাতে বায়াত নিয়েছিলেন। ৬ মাস দেরীতে বায়াত নেয়ার ব্যাপারটি একান্তই বর্ণনাকারদের ধারনাপ্রসূত ও বাস্তবতাবিবর্জিত। দ্রুত বায়াত হওয়া বর্ণনাসমূহের
সূত্রে ইবনে শিহাব যুহরী (রহ:) নেই। দেরীতে বায়াত হওয়া বর্ণনাসমূহের সবগুলোতেই যুহরী বিদ্যমান। ব্যাপারটি আসলে কী তা বোধকরি সুধী পাঠকদের সম্মুখে এতক্ষণে পরিস্কার হয়ে গেছে।
আরো বিস্তারিত সামনে আসছে। বোদ্ধা পাঠকদের সুবিধার্থে এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা থেকে লোভ সামলাতে পারছিনা যে, মূসা ইবনে ওকবার (রা:) 'যুদ্ধপর্বে' বর্ণিত রেওয়ায়েতটি শীয়া
ওলামারাও তাদের কিতাবে উল্লেখ করেছেন। এর ওপর তারা কোনপ্রকার সমালোচনাও করেন নি।
প্রখ্যাত শীয়া ভাষ্যকার ইবনে আবিল হাদীদ তার
'শরহে নাহজুল বালাগাহ ' -এ যা বর্ণনা করেন তা নিম্নোক্ত শব্দচিত্রে প্রকাশ পেয়েছে --
"হযরত আলী (রা:) ও যুবায়ের (রা:) উভয়েই বর্ণনা করেন, আমাদের এই সাময়িক দুঃখ -বেদনা ও টানাপড়েনন নিছক পরামর্শে শামিল না হবার দরুনই হয়েছিল। নচেত আমরা খুব ভাল করেই জানতাম খেলাফতের মসনদে আবূ বকর বকর (রা:) ই সর্বাধিক যোগ্য ব্যক্তি। হিজরতকালীন রাসূলের সাথে গুহায় অবস্হানের
মহা ফজিলতটিতো একমাত্র তাঁরই। আমরা তাঁর বুযুর্গীর অকৃপণ স্বীকৃতি দিই। নবীজী (সা:) তাঁকে জীবদ্দশায় মুসলমানদের জামাতে নামায পড়ার আদেশ করেছিলেন।
এক্ষণে সকল বর্ণনা আসার পর বেশ জোর গলায়ই বলা যাচ্ছে, নবীজীর ইন্তেতালের এক/দু'দিনের মধ্যেই হযরত আলী (রা:) হযরত আবূূ বকর (রা:)এর হাতে বায়াত হয়েছিলেন। শুধু কী তাই। সিদ্দীকে আকবারের সর্বজনস্বীকৃত ফজিলত ও মর্যাদার স্বীকৃতিও দিয়েছিলেন।
এখানে ৬ মাসে বিলম্বে বায়াতের ব্যাপারটি আদৌ ঘটেনি।
Tuesday, 14 May 2019
সমকালীন খলীফার 'ইমামতিতে হাশেমীদের (নবী বংশ) নামাযে জানাযা
হাশেমীগণ নবী বংশের লোক। নবী করীম (সা:) হাশেমী গোত্রের সন্তান । আমরা এক্ষণে সেই নবী বংশের এমন কিছু বুযুর্গের জানাযার কথা তুলে
ধরব সমকালীন খলীফারা যাদের নামাযে জানাযায় ইমামত করেছিলেন ।
প্রথম জানাযাঃঃ
হাশেমী বুযুর্গদের মাঝে নওফেল ইবনে হারেস ইবনে আবদুল মোতালেব (রা:) ১৫ হিজরীতে মদীনায় মৃত্যুবরণ করেন। হযরত ওমর (রা:) তখন মুসলিম বিশ্বের খলীফা । তিনি তাঁর জানাযা
পড়ান। জান্নাতুল বাকীতে তাঁকে দাফন করা হয় -
"হযরত ওমর (রা:) খলীফা হবার ১বছর ৩মাসের
মাথায় নওফেল (রা:) ইন্তেকাল করেন। হযরত ওমর (রা:) তাঁর নামাযে জানাযায় ইমামত করেন।
পরে বাকীতে (মদীনার গোরস্হান ) তাঁর খাটিয়া বহন করে নিয়ে যান এবং ওখানেই তাঁকে দাফন করা হয় "।
দ্বিতীয় জানাযাঃঃ
অন্যতম হাশেমী বুযুর্গ হযরত আবূ সুফিয়ান ইবনে হারেস ইবনে আবদুল মোতালেব। এদিকে সুফিয়ান (রা:) রাসূলুল্লাহ (সা:) এর দুধভাই ছিলেন । হালিমা সাদিয়া (রা:) তাদের দু'জনার দুধমাতা ছিলেন। তার সম্পর্কে বর্ণিত আছে --
"আবূ সুফিয়ান (রা:) ২০ হিজরীতে মদীনায় ইন্তেকাল করলে দ্বিতীয় খলীফা ওমর (রা:) তাঁর জানাযায় ইমামতি করেন । বলা হয় তাঁর ভাই নওফেলের চার মাস পরে তিনি ইন্তেকাল করেন।
তৃতীয় জানাযাঃঃ তৃতীয় জানাযাটি রাসূলুল্লাহ (সা:) এর আপন চাচা হযরত আব্বাস (রা:) এর।
এতদসম্পর্কে ওলামায়ে কেরামের ভাষ্য -
"রাসূলুল্লাহ (সা:) এর চাচা হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মোত্তালেবের মৃত্যু ৩২ হিজরীতে মদীনায় হয়েছিল। দিনটি ছিল শুক্রবার । তাঁর মৃত্যুটি হযরত ওসমান (রা:) এর শাহাদতের দু'বছর পূর্বে হয়েছিল। সমকালীন খলীফা হযরত ওসমান ইবনে আফফান (রা:) তাঁর জানাযা পড়িয়েছিলেন ।ব বাকীতে তাঁঁকে দাফন করা হয়েছিল । ওই সময় তার বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর "।
সতর্কীকরণঃঃ উপরিউক্ত তিনটি জানাযাই মদীনায় হযরত আলী (রা:) উপস্হিতিতেই সংঘটিত হয়েছিল । আর তিনটি জানাযাই তদানিন্তন মুসলিম বিশ্বের খলীফাই আদায় করেছিলেন।
চতুর্থ জানাযাঃঃ
এবার আমরা খলীফদের জানাযা পড়ানো সম্পর্কে হযরত হাসান (রা:) এর জানাযা প্রসংগ দেখব । তাঁর ইন্তেকালও মদীনায় হয়েছিল। কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে তিনি ৫০ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন। ওই সময় মুসলিম বিশ্বের খলীফা ছিলেন হযরত আমীরে মুয়াবিয়া (রা:)।
তাঁর রাজধানী ছিল সিরিয়ায় । তৎকালে মদীনার
গভর্ণর ছিলেন হযরত সাঈদ ইবনুল আস (রা:) স্বয়ং হুসাইন (রা:) ও ওইসময় মদীনায় উপস্হিত ছিলেন। তিনি জানাযার সময় মদীনার গভর্ণরকে সামনে আগাতে গিয়ে বলেছিলেন, সুন্নত (নিয়ম )
না হলে আপনাকে আগে বাড়াতাম না ।
অর্থাৎ ইমাম হুসাইন (রা:) ইমাম হাসান (রা:) এর জানাযার সময়ে তদানিন্তন মদীনার গভর্ণরকে বলেন , আগে বাড়ুন, জানাযা পড়ান, এটি ইসলারে আদর্শ না হলে আপনাকে আগে বাড়তে বলতাম না ।
নোট: শীয়া আলেমগণই শহীদে কারবালা ইমাম হুসাইন (রা:) এর এই কথা নকল করেছেন । কথাটি তাঁর ভায়ের জানাযাকালীন। আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের কিতাবেও এই কথাটি বিদ্যমান।
আমরা এখানে স্রেফ রেফারেন্স দেয়াকেই যথেষ্ট মনে করছি। কথাটি এভাবে এসেছে যে,
"যদি সুন্নত না হত তাহলে আপনাকে আগে বাড়তে বলতাম না"।
এখানে সিরাজুল হিন্দ হযরত শাহ আবদুল আযীয (রহ:) এর একটি বিশ্বেষণধর্মী কথা প্রনিধানযোগ্য --
"সুতরাং জানা গেল হযরত ফাতেমা (রা:) হযরত আবূ বকর (রা:) কে দিয়ে তাঁর জানাযা না পড়ানোর কোনও অসিয়ত করেননি। নতুবা ইমাম হুসাইন (রা:) তাঁর মায়ের অসিয়তের বিপরীত কাজটি কীভাবে আঞ্জাম দিলেন ? আর এ কথা
স্বতঃসিদ্ধ যে, জানাযা পড়ানোর যোগ্যতায় সাঈদ
ইবনুল আস (রা:) আবূ বকর (রা:) এর তুলনায় হাজার গুনে নিম্নতর "।
পঞ্চম জানাযাঃঃ
আবদুল্লাহ ইবনে জাফর (রা:) এর জানাযা -
"সিংহভাগ ঐতিহাসিকের মত এই যে, ৮০ হিজরীতে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জাফর (রা:) মারা যান । হযনত ওসমান (রা:) এর পুত্র হযরত আবান (রহ:) তাঁর জানাযা পড়ান । ঘটনাটি বন্যার বছরের "।
শীয়া ওলামাগণও জানাযাটির মন্তব্য করছেন এভাবে --
ষষ্ঠ জানাযাঃ
আলীপুত্র মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়ার জানাযা
হযরত আলী (রা:) এর পুত্র মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়া (রা:) ৮১ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন। তাঁর জানাযা কালে মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়া (রহ:) এর পুত্রগণ তদানিন্তন খলীফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের পক্ষ থেকে মদীনার গভর্ণর আবার ইবনে ওসসান (রা:) কে লক্ষ্য করে বলেছিলেন --
"আমরা জানি, সমকালীন খলীফাই জানাযার ইমামতিতে সর্বাধিক যোগ্য বক্তি । এমনটি না জানলে আপনাকে আগে বাড়াতাম না । তিনি আগে বাড়েন এবং জানাযা পড়ান"।
সপ্তম জানাযাঃঃ
আলীকন্যা উম্মে কুলছুম (রা:) এর জানাযা
এখানে আরেকটি জানাযা উল্লেখ করতে চাই । বিশিষ্ট শীয়া আলেম আবূ আলী মুহাম্মাদ ইবনে আসআছ আল -কুফী বর্ণনা করেন এভাবে --
"ইমাম জাফর সাদেক (রহ:) ইমাম মোহাম্মাদ বাকের (রহ:) এর সূত্রে বর্ণনা করেন, হযরত আলী
মোরতাযা (রা:) এর কন্যা হযরত উম্মে কুলসুম (রহ:) ইন্তেকাল কালে মারওয়ান ইবনুল হাকাম মদীনার গভর্ণর ছিলেন । গভর্ণর জানাযার উদ্দেশ্যে বেরোলে হযরত হুসাইন (রা:) বলেন, যদি সুন্নত না হত তাহলে আমি মারওয়ানকে নামায পড়ানোর অনুমতি দিতাম না "।
উপরিউক্ত বর্ণনাসমূহ সবই শীয়া বুযুর্গগণের । আর জানাযা সমূহও হাশেমী বুযুর্গগণের। এসব
জানাযায় দেখা যাচ্ছে সমকালীন খলীফাগণই জানাযা পড়িয়েছিলেন । এবার আমরা হযরত ফাতেমা (রা:) এর জানাযাটি দেখব। ওখানেও ইমামুল মুসলিমীন হযরত আবূ বকর (রা:) উপস্হিত ছিলেন । যিনি তদানান্তন মসজিদে নববীর ইমামও বটে । সুতরাং সর্বদিক দিয়ে তিনি এ জানাযার যোগ্য ইমম ছিলেন।
একটি প্রশ্ন ও উত্তর
বিভিন্ন হাদীসের কিতাবের একটি বর্ণনা উপরোক্ত রেওয়ায়েত সমূূূহের সাথে সাংঘর্ষিক। বর্ণনাটি এমন --
"ফাতেমাকে তাঁর স্বামী আঁধার রাতেই দাফন করেন। হযরত আবূ বকর (রা:) কে জানাযার খবর পর্যন্ত জানানো হয়নি । হযরত আলী (রা:) ই
তাঁর জানাযা পড়িয়েছিলেন "।
উপরোক্ত বর্ণনায় তিনটি দিক ফুটে ওঠে --
ক. আঁধার রাতে ফাতেমার দাফন।
খ. হযরত আলী (রা:) এর এই মহাশোক খলীফার কাছে গোপন।
গ. ফাতেমা (রা:) এর জানাযায় আলী (রা:) এর ইমামতি।
উপরোক্ত রেওয়ায়েত নিয়ে কিছু কথা --
১. ইবনে শিহাব যুহরীর একক বর্ণনা ও সংযোজন
আমরা যেখানে এই রেওয়ায়েত পেয়েছি তার সব স্হানেই দেখেছি সবগুলোর বর্ণনাসূত্রেই যুহরী (রহ:) বিদ্যমান। যুহরী (রহ:) ছাড়া একটা রেওয়ায়েত পাওয়া যাবে না যাতে কোন প্রকার সংঘর্ষ কিংবা স্ব বিরোধ পাওয়া যাবে। ইতোপূর্বে
ফাদাকের মাসয়ালায় আমরা ইমাম যুহরী প্রসঙ্গে
আলোচনা করেছি ।
২. বর্ণনাটির নির্মোহ বিশ্লেষনঃঃ
বর্ণনাটিতে তিনটি দিক ফুটে উঠেছে । এ প্রতঙ্গে আমরা সুবিখ্যাত মুহাদ্দিস শায়খুল ইসলাম ইবনে হাজার আসকালানীর বিশ্লেষন দেখব ফাতহুল
বারীতে তিনি লেখেন -
হযরত ফাতেমা (রা:) হিজাব ও পর্দাব্রতের জন্য রাতে দাফন করে দেওয়ার অসিয়ত করেছিলেন। আর হযরত আলী হযরত আবূ বকর (রা:) খুব সম্ভব এ জন্য খবরটি দেননি । শোকাবহ এ সংবাদটি তার অজানা নেই । উপরিউক্ত রেওয়ায়েত এমন কথা উল্লেক নেই যে , হযরত ফাতেমা (রা:)এর ওফাতের খবর হযরত আবূ বকর (রা:) জানতে পারেননি এবং তিনি নামাযে জানাযাও আদায় করেননি "।
সতর্কীকরণ:
অন্যভাবে বলা যায়, হযরত আবূ বকর (রা:) কে এই শোকাবহ খবর হযরত আলী (রা:) এর দেওয়ার দরকার হয়নি। কেননা ফাতেমা (রা:)এর
সেবায়রত তাঁর স্ত্রী হযরত আসমা বিনতে উমাইস
(রা:) এর মাধ্যমেই তিনি এ খবর পেয়ে থাকবেন।
তাছাড়া হযরত আলী (রা:) এর জানাযা পড়ানোর পথে সিদ্দীকে আকবার (রা:) বাধাদানকারী হতে পারেন না । সুতরাং জানাযা পড়ানো আর না পড়ানো নিয়ে যে সব রেওয়ায়েত বিদ্যমান তাতে
কোন স্ববিরোধ থাকার কথা নয় । থাকতেও পারে না।
এই অধ্যায়ের সর্বশেষ নিবেদন ছিল হযরত ফাতেমা (রা:)এর জানাযা প্রসঙ্গ। আলহামদুলিল্লাহ, এবিষয়ে আমরা বিস্তারিত জেনেছি ।
ধরব সমকালীন খলীফারা যাদের নামাযে জানাযায় ইমামত করেছিলেন ।
প্রথম জানাযাঃঃ
হাশেমী বুযুর্গদের মাঝে নওফেল ইবনে হারেস ইবনে আবদুল মোতালেব (রা:) ১৫ হিজরীতে মদীনায় মৃত্যুবরণ করেন। হযরত ওমর (রা:) তখন মুসলিম বিশ্বের খলীফা । তিনি তাঁর জানাযা
পড়ান। জান্নাতুল বাকীতে তাঁকে দাফন করা হয় -
"হযরত ওমর (রা:) খলীফা হবার ১বছর ৩মাসের
মাথায় নওফেল (রা:) ইন্তেকাল করেন। হযরত ওমর (রা:) তাঁর নামাযে জানাযায় ইমামত করেন।
পরে বাকীতে (মদীনার গোরস্হান ) তাঁর খাটিয়া বহন করে নিয়ে যান এবং ওখানেই তাঁকে দাফন করা হয় "।
দ্বিতীয় জানাযাঃঃ
অন্যতম হাশেমী বুযুর্গ হযরত আবূ সুফিয়ান ইবনে হারেস ইবনে আবদুল মোতালেব। এদিকে সুফিয়ান (রা:) রাসূলুল্লাহ (সা:) এর দুধভাই ছিলেন । হালিমা সাদিয়া (রা:) তাদের দু'জনার দুধমাতা ছিলেন। তার সম্পর্কে বর্ণিত আছে --
"আবূ সুফিয়ান (রা:) ২০ হিজরীতে মদীনায় ইন্তেকাল করলে দ্বিতীয় খলীফা ওমর (রা:) তাঁর জানাযায় ইমামতি করেন । বলা হয় তাঁর ভাই নওফেলের চার মাস পরে তিনি ইন্তেকাল করেন।
তৃতীয় জানাযাঃঃ তৃতীয় জানাযাটি রাসূলুল্লাহ (সা:) এর আপন চাচা হযরত আব্বাস (রা:) এর।
এতদসম্পর্কে ওলামায়ে কেরামের ভাষ্য -
"রাসূলুল্লাহ (সা:) এর চাচা হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মোত্তালেবের মৃত্যু ৩২ হিজরীতে মদীনায় হয়েছিল। দিনটি ছিল শুক্রবার । তাঁর মৃত্যুটি হযরত ওসমান (রা:) এর শাহাদতের দু'বছর পূর্বে হয়েছিল। সমকালীন খলীফা হযরত ওসমান ইবনে আফফান (রা:) তাঁর জানাযা পড়িয়েছিলেন ।ব বাকীতে তাঁঁকে দাফন করা হয়েছিল । ওই সময় তার বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর "।
সতর্কীকরণঃঃ উপরিউক্ত তিনটি জানাযাই মদীনায় হযরত আলী (রা:) উপস্হিতিতেই সংঘটিত হয়েছিল । আর তিনটি জানাযাই তদানিন্তন মুসলিম বিশ্বের খলীফাই আদায় করেছিলেন।
চতুর্থ জানাযাঃঃ
এবার আমরা খলীফদের জানাযা পড়ানো সম্পর্কে হযরত হাসান (রা:) এর জানাযা প্রসংগ দেখব । তাঁর ইন্তেকালও মদীনায় হয়েছিল। কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে তিনি ৫০ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন। ওই সময় মুসলিম বিশ্বের খলীফা ছিলেন হযরত আমীরে মুয়াবিয়া (রা:)।
তাঁর রাজধানী ছিল সিরিয়ায় । তৎকালে মদীনার
গভর্ণর ছিলেন হযরত সাঈদ ইবনুল আস (রা:) স্বয়ং হুসাইন (রা:) ও ওইসময় মদীনায় উপস্হিত ছিলেন। তিনি জানাযার সময় মদীনার গভর্ণরকে সামনে আগাতে গিয়ে বলেছিলেন, সুন্নত (নিয়ম )
না হলে আপনাকে আগে বাড়াতাম না ।
অর্থাৎ ইমাম হুসাইন (রা:) ইমাম হাসান (রা:) এর জানাযার সময়ে তদানিন্তন মদীনার গভর্ণরকে বলেন , আগে বাড়ুন, জানাযা পড়ান, এটি ইসলারে আদর্শ না হলে আপনাকে আগে বাড়তে বলতাম না ।
নোট: শীয়া আলেমগণই শহীদে কারবালা ইমাম হুসাইন (রা:) এর এই কথা নকল করেছেন । কথাটি তাঁর ভায়ের জানাযাকালীন। আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের কিতাবেও এই কথাটি বিদ্যমান।
আমরা এখানে স্রেফ রেফারেন্স দেয়াকেই যথেষ্ট মনে করছি। কথাটি এভাবে এসেছে যে,
"যদি সুন্নত না হত তাহলে আপনাকে আগে বাড়তে বলতাম না"।
এখানে সিরাজুল হিন্দ হযরত শাহ আবদুল আযীয (রহ:) এর একটি বিশ্বেষণধর্মী কথা প্রনিধানযোগ্য --
"সুতরাং জানা গেল হযরত ফাতেমা (রা:) হযরত আবূ বকর (রা:) কে দিয়ে তাঁর জানাযা না পড়ানোর কোনও অসিয়ত করেননি। নতুবা ইমাম হুসাইন (রা:) তাঁর মায়ের অসিয়তের বিপরীত কাজটি কীভাবে আঞ্জাম দিলেন ? আর এ কথা
স্বতঃসিদ্ধ যে, জানাযা পড়ানোর যোগ্যতায় সাঈদ
ইবনুল আস (রা:) আবূ বকর (রা:) এর তুলনায় হাজার গুনে নিম্নতর "।
পঞ্চম জানাযাঃঃ
আবদুল্লাহ ইবনে জাফর (রা:) এর জানাযা -
"সিংহভাগ ঐতিহাসিকের মত এই যে, ৮০ হিজরীতে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জাফর (রা:) মারা যান । হযনত ওসমান (রা:) এর পুত্র হযরত আবান (রহ:) তাঁর জানাযা পড়ান । ঘটনাটি বন্যার বছরের "।
শীয়া ওলামাগণও জানাযাটির মন্তব্য করছেন এভাবে --
ষষ্ঠ জানাযাঃ
আলীপুত্র মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়ার জানাযা
হযরত আলী (রা:) এর পুত্র মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়া (রা:) ৮১ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন। তাঁর জানাযা কালে মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়া (রহ:) এর পুত্রগণ তদানিন্তন খলীফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের পক্ষ থেকে মদীনার গভর্ণর আবার ইবনে ওসসান (রা:) কে লক্ষ্য করে বলেছিলেন --
"আমরা জানি, সমকালীন খলীফাই জানাযার ইমামতিতে সর্বাধিক যোগ্য বক্তি । এমনটি না জানলে আপনাকে আগে বাড়াতাম না । তিনি আগে বাড়েন এবং জানাযা পড়ান"।
সপ্তম জানাযাঃঃ
আলীকন্যা উম্মে কুলছুম (রা:) এর জানাযা
এখানে আরেকটি জানাযা উল্লেখ করতে চাই । বিশিষ্ট শীয়া আলেম আবূ আলী মুহাম্মাদ ইবনে আসআছ আল -কুফী বর্ণনা করেন এভাবে --
"ইমাম জাফর সাদেক (রহ:) ইমাম মোহাম্মাদ বাকের (রহ:) এর সূত্রে বর্ণনা করেন, হযরত আলী
মোরতাযা (রা:) এর কন্যা হযরত উম্মে কুলসুম (রহ:) ইন্তেকাল কালে মারওয়ান ইবনুল হাকাম মদীনার গভর্ণর ছিলেন । গভর্ণর জানাযার উদ্দেশ্যে বেরোলে হযরত হুসাইন (রা:) বলেন, যদি সুন্নত না হত তাহলে আমি মারওয়ানকে নামায পড়ানোর অনুমতি দিতাম না "।
উপরিউক্ত বর্ণনাসমূহ সবই শীয়া বুযুর্গগণের । আর জানাযা সমূহও হাশেমী বুযুর্গগণের। এসব
জানাযায় দেখা যাচ্ছে সমকালীন খলীফাগণই জানাযা পড়িয়েছিলেন । এবার আমরা হযরত ফাতেমা (রা:) এর জানাযাটি দেখব। ওখানেও ইমামুল মুসলিমীন হযরত আবূ বকর (রা:) উপস্হিত ছিলেন । যিনি তদানান্তন মসজিদে নববীর ইমামও বটে । সুতরাং সর্বদিক দিয়ে তিনি এ জানাযার যোগ্য ইমম ছিলেন।
একটি প্রশ্ন ও উত্তর
বিভিন্ন হাদীসের কিতাবের একটি বর্ণনা উপরোক্ত রেওয়ায়েত সমূূূহের সাথে সাংঘর্ষিক। বর্ণনাটি এমন --
"ফাতেমাকে তাঁর স্বামী আঁধার রাতেই দাফন করেন। হযরত আবূ বকর (রা:) কে জানাযার খবর পর্যন্ত জানানো হয়নি । হযরত আলী (রা:) ই
তাঁর জানাযা পড়িয়েছিলেন "।
উপরোক্ত বর্ণনায় তিনটি দিক ফুটে ওঠে --
ক. আঁধার রাতে ফাতেমার দাফন।
খ. হযরত আলী (রা:) এর এই মহাশোক খলীফার কাছে গোপন।
গ. ফাতেমা (রা:) এর জানাযায় আলী (রা:) এর ইমামতি।
উপরোক্ত রেওয়ায়েত নিয়ে কিছু কথা --
১. ইবনে শিহাব যুহরীর একক বর্ণনা ও সংযোজন
আমরা যেখানে এই রেওয়ায়েত পেয়েছি তার সব স্হানেই দেখেছি সবগুলোর বর্ণনাসূত্রেই যুহরী (রহ:) বিদ্যমান। যুহরী (রহ:) ছাড়া একটা রেওয়ায়েত পাওয়া যাবে না যাতে কোন প্রকার সংঘর্ষ কিংবা স্ব বিরোধ পাওয়া যাবে। ইতোপূর্বে
ফাদাকের মাসয়ালায় আমরা ইমাম যুহরী প্রসঙ্গে
আলোচনা করেছি ।
২. বর্ণনাটির নির্মোহ বিশ্লেষনঃঃ
বর্ণনাটিতে তিনটি দিক ফুটে উঠেছে । এ প্রতঙ্গে আমরা সুবিখ্যাত মুহাদ্দিস শায়খুল ইসলাম ইবনে হাজার আসকালানীর বিশ্লেষন দেখব ফাতহুল
বারীতে তিনি লেখেন -
হযরত ফাতেমা (রা:) হিজাব ও পর্দাব্রতের জন্য রাতে দাফন করে দেওয়ার অসিয়ত করেছিলেন। আর হযরত আলী হযরত আবূ বকর (রা:) খুব সম্ভব এ জন্য খবরটি দেননি । শোকাবহ এ সংবাদটি তার অজানা নেই । উপরিউক্ত রেওয়ায়েত এমন কথা উল্লেক নেই যে , হযরত ফাতেমা (রা:)এর ওফাতের খবর হযরত আবূ বকর (রা:) জানতে পারেননি এবং তিনি নামাযে জানাযাও আদায় করেননি "।
সতর্কীকরণ:
অন্যভাবে বলা যায়, হযরত আবূ বকর (রা:) কে এই শোকাবহ খবর হযরত আলী (রা:) এর দেওয়ার দরকার হয়নি। কেননা ফাতেমা (রা:)এর
সেবায়রত তাঁর স্ত্রী হযরত আসমা বিনতে উমাইস
(রা:) এর মাধ্যমেই তিনি এ খবর পেয়ে থাকবেন।
তাছাড়া হযরত আলী (রা:) এর জানাযা পড়ানোর পথে সিদ্দীকে আকবার (রা:) বাধাদানকারী হতে পারেন না । সুতরাং জানাযা পড়ানো আর না পড়ানো নিয়ে যে সব রেওয়ায়েত বিদ্যমান তাতে
কোন স্ববিরোধ থাকার কথা নয় । থাকতেও পারে না।
এই অধ্যায়ের সর্বশেষ নিবেদন ছিল হযরত ফাতেমা (রা:)এর জানাযা প্রসঙ্গ। আলহামদুলিল্লাহ, এবিষয়ে আমরা বিস্তারিত জেনেছি ।
আওফি স্ট্যান্ডার্ড এর বিবৃতি -৪
১. স্ট্যান্ডার্ডটির আওতা -
এই স্ট্যান্ডার্ডটি প্রতিসাদনের মাধ্যমে ঋনের নিস্পত্তিকরন কাভার করেছে। স্টান্ডার্ডটি যেসব
ক্ষেত্রে প্রযোজ গবে না -
স্হানান্তরের মাধ্যমে দায়মুক্ত হওয়া, বাধ্যবাধকতা
ওয়েভার বা ছাড় দেয়া , রাইট পে এবল এর কম্পোজিশন, একুইজেশন অথবা দ্বিপাক্ষিক চুক্তি বাতিল করা, কারন এগুলো তাদের প্রাসঙ্গিক স্ট্যান্ডার্ড এ বর্ণনা করা হয়েছে।
২. প্রতিসাদন এর সংজ্ঞা এবং এর বিভিন্ন ধরণ
প্রতিসাদন হচ্ছে একটি ঋন প্রাপ্যকে ঋন প্রদেয় দ্বারা আবদমন বা অবসান করা । এটি প্রধানত দুই ধরনের - বাধ্যতামূলক প্রতিসাদন এবং চুক্তিভিত্তিক প্রতিসাদন।
২/১ বাধ্যতামূলক প্রতিসাদন
এটি এমন ধরনের প্রতিসাদন যার জন্য কোন দ্বিপাক্ষিক চুক্তি বা ঋনগ্রস্হ দুই পক্ষের কোন সম্মতির প্রয়োজন হয় না । কোন কোন ক্ষেত্রে এটি এমন প্রতিসাদন যা এক পক্ষের অনুরোধের প্রেক্ষিতে অন্য পক্ষকে বাধ্য করা হয়। এটি দুই ভাগে বিভক্ত আবশ্যকীয় প্রতিসাদন (দুই পক্ষের)
(২) ও চাহিদা প্রতিসাদন (সুপরিয়র ঋনীর চাহিদা সাপেক্ষে অপর পক্ষকে বাধ্য করা)
২/১/১ বাধ্যতামূলক প্রতিসাধন হচ্ছে দুটি ঋনের স্বতঃ স্ফূর্ত ছাড় যা উভয় পক্ষ বা যে কোন পক্ষের অনুরোধ বা সম্মতির শর্ত সাপেক্ষ নয় ।
২/১/২ বাধ্যতামূলক প্রতিসাদনের বৈধতার শর্ত সমূহ নিম্নরুপঃঃ
ক. উভয় পক্ষ একই সময় পাওনাদার ও দেনাদার হবে।
খ. উভয় ঋন একই রকম ও ধরনের , একই বর্ণনা ও ম্যাচুয়িরিটির হবে। অধিকন্ত দুটো ঋন যদি পরিমানে সমান না হয়, প্রতিসাদন উভয় পক্ষের মাঝে সমপরিমানে হবে এবং বড় অংশের পাওনাদার অবশিষ্ট পরিমান ঋন পাওনা
থাকবেন।
গ. দুটো ঋনের কোনটিই তৃতীয় পক্ষের বাধ্যবাধকতা দ্বারা ভারাক্রান্ত থাকবে না। যেমন যেকোন একটি ঋনে মর্টগেজ এর অধিকার । এর
উদ্দেশ্য হচ্ছে ঋনের সাথে জড়িত তৃতীয় পক্ষের
অধিকারকে সুরক্ষা দেয়া ।
এই স্ট্যান্ডার্ডটি প্রতিসাদনের মাধ্যমে ঋনের নিস্পত্তিকরন কাভার করেছে। স্টান্ডার্ডটি যেসব
ক্ষেত্রে প্রযোজ গবে না -
স্হানান্তরের মাধ্যমে দায়মুক্ত হওয়া, বাধ্যবাধকতা
ওয়েভার বা ছাড় দেয়া , রাইট পে এবল এর কম্পোজিশন, একুইজেশন অথবা দ্বিপাক্ষিক চুক্তি বাতিল করা, কারন এগুলো তাদের প্রাসঙ্গিক স্ট্যান্ডার্ড এ বর্ণনা করা হয়েছে।
২. প্রতিসাদন এর সংজ্ঞা এবং এর বিভিন্ন ধরণ
প্রতিসাদন হচ্ছে একটি ঋন প্রাপ্যকে ঋন প্রদেয় দ্বারা আবদমন বা অবসান করা । এটি প্রধানত দুই ধরনের - বাধ্যতামূলক প্রতিসাদন এবং চুক্তিভিত্তিক প্রতিসাদন।
২/১ বাধ্যতামূলক প্রতিসাদন
এটি এমন ধরনের প্রতিসাদন যার জন্য কোন দ্বিপাক্ষিক চুক্তি বা ঋনগ্রস্হ দুই পক্ষের কোন সম্মতির প্রয়োজন হয় না । কোন কোন ক্ষেত্রে এটি এমন প্রতিসাদন যা এক পক্ষের অনুরোধের প্রেক্ষিতে অন্য পক্ষকে বাধ্য করা হয়। এটি দুই ভাগে বিভক্ত আবশ্যকীয় প্রতিসাদন (দুই পক্ষের)
(২) ও চাহিদা প্রতিসাদন (সুপরিয়র ঋনীর চাহিদা সাপেক্ষে অপর পক্ষকে বাধ্য করা)
২/১/১ বাধ্যতামূলক প্রতিসাধন হচ্ছে দুটি ঋনের স্বতঃ স্ফূর্ত ছাড় যা উভয় পক্ষ বা যে কোন পক্ষের অনুরোধ বা সম্মতির শর্ত সাপেক্ষ নয় ।
২/১/২ বাধ্যতামূলক প্রতিসাদনের বৈধতার শর্ত সমূহ নিম্নরুপঃঃ
ক. উভয় পক্ষ একই সময় পাওনাদার ও দেনাদার হবে।
খ. উভয় ঋন একই রকম ও ধরনের , একই বর্ণনা ও ম্যাচুয়িরিটির হবে। অধিকন্ত দুটো ঋন যদি পরিমানে সমান না হয়, প্রতিসাদন উভয় পক্ষের মাঝে সমপরিমানে হবে এবং বড় অংশের পাওনাদার অবশিষ্ট পরিমান ঋন পাওনা
থাকবেন।
গ. দুটো ঋনের কোনটিই তৃতীয় পক্ষের বাধ্যবাধকতা দ্বারা ভারাক্রান্ত থাকবে না। যেমন যেকোন একটি ঋনে মর্টগেজ এর অধিকার । এর
উদ্দেশ্য হচ্ছে ঋনের সাথে জড়িত তৃতীয় পক্ষের
অধিকারকে সুরক্ষা দেয়া ।
Monday, 13 May 2019
নামাযে ইমামতির ইসলামী বিধি -বিধান
হযরত ফাতেমা (রা:) জানাযার বিশ্লেষণের পূর্বে
'ইমামতিতে ইসলামের বিধ' জানা গেলে সমস্যাটির সহজ সমাধান হবে।
ইসলামী শরীয়তোশরীয়তে (পাঞ্জেগানা নামায হোক কিংবা জানাযা) , মুসলিম আমীর এবং খলীফা ওয়াক্তিয়া নামাযে ইমামতির অধিকার রাখেন। তিনি যদি উপস্হিত না থাকেন কিংবা তার কোন ওযর থাকে তাহলে আমীরুল মুমিনীনের পক্ষ থেকে যিনি নির্ধারিত থাকবেন তিনিই এর অধিকারী হবেন। প্রতি শতাব্দীর মানুষ উপরিউক্ত মাসয়ালায় এই বিধানটি এভাবেই মেনে আসছেন। ইসলামী ফিকহের কিতাবগুলোতেও এভাবেই লেখা আছে। এখানে আমরা সুন্নী কিতাবের দিকে না গিয়ে শীয়া বন্ধুদের কিতাবকেই প্রামাণ্য হিসেবে পেশ করব।
১। জনগণ ইমাম জাফর সাদেক (রহ:) কে এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন --
(১) রাসূলুল্লাহ (সা:) ইরশাদ করেন , যে লোক অন্যদের তুলনায় কিরাত শাস্ত্রে অধিক পারদর্শী সে ইমামতি করবে । কিরাত শাস্ত্রে পারদর্শীগণ যদি সমান্তরাল হয়ে যান তখন হিজরতে অগ্রজ ব্যক্তি ইমামতি করবেন। যদি হিজরতেও সমান্তরাল কয়েকজন হয়ে যান তাহলে বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিই ইমামতি করবেন।
(২) শায়খ তুসী বলেন, ইমামতির যোগ্য সর্বাধিক সেই লোক যিনি কুরআন -চর্চায় অধীক পারদর্শী ।
এতে সকলে সমান্তরাল হলে হিজরতে অগ্রজ ব্যক্তিই ইমামতের যোগ্য নির্ধারিত হবেন। হিজরতেও সকলে সমান হলে বয়োজেষ্ঠ্য ব্যক্তিই
ইমামতের যোগ্য নির্ধারিত হবেন।
শীয়া মুজতাহিদবৃন্দ তাদের ফতোয়াসিদ্ধ মত ব্যক্ত করেন এভাবে -
"যদি জানাযা পড়ুয়াদের মাঝে সকলে ইলমে ফিকহ ও ইলমে কিরাআতে সমান্তরাল হয় তবে দারুল ইসলামের দিকে হিজরতে যে অগ্রজ সেই
ইমামতের যোগ্য । উপস্হিতজনেরা যদি হিজরতেও বরাবর হয় তাহলে তাদের মধ্যকার বয়োজেষ্ঠ লোকটিই ইমামতের সর্বাধিক হকদার।
এদিকে মসজিদের বেতনভুক ইমাম সর্বাধিক জানাযা পড়ানোর অধিকারী । এমনিভাবে বাড়ীওয়ালা তার বাড়ীতে ইমামতের সর্বাধিক অধিকারী। অবশিষ্ট লোকদের মাঝে আমীরুল মুমিনীন ও সমকালীন খলিফাই ইমামতের সর্বাধিক যোগ্য ব্যক্তি।
৪. ইমাম জাফর সাদেক (রহ:) এর ভাষ্য দেখুন -
"ইমাম জাফর সাদেক (রহ:) বলেন, সমকালীন আমীর উপস্হিত থাকলে জানাযার ব্যাপারে তিনিই সর্বাধিক যোগ্য।
৫. এবার খোদ হযরত আলী (রা:) এর ভাষ্যের প্রতি নজর বুলানো যাক -
"হযরত আলী (রা:) বলেন, মৃতের নিকটাত্মীয়ের
চেয়ে সমকালীন শাসকই নামযে জানাযার অধিক অধিকারী।
উপরিউক্ত শীয়া রেফারেন্সসমূহ দ্বারা প্রতীয়মান
হচ্ছে, ইমামুল মুসলিম ও খলীফাতুল মুমিনীনের
উপস্হিতিতে অপর কোন মুমিন -মুসলমানের জানাযা পড়ানোর অধিকার নেই। ইমামতের অধিকার এক্ষেত্রে কেবল তাঁরই । চাই নামাযটি পাঞ্জেগানা হোক কিংবা জানাযা ।
ইমামদের আলোচনা অবগত হবার পর সুধী পাঠকই বিচার করুন, ইমামতের শর্ত কার মধ্যে পাওয়া যায়? একটু ভাবলেই দেখবেন হযরত ফাতেমা (রা:) এর জানাযা সম্পর্কে যে কথা বাজারে চাউর হয়ে আছে তাতে হযরত আবূ বকর (রা:) এর যোগ্যতা ও অযোগ্যতা কতটুকু। আর নবী -নন্দিনীর জানাযাটি পড়িয়ে তিনি অনধিকার চর্চাইবা কতখানি করেছেন তাও বলা বাহুল্য।
মজার বিষয় এই যে, ওইসময় জানাযায় যারা উপস্হিত ছিলেন তন্মধ্যে ইসলাম গ্রহণের দিক দিয়ে সর্বপ্রাচীন ছিলেন হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা:)। হিজরতের বেলায় তিনি ছিলেন সর্বঅগ্রজ, অন্যান্য লোকদের তুলনায় সিদ্দীকে আকবার (রা:) ছিলেন বয়োজেষ্ঠ্য। সর্বোপরি হযরত আলী (রা:) ও ফাতেমা (রা:) যে মহল্লায়
বসবাস করতেন সেই মহল্লা অর্থাৎ মসজিদে নববীর ইমামও ছিলেন হযরত আবূ বকর (রা:)।
সবার চেয়ে বড় কথা হল, ওইসময় তিনি গোটা মুসলিম উম্মাহর আমীর ও খলীফা ছিলেন।
একথাও মনে রাখতে হবে , হযরত ফাতেমা (রা:)
এর ইন্তেতালের সময় সিদ্দীকে আকবার (রা:) মদীনায় উপস্হিত ছিলেন। তিনি কোনও সফরে
ছিলেন না । মদীনায় থাকতেই তিনি নবী -নন্দিনীর ওফাতের খবর পান এবং জানাযায় শরীক হন।
ইনসাফী দৃষ্টিকোণ থেকে পাঠকই এখন বিচার করুন উক্ত জানাযা পড়ানোর প্রকৃত অধিকারী কে? এবং কে এই জানাযা পড়িয়েছিলেন? সঠিক
ও প্রকৃত উত্তর এই যে, ওই জানাযা রাসূলের খলীফা সিদ্দীকে আকবার (রা:) ই পড়িয়েছিলেন
এবং তিনি নবী পরিবারের আত্মীয়তার হকও পুরোপুরি আদায় করেছিলেন।
'ইমামতিতে ইসলামের বিধ' জানা গেলে সমস্যাটির সহজ সমাধান হবে।
ইসলামী শরীয়তোশরীয়তে (পাঞ্জেগানা নামায হোক কিংবা জানাযা) , মুসলিম আমীর এবং খলীফা ওয়াক্তিয়া নামাযে ইমামতির অধিকার রাখেন। তিনি যদি উপস্হিত না থাকেন কিংবা তার কোন ওযর থাকে তাহলে আমীরুল মুমিনীনের পক্ষ থেকে যিনি নির্ধারিত থাকবেন তিনিই এর অধিকারী হবেন। প্রতি শতাব্দীর মানুষ উপরিউক্ত মাসয়ালায় এই বিধানটি এভাবেই মেনে আসছেন। ইসলামী ফিকহের কিতাবগুলোতেও এভাবেই লেখা আছে। এখানে আমরা সুন্নী কিতাবের দিকে না গিয়ে শীয়া বন্ধুদের কিতাবকেই প্রামাণ্য হিসেবে পেশ করব।
১। জনগণ ইমাম জাফর সাদেক (রহ:) কে এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন --
(১) রাসূলুল্লাহ (সা:) ইরশাদ করেন , যে লোক অন্যদের তুলনায় কিরাত শাস্ত্রে অধিক পারদর্শী সে ইমামতি করবে । কিরাত শাস্ত্রে পারদর্শীগণ যদি সমান্তরাল হয়ে যান তখন হিজরতে অগ্রজ ব্যক্তি ইমামতি করবেন। যদি হিজরতেও সমান্তরাল কয়েকজন হয়ে যান তাহলে বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিই ইমামতি করবেন।
(২) শায়খ তুসী বলেন, ইমামতির যোগ্য সর্বাধিক সেই লোক যিনি কুরআন -চর্চায় অধীক পারদর্শী ।
এতে সকলে সমান্তরাল হলে হিজরতে অগ্রজ ব্যক্তিই ইমামতের যোগ্য নির্ধারিত হবেন। হিজরতেও সকলে সমান হলে বয়োজেষ্ঠ্য ব্যক্তিই
ইমামতের যোগ্য নির্ধারিত হবেন।
শীয়া মুজতাহিদবৃন্দ তাদের ফতোয়াসিদ্ধ মত ব্যক্ত করেন এভাবে -
"যদি জানাযা পড়ুয়াদের মাঝে সকলে ইলমে ফিকহ ও ইলমে কিরাআতে সমান্তরাল হয় তবে দারুল ইসলামের দিকে হিজরতে যে অগ্রজ সেই
ইমামতের যোগ্য । উপস্হিতজনেরা যদি হিজরতেও বরাবর হয় তাহলে তাদের মধ্যকার বয়োজেষ্ঠ লোকটিই ইমামতের সর্বাধিক হকদার।
এদিকে মসজিদের বেতনভুক ইমাম সর্বাধিক জানাযা পড়ানোর অধিকারী । এমনিভাবে বাড়ীওয়ালা তার বাড়ীতে ইমামতের সর্বাধিক অধিকারী। অবশিষ্ট লোকদের মাঝে আমীরুল মুমিনীন ও সমকালীন খলিফাই ইমামতের সর্বাধিক যোগ্য ব্যক্তি।
৪. ইমাম জাফর সাদেক (রহ:) এর ভাষ্য দেখুন -
"ইমাম জাফর সাদেক (রহ:) বলেন, সমকালীন আমীর উপস্হিত থাকলে জানাযার ব্যাপারে তিনিই সর্বাধিক যোগ্য।
৫. এবার খোদ হযরত আলী (রা:) এর ভাষ্যের প্রতি নজর বুলানো যাক -
"হযরত আলী (রা:) বলেন, মৃতের নিকটাত্মীয়ের
চেয়ে সমকালীন শাসকই নামযে জানাযার অধিক অধিকারী।
উপরিউক্ত শীয়া রেফারেন্সসমূহ দ্বারা প্রতীয়মান
হচ্ছে, ইমামুল মুসলিম ও খলীফাতুল মুমিনীনের
উপস্হিতিতে অপর কোন মুমিন -মুসলমানের জানাযা পড়ানোর অধিকার নেই। ইমামতের অধিকার এক্ষেত্রে কেবল তাঁরই । চাই নামাযটি পাঞ্জেগানা হোক কিংবা জানাযা ।
ইমামদের আলোচনা অবগত হবার পর সুধী পাঠকই বিচার করুন, ইমামতের শর্ত কার মধ্যে পাওয়া যায়? একটু ভাবলেই দেখবেন হযরত ফাতেমা (রা:) এর জানাযা সম্পর্কে যে কথা বাজারে চাউর হয়ে আছে তাতে হযরত আবূ বকর (রা:) এর যোগ্যতা ও অযোগ্যতা কতটুকু। আর নবী -নন্দিনীর জানাযাটি পড়িয়ে তিনি অনধিকার চর্চাইবা কতখানি করেছেন তাও বলা বাহুল্য।
মজার বিষয় এই যে, ওইসময় জানাযায় যারা উপস্হিত ছিলেন তন্মধ্যে ইসলাম গ্রহণের দিক দিয়ে সর্বপ্রাচীন ছিলেন হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা:)। হিজরতের বেলায় তিনি ছিলেন সর্বঅগ্রজ, অন্যান্য লোকদের তুলনায় সিদ্দীকে আকবার (রা:) ছিলেন বয়োজেষ্ঠ্য। সর্বোপরি হযরত আলী (রা:) ও ফাতেমা (রা:) যে মহল্লায়
বসবাস করতেন সেই মহল্লা অর্থাৎ মসজিদে নববীর ইমামও ছিলেন হযরত আবূ বকর (রা:)।
সবার চেয়ে বড় কথা হল, ওইসময় তিনি গোটা মুসলিম উম্মাহর আমীর ও খলীফা ছিলেন।
একথাও মনে রাখতে হবে , হযরত ফাতেমা (রা:)
এর ইন্তেতালের সময় সিদ্দীকে আকবার (রা:) মদীনায় উপস্হিত ছিলেন। তিনি কোনও সফরে
ছিলেন না । মদীনায় থাকতেই তিনি নবী -নন্দিনীর ওফাতের খবর পান এবং জানাযায় শরীক হন।
ইনসাফী দৃষ্টিকোণ থেকে পাঠকই এখন বিচার করুন উক্ত জানাযা পড়ানোর প্রকৃত অধিকারী কে? এবং কে এই জানাযা পড়িয়েছিলেন? সঠিক
ও প্রকৃত উত্তর এই যে, ওই জানাযা রাসূলের খলীফা সিদ্দীকে আকবার (রা:) ই পড়িয়েছিলেন
এবং তিনি নবী পরিবারের আত্মীয়তার হকও পুরোপুরি আদায় করেছিলেন।
Sunday, 12 May 2019
হযরত ফাতেমা (রা:) এর জানাযা প্রসঙ্গ
ইতোপূর্বে খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতেমা (রা:) এর মুমূর্ষকালীন কথা জেনেছি। জেনেছি আবূ বকর (রা:) ও ওমর (রা:) নিখাদ সেবা ও দৌড়ঝাপের কথাও। এবার জানতে চেষ্টা করব মৃত্যুপরবর্তী জানাযা প্রসংগটি। জনসমাজে একটি কথা চাউর হয়ে আছে যে , খাতুনে জান্নাত ও হযরত আবূ বকর (রা:) এর মাঝে বৈরিতা ছিল। ছিল টানাপোড়েন। তিনি নাকি হযরত আলী (রা:) জীবনের শেষ মুহূর্তেও বলেছিলেন আবূ বকর (রা:) যেন আমার জানাযায় শরীক না হন। এ জন্য হযরত আলী (রা:) তড়িঘড়ি করে আঁধার রাতেই তাঁর দাফন কাফন সম্পন্ন করেন। আবূ বকর (রা:) কে তারা মৃত্যুর খবরটি পর্যন্ত দেননি।
জানাযার ব্যাপারটি কিছু বর্ণনার উপর ভিত্ত করে অতিশয় গুরুত্ব দেয়া হয়েছে । বিরোধী শিবিরটি সুচতুর ভাবে আম -জনতার মাঝে এই কথাটি ঢুকিয়ে দিয়েছে। তাদের প্রানান্তকর চেষ্টা ছিল, যে
কোন কিছুর বিনিময়ে খলীফা ও খাতুনে জান্নাতের মাঝের বিদ্বেষটি প্রতিষ্ঠিত করা । বিষয়টি একটু দীর্ঘ হলেও যেহেতু এটি আকীদানির্ভর সেহেতু বোধকরি পাঠক সমাজে বিরক্তিবোধ হবে না। প্রথমে আমরা 'মূল মাসয়ালা' মাঝে এই মাসয়ালার সমর্থনপুষ্ট শরয়ী নিয়ম -কানুন ও ঐতিহাসিক স্বাক্ষ্য পেশ করব। এরদ্বারা বনি হাশেমের নিরবচ্ছিন্ন আমলের প্রমাণটিও হয়ে যাবে।
"মূল মাসয়ালা'র বর্ণনাসমূহ
১, ইবনে সায়াদ বর্ণনা করেন -
"ইব্রাহীম নাখায়ী (রহ:) বর্ণনা করেন, হযরত ফাতেমা (রা:) এর জানাযা আবূ বকর (রা:) ই পড়ান । তিনি চার তাকবীরের সাথে তা পড়িয়েছিলেন।
২, ইবনে সায়াদের অপর একটি ভাষ্য --
"শাবী (রহ:) বলেন, ফাতেমা (রা:) এর জানাযা
হযরত আবূ বকর (রা:)ই পড়িয়েছিলেন ।
৩, ইমাম বায়হাকী স্ব -সনদে বর্ণনা করেন -
"হযরত ফাতেমা (রা:) মারা গেলে আলী (রা:) রাতারাতিই তাঁকে দাফন করেন। জানাযার মুহূর্তে আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) এর দু'হাত ধরে সামনে এগিয়ে দেন (ইমামতির জন্য) ।
৪, কানযুল উম্মাল প্রণেতা মুহাম্মাদ বাকেরের সুত্রে বর্ণিত রেওয়ায়েতকে খতীবের বরাতে বর্ণনা করে এভাবে -
"ইমাম জাফর সাদেক ইমাম মুহাম্মাদ বাকের (রহ:) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলতনয়া হযরত ফাতেমা (রা:) ইন্তেকাল করলে হযরত আবূ বকর (রা:) ও ওমর ফারুক (রা:) জানাযায় শরীক হন। হযরত আবূ বকর (রা:) আলী (রা:) কে জানাযা
পড়ানোর কথা বললে তিনি বলেন, আপনি আল্লাহর রাসূলের খলীফা। আপনার উপস্হিতিতে আমি জানাযা পড়াই কী করে ? সুতরাং আবূ বকর (রা:) অগ্রসর হয়ে জানাযা পড়ালেন।
৫, এবার দেখব ইমাম যাইনুল আবিদীন (রা:) এর একটি বর্ণনা । তাঁর ভাষ্যটি উপরোক্ত বিষয়কে আরো বিশ্লেষণধর্মী ও পরিচ্ছন্ন করে তুলবে --
অর্থঃ
জাফর সাদেক (রহ:) তাঁর বাবা মুহাম্মাদ বাকের (রহ:) থেকে, তিনি তাঁর পিতা ইমাম যাইনুল আবিদীন থেকে বর্ণনা করেন যে, মাগরিব ও ইশার মধ্যবর্তী সময়ে খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতেমা (রা:) ইন্তিকাল করেন। তাঁর মৃত্যুর কথা শুনে হযরত আবূ বকর ,ওমর, ওসমান, যুবায়ের ও আবদুর রহমান ইবনে আউফ রাযি আল্লাহু আনহুম প্রমুখ উপস্হিত হন। জানাযা নামাযের সময় হলে হযরত আলী (রা:) হযরত আবূ বকর (রা:) কে বললেন, হযরত! আগে বাড়ুন, নামাযটি পড়ান। আবূ বকর (রা:) জবাবে বললেন, আবূল হাসান!আপনার উপস্হিতিতে? (আমি নামায পড়াব! ) তিনি বললেন, আগে বাড়ুন! কসম খোদার! আপনি ছাড়া ফাতেমা (রা:) এর জানাযা আর কেউ পড়াবে না । শেষ পর্যন্ত আবূ বকর (রা:) ই জানাযা নামায পড়ালেন। রাতেই তাঁকে সমাহিত করা হলো।
সিরাজুল হিন্দ শাহ আবদুল আযীয মুহাদ্দিসে দেহলভী (রা:) 'তোহফায়ে ইছনা আশারিয়া' -এ সিদ্দীকের প্রতি ভর্ৎসনা অধ্যায়ের শেষে ফসলে খেতাবের সুত্রে বর্ণনা করেন যা ইমাম যাইনুল আবেদীনের উক্ত বর্ণনাটিকে সমর্থন করে -
"ফসলে খেতাবের লেখক উল্লেখ করেন, আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) , ওসমান (রা:) , আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা:) ও যুবায়ের ইবনুল আওয়াম (রা:) সহ সকল সাহাবী ইশার নামযে জড়ো হন। এদিকে ফাতেমা (রা:) এর শেষবিদায়টি এই সময়ের কিছু আগে পরে অনু্ষ্টিত হয় । মঙ্গলবারের ৩য় রমজানে তিনি মারা গিয়েছিলেন । প্রিয়নবী (সা:) এর তিরোধানের ৬ মাস পরে তিনি ইহলোক ছেড়েছিলেন। এ সময় ফাতেমা (রা:) এর বয়স ছিল মাত্র ২৮ । আলী (রা:) এর আর্জি মোতাবেক আবূ বকর (রা:) জানাযায় ইমামতি করেছিলেন। নামাযটি ছিল তাঁর ৪ তকবীরের সাথে।
৬, হাফেজ আবূ নাঈম ইস্পাহানী (রহ:) স্ব -সনদে হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) এর সূত্রে বর্ণনা করেন
"হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণনা করেন, নবী করিম (সা:) এর সমীপে একটি জানাযা এলে সেখানে জানাযাটি চার তকবীরের সাথে আদায় করে বললেন, ফেরেশতারা আদম (আ:) এর জানাযায়ও ৪ তাকবীর দিয়েছিলেন । ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন, আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) ফাতেমা (রা:) এর জানাযায় ৪ তাকবীর দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ওমর (রা:) হযরত আবূ বকর (রা:) এর জানাযায়ও ৪ তাকবীর দিয়েছিলেন। এদিকে হযরত সুহায়ব (রা:) হযরত ওমর (রা:) এর জানাযায়ও ৪ তাকবীর দিয়েছিলেন ।"
সার -সংক্ষেপঃ
জানাযা সম্পর্ক আমরা মোটামুটি ৬টি বর্ণনা সন্নিবেশ করেছি। তন্মধ্যে ৩টি বর্ণনা হাশেমীদের
(নবী বংশ) আবার তিনটি অ -হাশেমীদের । হাশেমী বর্ণনাকার যথাক্রমে ইমাম বাকের (রা:) , ইমাম যায়নুল আবেদীন (রা:) ও হযরত আব্দুল্লাহ
ইবনে আব্বাস (রা:) । উপরিউক্ত রেওয়ায়েতসমূহের সারকথা নিম্নরুপ --
১। হযরত ফাতেমা (রা:) এর শোকাবহ ঘটনার খবর বড় বড় সাহাবাদের মনে যথেষ্ট চোট দিয়েছিল। তার এই খবর কারো কাছেই গোপন ছিলনা । খলীফা আবূ বকর (রা:) ও তাঁর স্ত্রী আসমা (রা:) এর কাছে তো নয়ই। কারণ তিনি তাঁর সেবায় রত ছিলেন।
২। খাতুনে জান্নাতের ইন্তেতালের পর সকলেই বিশেষ করে খলীফা ও ফারুক আযম সাহাবাসমেত উপস্হিত ছিলেন । জানাযাবিষয়ে
আলীর (রা:) এর সাথে তাঁদের অনেক কথাও হয়েছিল । জানাযা পড়ানোর সৌভাগ্য কে অর্জন করবেন তা নিয়েও যথেষ্ট কথা হয়েছিল । খলীফা
ও খাতুনে জান্নাতের স্বামী দীর্ঘ আলাপ শেষে সিদ্ধান্ত নিলেন আবূ বকর (রা:) ই জানাযা পড়াবেন । বড় বড় সাহাবা ও হাশেমী বুযুর্গদের সিদ্ধান্তেই তাঁকে জানাযাটি পড়াতে হয়েছিল ।
এরদ্বারা আরো একটি বিষয় প্রতীয়মান হলো যে,
খলীফার জীবদ্দশায় অন্য কারো যে কোনও নামাযের ইমামতি চলবে না। চাই তা ওয়াক্তিয়া,জুমুআ,পাঞ্জেগানা কিংবা জানাযা নামাযই হোক না কেন ।
৩। তৃতীয় যে বিষয়টি প্রতিভাত হলো যে, আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) জানাযার নামায পড়িয়েছিলেন এবং তা চার তাকবীরের সাথেই পড়েছিলেন । এমনকি আরো একটি বিষয় জানা গেল, আদম (আ:) এর জানাযাও ৪ তাকবীরের সাথে পড়া হয়েছিল ।
সুধী পাঠকসমাজের জ্ঞাতার্থে এখানে আরেকটি বিষয় জানিয়ে রাখতে চাই যে, হযরত আলী (রা:)
শাহাদাত বরণ করলে হযরত হাসান (রা:) তাঁর জানাযা পড়িয়েছিলেন । সেখানে ৪ দাকবীর ছিল। ১. এমনকি হযরত আলী (রা:) এর মাতা ফাতেমা বিনতে আসাদ (রা:) ইন্তেকাল করলে নবী করীম
(সা:) তাঁর জানাযায়ও ৪ তাকবীর দিয়েছিলেন । ২- আলহামদু সকল বড় মানুষের জানাযায় দেখা
যাচ্ছে তাকবীর ৪ টিই ছিল। পাঁচ তাকবীর এদের কারো জানাযায়ই দেয়া হয়নি ।
৪। হযরত আলী (রা:) ফাতেমা (রা:) এর জানাযা আঁধার রাতেই সম্পন্ন করেছিলেন। ইসলামী আইনেও একথাটি সর্বজনবিদিত যে, মানুষ মারা যাওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব তাঁকে দাফন করতে হবে । হযরত ফাতেমা (রা:) যেহেতু মাগরীব ও ইশার মাঝখানে মারা যান। সুতরাং রাতারাতি তাঁর দাফনটি জরুরী ছিল । খাতুনে জান্নাতের জানাযা
পর্দাসহকারে করার ওসিয়ত ছিল। এ জন্য রাতেই
তাঁকে দাফন করা । সুতরাং রাতে দাফন করার উদ্দেশ্য আবূ বকর ও ওমর (রা:) কে জানাযা থেকে বঞ্চিত করার জন্য হতে পারে না।
জানাযার ব্যাপারটি কিছু বর্ণনার উপর ভিত্ত করে অতিশয় গুরুত্ব দেয়া হয়েছে । বিরোধী শিবিরটি সুচতুর ভাবে আম -জনতার মাঝে এই কথাটি ঢুকিয়ে দিয়েছে। তাদের প্রানান্তকর চেষ্টা ছিল, যে
কোন কিছুর বিনিময়ে খলীফা ও খাতুনে জান্নাতের মাঝের বিদ্বেষটি প্রতিষ্ঠিত করা । বিষয়টি একটু দীর্ঘ হলেও যেহেতু এটি আকীদানির্ভর সেহেতু বোধকরি পাঠক সমাজে বিরক্তিবোধ হবে না। প্রথমে আমরা 'মূল মাসয়ালা' মাঝে এই মাসয়ালার সমর্থনপুষ্ট শরয়ী নিয়ম -কানুন ও ঐতিহাসিক স্বাক্ষ্য পেশ করব। এরদ্বারা বনি হাশেমের নিরবচ্ছিন্ন আমলের প্রমাণটিও হয়ে যাবে।
"মূল মাসয়ালা'র বর্ণনাসমূহ
১, ইবনে সায়াদ বর্ণনা করেন -
"ইব্রাহীম নাখায়ী (রহ:) বর্ণনা করেন, হযরত ফাতেমা (রা:) এর জানাযা আবূ বকর (রা:) ই পড়ান । তিনি চার তাকবীরের সাথে তা পড়িয়েছিলেন।
২, ইবনে সায়াদের অপর একটি ভাষ্য --
"শাবী (রহ:) বলেন, ফাতেমা (রা:) এর জানাযা
হযরত আবূ বকর (রা:)ই পড়িয়েছিলেন ।
৩, ইমাম বায়হাকী স্ব -সনদে বর্ণনা করেন -
"হযরত ফাতেমা (রা:) মারা গেলে আলী (রা:) রাতারাতিই তাঁকে দাফন করেন। জানাযার মুহূর্তে আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) এর দু'হাত ধরে সামনে এগিয়ে দেন (ইমামতির জন্য) ।
৪, কানযুল উম্মাল প্রণেতা মুহাম্মাদ বাকেরের সুত্রে বর্ণিত রেওয়ায়েতকে খতীবের বরাতে বর্ণনা করে এভাবে -
"ইমাম জাফর সাদেক ইমাম মুহাম্মাদ বাকের (রহ:) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলতনয়া হযরত ফাতেমা (রা:) ইন্তেকাল করলে হযরত আবূ বকর (রা:) ও ওমর ফারুক (রা:) জানাযায় শরীক হন। হযরত আবূ বকর (রা:) আলী (রা:) কে জানাযা
পড়ানোর কথা বললে তিনি বলেন, আপনি আল্লাহর রাসূলের খলীফা। আপনার উপস্হিতিতে আমি জানাযা পড়াই কী করে ? সুতরাং আবূ বকর (রা:) অগ্রসর হয়ে জানাযা পড়ালেন।
৫, এবার দেখব ইমাম যাইনুল আবিদীন (রা:) এর একটি বর্ণনা । তাঁর ভাষ্যটি উপরোক্ত বিষয়কে আরো বিশ্লেষণধর্মী ও পরিচ্ছন্ন করে তুলবে --
অর্থঃ
জাফর সাদেক (রহ:) তাঁর বাবা মুহাম্মাদ বাকের (রহ:) থেকে, তিনি তাঁর পিতা ইমাম যাইনুল আবিদীন থেকে বর্ণনা করেন যে, মাগরিব ও ইশার মধ্যবর্তী সময়ে খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতেমা (রা:) ইন্তিকাল করেন। তাঁর মৃত্যুর কথা শুনে হযরত আবূ বকর ,ওমর, ওসমান, যুবায়ের ও আবদুর রহমান ইবনে আউফ রাযি আল্লাহু আনহুম প্রমুখ উপস্হিত হন। জানাযা নামাযের সময় হলে হযরত আলী (রা:) হযরত আবূ বকর (রা:) কে বললেন, হযরত! আগে বাড়ুন, নামাযটি পড়ান। আবূ বকর (রা:) জবাবে বললেন, আবূল হাসান!আপনার উপস্হিতিতে? (আমি নামায পড়াব! ) তিনি বললেন, আগে বাড়ুন! কসম খোদার! আপনি ছাড়া ফাতেমা (রা:) এর জানাযা আর কেউ পড়াবে না । শেষ পর্যন্ত আবূ বকর (রা:) ই জানাযা নামায পড়ালেন। রাতেই তাঁকে সমাহিত করা হলো।
সিরাজুল হিন্দ শাহ আবদুল আযীয মুহাদ্দিসে দেহলভী (রা:) 'তোহফায়ে ইছনা আশারিয়া' -এ সিদ্দীকের প্রতি ভর্ৎসনা অধ্যায়ের শেষে ফসলে খেতাবের সুত্রে বর্ণনা করেন যা ইমাম যাইনুল আবেদীনের উক্ত বর্ণনাটিকে সমর্থন করে -
"ফসলে খেতাবের লেখক উল্লেখ করেন, আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) , ওসমান (রা:) , আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা:) ও যুবায়ের ইবনুল আওয়াম (রা:) সহ সকল সাহাবী ইশার নামযে জড়ো হন। এদিকে ফাতেমা (রা:) এর শেষবিদায়টি এই সময়ের কিছু আগে পরে অনু্ষ্টিত হয় । মঙ্গলবারের ৩য় রমজানে তিনি মারা গিয়েছিলেন । প্রিয়নবী (সা:) এর তিরোধানের ৬ মাস পরে তিনি ইহলোক ছেড়েছিলেন। এ সময় ফাতেমা (রা:) এর বয়স ছিল মাত্র ২৮ । আলী (রা:) এর আর্জি মোতাবেক আবূ বকর (রা:) জানাযায় ইমামতি করেছিলেন। নামাযটি ছিল তাঁর ৪ তকবীরের সাথে।
৬, হাফেজ আবূ নাঈম ইস্পাহানী (রহ:) স্ব -সনদে হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) এর সূত্রে বর্ণনা করেন
"হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণনা করেন, নবী করিম (সা:) এর সমীপে একটি জানাযা এলে সেখানে জানাযাটি চার তকবীরের সাথে আদায় করে বললেন, ফেরেশতারা আদম (আ:) এর জানাযায়ও ৪ তাকবীর দিয়েছিলেন । ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন, আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) ফাতেমা (রা:) এর জানাযায় ৪ তাকবীর দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ওমর (রা:) হযরত আবূ বকর (রা:) এর জানাযায়ও ৪ তাকবীর দিয়েছিলেন। এদিকে হযরত সুহায়ব (রা:) হযরত ওমর (রা:) এর জানাযায়ও ৪ তাকবীর দিয়েছিলেন ।"
সার -সংক্ষেপঃ
জানাযা সম্পর্ক আমরা মোটামুটি ৬টি বর্ণনা সন্নিবেশ করেছি। তন্মধ্যে ৩টি বর্ণনা হাশেমীদের
(নবী বংশ) আবার তিনটি অ -হাশেমীদের । হাশেমী বর্ণনাকার যথাক্রমে ইমাম বাকের (রা:) , ইমাম যায়নুল আবেদীন (রা:) ও হযরত আব্দুল্লাহ
ইবনে আব্বাস (রা:) । উপরিউক্ত রেওয়ায়েতসমূহের সারকথা নিম্নরুপ --
১। হযরত ফাতেমা (রা:) এর শোকাবহ ঘটনার খবর বড় বড় সাহাবাদের মনে যথেষ্ট চোট দিয়েছিল। তার এই খবর কারো কাছেই গোপন ছিলনা । খলীফা আবূ বকর (রা:) ও তাঁর স্ত্রী আসমা (রা:) এর কাছে তো নয়ই। কারণ তিনি তাঁর সেবায় রত ছিলেন।
২। খাতুনে জান্নাতের ইন্তেতালের পর সকলেই বিশেষ করে খলীফা ও ফারুক আযম সাহাবাসমেত উপস্হিত ছিলেন । জানাযাবিষয়ে
আলীর (রা:) এর সাথে তাঁদের অনেক কথাও হয়েছিল । জানাযা পড়ানোর সৌভাগ্য কে অর্জন করবেন তা নিয়েও যথেষ্ট কথা হয়েছিল । খলীফা
ও খাতুনে জান্নাতের স্বামী দীর্ঘ আলাপ শেষে সিদ্ধান্ত নিলেন আবূ বকর (রা:) ই জানাযা পড়াবেন । বড় বড় সাহাবা ও হাশেমী বুযুর্গদের সিদ্ধান্তেই তাঁকে জানাযাটি পড়াতে হয়েছিল ।
এরদ্বারা আরো একটি বিষয় প্রতীয়মান হলো যে,
খলীফার জীবদ্দশায় অন্য কারো যে কোনও নামাযের ইমামতি চলবে না। চাই তা ওয়াক্তিয়া,জুমুআ,পাঞ্জেগানা কিংবা জানাযা নামাযই হোক না কেন ।
৩। তৃতীয় যে বিষয়টি প্রতিভাত হলো যে, আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) জানাযার নামায পড়িয়েছিলেন এবং তা চার তাকবীরের সাথেই পড়েছিলেন । এমনকি আরো একটি বিষয় জানা গেল, আদম (আ:) এর জানাযাও ৪ তাকবীরের সাথে পড়া হয়েছিল ।
সুধী পাঠকসমাজের জ্ঞাতার্থে এখানে আরেকটি বিষয় জানিয়ে রাখতে চাই যে, হযরত আলী (রা:)
শাহাদাত বরণ করলে হযরত হাসান (রা:) তাঁর জানাযা পড়িয়েছিলেন । সেখানে ৪ দাকবীর ছিল। ১. এমনকি হযরত আলী (রা:) এর মাতা ফাতেমা বিনতে আসাদ (রা:) ইন্তেকাল করলে নবী করীম
(সা:) তাঁর জানাযায়ও ৪ তাকবীর দিয়েছিলেন । ২- আলহামদু সকল বড় মানুষের জানাযায় দেখা
যাচ্ছে তাকবীর ৪ টিই ছিল। পাঁচ তাকবীর এদের কারো জানাযায়ই দেয়া হয়নি ।
৪। হযরত আলী (রা:) ফাতেমা (রা:) এর জানাযা আঁধার রাতেই সম্পন্ন করেছিলেন। ইসলামী আইনেও একথাটি সর্বজনবিদিত যে, মানুষ মারা যাওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব তাঁকে দাফন করতে হবে । হযরত ফাতেমা (রা:) যেহেতু মাগরীব ও ইশার মাঝখানে মারা যান। সুতরাং রাতারাতি তাঁর দাফনটি জরুরী ছিল । খাতুনে জান্নাতের জানাযা
পর্দাসহকারে করার ওসিয়ত ছিল। এ জন্য রাতেই
তাঁকে দাফন করা । সুতরাং রাতে দাফন করার উদ্দেশ্য আবূ বকর ও ওমর (রা:) কে জানাযা থেকে বঞ্চিত করার জন্য হতে পারে না।
Wednesday, 8 May 2019
সিদ্দীকে আকবার (রা:) -এর স্ত্রী আসমা বিনতে উমাইস (রা:) ও হযরত ফাতেমা (রা:)
এক্ষণে আমরা সিদ্দীকে আকবর (রা:) এর পরিবার -পরিজনের সাথে খাতুনে জান্নাতের ওঠাবসা, সাহায্য -সহানুভূতি ও খায় -খেদমতের আলোচনায় আসব । দেখব সিদ্দীকে আকবর (রা:) এর এই মহীয়সী স্ত্রী খাতুনে জান্নাতের জীবনের শেষ ক,টা দিন কী করে সেবা করেছেন। শুধু কী তাই! খাতুনে জান্নাতের ইন্তেতালের পর গোসল ও কাফনেও তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন । তাঁর স্বামী ও খাতুনে জান্নাতের মধ্যে যদি শত্রুতাই থাকত তাহলে তাঁর জীবদ্দশায় কেন আলী (রা:) এর খান্দান তাঁকে সেবার সুযোগ দিলেন? কেনইবা মৃত্যুপরবর্তী সৎকারে তাঁর সেবা
নিলেন ? এ বিষয়টি আমরা দেখব। প্রথমেই হযরত আসমা (রা:) এর সংক্ষিপ্ত জীবনী আলোকপাত হবে। এরপর দেখা যাবে তিনি কীভাবে তাঁর সেবা করেছেন ।
আসমা বিনতে উমাইস (রা:) এর সংক্ষিপ্ত জীবন চরিত
তাঁর নাম আসমা বিনতে উমাইস (রা:) । বংশের নাম খাছ 'আম । অভিজাত, দ্বীনদার , অতিশয় খেদমতকারিনী ছিলেন । গোড়ার দিকেই ইসলাম
গ্রহণ করেছিলেন। বংশ বিশেষজ্ঞদের মতে ইনি রাসূলুল্লাহ (সা:) ও তাঁর চাচা আব্বাস (রা:) এর স্ত্রীর বোন ছিলেন । অর্থাৎ তিনি উম্মৎজননী মায়মুনা বিনতে হারিসের বৈমাত্রেয় বোন । অন্য ভাষায় বলতে গেলে, তিনি নবী কারীম (সা:) ও হযরত আব্বাস (রা:) এর শ্যালিকা ছিলেন । এই হিসাবে নবী করীম (সা:) ও হযরত আবূ বকর (রা:) পরসবপরে ভায়রা ছিলেন। এদের বাবা ভিন্ন হলেও মা কিন্ত একজনই ছিলেন । তাঁদের মায়ের নাম হিন্দ বিনতে আওযা । আসমা বিনতে উমাইস (রা:) এর বোন সালমা বিনতে উমাইস (রা:) হযরত হামযা (রা:) এর স্ত্রী ছিলেন।
প্রথমে তাঁঁর বিয়ে হয়েছিল হযরত আলী (রা:) এর
আপন ভাই হযরত জাফর বিন আবূ তালেবের সাথে । তাঁরা স্বামী -স্ত্রী উভয়েই হাবাশায় হিজরত করেছিলেন। হাবাশার হিজরত ইসলামে একটি বড় সৌভাগ্যের বিষয় । পরে তাঁরা হাবাশা থেকে
মদীনায় উপনীত হন । এতে মুসলমানেরা বেজায় খোশ হন ।
হযরত জাফর তৈয়্যাব (রা:) এর থেকে হযরত আসমা (রা:) এর সন্তান হয়েছিল। এরা ছিলেন জগদ্বিখ্যাত। আবদুল্লাহ (রা:) ও মোহাম্মাদ (রা:)।
৮ম হিজরীতে ঐতিহাসিক মূতা প্রান্তরে হযরত জাফর (রা:) শহীদ হলে হযরত সিদ্দীকে আকবার
(রা:) এর সাথে তাঁর বিয়ে হয়। জাফর (রা:) থেকে বিধবা হওয়া নারীকে বিয়ে করায় সিদ্দীকে আকবার ও বনী হাশেমের সাথে এক ধরনের সখ্য কায়েম হয়। আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) থেকেও হযরত আসমা (রা:) এর সন্তান হয় । সেই সন্তানের নাম মুহাম্মাদ ইবনে আবূ বকর (রা:)।
এ পর্যায়ে এই আসমা (রা:) কীরূপে অন্তিম লগ্নে হযরত ফাতেমা (রা:) এর সেবা করেন সেই আলোচনাই করা হবে।
হযরত আসমার সেবা আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) এর স্ত্রী হযরত আসমা বিনতে উমাইস (রা:) সর্বদা হযরত ফাতেমা (রা:) কল্যাণকামী ও মনোভাব বুঝে কাজ করতে পারতেন। এ জন্য তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি যারপরনাই সেবা করতে পেরেছিলেন। হযরত ফাতেমা (রা:) অসুস্হ হলে সেই সময়কার ঘটনা খোদ ইমাম যাইনুল আবিদীন (রহ:) ইবনে আব্বাস (রা:) এর সূত্রে বর্ণনা করেন -
১। হযরত ফাতেমা (রা:) অসুস্হ হলেন, আসমা (রা:) তাঁর সেবাই লেগে থাকলেন। তিনি তাঁকে বললেন, 'তুমি জানো, আমার শেষ সময় উপস্হিত। আমি মারা গেলে আমার আমার লাশ কি এমন বেপর্দার সাথে উঠানো হবে? আসমা (রা:) বললেন, অসম্ভব । আমি আপনার জন্য এমন এক খাটিয়া বানাব যা হাবাশায় দেখেছিি । ওই খাটিয়া ছাদযুক্ত থাকবে । তাতে কাপড় দিয়ে পর্দা করা হবে । বেপর্দা হবার কোন সুযোগ থাকবে না । হযরত আসমা (রা:) খাতুনে জান্নাতের জীবদ্দশায়ই এই খাটিয়া বানিয়ে দেখালেন । তিনি তা দেখে সন্তোষও প্রকাশ করলেন , রাসূলুল্লাহ (সা:) এর ইন্তেতালের পর এই প্রথম তাঁকে হাসতে
দেখা গেল । এরপূর্বে তিনি একটিবারও হাঁসেননি তাঁর ইন্তেতালের পর ওই খাটিয়ায় করেই তাঁকে দাফন করা হয়েছিল।
২। শীয়া লেখকদের লেখনীতেও আমরা ইবনে আব্বাস (রা:) এর উক্ত বর্ণনার সমর্থন পাই। শায়খ আবূ জাফর তুসী বর্ণনা করেন -
"হযরত আলী (রা:) ফাতেমার সেবায় নিজের পাশাপাশি হযরত আসমা বিনতে উমাইস (রা:) তেও নিযুক্ত করেছিলেন এ কাজে ।
৩। হযরত ফাতেমা (রা:) ইন্তেকাল করলে তার গোসলের প্রসংগটি এসে দাঁড়ায়। ইসলামী শরীয়া
মোতাবেক প্রথমে মৃতকে গোসল মাঝে জানাযা
সবশেষে দাফন করার নিয়ম । উপরিউক্ত শেষকৃত্যসমূহে আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) এর স্ত্রী হযরত আসমা বিনতে উমাইস (রা:) এরও সবিশেষ অবদান রয়েছে। সাধারণত: এ সব ক্ষেত্রে বংশের একান্ত নিকটাত্মীয়গণই ভূমিকা নিয়ে থাকেন ।
কথিত আছে, খাতুনে জান্নাতের গোসলের দায়িত্ব নিয়েছিলেন ৩ জন। তন্মধ্যে একজন স্বয়ং হযরত আলী (রা:) এবং দু'জন নারী । হযরত আলী (রা:) কে উক্ত দু'নারী গোসলকার্যে সহায়তা করেছিলেন। তন্মধ্যে একজন হযরত আসমা বিনতে উমাইস (রা:) অপরজন হযরত সালমা যিনি রাসূলের (সা:) গোলাম হযরত আবূ রাফে (রা:) এর স্ত্রী।
হযরত আসমা বিনতে উমাইস (রা:) এর গোসলদানের বিষয়টি শীয়াদের কিতাবেও উল্লেখ আছে।
মোটকথা খাতুনে জান্নাতের খিদমতে হযরত আসমা (রা:) এর অংশগ্রহণ উভয় -পরিবারের অনুমতিতেই হয়েছিল । এতে কোন সন্দেহ নেই।
সার -সংক্ষেপঃ
১। খাতুনে জান্নাত ফাতেমা (রা:) চাহিদার প্রেক্ষিতেই পর্দাবিশিষ্ট খাটিয়া প্রস্তুত করা হয়েছিল। আর তা করেছিলেন হযরত আসমা বিনতে উমাইস (রা:) ই।
২। খাতুনে জান্নাতের শেষ -দিনগুলোতে সেবা করেছিলেন সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর স্ত্রী।
৩। হযরত ফাতেমা (রা:) তাঁর ওসিয়তগুলো আসমা (রা:) এর কাছেই করেছিলেন।
৪। হযরত ফাতেমা (রা:) এর গোসলেও তিনি সমান ভূমিকা রেখেছিলেন।
এসব ঘটনা দ্বারা বোঝা যাচ্ছে সিদ্দীকে আকবার
(রা:) এর খান্দানের সাথে নবী পরিবারের চমৎকার সম্পর্ক বজায় ছিল ।
নিলেন ? এ বিষয়টি আমরা দেখব। প্রথমেই হযরত আসমা (রা:) এর সংক্ষিপ্ত জীবনী আলোকপাত হবে। এরপর দেখা যাবে তিনি কীভাবে তাঁর সেবা করেছেন ।
আসমা বিনতে উমাইস (রা:) এর সংক্ষিপ্ত জীবন চরিত
তাঁর নাম আসমা বিনতে উমাইস (রা:) । বংশের নাম খাছ 'আম । অভিজাত, দ্বীনদার , অতিশয় খেদমতকারিনী ছিলেন । গোড়ার দিকেই ইসলাম
গ্রহণ করেছিলেন। বংশ বিশেষজ্ঞদের মতে ইনি রাসূলুল্লাহ (সা:) ও তাঁর চাচা আব্বাস (রা:) এর স্ত্রীর বোন ছিলেন । অর্থাৎ তিনি উম্মৎজননী মায়মুনা বিনতে হারিসের বৈমাত্রেয় বোন । অন্য ভাষায় বলতে গেলে, তিনি নবী কারীম (সা:) ও হযরত আব্বাস (রা:) এর শ্যালিকা ছিলেন । এই হিসাবে নবী করীম (সা:) ও হযরত আবূ বকর (রা:) পরসবপরে ভায়রা ছিলেন। এদের বাবা ভিন্ন হলেও মা কিন্ত একজনই ছিলেন । তাঁদের মায়ের নাম হিন্দ বিনতে আওযা । আসমা বিনতে উমাইস (রা:) এর বোন সালমা বিনতে উমাইস (রা:) হযরত হামযা (রা:) এর স্ত্রী ছিলেন।
প্রথমে তাঁঁর বিয়ে হয়েছিল হযরত আলী (রা:) এর
আপন ভাই হযরত জাফর বিন আবূ তালেবের সাথে । তাঁরা স্বামী -স্ত্রী উভয়েই হাবাশায় হিজরত করেছিলেন। হাবাশার হিজরত ইসলামে একটি বড় সৌভাগ্যের বিষয় । পরে তাঁরা হাবাশা থেকে
মদীনায় উপনীত হন । এতে মুসলমানেরা বেজায় খোশ হন ।
হযরত জাফর তৈয়্যাব (রা:) এর থেকে হযরত আসমা (রা:) এর সন্তান হয়েছিল। এরা ছিলেন জগদ্বিখ্যাত। আবদুল্লাহ (রা:) ও মোহাম্মাদ (রা:)।
৮ম হিজরীতে ঐতিহাসিক মূতা প্রান্তরে হযরত জাফর (রা:) শহীদ হলে হযরত সিদ্দীকে আকবার
(রা:) এর সাথে তাঁর বিয়ে হয়। জাফর (রা:) থেকে বিধবা হওয়া নারীকে বিয়ে করায় সিদ্দীকে আকবার ও বনী হাশেমের সাথে এক ধরনের সখ্য কায়েম হয়। আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) থেকেও হযরত আসমা (রা:) এর সন্তান হয় । সেই সন্তানের নাম মুহাম্মাদ ইবনে আবূ বকর (রা:)।
এ পর্যায়ে এই আসমা (রা:) কীরূপে অন্তিম লগ্নে হযরত ফাতেমা (রা:) এর সেবা করেন সেই আলোচনাই করা হবে।
হযরত আসমার সেবা আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) এর স্ত্রী হযরত আসমা বিনতে উমাইস (রা:) সর্বদা হযরত ফাতেমা (রা:) কল্যাণকামী ও মনোভাব বুঝে কাজ করতে পারতেন। এ জন্য তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি যারপরনাই সেবা করতে পেরেছিলেন। হযরত ফাতেমা (রা:) অসুস্হ হলে সেই সময়কার ঘটনা খোদ ইমাম যাইনুল আবিদীন (রহ:) ইবনে আব্বাস (রা:) এর সূত্রে বর্ণনা করেন -
১। হযরত ফাতেমা (রা:) অসুস্হ হলেন, আসমা (রা:) তাঁর সেবাই লেগে থাকলেন। তিনি তাঁকে বললেন, 'তুমি জানো, আমার শেষ সময় উপস্হিত। আমি মারা গেলে আমার আমার লাশ কি এমন বেপর্দার সাথে উঠানো হবে? আসমা (রা:) বললেন, অসম্ভব । আমি আপনার জন্য এমন এক খাটিয়া বানাব যা হাবাশায় দেখেছিি । ওই খাটিয়া ছাদযুক্ত থাকবে । তাতে কাপড় দিয়ে পর্দা করা হবে । বেপর্দা হবার কোন সুযোগ থাকবে না । হযরত আসমা (রা:) খাতুনে জান্নাতের জীবদ্দশায়ই এই খাটিয়া বানিয়ে দেখালেন । তিনি তা দেখে সন্তোষও প্রকাশ করলেন , রাসূলুল্লাহ (সা:) এর ইন্তেতালের পর এই প্রথম তাঁকে হাসতে
দেখা গেল । এরপূর্বে তিনি একটিবারও হাঁসেননি তাঁর ইন্তেতালের পর ওই খাটিয়ায় করেই তাঁকে দাফন করা হয়েছিল।
২। শীয়া লেখকদের লেখনীতেও আমরা ইবনে আব্বাস (রা:) এর উক্ত বর্ণনার সমর্থন পাই। শায়খ আবূ জাফর তুসী বর্ণনা করেন -
"হযরত আলী (রা:) ফাতেমার সেবায় নিজের পাশাপাশি হযরত আসমা বিনতে উমাইস (রা:) তেও নিযুক্ত করেছিলেন এ কাজে ।
৩। হযরত ফাতেমা (রা:) ইন্তেকাল করলে তার গোসলের প্রসংগটি এসে দাঁড়ায়। ইসলামী শরীয়া
মোতাবেক প্রথমে মৃতকে গোসল মাঝে জানাযা
সবশেষে দাফন করার নিয়ম । উপরিউক্ত শেষকৃত্যসমূহে আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) এর স্ত্রী হযরত আসমা বিনতে উমাইস (রা:) এরও সবিশেষ অবদান রয়েছে। সাধারণত: এ সব ক্ষেত্রে বংশের একান্ত নিকটাত্মীয়গণই ভূমিকা নিয়ে থাকেন ।
কথিত আছে, খাতুনে জান্নাতের গোসলের দায়িত্ব নিয়েছিলেন ৩ জন। তন্মধ্যে একজন স্বয়ং হযরত আলী (রা:) এবং দু'জন নারী । হযরত আলী (রা:) কে উক্ত দু'নারী গোসলকার্যে সহায়তা করেছিলেন। তন্মধ্যে একজন হযরত আসমা বিনতে উমাইস (রা:) অপরজন হযরত সালমা যিনি রাসূলের (সা:) গোলাম হযরত আবূ রাফে (রা:) এর স্ত্রী।
হযরত আসমা বিনতে উমাইস (রা:) এর গোসলদানের বিষয়টি শীয়াদের কিতাবেও উল্লেখ আছে।
মোটকথা খাতুনে জান্নাতের খিদমতে হযরত আসমা (রা:) এর অংশগ্রহণ উভয় -পরিবারের অনুমতিতেই হয়েছিল । এতে কোন সন্দেহ নেই।
সার -সংক্ষেপঃ
১। খাতুনে জান্নাত ফাতেমা (রা:) চাহিদার প্রেক্ষিতেই পর্দাবিশিষ্ট খাটিয়া প্রস্তুত করা হয়েছিল। আর তা করেছিলেন হযরত আসমা বিনতে উমাইস (রা:) ই।
২। খাতুনে জান্নাতের শেষ -দিনগুলোতে সেবা করেছিলেন সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর স্ত্রী।
৩। হযরত ফাতেমা (রা:) তাঁর ওসিয়তগুলো আসমা (রা:) এর কাছেই করেছিলেন।
৪। হযরত ফাতেমা (রা:) এর গোসলেও তিনি সমান ভূমিকা রেখেছিলেন।
এসব ঘটনা দ্বারা বোঝা যাচ্ছে সিদ্দীকে আকবার
(রা:) এর খান্দানের সাথে নবী পরিবারের চমৎকার সম্পর্ক বজায় ছিল ।
নবী পরিবারের স্বাক্ষ্যঃ খোলাফায়ে রাশেদার দায়মুক্তিতে
এবার আমরা এ প্রসংগে নবী পরিবারের দু'চারজনের স্বাক্ষ্য নেব । প্রথমেই ইমাম যাইনুল আবিদীনের পুত্র ইমাম বাকের (রা:) এর মতামত জানব যার কথা আহলুস সুন্নাহ ও শীয়া ওলামাদের কিতাবে সমানে দেখতে পাওয়া যায়।
সুন্নীদের কিতাবের মধ্যে 'ফাযায়েলে আবূ বকর সিদ্দীক ' - এ ইমাম বাকের (রা:) এর ভাষ্য এভাবে বিবৃত হয়েছে -
"কাসিরুন্নওয়া বলেন, আমি ইমাম বাকের (রা:) -কে জিজ্ঞেস করেছি আবূ বকর ও ওমর (রা:) আপনাদের অধিকার নিয়ে কখনো জুলুম করেছেন কী ? ইমাম বাকের (রহ:) বললেন, আদৌ না । কসম সেই সত্বার যিনি গোটা বিশ্ববাসীর জন্য কুরআনকে (জাহান্নামের) ভীতিস্বরূপ নাযিল করেছেন , তাঁরা দু'জনা আমাদের অধিকার তিল বরাবরও ক্ষুন্ন করেননি।
'ওয়াফাউল ওয়াফা' পুস্তকে আল্লামা সামহুদীর ভাষ্যঃ
"কাসীরুন্নওয়া বলেন, আমি ইমাম মুহাম্মাদ বাকের (রহ:) কে বলি, আল্লাহ আমাকে আপনার প্রতি কোরবান হবার তৌফিক দান করুন। বলুন! আবূ বকর (রা:) ও ওমর (রা:) আপনাদের অধিকারের প্রতি কোনও জুলুম বাকী রেখেছেন কী ? কিংবা তারা আপনাদের অধিকার ক্ষুন্ন করেছেন কি -না? ইমাম এ কথার জবাবে বলেন, না! কসম সেই সত্ত্বার যিনি (জাহান্নামের ভীতি প্রদর্শনকারীর) ওপর কুরআন নাযিল করেছেন,
আমাদের অধিকার বিষয়ে এ দু'জনা তিল বরাবরও জুলুম করেননি । পুনরায় আরয করি, আমি আমাকে আপনার প্রতি উৎসর্গ করছি, আমি কী উক্ত দু'জনার সাথে বন্ধুত্ব করতে পারি?
তিনি বললেন, দুনায়া -আখেরাতে তুমি তাঁদের সাথে বন্ধুত্ব রাখতে পার। আর এ কারণে তোমার প্রতি কোন মসিবত এলে এ জন্য তুমি এর দায়ভার আমার ঘাড়েই চাপাতে পার। অর্থাৎ তুমি
নিশ্চিতে এটা করতে পার। পরে বললেন , আল্লাহ পাক মুগিরা ও বান্নানের প্রতি সেই ব্যবহার করুন যার যোগ্য তারা। কেননা এরা দু'জনা আমাদের আহলে বাইতের প্রতি খামোকা মিথ্যা লিখেছে। তারা নিজেদের মনগড়া কথায় আমাদের নাম জুড়ে দিয়েছে "।
উপরোক্ত স্বাক্ষ্য সুন্নিদের কিতাব থেকে চয়নিত । এবার আমরা একটু শীয়াদের লিখিত পুস্তকের প্রতি নজর বুলাব। সেই মহান ইমাম বাকের (রা:) -
এরই ভাষ্য --
সুন্নীদের কিতাবের মধ্যে 'ফাযায়েলে আবূ বকর সিদ্দীক ' - এ ইমাম বাকের (রা:) এর ভাষ্য এভাবে বিবৃত হয়েছে -
"কাসিরুন্নওয়া বলেন, আমি ইমাম বাকের (রা:) -কে জিজ্ঞেস করেছি আবূ বকর ও ওমর (রা:) আপনাদের অধিকার নিয়ে কখনো জুলুম করেছেন কী ? ইমাম বাকের (রহ:) বললেন, আদৌ না । কসম সেই সত্বার যিনি গোটা বিশ্ববাসীর জন্য কুরআনকে (জাহান্নামের) ভীতিস্বরূপ নাযিল করেছেন , তাঁরা দু'জনা আমাদের অধিকার তিল বরাবরও ক্ষুন্ন করেননি।
'ওয়াফাউল ওয়াফা' পুস্তকে আল্লামা সামহুদীর ভাষ্যঃ
"কাসীরুন্নওয়া বলেন, আমি ইমাম মুহাম্মাদ বাকের (রহ:) কে বলি, আল্লাহ আমাকে আপনার প্রতি কোরবান হবার তৌফিক দান করুন। বলুন! আবূ বকর (রা:) ও ওমর (রা:) আপনাদের অধিকারের প্রতি কোনও জুলুম বাকী রেখেছেন কী ? কিংবা তারা আপনাদের অধিকার ক্ষুন্ন করেছেন কি -না? ইমাম এ কথার জবাবে বলেন, না! কসম সেই সত্ত্বার যিনি (জাহান্নামের ভীতি প্রদর্শনকারীর) ওপর কুরআন নাযিল করেছেন,
আমাদের অধিকার বিষয়ে এ দু'জনা তিল বরাবরও জুলুম করেননি । পুনরায় আরয করি, আমি আমাকে আপনার প্রতি উৎসর্গ করছি, আমি কী উক্ত দু'জনার সাথে বন্ধুত্ব করতে পারি?
তিনি বললেন, দুনায়া -আখেরাতে তুমি তাঁদের সাথে বন্ধুত্ব রাখতে পার। আর এ কারণে তোমার প্রতি কোন মসিবত এলে এ জন্য তুমি এর দায়ভার আমার ঘাড়েই চাপাতে পার। অর্থাৎ তুমি
নিশ্চিতে এটা করতে পার। পরে বললেন , আল্লাহ পাক মুগিরা ও বান্নানের প্রতি সেই ব্যবহার করুন যার যোগ্য তারা। কেননা এরা দু'জনা আমাদের আহলে বাইতের প্রতি খামোকা মিথ্যা লিখেছে। তারা নিজেদের মনগড়া কথায় আমাদের নাম জুড়ে দিয়েছে "।
উপরোক্ত স্বাক্ষ্য সুন্নিদের কিতাব থেকে চয়নিত । এবার আমরা একটু শীয়াদের লিখিত পুস্তকের প্রতি নজর বুলাব। সেই মহান ইমাম বাকের (রা:) -
এরই ভাষ্য --
Tuesday, 7 May 2019
হযরত আলী ও আব্বাস (রা:) এর মতানৈক্যঃ খলীফার বিব্রতবোধ
সহীহ বুখারীতে বর্ণিত উপরিউক্ত হাদীসখানা দীর্ঘ, তবে এখানে প্রয়োজনীয় অংশটুকু উল্লেখ করা হয়েছে । এতে হযরত আলী ও আব্বাস (রা:) এর
ঝগড়ার কথা আছে। ঝগড়াটি বনী নযীরের সম্পদ থেকে বনী হাশেমের বুযুর্গগণ যে হিস্যা পেতেন তা নিয়ে দুটি দলের সৃষ্ট হয়েছিল। এক
দলের পুরোধা ছিলেন হযরত আলী (রা:) আরেক
দলের প্রধান ছিলেন হযরত আব্বাস (রা:) । মুহাদ্দেসীনে কেরাম বলেন, এমহান বুযুর্গদ্বয়ের পারস্পারিক সংঘর্ষ উক্ত যুদ্ধলব্ধ মালের বরাদ্দ ও
জমা খরচ নিয়ে। এক সময় তাদের এই মামলা হযরত ওমর (রা:) এর দরকারে উত্থাপিত হয়।
হাশেমীদের দাবী ছিল, যুদ্ধে যে সব ভূ -সম্পদ হস্তগত হয়েছে তা যেন আমাদের মাঝে পৃথক পৃথক করে ভাগ করে দেওয়া হয়। এতে বোধকরি
আমাদের মাঝে কোন সংঘর্ষই থাকবে না। হযরত
ওমর (রা:) তাদের মর্জিমত ভূ -সম্পদ ভাগ করে
দিতে অস্বীকৃত হলেন। বললেন, নবী (সা:) ও প্রথম খলীফার মতই এই সম্পদের ভোগ দখল চলবে , বরাদ্দ হবে । নতুন করে আমি কোন পৃথক সিদ্ধান্ত দিতে পারব না। আমীরুল মুমিনীন ওমর
ইবনুল খাত্তাব (রা:) এই ধরনের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যায় মুহাদ্দেসীনে কেরাম বলেন, যদি মামলার বিবদমান দু গ্রুপের মর্জিমত জমি জমা ভাগ করে
দেয়া হত তাহলে বনী হাশেমকে অর্ধেক আর নবী
পরিবারকে অর্ধেক দেওয়া লাগত। এতে একটা জিনিষ পরিস্কার হত যে , নবীর সম্পদের মিরাছ
ভাগ হচ্ছে । রাসূলুল্লাহ (সা:) এর অর্ধেক সম্পদ তাঁর মেয়ের সুত্রে হযরত আলী (রা:) পেয়েছেন আর উম্মুল মুমিনীনগণের অংশ আসাবা হিসেবে
চাচা আব্বাস পেয়েছেন । অথচ নবীদের সম্পদের
কোন বিলি -বন্টন হয় না । তাদের পরিত্যাক্ত সম্পদ পাবেন জনসাধারণ। এই সন্দেহ থেকে বাঁচার স্বার্থে হযরত ওমর (রা:) ওই মামলায় বিব্রতবোধ করে তাঁর পূর্বসূরীর নিয়ম বহাল রেখেছেন। তবে হাশেমী ও আলী (রা:) খান্দান তথা নবী পরিবার পর্যাপ্ত পরিমান বরাদ্দ সন্তোষজনক আকারে বায়তুল মাল থেকে যথারীতি পেয়ে গেছেন আমৃত্যুই। এর ওপর আমরা আরো বিশদ আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ্।
শীয়াদের ভাষ্যঃ
মালে ফাই (যুদ্ধলব্ধ মাল ) এর আমদানী ও বরাদ্দ নিয়ে শীয়া ওলামাগণ বিশদ কালি কলম খরচ
করেছেন । ইবনে আবিল হাদীদের 'নাহ্জুুল বালাগাহ' কিতাবটি এ বিষয়ে সর্বাধিক সোচ্চার । তার ভাষ্য, ওসমান ইবনে হানীফ হযরত আলী (রা:) এর পক্ষ থেকে বসরার গভর্ণর নিযুক্ত ছিলেন । হযরত আলী (রা:) তাকে লেখা একটি পত্রে বলেন - 'ফাদাকের জমিজমা আমার অধীনে ছিল ' । ইবনে আবিল হাদীদ 'শরহে নাহ্জুুল বালাগাহ ' -এ ফাদাক বিষয়ে তিনটি পরিচ্ছেদ টেনেছেন। প্রথম পরিচ্ছেদে আবূ বকর আল -জওয়াহিরীর প্রমানসিদ্ধ বর্ণনা এনেছেন।
এই পরিচ্ছেদে তিনি একথাটি স্বীকার গেছেন যে,
মালে ফাই -এর আমদানী ও বরাদ্দের দায়িত্বটি
হযরত আলী (রা:) এর ওপরই ছিল । তাঁর পবিত্র
খান্দানও সেগুলো ভোগ দখল করত । দেখুন তার ভাষ্য -
"এই মামলায় হযরত আলী (রা:) হযরত আব্বাস (রা:) এর বিরুদ্ধে জিতে গেলেন । সুতরাং এই মাল সম্পদ হযরত আলী (রা:) এর হস্তগত হল। পরবর্তীতে হযরত হাসান (রা:) এর করতলগত হল । তারপরে একে একে হুসাইন (রা:) . আলী যায়নুল আবিদীন, হাসান ইবনে হাসান ও যায়েদ
ইবনে হাসানের দায়িত্বে অর্পিত হয়।
সার -সংক্ষেপঃ
১। নবী পরিবারের লোকজনের জন্য মালে ফাই তথা বনি নযীরের সম্পদ যথারীতি আদায় করা হত।
২। এই সব মালের রক্ষক ও বন্টনকারী খোদ হযরত আলী (রা:) ই ছিলেন । তাঁর মৃত্যুর পর এ
মহান দায়িত্বটি তাঁর উত্তরাধিকারীগণই একে এক
পালন করেন।
৩। নবী পরিবার ও বনী হাশেমের অধিকারসমূহ
হরণের সকল ঘটনাই উদ্ভট বানোয়াট ও উদ্দেশ্য
প্রণোদিত । সর্বোপরি মিথ্যার বেসাতিতে পূর্ণ ।
তাদের অধিকার কোনদিনও ক্ষুন্ন হয়নি। খয়বারের ভূ -সম্পদের এক ছটাকও কেউ আত্মসাৎ করেনি। সিদ্দীকি,ফারুকী ও ওসমানি
খেলাফতের কোনও ব্যক্তি এ দুস্কর্মটি করেননি। বরং যথাযথ যার যার অধিকার যার যার কাছে তাঁরা পৌঁছিয়েছেন নিতান্তই আমানতদারির সাথে।
ঝগড়ার কথা আছে। ঝগড়াটি বনী নযীরের সম্পদ থেকে বনী হাশেমের বুযুর্গগণ যে হিস্যা পেতেন তা নিয়ে দুটি দলের সৃষ্ট হয়েছিল। এক
দলের পুরোধা ছিলেন হযরত আলী (রা:) আরেক
দলের প্রধান ছিলেন হযরত আব্বাস (রা:) । মুহাদ্দেসীনে কেরাম বলেন, এমহান বুযুর্গদ্বয়ের পারস্পারিক সংঘর্ষ উক্ত যুদ্ধলব্ধ মালের বরাদ্দ ও
জমা খরচ নিয়ে। এক সময় তাদের এই মামলা হযরত ওমর (রা:) এর দরকারে উত্থাপিত হয়।
হাশেমীদের দাবী ছিল, যুদ্ধে যে সব ভূ -সম্পদ হস্তগত হয়েছে তা যেন আমাদের মাঝে পৃথক পৃথক করে ভাগ করে দেওয়া হয়। এতে বোধকরি
আমাদের মাঝে কোন সংঘর্ষই থাকবে না। হযরত
ওমর (রা:) তাদের মর্জিমত ভূ -সম্পদ ভাগ করে
দিতে অস্বীকৃত হলেন। বললেন, নবী (সা:) ও প্রথম খলীফার মতই এই সম্পদের ভোগ দখল চলবে , বরাদ্দ হবে । নতুন করে আমি কোন পৃথক সিদ্ধান্ত দিতে পারব না। আমীরুল মুমিনীন ওমর
ইবনুল খাত্তাব (রা:) এই ধরনের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যায় মুহাদ্দেসীনে কেরাম বলেন, যদি মামলার বিবদমান দু গ্রুপের মর্জিমত জমি জমা ভাগ করে
দেয়া হত তাহলে বনী হাশেমকে অর্ধেক আর নবী
পরিবারকে অর্ধেক দেওয়া লাগত। এতে একটা জিনিষ পরিস্কার হত যে , নবীর সম্পদের মিরাছ
ভাগ হচ্ছে । রাসূলুল্লাহ (সা:) এর অর্ধেক সম্পদ তাঁর মেয়ের সুত্রে হযরত আলী (রা:) পেয়েছেন আর উম্মুল মুমিনীনগণের অংশ আসাবা হিসেবে
চাচা আব্বাস পেয়েছেন । অথচ নবীদের সম্পদের
কোন বিলি -বন্টন হয় না । তাদের পরিত্যাক্ত সম্পদ পাবেন জনসাধারণ। এই সন্দেহ থেকে বাঁচার স্বার্থে হযরত ওমর (রা:) ওই মামলায় বিব্রতবোধ করে তাঁর পূর্বসূরীর নিয়ম বহাল রেখেছেন। তবে হাশেমী ও আলী (রা:) খান্দান তথা নবী পরিবার পর্যাপ্ত পরিমান বরাদ্দ সন্তোষজনক আকারে বায়তুল মাল থেকে যথারীতি পেয়ে গেছেন আমৃত্যুই। এর ওপর আমরা আরো বিশদ আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ্।
শীয়াদের ভাষ্যঃ
মালে ফাই (যুদ্ধলব্ধ মাল ) এর আমদানী ও বরাদ্দ নিয়ে শীয়া ওলামাগণ বিশদ কালি কলম খরচ
করেছেন । ইবনে আবিল হাদীদের 'নাহ্জুুল বালাগাহ' কিতাবটি এ বিষয়ে সর্বাধিক সোচ্চার । তার ভাষ্য, ওসমান ইবনে হানীফ হযরত আলী (রা:) এর পক্ষ থেকে বসরার গভর্ণর নিযুক্ত ছিলেন । হযরত আলী (রা:) তাকে লেখা একটি পত্রে বলেন - 'ফাদাকের জমিজমা আমার অধীনে ছিল ' । ইবনে আবিল হাদীদ 'শরহে নাহ্জুুল বালাগাহ ' -এ ফাদাক বিষয়ে তিনটি পরিচ্ছেদ টেনেছেন। প্রথম পরিচ্ছেদে আবূ বকর আল -জওয়াহিরীর প্রমানসিদ্ধ বর্ণনা এনেছেন।
এই পরিচ্ছেদে তিনি একথাটি স্বীকার গেছেন যে,
মালে ফাই -এর আমদানী ও বরাদ্দের দায়িত্বটি
হযরত আলী (রা:) এর ওপরই ছিল । তাঁর পবিত্র
খান্দানও সেগুলো ভোগ দখল করত । দেখুন তার ভাষ্য -
"এই মামলায় হযরত আলী (রা:) হযরত আব্বাস (রা:) এর বিরুদ্ধে জিতে গেলেন । সুতরাং এই মাল সম্পদ হযরত আলী (রা:) এর হস্তগত হল। পরবর্তীতে হযরত হাসান (রা:) এর করতলগত হল । তারপরে একে একে হুসাইন (রা:) . আলী যায়নুল আবিদীন, হাসান ইবনে হাসান ও যায়েদ
ইবনে হাসানের দায়িত্বে অর্পিত হয়।
সার -সংক্ষেপঃ
১। নবী পরিবারের লোকজনের জন্য মালে ফাই তথা বনি নযীরের সম্পদ যথারীতি আদায় করা হত।
২। এই সব মালের রক্ষক ও বন্টনকারী খোদ হযরত আলী (রা:) ই ছিলেন । তাঁর মৃত্যুর পর এ
মহান দায়িত্বটি তাঁর উত্তরাধিকারীগণই একে এক
পালন করেন।
৩। নবী পরিবার ও বনী হাশেমের অধিকারসমূহ
হরণের সকল ঘটনাই উদ্ভট বানোয়াট ও উদ্দেশ্য
প্রণোদিত । সর্বোপরি মিথ্যার বেসাতিতে পূর্ণ ।
তাদের অধিকার কোনদিনও ক্ষুন্ন হয়নি। খয়বারের ভূ -সম্পদের এক ছটাকও কেউ আত্মসাৎ করেনি। সিদ্দীকি,ফারুকী ও ওসমানি
খেলাফতের কোনও ব্যক্তি এ দুস্কর্মটি করেননি। বরং যথাযথ যার যার অধিকার যার যার কাছে তাঁরা পৌঁছিয়েছেন নিতান্তই আমানতদারির সাথে।
Monday, 6 May 2019
তিন খলীফার যুগে নবী পরিবারের যুদ্ধলদ্ধ মাল (ফাই) প্রাপ্তি
বন্টননীতি বিশ্লেষণের পর সংক্ষেপে মাল ফাই নিয়ে কিছু কথা বলা জরুরী । সুধী পাঠকদের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি যে, 'মালে গণীমত ' ওই মালকে বলা হয় যা কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করার পর মুসলমানদের হস্তগত হয় । এই মালকে পাঁচ ভাগ করা হয় । চার ভাগ উপস্হিত মুজাহিদদের মাঝে ভাগ করা হয়। আর এক ভাগ বায়তুলমালে প্রেরণ করা হয় । 'মালে ফাই' ওই মালকে বলা হয় যা যুদ্ধ ব্যতিরেকে মুসলমানদের হস্হগত হয় । মালে ফাই অনেক ভাগে ভাগ করা হয়। যেমন,
(১ ) আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অংশ (২ ) রাসূলের
আত্মীয়দের অংশ (৩) ইয়াতীমদের অংশ ( ৪ ) মিসকীনদের অংশ (৫ ) মুসাফির (পর্যটক) দের অংশ। এভাবেই সূূরা হাশরের মধ্যে বর্ণিত আছে।
সুধী পাঠকদের খেদমতে এখানে আরেকটি
দিক আমরা তুলে ধরতে চাই । তাহল, মালে ফই -এর যা নবী পরিবারের জন্য বরাদ্দ ছিল , তা হযরত আলীর তত্বাবধানে বন্টিত হত। এ প্রসংগে
আমরা বুখারীসহ কিছু কিতাবে বর্ণিত 'একটি রেওয়ায়েতের প্রতি প্রমাণস্বরূপ চোখ বুলিয়ে নিতে পারি -- -
"মদীনার বনী নযীরের থেকে অর্জিত মাল -সম্পদে বনী হাশেম ও নবী পরিবারের করাদ্দের
দায়িত্বটি হযরত আলী (রা:) এর স্কন্ধেছিল। এই
মালের হিস্যা নিয়ে হযরত আলী (রা:) ও তাঁর চাচা হযরত আব্বাস (রা:) এর মধ্যে মত পার্থক্য চলে আসাছিল। হযরত ওমর (রা:) তাদের দাবী উভয়ের মতানৈক্যের দরুন ওই মাল বন্টন করতে
পুরোদস্তুর অস্বীকার করে বসেন । ব্যাপারটি আঁচ করতে পেরে হযরত আব্বাস (রা:) দাবী -দাওয়া থেকে নিজেকে সড়িয়ে নেন। হযরত আলী (রা:)
এর ইন্তেতালের পর বিষয়টি হযরত হাসান (রা:)
এর ওপর বার্তায়, পরে হযরত হুসাইন (রা:) এর
ওপর । পরে আসে ইমাম যাইনুল আবিদীনের ওপর। এরপর হযরত হাসান ইবনে হাসান (রা:) এর ওপর। সর্বশেষে যায়দ ইবনে হাসানের ওপর ।
নিশ্চিতরূপে এগুলো সব রাসূলের সাদাকাহ ছিল।
(১ ) আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অংশ (২ ) রাসূলের
আত্মীয়দের অংশ (৩) ইয়াতীমদের অংশ ( ৪ ) মিসকীনদের অংশ (৫ ) মুসাফির (পর্যটক) দের অংশ। এভাবেই সূূরা হাশরের মধ্যে বর্ণিত আছে।
সুধী পাঠকদের খেদমতে এখানে আরেকটি
দিক আমরা তুলে ধরতে চাই । তাহল, মালে ফই -এর যা নবী পরিবারের জন্য বরাদ্দ ছিল , তা হযরত আলীর তত্বাবধানে বন্টিত হত। এ প্রসংগে
আমরা বুখারীসহ কিছু কিতাবে বর্ণিত 'একটি রেওয়ায়েতের প্রতি প্রমাণস্বরূপ চোখ বুলিয়ে নিতে পারি -- -
"মদীনার বনী নযীরের থেকে অর্জিত মাল -সম্পদে বনী হাশেম ও নবী পরিবারের করাদ্দের
দায়িত্বটি হযরত আলী (রা:) এর স্কন্ধেছিল। এই
মালের হিস্যা নিয়ে হযরত আলী (রা:) ও তাঁর চাচা হযরত আব্বাস (রা:) এর মধ্যে মত পার্থক্য চলে আসাছিল। হযরত ওমর (রা:) তাদের দাবী উভয়ের মতানৈক্যের দরুন ওই মাল বন্টন করতে
পুরোদস্তুর অস্বীকার করে বসেন । ব্যাপারটি আঁচ করতে পেরে হযরত আব্বাস (রা:) দাবী -দাওয়া থেকে নিজেকে সড়িয়ে নেন। হযরত আলী (রা:)
এর ইন্তেতালের পর বিষয়টি হযরত হাসান (রা:)
এর ওপর বার্তায়, পরে হযরত হুসাইন (রা:) এর
ওপর । পরে আসে ইমাম যাইনুল আবিদীনের ওপর। এরপর হযরত হাসান ইবনে হাসান (রা:) এর ওপর। সর্বশেষে যায়দ ইবনে হাসানের ওপর ।
নিশ্চিতরূপে এগুলো সব রাসূলের সাদাকাহ ছিল।
সিদ্দীকী খেলা্ফতঃ নিকটাত্মীয়ের হিস্যা কিংবা এক পঞ্চমাংশ অর্জনের বর্ণনা
উপরোক্ত আলোচনায় খুমুস ( এক পঞ্চমাংশ ) এর আলোচনা এলেও তা ছিল মালে ফাই ( যুদ্ধ না করে রণাঙ্গন থেকে সম্পদ হাসিল করা) এর প্রাসঙ্গিক আকারে। এক্ষণে আমরা বিষয়টি পৃথকাকারে উল্লেখ করতে চাই । বলতে চাই এক পঞ্চমাংশ বা মালে খুমুসে বনী হাশেমের যে পাওনা ছিল হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) খেলাফত কালে তা পুঙ্খানুুপুঙ্খ আদায় করা হয়েছে । এক কানাকড়ি থেকেও তাদের বঞ্চিত করা হয়নি।
মজার বিষয় হলো, এগুলো বন্টনের দায়িত্ব ছিল
স্বয়ং হযরত আলী ( রা:) এর হাতে । সুতরাং পঞ্চমাংশ আত্মসাতের কাহিনী শুদ্ধ নয় । এই বিষয়টিতে স্বয়ং হযরত আলী (রা:) এর ভাষ্য দেখা যেতে পারে । হযরত আলী (রা:) বর্ণনা করেন --
"হযরত আলী (রা:) বলেন, হযরত ফাতেমা , আব্বাস ও যায়দ ইবনে হারিসা (রা:) এর উপস্হিতিতেই আমি রাসূলুল্লাহ (সা:) এর খেদমতে আরয করলাম, নিকটাত্মীয়দের মালে
খুমুসের (যুদ্ধলব্ধ মালের এক পঞ্চমাংশ) ভাগ বাটোয়ারার দায়িত্ব যদি আপনার জীবদ্দশায় আমাকে দেয়া হত তাহলে ভাল হত। আপনার পরবর্তীতে এতদ্বিষয়ে কেউ আমার সাথে মতানৈক্য লিপ্ত হতে পারত না । হযরত আলী (রা:)
বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) আমাকে ওই মাল বন্টনের দায়িত্ব অর্পন করেন । রাসূলুল্লাহ (সা:) এর জীবদ্দশায় আমি ওই মালের ( বনী হাশেমের মাঝে) বিলি -বন্টন করেছি । পরে আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) তাঁর শাসনকালে আমাকে ওই দায়িত্বে বহাল রাখেন । তাঁর যুগেও আমি উহা বনী
হাশেমের মাঝে বিলি করি । তাঁর পরবর্তিতে হযরত ওমর ফারুক (রা:) এর যুগেও আমাকে স্বপদে বহাল রাখা হলে ফারুকী যুগে উহা বনী হাশেমের মাঝে বিলি করি। ফারুকী খেলাফতের শেষের দিকে অঢেল মালেে খুমুস আসে । তিনি এ
সময় আমাদের হিস্যার মাল আলাদা করে আমার কাছে প্রেরণ করে বলেন, আপনাদের অংশ নিয়ে পূর্বাপর নিয়মে বন্টন করুন। ওই সময় আমি বলি, আমীরুল মুমিনীন! আমরা (বনী হাশেম ) এক্ষণে আর এই মাল নিতে চাচ্ছি না। (আলহামদুলিল্লাহ এক্ষণে আমাদের অবস্হা ভাল ) অন্যান্য মুসলমানদের দরকার আছে । তারা ঠোকাগ্রস্হও । তখন হযরত ওমর (রা:) ওই মালগুলো ঠোকাগ্রস্হ মুসলমানদের জন্য বায়তুলমালে ফেরৎ নিয়ে নেন ।
সার সংক্ষেপঃ
১। উপরোক্ত বর্ণনা দ্বারা প্রতীয়মান হলো , সিদ্দীকী ও ফারুকী খেলাফতকালে বনী হাশেম ও
নবী পরিবার যুদ্ধলব্ধ মালের হিস্যা যথারীতি পেতেন। তাঁদের অধিকারসমূহ কেউ কখনো ছিনতাই করেনি ।
২। মজার বিষয় হলো, বনী হাশেম ও নবী পরিবারের খুমুস (যুদ্ধলব্ধ মাল ) বন্টনের দায়িত্বে হযরত আলী (রা:) ই নিয়োজিত ছিলেন । এগুলো সব হযরত আলী (রা:) এর মাধ্যমেই বন্টন হবার
কারণে নবী বংশের কারো প্রতি কোনরূপ অনিয়ম হবার শংকা নেই ।
৩। মালে খুমুস প্রাপ্তিতে বনী হাশেম ও আহলে বায়তের ক্ষেত্রে ঠেকা ও দারিদ্রে্ার বিষয়টি লক্ষ্য
করা হত। অর্থাৎ তারা প্রয়োজনে নিতেন, নিষ্প্রয়োজনে নিতেন না ।
৪। তাঁদের মধ্যকার এই ধরনের পারস্পারিক লেন -দেন, আদান -প্রদান এ কথার স্বাক্ষী দেয় যে,
চমৎকার বন্ধুত্ব ও বোঝাপড়া ছিল তাদের মধ্যে।
'শত্রুর মাঝে এমন লেনদেন তল্পনা করা যায় কী!
মজার বিষয় হলো, এগুলো বন্টনের দায়িত্ব ছিল
স্বয়ং হযরত আলী ( রা:) এর হাতে । সুতরাং পঞ্চমাংশ আত্মসাতের কাহিনী শুদ্ধ নয় । এই বিষয়টিতে স্বয়ং হযরত আলী (রা:) এর ভাষ্য দেখা যেতে পারে । হযরত আলী (রা:) বর্ণনা করেন --
"হযরত আলী (রা:) বলেন, হযরত ফাতেমা , আব্বাস ও যায়দ ইবনে হারিসা (রা:) এর উপস্হিতিতেই আমি রাসূলুল্লাহ (সা:) এর খেদমতে আরয করলাম, নিকটাত্মীয়দের মালে
খুমুসের (যুদ্ধলব্ধ মালের এক পঞ্চমাংশ) ভাগ বাটোয়ারার দায়িত্ব যদি আপনার জীবদ্দশায় আমাকে দেয়া হত তাহলে ভাল হত। আপনার পরবর্তীতে এতদ্বিষয়ে কেউ আমার সাথে মতানৈক্য লিপ্ত হতে পারত না । হযরত আলী (রা:)
বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) আমাকে ওই মাল বন্টনের দায়িত্ব অর্পন করেন । রাসূলুল্লাহ (সা:) এর জীবদ্দশায় আমি ওই মালের ( বনী হাশেমের মাঝে) বিলি -বন্টন করেছি । পরে আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) তাঁর শাসনকালে আমাকে ওই দায়িত্বে বহাল রাখেন । তাঁর যুগেও আমি উহা বনী
হাশেমের মাঝে বিলি করি । তাঁর পরবর্তিতে হযরত ওমর ফারুক (রা:) এর যুগেও আমাকে স্বপদে বহাল রাখা হলে ফারুকী যুগে উহা বনী হাশেমের মাঝে বিলি করি। ফারুকী খেলাফতের শেষের দিকে অঢেল মালেে খুমুস আসে । তিনি এ
সময় আমাদের হিস্যার মাল আলাদা করে আমার কাছে প্রেরণ করে বলেন, আপনাদের অংশ নিয়ে পূর্বাপর নিয়মে বন্টন করুন। ওই সময় আমি বলি, আমীরুল মুমিনীন! আমরা (বনী হাশেম ) এক্ষণে আর এই মাল নিতে চাচ্ছি না। (আলহামদুলিল্লাহ এক্ষণে আমাদের অবস্হা ভাল ) অন্যান্য মুসলমানদের দরকার আছে । তারা ঠোকাগ্রস্হও । তখন হযরত ওমর (রা:) ওই মালগুলো ঠোকাগ্রস্হ মুসলমানদের জন্য বায়তুলমালে ফেরৎ নিয়ে নেন ।
সার সংক্ষেপঃ
১। উপরোক্ত বর্ণনা দ্বারা প্রতীয়মান হলো , সিদ্দীকী ও ফারুকী খেলাফতকালে বনী হাশেম ও
নবী পরিবার যুদ্ধলব্ধ মালের হিস্যা যথারীতি পেতেন। তাঁদের অধিকারসমূহ কেউ কখনো ছিনতাই করেনি ।
২। মজার বিষয় হলো, বনী হাশেম ও নবী পরিবারের খুমুস (যুদ্ধলব্ধ মাল ) বন্টনের দায়িত্বে হযরত আলী (রা:) ই নিয়োজিত ছিলেন । এগুলো সব হযরত আলী (রা:) এর মাধ্যমেই বন্টন হবার
কারণে নবী বংশের কারো প্রতি কোনরূপ অনিয়ম হবার শংকা নেই ।
৩। মালে খুমুস প্রাপ্তিতে বনী হাশেম ও আহলে বায়তের ক্ষেত্রে ঠেকা ও দারিদ্রে্ার বিষয়টি লক্ষ্য
করা হত। অর্থাৎ তারা প্রয়োজনে নিতেন, নিষ্প্রয়োজনে নিতেন না ।
৪। তাঁদের মধ্যকার এই ধরনের পারস্পারিক লেন -দেন, আদান -প্রদান এ কথার স্বাক্ষী দেয় যে,
চমৎকার বন্ধুত্ব ও বোঝাপড়া ছিল তাদের মধ্যে।
'শত্রুর মাঝে এমন লেনদেন তল্পনা করা যায় কী!
Sunday, 5 May 2019
ছিদ্দীকী খেলাফতকালে নবী পরিবারের সম্পদ সংরক্ষক ও ফাদাক প্রসংগ
বিগত অধ্যায়ে আমরা নবী পরিবারের আচার -অনুষ্ঠানে হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) এর খাদ্দানের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছি। এবার আমরা হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) এর শাসনকালের কাহিনী বর্ণনা করব । কেননা এই সময়টায় মুসলিম জাহানের প্রথম ও দ্বিতীয় খলীফা নবী পরিবারের
প্রতি যারপরনাই জুলুম করেছেন বলে মানুষেরা যাচ্ছে তাই কাঁদা ছুড়েছে। বলেছে , এরা দু'জনা নবী পরিবারের অধিকার হরণ করেছেন, তাদের
ন্যায়সংগত পাওয়া বুঝিয়ে দেননি । এমনকি তাদের প্রতি শক্রভাবাপন্ন ছিলেন।
আমরা তাই সিদ্দীক আকবারের যুগের সংঘটিত ও আপত্তিকর স্হানসমূহের প্রাণবন্ত আলোচনা
করব। ঘটনার প্রকৃতি তুলে আনতে চেষ্ঠা করব যাতে সন্দেহ, আপত্তি ও অপবাদের উড়ন্ত ডানা সহজেই ঝিমিয়ে পড়ে। প্রথমেই আমরা নবী পরিবারের "অর্থনৈতিক অধিকার" বিষয়টি তুলে
ধরব। রাসূলুল্লাহ (সা:) যেভাবে তার রক্তীয় ও নিকটাত্মীয়দের বিশেষ করে আহলে বাইতকে সায় -সাহায্য করতেন ঠিক সেভাবে তাঁর ইন্তেতালের পর সিদ্দীকে আকবার তাঁর খেলাফতকালেও সাহায্য করে গেছেন । তিনি নববী ধারার একচুলও লংঘন করেননি । বন্ধুও নিজের বন্ধু হয় । নিখাদ
অন্তরঙ্গ বন্ধুও বন্ধুর আত্মীয় এমনকি দূরতম আত্মীয়দের সাথেও সুসম্পর্ক বজায় রাখে । সুতরাং সিদ্দীকে আকবার (রা:) রাসূলুল্লাহ (সা:)
পরিবারের সাথে নববী রসম -রেওয়াজ মোতাবেক সুসম্পর্ক বজায় রেখে গেছেন আমৃত্যু ।তাঁদের
প্রতিটি অধিকার গুণে গুণে আদায় করেছেন । এটিই তাঁর পূর্ণ নিষ্ঠা ও সহমর্মিতার অতি উত্তম নমুনা । উপরোক্ত দাবীর সমর্থনে আমরা কিছু রেওয়ায়েত পেশ করব যা মুহাদ্দিসীনে কেরামের
নিকট সহীহ বলে সমাদৃত। নবী পরিবারের প্রতি
সিদ্দীকে আকবরের শ্রদ্ধা, ভক্তি ও আবেগ কতটা নিখাদ তা এর দ্বারা প্রতিভাত । তাদের অর্থনৈতিক অধিকার কী করে আদায় করেছেন এতে তা পরিস্কারভাবে বিবৃত।
পয়লা রেওয়ায়েতঃঃ যুদ্ধলদ্ধ মাল (মালে ফাই )
"হযরত ওরওয়া ইবনে যুবায়ের (রা:) থেকে বর্ণিত। তিনি হযরত আয়েশা (রা:) এর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, হযরত ফাতেমা (রা:) হযরত আব্বাস (রা:) কে আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) এর দরবারে প্রেরণ করে
মদীনার সাদাকা ফাদাক ও খয়বারের এক পঞ্চমাংশ মালের ব্যাপারে উত্তরাধিকার দাবী উত্থাপন করেন। আবূ বকর (রা:) দাবী শুনে বললেন, নবী করীম (সা:) ইরশাদ করেন , আমাদের নবীদের পরিত্যক্ত মালে মীরাছ (উত্তরাধিকার ) হয় না । আমরা যা কিছু রেখে যাই তা ওয়াকফস্বরূপ সাদাকা হয়ে যায় । (উপরিউক্ত
দাবী দাওয়ার পরে রাসূলুল্লাহ (সা:) এর সহায় সম্পদ, রুটি -রুজি ও খোরাক -পোষাকের ব্যাপারে ) সিদ্দীকে আকবার (রা:) বলেন, রাসূলের জীবদ্দশায় তিনি ও তাঁর পরিবার যেখান
থেকে যে হারে খাবার -দাবার গ্রহণ করতেন ঠিক সে সব জায়গা থেকেই ওভাবেই তাঁর পরিবার
খোর -পোশ পাবেন । এতে কোন প্রকার পরিবর্তন -পরিবর্ধন করা হবে না । অর্থাৎ জীবন ধারণের উপায় -উপকরণ ছাড়া মীরাছ নামে রাসূলুল্লাহ (সা:) এর পরিবার কিছুই পাবেন না । এ সময় হযরত আলী আগমন করলেন। তিনি হামদ ও ছানার পর বললেন, 'আবূ বকর ! আমরা আপনার মাহাত্ম্য ও আভিজাত্য সম্পর্কে সম্যক অবগত। এগুলোর অকুন্ঠ স্বীকৃতি দিই আমরা। আপনার সাথে রাসূলুল্লাহ (সা:) আত্মীয়তাও আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি এবং তাদের অধিকারসমূহ মনে রাখি । এরপর হযরত আবূ বকর (রা:) বলেন, কসম সেই সত্ত্বার যার কুদরতি
কব্জায় আমার প্রাণ ! রাসূলুল্লাহ (সা:) এর আত্মীয় -স্বজনের দেখভাল আমার কাছে আমার পরিবার অপেক্ষা অধীক ।
দ্বিতীয় রেওয়ায়েতঃ মালে ফাই (যুদ্ধ লদ্ধ মাল)
"ফাতেমা (রা:) ও আব্বাস (রা:) হযরত আবূ বকর (রা:) এর কাছে এসে মীরাছস্বরূপ ফাদাকের জমি ও খয়বারের হিস্যা উত্থাপন করেন। আবূ বকর (রা:) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা:) কে বলতে শুনেছি , আমাদের নবীদের পরিত্যাক্ত সম্পত্তিতে কোন মীরাছ দেওয়া হয় না ।
আমরা যা রেখে যাই তা সাদাকাহ হিসেবে গণ্য হবে। ( সংক্ষেপিত)
এছাড়া হানাফী মাযহাবের ব্যারিস্টার বলে খ্যাত
ইমাম ত্বহাবী ( রহ:) ও এ মর্মে একটি বর্ণনা করেন তার 'শরহে মাআনিউল আছারে' । বর্ণনাটির শব্দ ও মর্ম হুবহু বুখারীর মত বলে আমরা দ্বিরুক্তি করা থেকে বিরত রইলাম ।
সার -নির্যাসঃ
১। উপরিউক্ত বর্ণনা দ্বারা প্রতীয়মান হলো , মিদ্দীকি খেলাফত যুগে আহলে বাইত ও নবী পরিবারের সম্মানিত সদস্যবৃন্দ, মদীনা,ফাদাক ও খয়বারের পঞ্চমাংশ থেকে স্ব -স্ব অধিকার পেতেন। অবশ্য মীরাছর অংশ তারা পেতেন না একান্তই নবী ( আ:) এর প্রতি নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে ।
২। দ্বিতীয় যে ব্যাপারটি এখানে প্রতিভাত তা হচ্ছে
এই যে, নবী পরিবারের অর্থনৈতিক অধিকারসমূহ
হযরত আবূ বকর (রা:) নিজ ইচ্ছামত বন্টন করতেন না বরং নবী (সা:) এর পবিত্র জীবদ্দশার সিস্টেম মোতাবেকই পরিচালনা করতেন। তিনি আদৌ নাউযুবিল্লাহ এখান থেকে আত্মসাৎ করতেন না বরং রাসূল -যুগের নিয়মেই বিলি -বন্টন করতেন ।
৩। সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর কাছে নবী পরিবারের সম্মান নিজ পরিবারের চেয়ে বেশীই
ছিল। হযরত আবূ বকর (রা:) এ বিষয়টি কসম করেই বলতেন । এ বিষয়ে তিনি শতভাগ সাচ্চা ও
সঠিক ছিলেন । তিনি নিজের চেয়ে আহলে বাইতকে অধীক ভালবাসতেন । তাদের অর্থনৈতিক অধিকারের প্রতি পূর্ন সজাগ থাকতেন। এটি তার বন্ধুত্বপূর্ণ সহমর্মিতা, পারস্পারিক সৌহার্দ্য ও কল্যাণকামিতার অতি উত্তম নমুনা । ইন্সাফী দুনিয়া যা অস্বীকার করতে পারে না ।
প্রতি যারপরনাই জুলুম করেছেন বলে মানুষেরা যাচ্ছে তাই কাঁদা ছুড়েছে। বলেছে , এরা দু'জনা নবী পরিবারের অধিকার হরণ করেছেন, তাদের
ন্যায়সংগত পাওয়া বুঝিয়ে দেননি । এমনকি তাদের প্রতি শক্রভাবাপন্ন ছিলেন।
আমরা তাই সিদ্দীক আকবারের যুগের সংঘটিত ও আপত্তিকর স্হানসমূহের প্রাণবন্ত আলোচনা
করব। ঘটনার প্রকৃতি তুলে আনতে চেষ্ঠা করব যাতে সন্দেহ, আপত্তি ও অপবাদের উড়ন্ত ডানা সহজেই ঝিমিয়ে পড়ে। প্রথমেই আমরা নবী পরিবারের "অর্থনৈতিক অধিকার" বিষয়টি তুলে
ধরব। রাসূলুল্লাহ (সা:) যেভাবে তার রক্তীয় ও নিকটাত্মীয়দের বিশেষ করে আহলে বাইতকে সায় -সাহায্য করতেন ঠিক সেভাবে তাঁর ইন্তেতালের পর সিদ্দীকে আকবার তাঁর খেলাফতকালেও সাহায্য করে গেছেন । তিনি নববী ধারার একচুলও লংঘন করেননি । বন্ধুও নিজের বন্ধু হয় । নিখাদ
অন্তরঙ্গ বন্ধুও বন্ধুর আত্মীয় এমনকি দূরতম আত্মীয়দের সাথেও সুসম্পর্ক বজায় রাখে । সুতরাং সিদ্দীকে আকবার (রা:) রাসূলুল্লাহ (সা:)
পরিবারের সাথে নববী রসম -রেওয়াজ মোতাবেক সুসম্পর্ক বজায় রেখে গেছেন আমৃত্যু ।তাঁদের
প্রতিটি অধিকার গুণে গুণে আদায় করেছেন । এটিই তাঁর পূর্ণ নিষ্ঠা ও সহমর্মিতার অতি উত্তম নমুনা । উপরোক্ত দাবীর সমর্থনে আমরা কিছু রেওয়ায়েত পেশ করব যা মুহাদ্দিসীনে কেরামের
নিকট সহীহ বলে সমাদৃত। নবী পরিবারের প্রতি
সিদ্দীকে আকবরের শ্রদ্ধা, ভক্তি ও আবেগ কতটা নিখাদ তা এর দ্বারা প্রতিভাত । তাদের অর্থনৈতিক অধিকার কী করে আদায় করেছেন এতে তা পরিস্কারভাবে বিবৃত।
পয়লা রেওয়ায়েতঃঃ যুদ্ধলদ্ধ মাল (মালে ফাই )
"হযরত ওরওয়া ইবনে যুবায়ের (রা:) থেকে বর্ণিত। তিনি হযরত আয়েশা (রা:) এর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, হযরত ফাতেমা (রা:) হযরত আব্বাস (রা:) কে আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) এর দরবারে প্রেরণ করে
মদীনার সাদাকা ফাদাক ও খয়বারের এক পঞ্চমাংশ মালের ব্যাপারে উত্তরাধিকার দাবী উত্থাপন করেন। আবূ বকর (রা:) দাবী শুনে বললেন, নবী করীম (সা:) ইরশাদ করেন , আমাদের নবীদের পরিত্যক্ত মালে মীরাছ (উত্তরাধিকার ) হয় না । আমরা যা কিছু রেখে যাই তা ওয়াকফস্বরূপ সাদাকা হয়ে যায় । (উপরিউক্ত
দাবী দাওয়ার পরে রাসূলুল্লাহ (সা:) এর সহায় সম্পদ, রুটি -রুজি ও খোরাক -পোষাকের ব্যাপারে ) সিদ্দীকে আকবার (রা:) বলেন, রাসূলের জীবদ্দশায় তিনি ও তাঁর পরিবার যেখান
থেকে যে হারে খাবার -দাবার গ্রহণ করতেন ঠিক সে সব জায়গা থেকেই ওভাবেই তাঁর পরিবার
খোর -পোশ পাবেন । এতে কোন প্রকার পরিবর্তন -পরিবর্ধন করা হবে না । অর্থাৎ জীবন ধারণের উপায় -উপকরণ ছাড়া মীরাছ নামে রাসূলুল্লাহ (সা:) এর পরিবার কিছুই পাবেন না । এ সময় হযরত আলী আগমন করলেন। তিনি হামদ ও ছানার পর বললেন, 'আবূ বকর ! আমরা আপনার মাহাত্ম্য ও আভিজাত্য সম্পর্কে সম্যক অবগত। এগুলোর অকুন্ঠ স্বীকৃতি দিই আমরা। আপনার সাথে রাসূলুল্লাহ (সা:) আত্মীয়তাও আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি এবং তাদের অধিকারসমূহ মনে রাখি । এরপর হযরত আবূ বকর (রা:) বলেন, কসম সেই সত্ত্বার যার কুদরতি
কব্জায় আমার প্রাণ ! রাসূলুল্লাহ (সা:) এর আত্মীয় -স্বজনের দেখভাল আমার কাছে আমার পরিবার অপেক্ষা অধীক ।
দ্বিতীয় রেওয়ায়েতঃ মালে ফাই (যুদ্ধ লদ্ধ মাল)
"ফাতেমা (রা:) ও আব্বাস (রা:) হযরত আবূ বকর (রা:) এর কাছে এসে মীরাছস্বরূপ ফাদাকের জমি ও খয়বারের হিস্যা উত্থাপন করেন। আবূ বকর (রা:) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা:) কে বলতে শুনেছি , আমাদের নবীদের পরিত্যাক্ত সম্পত্তিতে কোন মীরাছ দেওয়া হয় না ।
আমরা যা রেখে যাই তা সাদাকাহ হিসেবে গণ্য হবে। ( সংক্ষেপিত)
এছাড়া হানাফী মাযহাবের ব্যারিস্টার বলে খ্যাত
ইমাম ত্বহাবী ( রহ:) ও এ মর্মে একটি বর্ণনা করেন তার 'শরহে মাআনিউল আছারে' । বর্ণনাটির শব্দ ও মর্ম হুবহু বুখারীর মত বলে আমরা দ্বিরুক্তি করা থেকে বিরত রইলাম ।
সার -নির্যাসঃ
১। উপরিউক্ত বর্ণনা দ্বারা প্রতীয়মান হলো , মিদ্দীকি খেলাফত যুগে আহলে বাইত ও নবী পরিবারের সম্মানিত সদস্যবৃন্দ, মদীনা,ফাদাক ও খয়বারের পঞ্চমাংশ থেকে স্ব -স্ব অধিকার পেতেন। অবশ্য মীরাছর অংশ তারা পেতেন না একান্তই নবী ( আ:) এর প্রতি নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে ।
২। দ্বিতীয় যে ব্যাপারটি এখানে প্রতিভাত তা হচ্ছে
এই যে, নবী পরিবারের অর্থনৈতিক অধিকারসমূহ
হযরত আবূ বকর (রা:) নিজ ইচ্ছামত বন্টন করতেন না বরং নবী (সা:) এর পবিত্র জীবদ্দশার সিস্টেম মোতাবেকই পরিচালনা করতেন। তিনি আদৌ নাউযুবিল্লাহ এখান থেকে আত্মসাৎ করতেন না বরং রাসূল -যুগের নিয়মেই বিলি -বন্টন করতেন ।
৩। সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর কাছে নবী পরিবারের সম্মান নিজ পরিবারের চেয়ে বেশীই
ছিল। হযরত আবূ বকর (রা:) এ বিষয়টি কসম করেই বলতেন । এ বিষয়ে তিনি শতভাগ সাচ্চা ও
সঠিক ছিলেন । তিনি নিজের চেয়ে আহলে বাইতকে অধীক ভালবাসতেন । তাদের অর্থনৈতিক অধিকারের প্রতি পূর্ন সজাগ থাকতেন। এটি তার বন্ধুত্বপূর্ণ সহমর্মিতা, পারস্পারিক সৌহার্দ্য ও কল্যাণকামিতার অতি উত্তম নমুনা । ইন্সাফী দুনিয়া যা অস্বীকার করতে পারে না ।
Thursday, 2 May 2019
হযরত ফাতেমা (রাঃ) ও আয়েশা (রাঃ) এর মধ্যকার মধুর সম্পর্ক
হযরত আলী (রাঃ) ও ফাতেমা (রা:) এর বিয়েসম্পর্কিত তথ্যে উপাত্তের পাশাপাশি নবী পরিবারের অন্যান্য সদস্য বিশেষ করে উম্মৎ জননীদের সাথে এই দম্পতি সৌহার্দপূর্ণ মানসিকতা , নিষ্ঠা ও ভক্তি -শ্রদ্ধা আলোচনা করা
যেতে পারে । বিশেষ করে সিদ্দীকি খান্দানের লোকজনের সাথে নবী পরিবারের সদস্যদের মধ্যকার তথাকথিত টানাপড়েন,ঝগড়া -বিবাদ ও
মনোমালিন্যের যে বিষয়গুলো নিয়ে অনেকেই সোচ্চার তার কিঞ্চিত খতিয়ান নিচে ফুটিয়ে তোলা
হচ্ছে ।
১। হযরত আয়েশা (রাঃ ) এর মুখে খাতুনে জান্নাতের গুন -কীর্তন
সর্বাগ্রে আমরা উম্মৎ জননী ও সিদ্দীক তনয়া হযরত আয়েশা (রাঃ) এর পবিত্র মুখনিঃসৃত গুণ -কীর্তন শুনব যা তিনি খাতুনে হান্নাত সম্পর্কে করেছেন । হাদীস, ইতিহাস ও চরিত্রবিষয়ক কিতাবসমূহে এ বিষয়ে ভূড়ি ভূড়ি আলোচনা বিদ্যমান। এখানে উদাহরণস্বরূপ আমরা হাকেম নিশাপুরী (রহ:)-এর 'মুস্তাদরাক' ও ইবনে আব্দুল বার (রহ:) এর 'আল -ইস্তিয়াব ' কিতাবের
বর্ণনা টানব --
"উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রাঃ ) থেকে বর্ণিত, রাসূলের অনুরূপ কথাবার্তা ও বাচনভঙ্গিতে ফাতেমা (রা:) -এর মত আমি আর কাউকে দেখিনি। নবী করীম (স:) তাঁর কাছে এলে তিনি সসম্মানে উঠে দাঁড়াতেন , তাঁকে চুমো দিতেন এবং স্বাগত জানাতেন । এমনিভাবে হযরত ফাতেমা (রা:) ও নবী করীম (সা:) এর কাছে এলে তিনিও অনুরূপ করতেন" ।
হযরত আয়েশা (রা:) বলেন, ফাতেমা (রা:) এর
মত সত্যবাক আর কাউকে দেখিনি আমি। তবে
তাঁর বাবা রাসূল (সা:) এ থেকে ভিন্ন ' ।
বিখ্যাত শীয়া আলেম শায়খ আব্বাস কুমীও তাঁর 'মুনতাহাল মাআল" শীর্ষক গ্রন্হে আয়েশা
(রা:) এর সূত্রে হুবহু উক্ত রেওয়ায়েত তুলে ধরেছেন ।
আবূ নাঈম ইস্পাহানী (রা:) বর্ণনা করেনঃ
"হযরত আয়েশা (রা:) বলেন, তাঁর বাবা বিনে
ফাতেমা (রা:) এর মত সত্যবাক আমি কাউকে দেখিনি '।
আল্লামা হায়ছামী (রহ:) ও ইবনে হাজার আসকালানী (রহ:) নকল করেনঃ
রাসূল (সা:) ছাড়া ফাতেমার
চেয়ে সেরা আর কেউ নেই "।
হযরত আয়েশা (রা:) উপরোক্ত কথিকাসমূহ দ্বারা
স্বতঃই প্রতীয়মান হচ্ছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা:) এর
পবিত্রা স্ত্রীগণ ও তাঁর কন্যাবৃন্দের মাঝে
সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক অন্য যে কারো তুলনায় অধিকই ছিল।
২। আয়েশা (রা:) -কে ভালবাসোঃ রাসূলের নির্দেশ ফাতিমার প্রতি
এবার আমরা একটি হাদীস বর্ণনা করব যাতে দেখা যাবে রাসূলুল্লাহ (সা:) হযরত ফাতোমা (রা:)
কে নির্দেশ করেছেন যেন তিনি আয়েশা (রা:) কে মুহাব্বত করেন । বর্ণনাটি সহীহ মুসলিমের।
ইমাম নাসাঈও ঘটনাটি বর্ণনা করেন সামান্য শাব্দিক পার্থক্যসহকারে --
"উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা:) বলেন, (একবার )
উম্মৎ জননীগণ হযরত ফাতেমা (রা:) কে রাসূলুল্লাহ (সা:) -এর কাছে এসে প্রবেশানুমতি চাইলেন । এ সময় রাসূলুল্লাহ (সা:) বিশ্রাম নিচ্ছলেন। অনুমতি পেয়ে হযরত ফাতেমা ভেতরে প্রবেশ করে বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! উম্মৎ জননীগণ আবূ বকর (রা:) এর মেয়ে ও তাঁদের মাঝে মহব্বত ও হাদীয়া -তোহফার ব্যাপারে সমতা
বিধানের ব্যাপারে কিছু বলতে আমাকে আপনার
কাছে প্রেরণ করেছেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমি চুপচাপ তাঁর কথা শুনছিলাম। নবী করীম (সা:) বললেন,প্রিয় বৎস ! আমি যার সাথে
মহব্বত রাখি তুমি তাঁর সাথে মহব্বত রাখবে না?
হযরত ফাতেমা (রা:) বললেন, জ্বী হ্যাঁ! (মুহবাবত রাখব) । রাসূলুল্লাহ (সা:) বললেন, তাহলে আয়েশার সাথে মহব্বত রাখবে। হযরত ফাতেমা
(রা:) এ কথা শুনে বেরিয়ে গেলেন । উম্মৎ জননীদের কাছে গিয়ে সব কথা তুলে ধরলেন। জননীগণ বললেন,তুমি আমাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে কথা বলোনি। যাও রাসূলুল্লাহ (সা:) এর কাছে আবার যাও । ফাতেমা (রা:) জবাবে বললেন, আল্লাহর কসম! আমি এ কথার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা:) এর কাছে আর কখনো যাব না,
কিছু বলব না। বর্ণনায় মুসলিম ও নাসাঈ।
উক্ত বর্ণনা দ্বারা প্রতিভাত হচ্ছে যে, পূর্বের কিছু বর্ণনায় যেভাবে আয়েশা (রা:) এর ভাষ্যে ফাতেমা (রা:) এর গুণকীর্তণ ও স্তুতি বন্দনা ফুটে উঠেছে সেভাবে এখানে খোদ ফাতেমা (রা:) এর ভাষ্যে উম্মৎ জননী আয়েশার প্রশংসা ও মাহাত্ম্য উঠে এসেছে । এটি সত্যিই তাদের চমৎকার আন্তরিকতা ও বোঝাপড়ার দলিল । হৃদ্যতা ও সৌহার্দের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন। তাছাড়া উম্মুল
মুমিনীনদের প্রতি হযরত ফাতেমা (রা:) এর ভক্তি
শ্রদ্ধা তো ছিলই এরপর তাঁর প্রতি রাসূলের নির্দেশে হযরত আয়েশার (রা:) প্রতি তাঁর অগাধ
শ্রদ্ধা আরো বেড়ে যায় এবং মহব্বত ওয়াজিব হয়ে
দাঁড়ায় -নয় কি! আল্লাহর প্রিয় হাবীবের প্রিয়তমার প্রতি হযরত ফাতেমা (রা:) অতি অবশ্যই মহব্বত,
আন্তরিকতা ও সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক থাকবে এটাই
স্বাভাবিক। এতে কারো সন্দেহ থাকার কথা নয়।
৩। হযরত আয়েশা (রা:) ও ফাতেমা (রা:) এর পারস্পারিক আস্হা ও গ্রহণযোগ্যতা
হযরত আয়েশা (রা:) ও আলী -ফাতেমা (রা:) দম্পতির মধ্যকার পারস্পরিক আস্হা ও নির্ভরতা ছিল খুবই প্রগাঢ়। শরয়ী মাসয়ালা মাসায়েল বিষয়ে তাদের একে অপরের ব্যাখ্যার প্রতি শ্রদ্ধা কত অমায়িক। মুসনাদে আহমাদ - এ 'হাদীসে ফাতেসা ' -উল্লেখ আছে --
"উম্মে সুলায়মান বলেন, আমি হযরত আয়েশা (রা:) এর কাছে গেলাম । তাঁর কাছে কুরবাণীর গোশতের মাসয়ালা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) প্রথমে গোশত খেতে নিষেধ করেছিলেন, পরে অবশ্য ভক্ষণেন অনুমতি দায়েছেন। (কারন এই যে ) হযরত আলী (রা:) একবার সফর থেকে বাড়ী এলে ফাতেমা (রা:) তাঁকে কুরবাণীর গোশত খেতে দিলেন। হযরত আলী (না:) বললেন, নবী কারীম (সা:) কুরবাণীর
গোশত খেতে নিষেধ করেননি? হযরত ফাতেমা (রা:) বললেন, নবী করীম (সা:) এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে খাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন । হযরত আলী (রা:) রাসূলুল্লাহ (সা:) এর কাছে ব্যাপারটি আরজ করলে তিনি বললেন, এখন থেকে সর্বদার জন্য তোমরা কোরবানির গোশত ভক্ষণ করে যেতে পার। উক্ত ঘটনা নমুনাস্বরূপ পেশ করা হল দেখা গেল শরয়ী ব্যাখ্যায় তাঁর সহমতের অধিকারী । এতে তাদের মাঝে কোন মতানৈক্য পরিলক্ষিত হয়নি ।এছাড়া আরেকটি ঘটনা যা হযরত আয়েশা (রা:) ও ফাতেমা (রা:) এর মধ্যকার সহমর্মিতার দিকটিকে ফুটিয়ে তোলে।
ঘটনাটিতে প্রতীয়মান হযরত সাহাবায়ে কেরামের
মাঝে কোন প্রকার হীনমন্যতা ছিল না। তাঁর পরস্পরের প্রতি নেহায়েত বন্ধু মনোভাবাপন্ন ছিলেন । সহীহ বুখারীতে উল্লেখ আছে --
অর্থাৎঃঃ ইবনে আবী লায়লা বলেন, আলী মুরতাজা (রা:) আমাকে বলেন, যাঁরা পেষতে পেষতে হযরত ফাতেমা (রা:) এর হাতে ফোস্কা পড়ে গিয়েছিল । তিনি নবী কারীম (সা:) এর খেদমতে এসে দেখলেন তিনি বাড়ীতে নেই । হযরত ফাতেমা (রা:) উম্মৎ জননী হযরত আয়েশা (রা:) এর কাছে তার আগমন হেতুটি বর্ণনা করলেন। নবী কারীম (সা:) এর তাশরীফ আনলে
হযরত আয়েশা (রা:) তাঁর পক্ষে জরুরতটি রাসূলুল্লাহ (সা:) এর কাছে তুললেন। রাসূলুল্লাহ (সা:) তৎক্ষণাৎ হযরত ফাতেমা (রা:) এর বাড়ীতে তাশরীফ নিয়ে গেলেন। ওই সময় আমরা শোয়া
ছিলাম। হুযুর (সা:) এর আগমনি জেনে আমরা উঠতে লাগলে 'তোমরা স্বস্হানে শুয়ে থাকো ' বলে তিনি আমাদের মাঝে বসে গেলেন। তাঁর পা
মোবারক আমার বক্ষ ছুঁয়েছিল। তিনি বললেন,
তোমরা আমার কাছে যা চেয়েছ তার চেয়ে উত্তম
জিনিস আমি তোমাদেরকে বাতলে দিচ্ছি (যা খাদেমের চেয়ে ভাল )। তোমরা যখন ঘরে প্রবেশ
তরবে তখন ৩৪ বার আল্লাহু আকবার ,৩৩ বার সোবহানাল্লাহ ও ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ পড়বে। উপরোক্ত হাদীস দ্বারা প্রতীয়মান হচ্ছে তাদের
প্রকৃতি ও চরিত্রে কোন হীনমন্যতা ও নোংরামি ছিলনা । পরস্পরে তাঁরা ছিলেন মিত্রসূলভ,সহমর্মী
ও হিতাকাংখী ।হিংসা, দ্বেষ ও মনোমালিন্য থেকে
তাঁদের হৃদয় ছিল স্বচ্ছ । ঘৃণা ও শীতলযুদ্ধ ছিল
না তাঁদের মাঝে ।
এখানে আরো একটি বিষয় জেনে রাখা ভাল যে ,
উক্ত তাসবীহকে 'তাসবীহে ফাতেমী' বলে। সৌভাগ্যবান মুসলমানেরা এই তাসবীহ সর্বদা তাদের মুখে জারী রাখে । নবীগৃহ থেকেে এই তাসবীহ সর্বকালের সকল মুসলমানের গৃহে জারী
থাকা দরকার যাতে ঐশী বরকতে সকলে বিমোহিত হতে পারে। তাছাড়া ওলামায়ে কেরাম বলেন , যে লোক রাতে শুতে গিয়ে উক্ত তাসবীহ
সূরা ইখলাসহকারে পড়ে ঘুমাবে তাদের ওই দানকার সকল দৈহিক গোনাহ মাফ করে দেওয়া হবে ।
৪। হযরত ফাতেমা (রা:) এর হযরত আয়েশা (রা:) এর কাছে গুরুত্বপূর্ন রহস্য প্রকাশ ।
এখানে আমরা এমন একটি রেওয়ায়েত পেশ করব যাতে দেখা যাবে হযরত ফাতেমা (রা:) ইসলামের গুরুত্বপূর্ন একটি রহস্য হযরত আয়েশা
(রা:) এর কাছে ফাঁস করেছেন। যেটি হযরত আয়েশা (রা:) এর মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ অবগত
হতে পেরেছে। হাদীসটির ভাষ্য মুসলিম শরীফে বিদ্যমান ।
"হযরত মাসরূক উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা:)
থেকে বর্ণনা করেন, একদা নবী করীম (সা:) এর কাছে সকল উম্মৎ জননী উপস্হিত ছিলেন । এ
সময় হযরত ফাতেমা (রা:) তাশরীফ আনলেন।
তার ওঠাবসা ও চাল -চলন তার (মহান) বাবার মতই ছিল । তিনি হযরত ফাতেমা (রা:) কে দেখে
স্বাগত জানিয়ে পাশটিতে বসালেন। তাঁর কানে
রাসূলুল্লাহ (সা:) অনুচ্চস্বরে একটি কথা বলতেই তিনি অবলীলায় কেঁদে দিলেন। তাঁর উদ্বিগ্নতা দেখে প্রিয়নবী (সা:) আবার তাঁর কানে অনুচ্চস্বরে আরেকটি কথা বললেন। এবার হযরত ফাতেমা হেসে ওঠলেন । হযরত আয়েশা (রা:) বলেন, আমি ফাতেমা (রা:) কে বললাম, গোপন কথা
জানানোর জন্য উম্মৎ জননীদের বাদ দিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা:) আপনাকেই নির্বাচন করলেন আর আপনি কেঁদে দিলেন ? রাসূলুল্লাহ (সা:) মজলিস ছেড়ে উঠে গেলে আমি ফাতেমা (রা:) কে
জিজ্ঞাসা করলাম, কি সেই গোপন কথা যা রাসূলুল্লাহ (সা:) আপনাকে বলেছেন? হযরত ফাতেমা (রা:) বললেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) এর গোপন রহস্য আমি ফাঁস করতে চাচ্ছি না। নবী
করীম (সা:) ইন্তেকাল করলে (হযরত আয়েশা (রা:) বলেন, আমি ফাতেমাকে জিজ্ঞাসা করলাম,
ওই অধিকার যা আপনার প্রতি আমার আছে ( অর্থাৎ আমি আপনার মা আর আপনি আমার মেয়ে হিসেবে )কসম দিয়ে বলছি, কি সেই গোপন রহস্য যা প্রিয়নবী (সা:) আপনার কানে কানে
বলেছিলেন? হযরত ফাতেমা (রা:) বললেন, হ্যা ?
এখন আমি বলব । বোধকরি এবলায় তেমন কোনও বাধা নেই। হযরত ফাতেমা (রা:) বললেন,
প্রথম বারের কানাকানিতে রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছিলেন, জিবরাঈল আমাকে বললোন, আমার মৃত্যুর সময় আসন্ন। কাজেই ফাতেমা ! তোমাকে
ধৈর্য ধারণ করতে হবে এবং আল্লাহকে ভয় করতে হবে। আমি তোমার জন্য উত্তম অগ্র -অভিভাবক হব। এ কথা শুনে আমি কাঁদলাম - যেমনটা আপনি (তখন) দেখেছিলেন। পরে আমার উদ্বিগ্নতা ও অস্হিরতা দেখে রাসূলুল্লাহ (সা:) দ্বিতীয় বার বললেন, ফাতেমা ! তুমি কী এতে খোশ হবে না যে, তুমি মোমেন নারীদের সর্দার হবে? কিংবা এই উম্মতের নারীকুলের সর্দার হবে? এ কথা শুনে আমি হাসলাম যেমনটা আপনি (তখন ) দেখেছিলেন। পাঠক? লক্ষ্য করুন হযরত
ফাতেমা (রা:) এর এই সুবিশাল মর্যাদা যা হযরত আয়েশা (রা:) এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে ; তা শীয়াদের পন্ডিতমনা লেখক, ওলামা ও মুজতাহিদবৃন্দের নির্ভরযোগ্য লেখনীতেও ঠাঁই পেয়েছে । অবশ্য তাদের লেখার মাঝে কিছু শাব্দিক পার্থক্য থাকলেও মূল মর্ম একই। কলেবর বৃদ্ধির আশংকায় আমরা সেসব বর্ণনা থেকে বিরত রইলাম । বর্ণনাগুলোয় শীয় মুজতাহিদবৃন্দ যেহেতু কোন সমালোচনা করেননি সেহেতু একে সুদৃঢ় দলীল বলা যায়।
সার -সংক্ষেপঃ
উপরিউক্ত সর্বজনস্বীকৃত বর্ণনাসমূহ দ্বারা প্রতীয়মান হচ্ছে --
১। নবী করীম (সা:) এর সাহেবযাদী ও তাঁর স্ত্রীগণের মাঝে তাঁর জীবদ্দশায় যেভাবে যাতায়াত ছাল সেভাবে তাঁর মৃত্যুর পরেও পরস্পরের মাঝে ওঠাবসা ছিল।
২। এই পুতঃপবিত্রা ইতিহাসখ্যাত মহিয়সী নারীদের মাঝে পারস্পারিক সৌহার্দ,সম্প্রীতি, রাসূলুল্লাহ (সা:) এর যুগে ও তাঁর পরবর্তিতেও বহাল ছিল ।
৩। ফাতেমা (রা:) ও রাসূলুল্লাহ (সা:) এর মধ্যকার
গুপ্ত রহস্য হযরত আয়েশা (রা:) এর কাছে এতই মর্যাদাকর ও গুরুত্ববহ ছিল যে, প্রিয়নবী (সা:) এর
ইন্তেতালের পরে কসম খেয়ে তাঁকে ফাতেমা (রা:) থেকে এই রহস্য উদ্ঘাটন করতে হয়েছিল । হযরত
ফাতেমা (রা:) এর মহান ফযিলতটি কিয়ামত পর্যন্ত আগত উম্মতের জন্য প্রচারের দায়িত্বটি নেন কিন্তু আবূ বকর (রা:) তনয়া হযরত আয়েশা সিদ্দীকাই (রা:) ।
যেতে পারে । বিশেষ করে সিদ্দীকি খান্দানের লোকজনের সাথে নবী পরিবারের সদস্যদের মধ্যকার তথাকথিত টানাপড়েন,ঝগড়া -বিবাদ ও
মনোমালিন্যের যে বিষয়গুলো নিয়ে অনেকেই সোচ্চার তার কিঞ্চিত খতিয়ান নিচে ফুটিয়ে তোলা
হচ্ছে ।
১। হযরত আয়েশা (রাঃ ) এর মুখে খাতুনে জান্নাতের গুন -কীর্তন
সর্বাগ্রে আমরা উম্মৎ জননী ও সিদ্দীক তনয়া হযরত আয়েশা (রাঃ) এর পবিত্র মুখনিঃসৃত গুণ -কীর্তন শুনব যা তিনি খাতুনে হান্নাত সম্পর্কে করেছেন । হাদীস, ইতিহাস ও চরিত্রবিষয়ক কিতাবসমূহে এ বিষয়ে ভূড়ি ভূড়ি আলোচনা বিদ্যমান। এখানে উদাহরণস্বরূপ আমরা হাকেম নিশাপুরী (রহ:)-এর 'মুস্তাদরাক' ও ইবনে আব্দুল বার (রহ:) এর 'আল -ইস্তিয়াব ' কিতাবের
বর্ণনা টানব --
"উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রাঃ ) থেকে বর্ণিত, রাসূলের অনুরূপ কথাবার্তা ও বাচনভঙ্গিতে ফাতেমা (রা:) -এর মত আমি আর কাউকে দেখিনি। নবী করীম (স:) তাঁর কাছে এলে তিনি সসম্মানে উঠে দাঁড়াতেন , তাঁকে চুমো দিতেন এবং স্বাগত জানাতেন । এমনিভাবে হযরত ফাতেমা (রা:) ও নবী করীম (সা:) এর কাছে এলে তিনিও অনুরূপ করতেন" ।
হযরত আয়েশা (রা:) বলেন, ফাতেমা (রা:) এর
মত সত্যবাক আর কাউকে দেখিনি আমি। তবে
তাঁর বাবা রাসূল (সা:) এ থেকে ভিন্ন ' ।
বিখ্যাত শীয়া আলেম শায়খ আব্বাস কুমীও তাঁর 'মুনতাহাল মাআল" শীর্ষক গ্রন্হে আয়েশা
(রা:) এর সূত্রে হুবহু উক্ত রেওয়ায়েত তুলে ধরেছেন ।
আবূ নাঈম ইস্পাহানী (রা:) বর্ণনা করেনঃ
"হযরত আয়েশা (রা:) বলেন, তাঁর বাবা বিনে
ফাতেমা (রা:) এর মত সত্যবাক আমি কাউকে দেখিনি '।
আল্লামা হায়ছামী (রহ:) ও ইবনে হাজার আসকালানী (রহ:) নকল করেনঃ
রাসূল (সা:) ছাড়া ফাতেমার
চেয়ে সেরা আর কেউ নেই "।
হযরত আয়েশা (রা:) উপরোক্ত কথিকাসমূহ দ্বারা
স্বতঃই প্রতীয়মান হচ্ছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা:) এর
পবিত্রা স্ত্রীগণ ও তাঁর কন্যাবৃন্দের মাঝে
সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক অন্য যে কারো তুলনায় অধিকই ছিল।
২। আয়েশা (রা:) -কে ভালবাসোঃ রাসূলের নির্দেশ ফাতিমার প্রতি
এবার আমরা একটি হাদীস বর্ণনা করব যাতে দেখা যাবে রাসূলুল্লাহ (সা:) হযরত ফাতোমা (রা:)
কে নির্দেশ করেছেন যেন তিনি আয়েশা (রা:) কে মুহাব্বত করেন । বর্ণনাটি সহীহ মুসলিমের।
ইমাম নাসাঈও ঘটনাটি বর্ণনা করেন সামান্য শাব্দিক পার্থক্যসহকারে --
"উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা:) বলেন, (একবার )
উম্মৎ জননীগণ হযরত ফাতেমা (রা:) কে রাসূলুল্লাহ (সা:) -এর কাছে এসে প্রবেশানুমতি চাইলেন । এ সময় রাসূলুল্লাহ (সা:) বিশ্রাম নিচ্ছলেন। অনুমতি পেয়ে হযরত ফাতেমা ভেতরে প্রবেশ করে বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! উম্মৎ জননীগণ আবূ বকর (রা:) এর মেয়ে ও তাঁদের মাঝে মহব্বত ও হাদীয়া -তোহফার ব্যাপারে সমতা
বিধানের ব্যাপারে কিছু বলতে আমাকে আপনার
কাছে প্রেরণ করেছেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমি চুপচাপ তাঁর কথা শুনছিলাম। নবী করীম (সা:) বললেন,প্রিয় বৎস ! আমি যার সাথে
মহব্বত রাখি তুমি তাঁর সাথে মহব্বত রাখবে না?
হযরত ফাতেমা (রা:) বললেন, জ্বী হ্যাঁ! (মুহবাবত রাখব) । রাসূলুল্লাহ (সা:) বললেন, তাহলে আয়েশার সাথে মহব্বত রাখবে। হযরত ফাতেমা
(রা:) এ কথা শুনে বেরিয়ে গেলেন । উম্মৎ জননীদের কাছে গিয়ে সব কথা তুলে ধরলেন। জননীগণ বললেন,তুমি আমাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে কথা বলোনি। যাও রাসূলুল্লাহ (সা:) এর কাছে আবার যাও । ফাতেমা (রা:) জবাবে বললেন, আল্লাহর কসম! আমি এ কথার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা:) এর কাছে আর কখনো যাব না,
কিছু বলব না। বর্ণনায় মুসলিম ও নাসাঈ।
উক্ত বর্ণনা দ্বারা প্রতিভাত হচ্ছে যে, পূর্বের কিছু বর্ণনায় যেভাবে আয়েশা (রা:) এর ভাষ্যে ফাতেমা (রা:) এর গুণকীর্তণ ও স্তুতি বন্দনা ফুটে উঠেছে সেভাবে এখানে খোদ ফাতেমা (রা:) এর ভাষ্যে উম্মৎ জননী আয়েশার প্রশংসা ও মাহাত্ম্য উঠে এসেছে । এটি সত্যিই তাদের চমৎকার আন্তরিকতা ও বোঝাপড়ার দলিল । হৃদ্যতা ও সৌহার্দের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন। তাছাড়া উম্মুল
মুমিনীনদের প্রতি হযরত ফাতেমা (রা:) এর ভক্তি
শ্রদ্ধা তো ছিলই এরপর তাঁর প্রতি রাসূলের নির্দেশে হযরত আয়েশার (রা:) প্রতি তাঁর অগাধ
শ্রদ্ধা আরো বেড়ে যায় এবং মহব্বত ওয়াজিব হয়ে
দাঁড়ায় -নয় কি! আল্লাহর প্রিয় হাবীবের প্রিয়তমার প্রতি হযরত ফাতেমা (রা:) অতি অবশ্যই মহব্বত,
আন্তরিকতা ও সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক থাকবে এটাই
স্বাভাবিক। এতে কারো সন্দেহ থাকার কথা নয়।
৩। হযরত আয়েশা (রা:) ও ফাতেমা (রা:) এর পারস্পারিক আস্হা ও গ্রহণযোগ্যতা
হযরত আয়েশা (রা:) ও আলী -ফাতেমা (রা:) দম্পতির মধ্যকার পারস্পরিক আস্হা ও নির্ভরতা ছিল খুবই প্রগাঢ়। শরয়ী মাসয়ালা মাসায়েল বিষয়ে তাদের একে অপরের ব্যাখ্যার প্রতি শ্রদ্ধা কত অমায়িক। মুসনাদে আহমাদ - এ 'হাদীসে ফাতেসা ' -উল্লেখ আছে --
"উম্মে সুলায়মান বলেন, আমি হযরত আয়েশা (রা:) এর কাছে গেলাম । তাঁর কাছে কুরবাণীর গোশতের মাসয়ালা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) প্রথমে গোশত খেতে নিষেধ করেছিলেন, পরে অবশ্য ভক্ষণেন অনুমতি দায়েছেন। (কারন এই যে ) হযরত আলী (রা:) একবার সফর থেকে বাড়ী এলে ফাতেমা (রা:) তাঁকে কুরবাণীর গোশত খেতে দিলেন। হযরত আলী (না:) বললেন, নবী কারীম (সা:) কুরবাণীর
গোশত খেতে নিষেধ করেননি? হযরত ফাতেমা (রা:) বললেন, নবী করীম (সা:) এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে খাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন । হযরত আলী (রা:) রাসূলুল্লাহ (সা:) এর কাছে ব্যাপারটি আরজ করলে তিনি বললেন, এখন থেকে সর্বদার জন্য তোমরা কোরবানির গোশত ভক্ষণ করে যেতে পার। উক্ত ঘটনা নমুনাস্বরূপ পেশ করা হল দেখা গেল শরয়ী ব্যাখ্যায় তাঁর সহমতের অধিকারী । এতে তাদের মাঝে কোন মতানৈক্য পরিলক্ষিত হয়নি ।এছাড়া আরেকটি ঘটনা যা হযরত আয়েশা (রা:) ও ফাতেমা (রা:) এর মধ্যকার সহমর্মিতার দিকটিকে ফুটিয়ে তোলে।
ঘটনাটিতে প্রতীয়মান হযরত সাহাবায়ে কেরামের
মাঝে কোন প্রকার হীনমন্যতা ছিল না। তাঁর পরস্পরের প্রতি নেহায়েত বন্ধু মনোভাবাপন্ন ছিলেন । সহীহ বুখারীতে উল্লেখ আছে --
অর্থাৎঃঃ ইবনে আবী লায়লা বলেন, আলী মুরতাজা (রা:) আমাকে বলেন, যাঁরা পেষতে পেষতে হযরত ফাতেমা (রা:) এর হাতে ফোস্কা পড়ে গিয়েছিল । তিনি নবী কারীম (সা:) এর খেদমতে এসে দেখলেন তিনি বাড়ীতে নেই । হযরত ফাতেমা (রা:) উম্মৎ জননী হযরত আয়েশা (রা:) এর কাছে তার আগমন হেতুটি বর্ণনা করলেন। নবী কারীম (সা:) এর তাশরীফ আনলে
হযরত আয়েশা (রা:) তাঁর পক্ষে জরুরতটি রাসূলুল্লাহ (সা:) এর কাছে তুললেন। রাসূলুল্লাহ (সা:) তৎক্ষণাৎ হযরত ফাতেমা (রা:) এর বাড়ীতে তাশরীফ নিয়ে গেলেন। ওই সময় আমরা শোয়া
ছিলাম। হুযুর (সা:) এর আগমনি জেনে আমরা উঠতে লাগলে 'তোমরা স্বস্হানে শুয়ে থাকো ' বলে তিনি আমাদের মাঝে বসে গেলেন। তাঁর পা
মোবারক আমার বক্ষ ছুঁয়েছিল। তিনি বললেন,
তোমরা আমার কাছে যা চেয়েছ তার চেয়ে উত্তম
জিনিস আমি তোমাদেরকে বাতলে দিচ্ছি (যা খাদেমের চেয়ে ভাল )। তোমরা যখন ঘরে প্রবেশ
তরবে তখন ৩৪ বার আল্লাহু আকবার ,৩৩ বার সোবহানাল্লাহ ও ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ পড়বে। উপরোক্ত হাদীস দ্বারা প্রতীয়মান হচ্ছে তাদের
প্রকৃতি ও চরিত্রে কোন হীনমন্যতা ও নোংরামি ছিলনা । পরস্পরে তাঁরা ছিলেন মিত্রসূলভ,সহমর্মী
ও হিতাকাংখী ।হিংসা, দ্বেষ ও মনোমালিন্য থেকে
তাঁদের হৃদয় ছিল স্বচ্ছ । ঘৃণা ও শীতলযুদ্ধ ছিল
না তাঁদের মাঝে ।
এখানে আরো একটি বিষয় জেনে রাখা ভাল যে ,
উক্ত তাসবীহকে 'তাসবীহে ফাতেমী' বলে। সৌভাগ্যবান মুসলমানেরা এই তাসবীহ সর্বদা তাদের মুখে জারী রাখে । নবীগৃহ থেকেে এই তাসবীহ সর্বকালের সকল মুসলমানের গৃহে জারী
থাকা দরকার যাতে ঐশী বরকতে সকলে বিমোহিত হতে পারে। তাছাড়া ওলামায়ে কেরাম বলেন , যে লোক রাতে শুতে গিয়ে উক্ত তাসবীহ
সূরা ইখলাসহকারে পড়ে ঘুমাবে তাদের ওই দানকার সকল দৈহিক গোনাহ মাফ করে দেওয়া হবে ।
৪। হযরত ফাতেমা (রা:) এর হযরত আয়েশা (রা:) এর কাছে গুরুত্বপূর্ন রহস্য প্রকাশ ।
এখানে আমরা এমন একটি রেওয়ায়েত পেশ করব যাতে দেখা যাবে হযরত ফাতেমা (রা:) ইসলামের গুরুত্বপূর্ন একটি রহস্য হযরত আয়েশা
(রা:) এর কাছে ফাঁস করেছেন। যেটি হযরত আয়েশা (রা:) এর মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ অবগত
হতে পেরেছে। হাদীসটির ভাষ্য মুসলিম শরীফে বিদ্যমান ।
"হযরত মাসরূক উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা:)
থেকে বর্ণনা করেন, একদা নবী করীম (সা:) এর কাছে সকল উম্মৎ জননী উপস্হিত ছিলেন । এ
সময় হযরত ফাতেমা (রা:) তাশরীফ আনলেন।
তার ওঠাবসা ও চাল -চলন তার (মহান) বাবার মতই ছিল । তিনি হযরত ফাতেমা (রা:) কে দেখে
স্বাগত জানিয়ে পাশটিতে বসালেন। তাঁর কানে
রাসূলুল্লাহ (সা:) অনুচ্চস্বরে একটি কথা বলতেই তিনি অবলীলায় কেঁদে দিলেন। তাঁর উদ্বিগ্নতা দেখে প্রিয়নবী (সা:) আবার তাঁর কানে অনুচ্চস্বরে আরেকটি কথা বললেন। এবার হযরত ফাতেমা হেসে ওঠলেন । হযরত আয়েশা (রা:) বলেন, আমি ফাতেমা (রা:) কে বললাম, গোপন কথা
জানানোর জন্য উম্মৎ জননীদের বাদ দিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা:) আপনাকেই নির্বাচন করলেন আর আপনি কেঁদে দিলেন ? রাসূলুল্লাহ (সা:) মজলিস ছেড়ে উঠে গেলে আমি ফাতেমা (রা:) কে
জিজ্ঞাসা করলাম, কি সেই গোপন কথা যা রাসূলুল্লাহ (সা:) আপনাকে বলেছেন? হযরত ফাতেমা (রা:) বললেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) এর গোপন রহস্য আমি ফাঁস করতে চাচ্ছি না। নবী
করীম (সা:) ইন্তেকাল করলে (হযরত আয়েশা (রা:) বলেন, আমি ফাতেমাকে জিজ্ঞাসা করলাম,
ওই অধিকার যা আপনার প্রতি আমার আছে ( অর্থাৎ আমি আপনার মা আর আপনি আমার মেয়ে হিসেবে )কসম দিয়ে বলছি, কি সেই গোপন রহস্য যা প্রিয়নবী (সা:) আপনার কানে কানে
বলেছিলেন? হযরত ফাতেমা (রা:) বললেন, হ্যা ?
এখন আমি বলব । বোধকরি এবলায় তেমন কোনও বাধা নেই। হযরত ফাতেমা (রা:) বললেন,
প্রথম বারের কানাকানিতে রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছিলেন, জিবরাঈল আমাকে বললোন, আমার মৃত্যুর সময় আসন্ন। কাজেই ফাতেমা ! তোমাকে
ধৈর্য ধারণ করতে হবে এবং আল্লাহকে ভয় করতে হবে। আমি তোমার জন্য উত্তম অগ্র -অভিভাবক হব। এ কথা শুনে আমি কাঁদলাম - যেমনটা আপনি (তখন) দেখেছিলেন। পরে আমার উদ্বিগ্নতা ও অস্হিরতা দেখে রাসূলুল্লাহ (সা:) দ্বিতীয় বার বললেন, ফাতেমা ! তুমি কী এতে খোশ হবে না যে, তুমি মোমেন নারীদের সর্দার হবে? কিংবা এই উম্মতের নারীকুলের সর্দার হবে? এ কথা শুনে আমি হাসলাম যেমনটা আপনি (তখন ) দেখেছিলেন। পাঠক? লক্ষ্য করুন হযরত
ফাতেমা (রা:) এর এই সুবিশাল মর্যাদা যা হযরত আয়েশা (রা:) এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে ; তা শীয়াদের পন্ডিতমনা লেখক, ওলামা ও মুজতাহিদবৃন্দের নির্ভরযোগ্য লেখনীতেও ঠাঁই পেয়েছে । অবশ্য তাদের লেখার মাঝে কিছু শাব্দিক পার্থক্য থাকলেও মূল মর্ম একই। কলেবর বৃদ্ধির আশংকায় আমরা সেসব বর্ণনা থেকে বিরত রইলাম । বর্ণনাগুলোয় শীয় মুজতাহিদবৃন্দ যেহেতু কোন সমালোচনা করেননি সেহেতু একে সুদৃঢ় দলীল বলা যায়।
সার -সংক্ষেপঃ
উপরিউক্ত সর্বজনস্বীকৃত বর্ণনাসমূহ দ্বারা প্রতীয়মান হচ্ছে --
১। নবী করীম (সা:) এর সাহেবযাদী ও তাঁর স্ত্রীগণের মাঝে তাঁর জীবদ্দশায় যেভাবে যাতায়াত ছাল সেভাবে তাঁর মৃত্যুর পরেও পরস্পরের মাঝে ওঠাবসা ছিল।
২। এই পুতঃপবিত্রা ইতিহাসখ্যাত মহিয়সী নারীদের মাঝে পারস্পারিক সৌহার্দ,সম্প্রীতি, রাসূলুল্লাহ (সা:) এর যুগে ও তাঁর পরবর্তিতেও বহাল ছিল ।
৩। ফাতেমা (রা:) ও রাসূলুল্লাহ (সা:) এর মধ্যকার
গুপ্ত রহস্য হযরত আয়েশা (রা:) এর কাছে এতই মর্যাদাকর ও গুরুত্ববহ ছিল যে, প্রিয়নবী (সা:) এর
ইন্তেতালের পরে কসম খেয়ে তাঁকে ফাতেমা (রা:) থেকে এই রহস্য উদ্ঘাটন করতে হয়েছিল । হযরত
ফাতেমা (রা:) এর মহান ফযিলতটি কিয়ামত পর্যন্ত আগত উম্মতের জন্য প্রচারের দায়িত্বটি নেন কিন্তু আবূ বকর (রা:) তনয়া হযরত আয়েশা সিদ্দীকাই (রা:) ।
Subscribe to:
Posts (Atom)