Saturday, 25 May 2019

প্রসঙ্গ হযরত আলীর বায়াতঃ দৃষ্টিভঙ্গি ওলামায়ে কেরামের

হযরত আলী (রা:) এর বায়াতে বিলম্বজনিত যে বক্তব্য আল্লামা যুহরী দিয়েছেন। এদের কিছু উদ্ধতি এক্ষণে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করব।
 এক.
বিদগ্ধ মুহাদ্দিস দিকপাল ইমাম বায়হাকী তার 'সুনানে কোবরা ' শীর্ষক গ্রন্হে বলেন -
"যুহরীর (যিনি একজন মহান তাবেয়ী)  এ ভাষ্য যে, সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর হাতে বায়াত হতে হযরত আলী (রা:) ফাতেমা (রা:) এর মৃত্যুঅবধি যে দেরী করেছেন তা সনদের দৃষ্টিকোণ থেকে মুনকাতি (বিচ্ছিন্ন)। পক্ষান্তরে সকীফায়ে বনী সায়েদার ঘটনায় বর্ণিত আবূ সাঈদ খুদরী (রা:) এর বর্ণনা বিশেষ করে যখন সাধারণ মুসলমান যে ব্য়াত করেছিলেন তার সনদ মুত্তাসিল ও সহীহ।
এই ইমাম বায়হাকীই তার জগদ্বিখ্যাত আরেক কিতাব 'আল -ইতিকাদ' এ ব্যাপারটি আরো পরিস্কার করে উল্লেখ করেছেন। যেখানে তিনি বলেছেন,  'বিলম্বিত বায়াত' কথাটি খোদ ইমাম যুহরীর নিজস্ব বক্তব্য। এটি হযরত আয়েশা (রা:) এর বক্তব্য নয়। তাঁর ভাষ্য --
"হযরত আলী (রা:) সম্পর্কে বলা হয়,  তিনি সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর হাতে বায়াত হতে ৬ মাসদেরী করেছিলেন - তা যুহরীর বক্তব্য, হযরত আয়েশা (রা:) এর নয়। অনেকে এ কথাকে আয়েশা (রা:) এর কথা বলে চালিয়ে দিয়েছেন। মা'মার ইবনে রাশেদ এটি বিস্তারিত বর্ণনা করেন এবং বর্ধিত অংশকে যুহরীর বক্তব্য বলে মত ব্যক্ত করেন। আমরা আবূ সাঈদ খুদরী (রা:) বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ করেছি যার সাথে বিজ্ঞ মাগাযী লেখকগণ একমত পোষণ করেন যে, জনগণের
সাথে সাকীফার দিনেই হযরত আলী (রা:) বায়াত হয়েছিলেন"। 
শায়খুল ইসলাম হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ:) ফতহুল বারীতে খায়বার যুদ্ধের শেষ পর্বে বায়াত প্রসংগের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন -
"অর্থাৎঃ ইবনে হিব্বানসহ প্রমুখ ওলামায়ে কেরাম হযরত আবূ সাঈদ (রা:) এর ওই বর্ণনাকে বিশুদ্ধ (সহীহ) সাব্যস্ত করেছেন যাতে সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর হাতে হযরত আলী (রা:) কালবিলম্ব না করে জনতার সাথে দ্রুত বায়াত গ্রহণ করার কথা আছে। পক্ষান্তরে মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে যে, আল্লামা যুহীকে জিজ্ঞাহসা করা হয়েছিল, ফাতেমা (রা:) এর জীবদ্দশায় হযরত আলী (রা:) সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর হাতে বায়াত নেননি বুঝি?  যুহরী জবাবে বলেন, ফাতেমা (রা:) এর জীবদ্দশায় আলী (রা:) তো দূরে থাক বনি হাশেমেরও কেউ বায়াত নেননি। যুহরীর এই বক্তব্যকে ইমাম বায়হাকী দুর্বল সাব্যস্ত করেছেন।  এ জন্য যে, যুহরীর  এ ভাষ্য মজবুত ও নিরবচ্ছিন্ন  নয়। পক্ষান্তরে আবূ সাঈদ খুদরী (রা:)
এর সূত্র (পরিপক্করূপে প্রাপ্ত)  ও  নিরবচ্ছিন্ন সুতরাং যুহরীর ভাষ্যের চেয়ে ওই রেওয়ায়েত অধিক বিশুদ্ধ। 
  তিন:
ইমাম কস্তালানী তাঁর 'ইরশাদুস সারী' গ্রন্হে ফতহুল বারীর হুবহু সমালোচনা ও বিশ্লেষণটি তুলে ধরেন।
মোটকথা ইবনে হাজার আসকালানীর বিশ্লেষণকে আল্লামা কস্তালানী হুবহু সত্যায়ন করেছেন।  অর্থাৎ বায়হাকী একাই নন তার সাথে বহু ওলামা ও মোহাদ্দেস রয়েছেন।
 আল্লামা ইবনে কাছীর (রহ:) এর বিশ্লেষণ
উপরোক্ত নানা বিজ্ঞানের মতামত শেষে আমরা হাফেজ ইবনে কাছীরের একটি মত পেশ করছি। এর দ্বরা বায়াত প্রসংগটি পরিস্কার হয়ে আসবে। ইতোপূর্বে উদ্ধৃত এ বর্ণনাটি আমরা বিজ্ঞ পাঠকবর্গের পুনঃস্মরণের নিমিত্তে পেশ করছি --
"নবী করীম (সা:) মৃত্যুর ১দিন কিংবা ২দিনের মাথায় হযরত আলী (রা:) হযরত আবূ বকর (রা:)
এর হাতে বায়াত নিয়েছিলেন। এ কথাটিই সত্য।
কেননা --
১. হযরত আলী (রা:) হযরত আবূ বকর (রা:) থেকে কখনোই পৃথক হননি। পরামর্শদানে সর্বদা
নিকটেই থাকতেন।
২. আবূ বকর (রা:) এর পেছনে নামায পড়া থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন হননি। প্রতিটি নামাযেই তাঁর পেছনে একতেদা করতেন।
৩. মোরতাদবিরোধী অভিযানে সিদ্দীকে আকবার (রা:) খোলা তরবারী হাতে নিয়ে বেরুলে হযরত আলী (রা:) তাঁর সঙ্গ দেন।
উপরোক্ত সকল কথা এ কথার সত্যায়ন করে হযরত আলীর বায়াতটি ঝামেলাহীন ছিল। কোন প্রকার কালক্ষেপণ ছিল না। হযরত আলী (রা:) যদি দ্রুত বায়াত নাই নেবেন তাহলে মোরতাদবিরোধী অভিযানে সিদ্দীকে আকবারের সাথে তার বেরোনোর কী অর্থ থাকে ?
       আরেকটি বর্ণনা
বিলম্বিত বায়াতের ৬ মাসধর্মী বর্ণনা নিয়ে আমরা বিজ্ঞ ও খ্যাতিমান মুহাদ্দিসবৃন্দের কথা বর্ণনা করেছি। এক্ষণে বিলম্বহীন দ্রুত বায়াত প্রসংগে হযরত সাঈদ ইবনে যায়েদ (রা:) এর একটি ভাষ্য উল্লেখ করব। ভাষ্যটিতে প্রতীয়মান, সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর বায়াতে কোন সাহাবীই বিলম্ব করেন নি। বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন ইতিহাসবেত্তা ইবনে জারীর ত্ববারী --
"বর্ণনাটির সারকথা --
১. সাহাবী হযরত সাঈদ ইবনে যায়েদ (রা:) নবীজীর মৃত্যুর সময় উপস্হিত ছিলেন ।
২. সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর হাতে ওইদিন সমগ্র সাহাবীই বায়াত নিয়েছিলেন।
৩. আমীরহীন এক মুহুর্তও সাহাবায়ে কেরাম থাকতে পছন্দ করেননি। সুতরাং ৬ মাসের  প্রশ্ন এখানে অবান্তর।
৪. মুরতাদ বা ধর্মত্যাগী ছাড়া কেউই এ বিষয়টিতে বিরোধীতা করেন নি।
৫. দলাদলি ও বিশৃঙ্খলার হাত থেকে আল্লাহ তাআলা সাহাবায়ে কেরামকে হেফাজত করেছেন।
৬. মুহাজিরবৃন্দ দ্রুতই বায়াত হয়েছিলেন। বায়াত হওয়ার ক্ষেত্রে কেউই বিলম্ব করেননি।
৭. সাঈদ ইবনে যায়েদ (রা:) এর বর্ণনা হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা:) বর্ণনাকে সমর্থনপুষ্ট করে। 

No comments:

Post a Comment