ইতোপূর্বে খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতেমা (রা:) এর মুমূর্ষকালীন কথা জেনেছি। জেনেছি আবূ বকর (রা:) ও ওমর (রা:) নিখাদ সেবা ও দৌড়ঝাপের কথাও। এবার জানতে চেষ্টা করব মৃত্যুপরবর্তী জানাযা প্রসংগটি। জনসমাজে একটি কথা চাউর হয়ে আছে যে , খাতুনে জান্নাত ও হযরত আবূ বকর (রা:) এর মাঝে বৈরিতা ছিল। ছিল টানাপোড়েন। তিনি নাকি হযরত আলী (রা:) জীবনের শেষ মুহূর্তেও বলেছিলেন আবূ বকর (রা:) যেন আমার জানাযায় শরীক না হন। এ জন্য হযরত আলী (রা:) তড়িঘড়ি করে আঁধার রাতেই তাঁর দাফন কাফন সম্পন্ন করেন। আবূ বকর (রা:) কে তারা মৃত্যুর খবরটি পর্যন্ত দেননি।
জানাযার ব্যাপারটি কিছু বর্ণনার উপর ভিত্ত করে অতিশয় গুরুত্ব দেয়া হয়েছে । বিরোধী শিবিরটি সুচতুর ভাবে আম -জনতার মাঝে এই কথাটি ঢুকিয়ে দিয়েছে। তাদের প্রানান্তকর চেষ্টা ছিল, যে
কোন কিছুর বিনিময়ে খলীফা ও খাতুনে জান্নাতের মাঝের বিদ্বেষটি প্রতিষ্ঠিত করা । বিষয়টি একটু দীর্ঘ হলেও যেহেতু এটি আকীদানির্ভর সেহেতু বোধকরি পাঠক সমাজে বিরক্তিবোধ হবে না। প্রথমে আমরা 'মূল মাসয়ালা' মাঝে এই মাসয়ালার সমর্থনপুষ্ট শরয়ী নিয়ম -কানুন ও ঐতিহাসিক স্বাক্ষ্য পেশ করব। এরদ্বারা বনি হাশেমের নিরবচ্ছিন্ন আমলের প্রমাণটিও হয়ে যাবে।
"মূল মাসয়ালা'র বর্ণনাসমূহ
১, ইবনে সায়াদ বর্ণনা করেন -
"ইব্রাহীম নাখায়ী (রহ:) বর্ণনা করেন, হযরত ফাতেমা (রা:) এর জানাযা আবূ বকর (রা:) ই পড়ান । তিনি চার তাকবীরের সাথে তা পড়িয়েছিলেন।
২, ইবনে সায়াদের অপর একটি ভাষ্য --
"শাবী (রহ:) বলেন, ফাতেমা (রা:) এর জানাযা
হযরত আবূ বকর (রা:)ই পড়িয়েছিলেন ।
৩, ইমাম বায়হাকী স্ব -সনদে বর্ণনা করেন -
"হযরত ফাতেমা (রা:) মারা গেলে আলী (রা:) রাতারাতিই তাঁকে দাফন করেন। জানাযার মুহূর্তে আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) এর দু'হাত ধরে সামনে এগিয়ে দেন (ইমামতির জন্য) ।
৪, কানযুল উম্মাল প্রণেতা মুহাম্মাদ বাকেরের সুত্রে বর্ণিত রেওয়ায়েতকে খতীবের বরাতে বর্ণনা করে এভাবে -
"ইমাম জাফর সাদেক ইমাম মুহাম্মাদ বাকের (রহ:) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলতনয়া হযরত ফাতেমা (রা:) ইন্তেকাল করলে হযরত আবূ বকর (রা:) ও ওমর ফারুক (রা:) জানাযায় শরীক হন। হযরত আবূ বকর (রা:) আলী (রা:) কে জানাযা
পড়ানোর কথা বললে তিনি বলেন, আপনি আল্লাহর রাসূলের খলীফা। আপনার উপস্হিতিতে আমি জানাযা পড়াই কী করে ? সুতরাং আবূ বকর (রা:) অগ্রসর হয়ে জানাযা পড়ালেন।
৫, এবার দেখব ইমাম যাইনুল আবিদীন (রা:) এর একটি বর্ণনা । তাঁর ভাষ্যটি উপরোক্ত বিষয়কে আরো বিশ্লেষণধর্মী ও পরিচ্ছন্ন করে তুলবে --
অর্থঃ
জাফর সাদেক (রহ:) তাঁর বাবা মুহাম্মাদ বাকের (রহ:) থেকে, তিনি তাঁর পিতা ইমাম যাইনুল আবিদীন থেকে বর্ণনা করেন যে, মাগরিব ও ইশার মধ্যবর্তী সময়ে খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতেমা (রা:) ইন্তিকাল করেন। তাঁর মৃত্যুর কথা শুনে হযরত আবূ বকর ,ওমর, ওসমান, যুবায়ের ও আবদুর রহমান ইবনে আউফ রাযি আল্লাহু আনহুম প্রমুখ উপস্হিত হন। জানাযা নামাযের সময় হলে হযরত আলী (রা:) হযরত আবূ বকর (রা:) কে বললেন, হযরত! আগে বাড়ুন, নামাযটি পড়ান। আবূ বকর (রা:) জবাবে বললেন, আবূল হাসান!আপনার উপস্হিতিতে? (আমি নামায পড়াব! ) তিনি বললেন, আগে বাড়ুন! কসম খোদার! আপনি ছাড়া ফাতেমা (রা:) এর জানাযা আর কেউ পড়াবে না । শেষ পর্যন্ত আবূ বকর (রা:) ই জানাযা নামায পড়ালেন। রাতেই তাঁকে সমাহিত করা হলো।
সিরাজুল হিন্দ শাহ আবদুল আযীয মুহাদ্দিসে দেহলভী (রা:) 'তোহফায়ে ইছনা আশারিয়া' -এ সিদ্দীকের প্রতি ভর্ৎসনা অধ্যায়ের শেষে ফসলে খেতাবের সুত্রে বর্ণনা করেন যা ইমাম যাইনুল আবেদীনের উক্ত বর্ণনাটিকে সমর্থন করে -
"ফসলে খেতাবের লেখক উল্লেখ করেন, আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) , ওসমান (রা:) , আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা:) ও যুবায়ের ইবনুল আওয়াম (রা:) সহ সকল সাহাবী ইশার নামযে জড়ো হন। এদিকে ফাতেমা (রা:) এর শেষবিদায়টি এই সময়ের কিছু আগে পরে অনু্ষ্টিত হয় । মঙ্গলবারের ৩য় রমজানে তিনি মারা গিয়েছিলেন । প্রিয়নবী (সা:) এর তিরোধানের ৬ মাস পরে তিনি ইহলোক ছেড়েছিলেন। এ সময় ফাতেমা (রা:) এর বয়স ছিল মাত্র ২৮ । আলী (রা:) এর আর্জি মোতাবেক আবূ বকর (রা:) জানাযায় ইমামতি করেছিলেন। নামাযটি ছিল তাঁর ৪ তকবীরের সাথে।
৬, হাফেজ আবূ নাঈম ইস্পাহানী (রহ:) স্ব -সনদে হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) এর সূত্রে বর্ণনা করেন
"হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণনা করেন, নবী করিম (সা:) এর সমীপে একটি জানাযা এলে সেখানে জানাযাটি চার তকবীরের সাথে আদায় করে বললেন, ফেরেশতারা আদম (আ:) এর জানাযায়ও ৪ তাকবীর দিয়েছিলেন । ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন, আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) ফাতেমা (রা:) এর জানাযায় ৪ তাকবীর দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ওমর (রা:) হযরত আবূ বকর (রা:) এর জানাযায়ও ৪ তাকবীর দিয়েছিলেন। এদিকে হযরত সুহায়ব (রা:) হযরত ওমর (রা:) এর জানাযায়ও ৪ তাকবীর দিয়েছিলেন ।"
সার -সংক্ষেপঃ
জানাযা সম্পর্ক আমরা মোটামুটি ৬টি বর্ণনা সন্নিবেশ করেছি। তন্মধ্যে ৩টি বর্ণনা হাশেমীদের
(নবী বংশ) আবার তিনটি অ -হাশেমীদের । হাশেমী বর্ণনাকার যথাক্রমে ইমাম বাকের (রা:) , ইমাম যায়নুল আবেদীন (রা:) ও হযরত আব্দুল্লাহ
ইবনে আব্বাস (রা:) । উপরিউক্ত রেওয়ায়েতসমূহের সারকথা নিম্নরুপ --
১। হযরত ফাতেমা (রা:) এর শোকাবহ ঘটনার খবর বড় বড় সাহাবাদের মনে যথেষ্ট চোট দিয়েছিল। তার এই খবর কারো কাছেই গোপন ছিলনা । খলীফা আবূ বকর (রা:) ও তাঁর স্ত্রী আসমা (রা:) এর কাছে তো নয়ই। কারণ তিনি তাঁর সেবায় রত ছিলেন।
২। খাতুনে জান্নাতের ইন্তেতালের পর সকলেই বিশেষ করে খলীফা ও ফারুক আযম সাহাবাসমেত উপস্হিত ছিলেন । জানাযাবিষয়ে
আলীর (রা:) এর সাথে তাঁদের অনেক কথাও হয়েছিল । জানাযা পড়ানোর সৌভাগ্য কে অর্জন করবেন তা নিয়েও যথেষ্ট কথা হয়েছিল । খলীফা
ও খাতুনে জান্নাতের স্বামী দীর্ঘ আলাপ শেষে সিদ্ধান্ত নিলেন আবূ বকর (রা:) ই জানাযা পড়াবেন । বড় বড় সাহাবা ও হাশেমী বুযুর্গদের সিদ্ধান্তেই তাঁকে জানাযাটি পড়াতে হয়েছিল ।
এরদ্বারা আরো একটি বিষয় প্রতীয়মান হলো যে,
খলীফার জীবদ্দশায় অন্য কারো যে কোনও নামাযের ইমামতি চলবে না। চাই তা ওয়াক্তিয়া,জুমুআ,পাঞ্জেগানা কিংবা জানাযা নামাযই হোক না কেন ।
৩। তৃতীয় যে বিষয়টি প্রতিভাত হলো যে, আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) জানাযার নামায পড়িয়েছিলেন এবং তা চার তাকবীরের সাথেই পড়েছিলেন । এমনকি আরো একটি বিষয় জানা গেল, আদম (আ:) এর জানাযাও ৪ তাকবীরের সাথে পড়া হয়েছিল ।
সুধী পাঠকসমাজের জ্ঞাতার্থে এখানে আরেকটি বিষয় জানিয়ে রাখতে চাই যে, হযরত আলী (রা:)
শাহাদাত বরণ করলে হযরত হাসান (রা:) তাঁর জানাযা পড়িয়েছিলেন । সেখানে ৪ দাকবীর ছিল। ১. এমনকি হযরত আলী (রা:) এর মাতা ফাতেমা বিনতে আসাদ (রা:) ইন্তেকাল করলে নবী করীম
(সা:) তাঁর জানাযায়ও ৪ তাকবীর দিয়েছিলেন । ২- আলহামদু সকল বড় মানুষের জানাযায় দেখা
যাচ্ছে তাকবীর ৪ টিই ছিল। পাঁচ তাকবীর এদের কারো জানাযায়ই দেয়া হয়নি ।
৪। হযরত আলী (রা:) ফাতেমা (রা:) এর জানাযা আঁধার রাতেই সম্পন্ন করেছিলেন। ইসলামী আইনেও একথাটি সর্বজনবিদিত যে, মানুষ মারা যাওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব তাঁকে দাফন করতে হবে । হযরত ফাতেমা (রা:) যেহেতু মাগরীব ও ইশার মাঝখানে মারা যান। সুতরাং রাতারাতি তাঁর দাফনটি জরুরী ছিল । খাতুনে জান্নাতের জানাযা
পর্দাসহকারে করার ওসিয়ত ছিল। এ জন্য রাতেই
তাঁকে দাফন করা । সুতরাং রাতে দাফন করার উদ্দেশ্য আবূ বকর ও ওমর (রা:) কে জানাযা থেকে বঞ্চিত করার জন্য হতে পারে না।
No comments:
Post a Comment