Sunday, 30 June 2019

আমার পিঠে উঠে পাইপটি লাগান

মসজিদে নববীতে যাবার পথে হযরত আব্বাস (রা:) এর বাসা ছিল। ওই বাসার বৃষ্টির পানি পড়ার একটি নালা থেকে রাস্তায় পানি পড়ত। এরপর  মসজিদে যাবার পথে হযরত ওমর (রা:) এর গায়ের কাপড় নষ্ট হল। তিনি পানির ওই নালা উঠিয়ে দেবার নির্দেশ করলেন। হযরত আব্বাস (রা:) এতে আপত্তি তুললেন, প্রতিবাদ জানালেন। মুসনাতে আহমাদের ভাষ্য --
 "হযরত আব্বাস (রা:) এর পুত্র উবায়দুল্লাহ যিনি আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) এর ভাই বলেন, মসজিদে যে পথে খলীফা ওমর (রা:) যাতায়াত করতেন সে পথে আমাদের আব্বা আব্বাস (রা:) এর বাড়ীর একটি পাইপ লাগানো ছিল। একবার হযরত ওমর (রা:) জুমুআর নামাযের উদ্দেশে মসজিদে নববীতে রওয়ানা হলেন। এদিকে হযরত আব্বাস (রা:) ছাদে দুটি চ্যাগা পাখি জবাই করছিলেন। পাইপের নল দিয়ে এর রক্ত হযরত ওমর (রা:) এর পোশাকে লাগল। হযরত ওমর (রা:) ওই পাইপ সড়িয়ে দিতে নির্দেশ করলেন। বাড়ীতে এসে তিনি পোশাক পাল্টে নামায পড়ালেন। পরে হযরত আব্বাস (রা:) খলীফার কাছে এসে বললেন, কসম খোদার! এই পাইপ তো স্বয়ং নবী করিম (সা:) ওখানে লাগিয়েছেন। আপনি তা উপড়ে দিলেন? হযরত ওমর (রা:) বললেন, হে আব্বাস! কসম দিচ্ছি আপনি আমার পিঠের ওপর উঠে ওই পাইপ সাবেক স্হানে লাগিয়ে দেবেন যেখানে নবীজী লাগিয়েছিলেন। আব্বাস (রা:) খলীফার নির্দেশ মোতাবেক তাই করলেন।

Saturday, 29 June 2019

ফারূকে আযম (রা:) এর শাহাদতকালীন কিছু ঘটনা

     স্বপ্নযোগে ফারুকে আযমের ইন্তেকাল প্রসংগ
ইমাম হুসাইন ও ইমাম আহমাদ তাঁদের স্ব -স্ব মুসনাদে একটা ঘটনা উল্লেখ করেন, ঘটনাটি হযরত উমর (রা:) এর একটি স্বপ্নের। ফারূকে আযমের ওই স্বপ্নের ব্যাখ্যা করেন হযরত আলী
(রা:) এর স্ত্রী হযরত আসমা বিনতে উমাইস (রা:)
। ব্যাখ্যায় বলা হয়,  এই স্বপ্ন খলীফা উমরের মৃত্যুর, এই মৃত্যু একজন বিদেশি গোলামের ন্যাক্কারজনক হামলার মাধ্যমে হবে --
   "একবার হযরত উমর (রা:) জুমুআর দিনে মিম্বারে দাঁড়িয়ে খুৎবা দিচ্ছিলেন। হামদ ও ছানার পরে তিনি শ্রদ্ধার সাথে নবী করিম (সা:) এর কথা ও আবু বকর (রা:) এর নামোচ্চারণ করেন, পরে
বলেন, আমি এক অদ্ভুৎ স্বপ্ন দেখেছি। এর দ্বারা বুঝেছি আমার সময় ফুরিয়ে এসেছে। একটি লাল মোরগ আমার পেটে দু'তিন বার তার ঠোঁট দ্বারা ঠুকরেছে।একটি লাল মোরগ আমার পেটে দু'তিন বার তার ঠোঁট দ্বারা ঠুকরেছে। এই স্বপ্ন আমি আসমা বিনতে উমাইসের (হযরত আলীর স্ত্রী) কাছে বললে তিনি বলেন, জনৈক অনারব আপনাকে হত্যা করবে। বর্ণনাকার বলেন, এই খুৎবা তিনি যে শুক্রবার দেন তার পরের বুধবার তিনি আঘাতপ্রাপ্ত হন।
ফারূকে আযমের হিজরত, খেলাফত ও দ্বীনদারীর বিষয়ে হযরত আলী ও ইবনে আব্বাসের স্বাক্ষ্য
    ২৩ হিজরীর জিলহজ্জের শেষের দিকে হযরত ওমর (রা:) ফজরের নামায পড়ানো অবস্হায় পারসিক গোলাম আবু লুলু ফিরোজ তাঁর ওপর নৃশংস হামলা চালায়। খলীফাকে মসজিদ থেকে তার বাস ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনদিন পর তিনি ইন্তেকাল করেন। ওদিনটি ২৪ হিজরীর ১লা মুহাররম।
ওইসময় সাহাবায়ে কেরাম খলীফার সাথে সাক্ষাৎ করেন। একবার হযরত আলী (রা:) ও ইবনে আব্বাস (রা:) তাঁর খেদমতে আসেন। খলীফা উমর (রা:) এ সময় আখেরাতের চিন্তায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ইবনে আব্বাস (রা:) তাকে সান্ত্বনা
দেন ও সন্তোষজননক কিছু কথা বলেন, হযরত আলী (রা:) তাঁকে সত্যায়ন করেন ও সঠিক বলে মতদেন। ইবনে আব্বাস (রা:) এর ভাষ্য --
  "আব্দুল্লাহর ইবনে আব্বাস (রা:) খলীফা উমর (রা:) এর খেদমতে হাযির হলেন। তিনি ওইসময় মারাত্মকভাবে আহত। তিনি বললেন, কসম আল্লাহর! আপনার ইসলাম গ্রহণ মুসলমানদের জন্য ইযযতের উপলক্ষ্য হয়েছিল। আপনার হিজরত বিজয়ের উপক্ষ্য হয়েছিল। আপনার খেলাফত ইনসাফের প্রতীক ছিল। আপনি নবীজীর সাহচর্য পেয়েছেন তিনি মৃত্যুকালে আপনার প্রতি সন্তুষ্টি ছিলেন। পরে আবু বকরেরও সাহচর্য পেয়েছিলেন,  তিনিও মৃত্যুকালে আপনার প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন। আপনার খেলাফত নিয়ে মতপার্থক্য করেছে -এমন দু'জন মানুষও খুঁজে পাওয়া যাবে না। একথা শুনে হযরত ওমর (রা:) বলেন, আপনি এর স্বাক্ষ্য দিচ্ছেন কী?  ইবনে আব্বাস স্বাক্ষ্যবিষয়ে বিব্রতবোধ করলে হযরত আলী (রা:) বললেন, আমরা এই বাস্তবতার স্বীকৃতি দিই। (ইবনে আব্বাস যথার্থই বলেছেন) ।
ইবনে আব্বাস (রা:) এর হযরত উমর (রা:) কে জান্নাতের সুসংবাদের বিষয়টি শীয়া আলেমগনও স্বীকার করেন।
  নৃশংস হামলার পর ফারূকে আযমের প্রতি আলী (রা:)এর পরিপূর্ণ সহমর্মিতা
 "ইমাম জাফর সাদেক তার বাবা মোহাম্মদ বাকের থেকে বর্ণনা করেন যে, নববী মেম্বর ও পবিত্র রওজা শরীফের মাঝে বদরী সাহাবারা জমায়েত হতেন। ওমর (রা:) এর প্রতি হামলা হলে তিনি ওখানকার সাহাবাদের কসম দিয়ে বলতে বলেন,
তোমরা কেউ খলীফার প্রতি এ ধরনের হামলায় সন্তুষ্ট কি -না? নাকি তোমাদের কারো ইন্ধনে এই জঘন্য কাজ হয়েছে? ওখানকার সাহাবারা একথা
শুনে হু হু করে কেঁদে ওঠলেন। এ সময় হযরত আলী (রা:) উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, কখনোই নয়। আমরা তার প্রতি বন্ধুপ্রতীম। প্রয়োজনে আমাদের কারো জীবনের বিনিময়েও যদি উমরের জীবন দীর্ঘ হয় তাতেও আমরা রাযী।
      ওমর জান্নাতী: সুসংবাদ আলীর
স্বীকৃতি ও শক্ত সমর্থন হাসান (রা:) এরও
  "আবু মাতর বলেন, আমি হযরত আলী (রা:)কে
বলতে শুনেছি,  পারসিক গোলাম আবু লুলু হযরত উমর (রা:) এর হামলা করেছিল। এ সময় আমি হযরত উমর (রা:) এর কাছে এলাম।
হযরত উমর (রা:) কাঁদছিলেন। বললাম,  আমিরুল মুমিনীন। কাঁদছেন কেন? হযরত উমর
(রা:) বললেন, আমার ব্যাপারে আসমানী ফয়সালা কী? তা না জানার দরুন কাঁদছি। জান্নাতে নাকি জাহান্নামে যাব? আমি বললাম, আপনি জান্নাতের সুসংবাদ নিতে পারেন। আমি
নবীজীকে বলতে শুনেছি পূর্ণপ্রাপ্ত বয়স্ক লোকদের মাঝে আবু বকর ও উমর জান্নাতী। ওঁরা বেশ উত্তম সর্দার। হযরত উমর (রা:) বললেন, আলী!
আপনার এই সুসংবাদের কোন স্বাক্ষী থাকবেন তো? আমি বললাম, আমি কেন, আমার পুত্র হাসানও এই বিষয়ের স্বাক্ষী দেবে যে, নববী ফরমান মোতাবেক উমর (রা:) জান্নাতী।
              মজলিসে শুরা: ভূক্তিআলী (রা:) এর
ফারুকে আযম (রা:) অন্মি সময় ঘনিয়ে এল।
জীবনের প্রতি তিনি আস্তে আস্তে নিরাশ হয়ে এলেন। এ সময় তিনি কিছু ওসিয়ত করলেন। ওসিয়ত গুলো নিকটাত্মীয় ও বন্ধুমহলকে লক্ষ্য করে। এই ওসিয়তগুলো শীয়া সুন্নি সকলের কিতাবে বর্ণিত আছে। তিনি এ সময় ৬ জন মানুষের নাম নিলেন। এরা যথাক্রমে হযরত ওসমান গণী (রা:) হযরত আলী ইবনে আবু তালেব (রা:) , হযরত যুবায়ের (রা:) হযরত তালহা (রা:) ,হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রা:) ,
হযরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা:)। বললেন,
এ ৬ জনই পরবর্তী খলীফা নির্বাচন করবেন। তিন
দিনের মধ্যেই নির্বাচন সমাধা করতে হবে। এই ৬
হনকে নির্বাচনের কারণটিও খলীফা উমর (রা:)
বলে গেলেন যে এদের প্রতি সন্তুষ্ট অবস্হায় নবী করিম (সা:) ইন্তেকাল করেছেন। উক্ত ৬ জনের
মধ্যে আলী (রা:) এর নাম ভুক্তি ছিল। মুসনাদে হুমায়দীর ভাষ্য --
 "খেলাফতের বিষয়টি আমার পরে ৬ জনের প্রতি সোপর্দ থাকবে। এরা তাঁরা যাদের প্রতি সন্তুষ্ট থেকেই মহানবী (সা:) ইন্তেকাল করেছেন। যার পক্ষে রায় আসবে সেই পরবর্তী খলীফা। এরা যথাক্রমে, ওসমান (রা:) ,আলী (রা:) ,তালহা (রা:) ,যুবায়ের (রা:) , আব্দুর রহমান (রা:) ও সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা:)।
হযরত আলী (রা:) কে বিশেষ অসিয়ত: ব্যবস্হাপনা নামাযের
তাবাকাতে ইবনে সায়াদে 'নসীহতে উমর' পরিচ্ছেদে আছে --
"এরপর তিনি হযরত আলী (রা:) কে ডেকে বিশেষ অসিয়ত করেন এবং (খলীফা নির্বাচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত)  সুহায়ব রূমী (রা:) কে নামায পড়াতে বলেন। কোন রেওয়ায়েত এমনও আছে যে, হযরত উমর (রা:) উক্ত ৬ বুযুর্গকে কসম দিয়ে তাকওয়া ও ইনসাফ করার প্রতি জোর দেন (বালাযুরী) ।
    আলীর মুখে ফারূকী বন্দনা
 "আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন, ফারূকে আযমের ইন্তেকালের সময় আমি জনগনের মাঝেই ছিলাম। হযরত উমর (রা:) এর তিরোধানে
জনতা শোকতাপ করছিল। তাঁদের তরফে আল্লাহর মাগফেরাত কামনা করছিল। উমর (রা:) কে খাটিয়ায় রাখা হলো। এ সময় আমার পেছন থেকে আমার কাধে দু'হাত রেখে হযরত আলী (রা:) বলতে লাগলেন, আল্লাহ আপনার প্রতি দয়াপরবশ হোন হে উমর। আমার যতদূর বিশ্বাস! আপনার অপর দু'বন্ধুর মত খোদা তাআলা আপনাকেও তার সান্নিধ্যে ঠাঁই দেবেন এবং তাদের দু'জনার সাথে আপনাকেও মিলিয়ে দেবেন। আমি নবী করিম (সা:) কে বলতে শুনেছি, আমি, আবু বকর ও উমর এভাবে কাজ করেছি,  আমি আবু বকর ও উমর এতে প্রবেশ করেছি,  আমি, আবু বকর ও উমর বের হয়েছি আমি আবু বকর ও উমর চলেছি।
ফারূকে আযম (রা:) কে গোসল দেয়া হল। তাকে কাফন পড়ানো হল। নামাযের জানাযার জন্য জনতার সামনে খাটিয়া আনা হলো। এ সময় মুসলিম বিশ্বের সামনে হযরত আলী (রা:) তাঁর যে প্রশংসা ও স্তুতিগান বর্ণনা করলেন - এক কথায় তা বিরল ও নজিরবিহীন। কোনও সাহাবীর থেকে এমনটা শোনা যায়নি, বিবৃত হয়নি। হযরত আলী (রা:) এর এই বর্ণনা 'মুসাজ্জাধর্মী' বর্ণনা বলে খ্যাত। শীয়া -সুন্নী সকলের নিকট এই বর্ণনাটি বিখ্যাত। প্রথমেই আমরা ইমাম আবু ইউসূফ (রহ:) এর উদ্ধৃতি টানব --
 "ইমাম আবূ ইউসুফ তার ওস্তাদ ইমাম আবূ হানীফাহ (রহ:) থেকে বর্ণনা করেন। ইমাম আবূ হানীফাহ ইমাম মুহাম্মাদ বাকের (রহ:) থেকে বর্ণনা করেন যে, হযরত আলী (রা:) হযরত উমর (রা:) এর জানাযায় শরীক হয়ে বললেন ,এউ কাফনপরিহিতের চেয়ে উত্তম কেউ নেই আমার কাছে (এই মুহুর্তে)।  আমিও আল্লাহর কাছে হাজির হব, যেমন তার আমলনামা আমার আমল নামাতে ওমন হোক।  ইমাম মোহাম্মাদ (রহ:) থেকেও এমন একটি বর্ণনা বিদ্যমান।
             ইমাম বাকের (রহ:) এর ভাষ্য
কারী আবু মুয়াইয়িদ মুহাম্মাদ ইবনে মাহমূদ আল -খারযামী তার জামেউ মাসানিদিল ইমাম আযম পুুস্তকে হযরত আলী (রা:) এর উপরিউক্ত কথিকা স্বপ্রমাণ বর্ণনা করেন --
 "ইমাম আবূ হানীফা (রহ:) বলেন,আমি ইমাম মুহাম্মাদ বাকেরের খেদমতে পৌঁছে তাকে সালাম করলাম। বসে কথাবার্তা বললাম, আরজ করলাম ফারূকে আযমের জানাযায় হযরত আলী (রা:) উপস্তিত ছিলেন কী? তিনি বিস্ময় প্রকাশপূর্বক বললেন, সোবহানাল্লাহ! উপস্হিত না থাকলে এ কথা বলল কে যে, এই কাফন জড়ানো ব্যক্তির চেয়ে অতি উত্তম কেউ নেই আমার কাছে, তাঁর মত আমালনামা নিয়ে আমি আল্লাহর সমীপে উপস্হিত হবার আশাবাদী। পরে ইমাম বাকের বলেন, আলী মুর্তাজা (রা:) তাঁর প্রিয়কন্যাকে হযরত ফারুকে আযমের কাছে বিয়ে দেন। তিনি তাঁকে যোগ্য মনে না করলে এই বিয়ে হত না। এই
শাহজাদী সমকালীন শ্রেষ্ঠ ও অভিজাত ছিলেন। কেননা তাঁর নানাজী স্বয়ং রাসূলে খোদা (সা:) ,পিতা অপরগুণের আঁধার শেরে খোদা আলী (রা:) , তাঁর মাতা ফাতেমা যাহরা (রা:) ,আর তার ভাই যথাক্রমে হাসান ও হুসাইন  (রা:)। জান্নাতী যুবককুলের সর্দার। আর তার নানী খাদীজাতুল কোবরা (রা:)।
মুসনাদে আহমাদেও 'কাফন জড়ানো'ধর্মী অন্তত দুটি রেওয়ায়েত বিদ্যমান। তাছাড়া তাবাকাতে ইবনে সায়াদ ও মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বায়ও
হাদীস রয়েছে এ বিষয়ে।।

ফারূকে আযম ও হাসান -হুসাইনের মাঝে সম্পর্ক

হযরত ওমর (রা:) এর সন্তান হযরত ইবনে ওমর (রা:) হাসান -হুসাইন (রা:) এর ভূয়সী প্রশংসা করেন। ইমাম বুখারী যা তার সহীহ গ্রন্হে বর্ণনা করেন --
      "জনৈক ইরাক ইহরাম অবস্হায় ইবনে উমর
(রা:) কে বলেন, কেউ যদি ইহরাম অবস্হায় মশা কিংবা মাছি মারে তাহলে তার জরিমানা কী? জবাবে ইবনে উমর (রা:) বলেন, ইরাকীরা মশা বা মাছি হত্যার মাসয়ালা জিজ্ঞাসাা করে,অথচ আল্লাহর হাবীবের নাতি ও পরিবারকে হত্যা করেছে। হুযুর (সা:) তাঁর দু'নাতি সম্পর্কে বলেন,ওরা আমাদের এই জগতের খোশবু।
         ইবনে উমর আর তুমি এক নও
হাফেজ ইবনে আসাকির লেখেন --
"একবার হযরত উমর (রা:) হযরত হুসাইন (রা:)কে বললেন, সময় বুঝে একবার আমার সাথে দেখা করো। হযরত হুসাইন (রা:) তার কাছে গেলেন। পথিমধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা:) এর সাথে দেখা। তিনি বললেন, রাষ্ট্রীয় কাজে হযরত উমর (রা:) খুবই ব্যস্হ। কারো সাথে দেখা করার অনুমতি নেই। এমনকি আমিও অনুমতি পাইনি। হযরত হুসাইন (রা:) ফিরে গেলেন। পরে হযরত উমর (রা:) এর সাথে দেখা হলে বললেন,তোমার না আমার সাথে দেখা করার কথা? হুসাইন (রা:) বললেন, আমি আপনার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু সে সময় আব্দুল্লাহরই অনুমতি
ছিল না। এ জন্য আমি ফিরে গিয়েছি। হযরত উমর (রা:) বললেন, তুমি নিজেকে ইবনে উমরের সমতুল্য মনে কর? ওর আমার চেয়ে তোমার মর্যাদা অনেক বেশী। আমাদের মর্যাদা সে তো তোমাদের কারণেই।
    তোমাদের মর্যাদামাফিক পোষাক এলই তবে --
আবার সেই হাসান -হুসাইন (রা:)। কী মর্যাদা দিতেন তাঁদেরকে হযরত ফারূকে আযম (রা:)!  এই না হলে ফারূকী খেলাফতের খলীফা। পুনশ্চ সেই ইবনে আসাকিরের ভাষ্য --
  "বিজিত এলাকা থেকে কাপড় এলো। সাহাবায়ে কেরামের সন্তানদের মাঝে যথারীতি তা বন্টনও করে দেওয়া হলো।। কিন্তু হাসান -হুসাইন (রা:) এর মর্যাদামাফিক ছিলনা কোন পোষাকও। এ সময় হযরত উমর (রা:) ইয়ামেনে লোক পাঠিয়ে বললেন, ওদের মর্যাদাসই পোষাক তৈরী করে নিয়ে এসো। এই পোষাক আসার পরে হযরত ওমর (রা:) এবার আমার মন শান্ত হলো।
    "ফারূকী খেলাফতে হাসান -হুসাইন (রা:) র
অর্থনৈতিক সুবিধাদি
ফারূকী খেলাফত নবী পরিবারের প্রতি যে অসীম
অবদান রেখেছে তা অনস্বীকার্য। ইতোপূর্বে হযরত
আলী (রা:) এর ভাতা প্রসংগে হাসান -হুসাইন (রা:) এর আলোচনা গেছে। এক্ষণে পৃথকাকারে এঁদের  দু'জনার নামোল্লেখ না করলেই নয়।
আর সেই উল্লেখটা হানাফী মাযহাবের ব্যারিস্টার
বলে খ্যাত ইমাম ত্বহাবীর একটি বর্ণনা দিয়েই --
 এদিকে ইমাম রায়হাকীও কাছাকাছি এমন একটি বর্ণনা দেন। ইবনে আসাকির শীয়া ভাষ্যকার ইবনে আবিল হাদীসও এমতের প্রতি সহমত দেন।
অর্থা: "হযরত ফারূকে আযম (রা:) হাসান -হুসাইন (রা:) দু'ভাইয়ের প্রত্যেকের জন্য ৫০০০ দিরহাম নির্ধারণ করেন। নবীজীর আত্মীয় হিসেবেই তাঁদের এই প্রাপ্তি।
         যমীনও যার সাথে কথা বলে
বিশিষ্ট শীয়া লেখক আব্বাস কুমী ইমাম হাসান (রা:) এর একটি কারামত বর্ণনা করেন। কারামতটি তার সাথে যমীনের কথা বলার। এই ঘটনাটি দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, হযরত হাসান (রা:) ফারূকী খেলাফতে জেহাদ করতেন। আব্বাস কুমীর ভাষ্য --
 'ইস্পাহান শহরে একটি মসজিদ রয়েছে। একে
'লিসানুল আরদ' বলে। ফাযেল হিন্দির মাজারের পূর্ব পার্শ্বে মসজিদটি প্রতিষ্ঠিত। ওখানকার লোকদের মাঝে একটি কথা প্রচলিত আছে যে,  উমর ইবনুল খাত্তাবের শাসনযুগে তার এক বাহিনীর সাথে ইমাম হাসান (রা:) এখানে জেহাদ
করতে এসেছিলেন। বিজিত এই এলাকাটিতে হযরত হাসান (রা:) এলে যমীন ইমামের সাথে কথা বলে। একারণে এই যমীনকে 'লিসানুল আরদ' বা 'কথা বলা যমিন' বলে।
           পারস্যের শাহজাদী শাহারবানু
শীয়া ভাষ্যকারদের বিবরণ দ্বারা জানা যায়,  ইমাম মুহাম্মাদ বাকের বলেন, পারস্য সম্রাট য়াজগরদের কন্যা মদীনায় পৌঁছুলে মদীনার বধু -মাতারা ছাদে চড়ে তাদেরকে দেখতে ভীড় জমান। তার অপার সৌন্দর্য্যে চারদিক আলো ঝলমল হয়ে উঠে। এমনকি মসজিদে নববীও আলোকিত হয়ে যায়।
হযরত উমর (রা:) রাজকুমারীর দিকে তাকালে সে চেহারা ঢেকে ফেলে। বলে, দেবতা হরমুজ ( পারস্য সেনাপতি) এর অনিষ্ট করেন, তার দরুনই
আজকে আমাকে এই পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে।
হযরত ওমর (রা:) (রাজকন্যার ভাষা বুঝতে না পেরে ) বললেন, সে আমাকে গাল দিচ্ছে কী? হযরত আলী (রা:) বললেন, আমীরুল মুমিনীন। না না। সে আপনাকে গাল দিচ্ছে না। হয়ত অন্য
কাউকে কিছু বলছে। পরে হযরত আলী (রা:) উমর (রা:) কে পরামর্শ দিতে গিয়ে বলেন, রাজকুমারীকে অধিকার দিন সে যে কাউকে
নির্বাচন করে নিবে। যাকেই সে পছন্দ করবে সেই
তার গনীমতের অংশ হয়ে যাবে। রাজকুমারী হযরত হুসাইন (রা:) এর মাথায় হাত রাখল। এভাবে সে হযরত হুসাইন (রা:) এর হয়ে গেল। হযরত আলী (রা:) রাজকুমারীকে তার নাম জিজ্ঞাসাা করলে সে বলল, তার নাম শাহজাহান। হযরত আলী (রা:) তাকে বললেন, উঁহু তুমি শাহারবানু। হযরত আলী (রা:) ভবিষ্যদ্বাণী করতে গিয়ে বলেন, তোমার গর্ভে এমন এক সন্তান হবে
যে গোটা যমীনের মাঝে সেরা হবে। পরবর্তীতে এই শাহারবানুর গর্ভে ইমাম যাইনুল আবেদীন জন্মগ্রহণ করেন। ইবনে আম্বাহ বলেন, রাজকুমারী শাহারবানু মাদায়েন যুদ্ধে বন্দী হন। হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা:) ই তাঁকে হুসাইন
(রা:) এর ভাগে ফেলেছিলেন।।

Wednesday, 26 June 2019

ওমরের বিয়েতে আলী (রা:)

সমাজের নিয়ম হল, খুশী -আহলাদ ও আনন্দঘন অনুষ্ঠানে বন্ধু -বান্ধবদের দাওয়াত করা। এই নিয়মের ব্যতিক্রম নন হযরত ওমর (রা:)। তিনি তার বিয়ে -শাদীতে অন্যান্য বন্ধু -বান্ধবদের পাশাপাশি হযরত আলী (রা:) কেও বিয়ের দাওয়াত করতেন। হযরত আলী (রা:) ও সন্তুষ্টচিত্তে এসব দাওয়াতে শরীক হতেন। এখানে
আমরা ইবনে আব্দুল বার (রহ:) এর 'ইস্তিয়াব' থেকে উদ্ধৃতি টানব। তাঁর ভাষ্য --
 "খলীফা ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা:) এর সাথে ১২
হিজরীতে আতেকাহ বিনতে যায়দ (রা:) এর বিয়ে হয়। বৌভাতে হযরত উমর (রা:) বন্ধু -বান্ধবদের দাওয়াত করেন। আনন্দ -ফুর্তিস্বরূপ হযরত আলী (রা:) বলেন, আমীরুল মুমিনীন! আমি আপনার স্ত্রী আতেকার সাথে একটু কৌতুক করতে পারি কী? হযরত উমর (রা:) অবশ্যই, কেন নয়? হযরত আলী (রা:) পর্দার বাইরে থেকে আতেকাহ (রা:) কে কিছু কবিতা স্মরন করিয়ে দেন - 'স্বামী হে!  আমি কসম খেয়েছি, আমার চোখ তোমার বিরহে সর্বদা বিমর্ষ থাকবে। দেহ থাকবে ধূলি ধুসরিত।
এই স্মৃতিচারনে আতেকাহ কাঁদতে লাগলে হযরত উমর (রা:) আলী (রা:) কে বললেন, হে আবুল হাসান! আপনি তাকে আরো বিমর্ষ করে তুলছেন। নারীরা তো অমনটা করবেই। (পেছনের কথা স্মরণ করলে তাদের অবস্হান এমনই হবে।
ভাবা যায়! খলীফা উমর (রা:) এর সদ্য বিবাহিতা
স্ত্রীর সাথে হযরত আলী (রা:) পেছনের কথা স্মরণ করিয়ে কৌতুক করছেন। এরদ্বারা প্রতীয়মান হয়, তাদের মাঝে কী প্রকার সুসম্পর্ক ছিল।।

ওয়ায়েস ক্বরণীর সাক্ষাৎ উদ্দেশে সফর

হযরত উমর (রা:) এর খেলাফতের শেষ বছর। হজ্জের সফরে হযরত ওমর (রা:) ও আলী (রা:) ওয়ায়েস ক্বরনীর খোঁজে আরাফাতের দিকে রওয়ানা করলেন। তারা দেখলেন, এক লোক গাছের দিকে মুখ করে নামায আদায় করছে। তার আশেপাশে উট ঘোরাফেরা করছে। তারা উভয়েই দ্রুতই বাহন কষে আগালেন। এসে  সালাম দিলেন। ওয়ায়েস ক্বরনী নামায সংক্ষেপ করলেন এবং সালামের জবাব দিলেন। তারা বললেন, আপনার পরিচয়?
তিনি বললেন, আমি উটের রাখাল ও খাদেম, তিনি বললেন, আপনারা কারা, কোত্থেকে? তাঁরা
বললেন, নবীজী (সা:) আমাদেরকে ওয়ায়েস ক্বরনী নামে এক লোকের কিছু গুণাগুণ বর্ণনা করেছিলেন - আমরা আপনার মাঝে দেখতে পাচ্ছি। আমাদের যদ্দুর বিশ্বাস নবীজীর বাতানো তরীকা মতে আপনিই সেই লোক। আল্লাহর কাছে আমাদের জন্য দোয়া করুন। পরে ওয়ায়েস ক্বরনী বললেন, আপনাদের পরিচয় দেননি এখনো। এ সময় হযরত আলী (রা:) বললেন --
 "ইনি আমীরুল মুমিনীন উমর (রা:) , আর আমি আলী ইবনে আবু তালেব। ওয়ায়েস ক্বরনী দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, সালাম আমীরুল মুমিনীন। সালাম আপনার প্রতিও হে আলী! আপনাদের দু'জনের মাধ্যমে আল্লাহপাক উম্মতের অনেক কল্যাণ পৌঁছান।
দেখা গেল, অভিনব এক সফরে তাঁরা দু'জনা এক ছিলেন। এখানে খলীফা উমর (রা:) অন্য কাউকেও নিয়ে যেতে পারতেন। নেননি। সম্পর্ক গভীর বলেই তো তাঁকে সাথে নেয়া।

Tuesday, 25 June 2019

সারিয়া! পাহাড়ে লুকাও

একবার হযরত উমর (রা:) মদীনায় খুৎবা দিচ্ছিলেন। খুৎবার মধ্যে আচমকাই বলে ওঠলেন
 "সারিয়া! পাহাড়ে চাপো,যে কেউ বাঘের প্রতি দয়াপরবশ হয়েছে সে ছাগপালের প্রতি জুলুম করেছে। মানুষেরা হযরত আলী (রা:) কে বলতে লাগল, খলীফা সারিয়ার কথা বললেন অথচ সে ইরাকে যুদ্ধ করছে। হযরত আলী (রা:) বললেন,
হযরত উমর (রা:) এর প্রতি আপত্তি তুলো না। তাঁর কাজ তাঁকে করতে দাও। খুব সম্ভব ওরা এমন কোনো বিপদে পড়েছে যা থেকে বেঁচে যাওয়া মুশকিল। কিছুদিন পরে ইরাক জয়ের সুসংবাদ এলো। সারিয়া সঙ্গীসাহাবীসহ মদীনায়
এলেন। আমরা যুদ্ধের মধ্যে হযরত উমর (রা:) এর কথা কণ্ঠ শুনে পাহাড়ে উঠি।

মসজিদ আলোকিতকরণে হযরত উমর (রা:) কে দোয়া

হিজরীতে হযরত ওমর (রা:) মসজিদে নববীতে
জামায়াত বদ্ধভাবে তারাবীহ আদায়ের সিদ্ধান্ত দেন। ইবনে খাইয়াতের ভাষ্য --
হযরত ফারূকে আযম (রা:) এর শাহাদতের পরে হযরত ওসমান (রা:) খেলাফতের মসনদে বসেন।
একবার তিনি মসজিদে এসে দেখলেন মসজিদ আলোকময়। মানুষেরা জড়ো হয়ে তারাবীহ আদায় করছে। কোরআন তেলাওয়াত করছে।
এই অশ্রুতপূর্ব দৃশ্য দেখে হযরত আলী (রা:) ফারূকে আযম (রা:) এর সম্পর্কে বললেন --
 "আল্লাহপাক  হযরত ওমর (রা:) এর কবরকে আলোকিত করেন যিনি আমাদের মসজিদকে আলোকিত করেছেন।
সুধী পাঠক! লক্ষ্য করুন! জামাতবদ্ধ তারাবীহ ১৪ হিজরীতেই শুরু। পরবর্তীতে ইসলামপন্থীরা প্রতি বছর এটি পালন করে আসছে। ফারূকী ও ওসমানী খেলাফতে এটি জারী ছিল। হযরত আলী (রা:) ও একে পছন্দ করে জারী রেখেছিলেন। বন্ধ করেননি। একবার মর্ম হলো, আমীরুল মুমিনীন দ্বীনের যে কাজটি সর্বদা জারী রাখতেন -তা দ্বীনই ছিল, বেদয়াত নয়। তা সঠিক ছিল -ভুল নয়। তবেই না হযরত শেরে খোদা একে শরীয়তসিদ্ধ হিসেবে আমল করেছেন। তবেই না হযরত আলী
(রা:) ফারূকে আযমের শানে ওই বিষয়ে দোয়া করেছেন। কাজেই তিন খলীফার যুগে সর্বসম্মাতিক্রম সিদ্ধান্ত হওয়া বিষয়কে বেদয়াত বলা তাঁদের মর্যাদার প্রতি চরম অবমাননা বৈকি।

খলীফার স্হলাভিষিক্ত নির্বাচন

ইতোপূর্বে আমরা হযরত ফরূকে আযম (রহ:) এর
রাষ্ট্রীয় নানা বিষয়ে হযরত আলী (রা:) এর সাথে
পরামর্শ বিষয়ে জানলাম। এক্ষণে খলীফা মদীনার বাইরে কোথাও গেলে হযরত আলী (রা:) কে যে কয়েকবার স্হলাভিষিক্ত করে যান সে বিষয়ে জানব।
     ইবনে জারীর তাবারীর ভাষ্য --
  "১৪ হিজরীর পহেলা মুহাররম হযরত ওমর (রা:) সুরার ঝর্ণার উদ্দেশে মদীনা  ছাড়লেন। বিরাট একদল সৈন্য নিয়ে স্বয়ং হযরত ওমর (রা:) ইরাক যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বেরোলেন। এ সময় মদীনায় হযরত আলী (রা:) কে তার স্হলাভিষিক্ত করে যান। হযরত ওসমান (রা:) সহ অপরাপর সাহাবাদেরকে সঙ্গে নেন। পরে সাহাবায়ে কেরাম
ওখানে জরুরি পরামর্শে বসেন। নামাযের গুরুত্বারোপ করা হয় এখানে। হযরত আলী (রা:) কেও ডেকে পাঠানো হয়। নামাযের পর হযরত আলী (রা:) এলে পরামর্শ হয়। শুধু আবাদুর রহমান ইবনে আওফ (রা:) ছাড়া সকলেই খলীফার ইরাক যুদ্ধে অংশগ্রহণ কে সঠিক মনে করেন। হযরত আব্দুর রহমান (রা:) এর ভাষ্য হলো, খোদা না করুন আপনি পরাস্ত হলে গোটা
বিশ্ব দূর্বল ও মুরুব্বীহারা হয়ে পড়বেন। কাজেই আপনি স্বস্হানে (মদীনায়) বহাল থেকে অন্য কাউকে সেনাপতি করে প্রেরণ করুন। আপনার স্হলে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা:) কে প্রেরণ করুণ।
  "আল্লাহ ইবনে কাছীরের ভাষ্য --
 "বায়তুল মোকাদ্দাস অবরোধ করে হযরত আবু ওবায়দা (রা:) তাদের সংকীর্ণ করে ফেলেন। শেষ পর্যন্ত তারা হযরত ওমর (রা:) এর আগমনের শর্তে আত্মসমর্পনে রাযী হয়। শর্তটি হযরত ওমর (রা:) কে জানানো হয়। হযরত ওমর (রা:) বিষয়টি নিয়ে সাহাবায়ে কেরামের সাথে পরামর্শে বসেন। হযরত ওসমান (রা:) ,উমর (রা:) এর বায়তুল মোকাদ্দাসে না যাওয়ার পরামর্শ দেন। যাতে ওরা লজ্জিত হয় ও নাক কাটা যায়। পক্ষান্তরে হযরত আলী (রা:) ওখানে স্ব -শরীরে হাজির হওয়ার পরামর্শ দেন। খলীফা হযরত আলী (রা:) এর মত গ্রহণ করেন। ওসমান গণী (রা:) এর মতামত খণ্ডন করেন। এ সময় তিনি হযরত আলী (রা:) কে মদীনায় তার স্হলবর্তী নিযুক্ত করেন। হযরত আব্বাস (রা:) তার অগ্রগামী বাহিনীর প্রধান হিসেবে অগ্রসর হচ্ছিলেন। ইবনে জারীর ত্ববারীও তার ইতিহাসগ্রন্হে এ বিষয়ে আলোকপাতপূর্বক বলেন,  বায়তুল মোকাদ্দস যাওয়র সিদ্ধান্ত হলে হযরত আলীকে মদীনায় তাঁর স্হলবর্তী নিযুক্ত করেন।
কানযুল উম্মাল গ্রন্হে হযরত আলী (রা:) কে হযরত উমর (রা:) নাজরানের গভর্ণর বানিয়ে ওখানে প্রেরণ করা প্রসংগে বলা হয়েছে --
  "ইবনে সীরীন বলেন,হযরত উমর (রা:) নাজরানবাসীর কাছে ফরমান জারীপূর্বক বলেন, তোমাদের মধ্যে যারা ইসলাম গ্রহণ করবে তিনি তাদের সাথে সদাচার করবেন। আমি তাকে  আরো নির্দেশ করেছি যেন তিনি যমীনের উৎপাদিত ফসলের অর্থ -ভাগা নিয়ম চালু করেন। আমি তোমাদের কে স্ব -দেশ থেকে বহিস্কারের ইচ্ছে করছি না। শুধু তোমাদের লেনদেন ও আচার ব্যবহারটা ঠিক রাখো দেখবে সব ঠিকঠাকমত চলছে।

জিযিয়ার নাম সাদাকাহ

হিজরী ১৭ সনে সিরিয়ার নিকটবর্তী 'ফাতহুল জাযিরা' জনপদটি মুসলিম দখলে আসে সে দেশের লোক খ্রীস্টান ছিল। ট্যাক্স ও জিযিয়া শব্দটি ওদের কাছে অপমানজনক  মনে হওয়ায় ওরা সেনাপতি সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা:) এর কাছে এসে এর বিপরীত কোন একটা নাম কিযবা মূল নামটি  (জিযিয়া) লুপ্ত করার কথা বললো। হযরত সা'দ (রা:) প্রতিনিধি দলকে ফারুকে আযম (রা:) এর দরবারে প্রেরণ করলেন। তারা এসে আরজ করল --
  "আপনারা আমাদের থেকে যা নিচ্ছেন এর নাম
ট্যাক্স বা জিযিয়া রাখবেন না। হযরত ফারুকে আযম (রা:) বলেন, তোমাদের জন্য ধার্য অর্থের নাম আমরা জিযিয়াই রাখব। তোমরা যা মনে চায় রাখতে পার।  ওই সময় হযরত আলী (রা:) কাছে ছিলেন। তিনি বললেন, হযরত সাদ বিন আবী ওয়াক্কাস (রা:) কি এদের প্রদেয় অর্থ দ্বিগুন করে
দেননি? আমীরুল মুমিনীন (রা:) বললেন, হ্যাঁ! বোঝা গেল তিনি ওদের মনোতুষ্টির জন্যই এটি
করেছেন। হযরত উমর (রা:) আলী (রা:) এর এই
কথা অর্থাৎ জিযিয়ার বদলে (নাম বদলপূবর্ক)
'দ্বিগুণ প্রদেয়' আদায় করা শুরু করার বিধান বহাল করেন।
             বিজিত ভূমি ইরাক নিয়ে পরামর্শ
ইরাক ইসলামী খেলাফতের অধিনে এলে এসব এলাকার ভূ -স্বামীদের সম্পর্কে একটি পরামর্শ হয় যে, এদের নিয়ে পরিকল্পনা কী হতে পারে? এ বিষয়ে মোহাদ্দেসী ও ফোকাহাগণ যথেষ্ট কালি -কলম খরচ করেছেন --
  "হারেসা ইবনে মোজরাব বলেন, ইরাক জয় হলে এর জমি -জমা হযরত উমর (রা:) মুসলমানদের মাঝে বন্টন করার পরিকল্পনা করলেন। প্রথমে তিনি একটি গড় হিসাব করলেন। আর তা এভাবে যে, এক এক জন মুসলমানের হিস্যায় তিন তিন
কাফের কৃষকের ভূমি আসবে। এরপর হযরত ফারুক আযম (রা:) সাহাবায়ে কেরামের সাথে
পরামর্শে বসলেন (পরামর্শ সভার সদস্যগণ যার
যার মত পেশ করলেন)। হযরত আলী (রা:) পরামর্শ দিলেন, প্রকৃত জমি কারো মালিকানায় না দিয়ে তা স্ব -অবস্হায় রেখে দেওয়া হোক। এতে
যা আমদানী হবে তা সকল মুসলমানের আমদানীরূপে গণ্য হবে। জমি যেভাবে যার মালিকানায় আছে সেভাবেই থাকবে। কৃষকের থেকে নির্ধারিত হারে ট্যাক্স আদায় হবে। পরিশেষে হযরত উমর (রা:) উসমান ইবনে হুনাইফ (রা:) কে ওই নির্দেশ মোতাবেক নির্ধারিত হারে ট্যাক্স আদায়ের জন্য প্রেরণ করলেন।

ইসলামী সন -তারিখ প্রবর্তনে

খ্রীস্ট সমাজ তাদের জাতি ও রাষ্ট্রে ঈসা (আ:) এর জন্ম হিসেবে দিনপন্ঙী নির্ধারণ হয়ে আসছিল। ফারুকে আযমের খেলাফতের গোড়ার দিকে মুহাজিরীন ও অন্যান্য সাহাবায়ে কেরাম পরামর্শে বসেন যে, মুসলিম সন -গণনা কোন সময় থেকে শুরু করা যায়। সকলেই যার যার নিজস্ব মতামত ব্যক্ত করলেন। ইমাম বুখারী (রহ:) এর তারীখে সগীর গ্রন্হের ভাষ্য --
ইবনে ক্ছীর (রহ:) আরেকটু
বিশ্লেষণধর্মী আকারে লেখেন --
  "আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা:) মুহাজির ও অন্যান্য মাহাবাদের জড়ো করে ইসলামী সন -গননা প্রবর্তনেরর পরামর্শে বসেন। কেউ প্রস্তাব করে বলেন, নবীজীর শুভ জন্মোর সাথে সাযুজ্য রেখে আরবী সনের প্রবর্তন করা যেতে পারে। কেউবা বলেন,  নবীজীর নবী হয়ে ওঠার সময়টা অর্থাৎ ওহী প্রেরনের সময়কে কেন্দ্র করে ইসলামের সন গণনা শুরু হোক। তবে হযরত আলী (রা:) সহ কিছু সাহাবী বললেন,  হিজরতের সময় থেকে এই সন -গণনা শুরু হতে পারে। কেননা, নবীজীর জন্ম ও ওহীপ্রাপ্তির চেয়েও হিজরতটি তাঁর অতি বিখ্যাত। হযরত উমর (রা:) শেষ পর্যন্ত শেষোক্ত মতটিই পছন্দ করলেন। আর
এ সময় থেকেই হিজরী সাল -গণনার প্রবর্তন ঘটে।

Monday, 24 June 2019

খলীফা ওমর (রা:) এর বেতন -ভাতা

ফারুকে আযম (রা:) মুসলিম জাতির খলীফা হলে তাঁর নিজস্ব ব্যবসা -বাণিজ্য ও আয় -রোজগারে যথেষ্ট ঘাটতি দেখা দেয়। কাজেই এ সময় তাঁর বেতন -ভাতা নির্ধারণে সাহাবায়ে কেরাম পরামর্শে
বসেন, ঐতিহাসিক ইবনে সা'দ ও ইবনে জারীর ত্ববারী লেখেন --
   "সাহাবায়ে কেরামের কাছে হযরত ওমর (রা:) লোক প্রেরণ করে তার বেতন -ভাতা বিষয়ে পরামর্শ চাইলেন। বললেন,আমি একজন ব্যবসায়ী। তোমাদের খেদমত আমাকে তা থেকে 
বঞ্চিত করছে। আমি এখন খেলাফতকার্যে প্রচুর সময় ব্যয় করছি। এক্ষণে বায়তুল মাল থেকে আমার জন্য কিছুু নেওয়া বৈধ হবে কী? হযরত ওসমান ও হযরত সাঈদ ইবনে যায়েদ (রা:) রায় প্রদানপূর্বক বললেন, আপনি বায়তুল মাল থেকে নিতে পারেন, অন্যকেও দিতে পারেন। পরে তিনি হযরত আলী (রা:) এর মত চাইলেন। বললেন,আলী! আপনার খেয়াল কী? হযরত আলী (রা:) বললেন,আপনি আপনার নিজের ও বালবাচ্চার খোরপোষ নিতে পারেন। হযরত আলী (রা:) মতই গৃহীত হলো।
ওলামায়ে কেরাম লিখেন, হযরত উমর (রা:) বায়তুলমাল থেকে খর্চা -খোরাক মিলত। দু'জোড়া পোষাক জুটত। গরমে একজোড়া, শীতে আরেক। সকলের জন্য একটি উট ও একজন প্রটোকল অফিসার (খাদেম) পেতেন। এই সামান্য ফ্যাসিলিটি ছিল অর্ধ পৃথিবীর বাদশাহ ফারুকে আযমের যার নাম শুনলে কেঁপে উঠত কাইসার ও কিসারার কলিজা। যিনি খেজুর পাতার চাটাইতে বসে ফরমান লিখতেন রোম ও ইরান সম্রাটের
কাছে। 

ফারুকী আদালতে আলী (রা:) এর মোকাদ্দমা

ফারুকী খেলাফতে হযরত আলী (রা:) চীফ জাস্টিজ ছিলেন। জনগণের বিচার আচার সবই
তাঁর স্কন্ধে অর্পিত ছিল। কিন্তু নিজস্ব কোন মামলা -কিংবা সমস্যা এলে হযরত আলী (রা:) সরাসরি তাতে হস্তেক্ষেপ না করে ফারুক আযমের আদালতে পেশ করতেন। সেই মামলার ফয়সালা তাঁকে দিতে বলতেন। হাদীস শরীফে এমন কিছু মামলার কথা বিদ্যমান। নিম্নে সামান্য এমন কিছু নযীর পেশ করা হচ্ছে।
            বনী নযীর ও মালে ফাইয়ের  মামলা
কুতুব সিত্তায় (সংক্ষেপে) বর্ণনা করা হয়েছে, বনি নযীরের সম্পদ ও ফাইয়ের মাল নিয়ে আব্বাস (রা:) ও আলী (রা:) এর মাঝে সৃষ্ট দ্বন্দ্ব হযরত ওমর (রা:) এর আদালতে পেশ করা হয় (দ্বন্দ্বটি ওই সম্পদের অভিভাবকত্ব ও খর্চাদি সম্পর্কিত) ।  আমিরুল মুমিনীন উমর (রা:) বলেন,  এখন ভূ -সম্পদ ও মালামাল আপনাদের তরফে বন্টন করে দেওয়া হবে না। অবশ্য এর আমদানী ও
লভ্যাংশ থেকে নব্বী যুগমাফিক আপনাদেরকে হিস্যা দেওয়া হবে এবং যথারীতি তা বহালও থাকবে। যদি এর রক্ষণাবেক্ষণ ও অভিভাবকত্ব নিয়েও আপনাদের মাঝে বচসা থাকে তাহলে যতটুকু যা আপনাদের প্রাপ্য তাও ফেরৎ নিতে বাধ্য হব। নিজেই আমি তা দেখভাল করব এবং লভ্যাংশ ও উৎপাদন জনগণের মাঝে বন্টন করব।
                  অপর একটি ঘটনা
  ইমাম আবু ইউসূফ ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ:) স্ব -স্ব কিতাবে লেখেন --
  "ইবরাহীম নাখায়ী (রা:) বলেন, নবীজীর  ফুফু হযরত সুফিয়া (রা:) এর জনৈক গোলাম লাপাত্তা হয়ে যায় (তার পরিত্যক্ত মাল -সম্পদ নিয়ে হযরত আলী ও যুবায়ের (রা:) এর মাঝে টানাপোড়েন সৃষ্টি হলে তা হযরত ওমর (রা:) এর এজলাস পর্যন্ত গড়ায়) ।  হযরত আলী (রা:)এর দাদী, সে আমার ফুফুর খাদেম ও গোলাম। আমি আমার ফুফুর ভাইপো হিসাবে আসাবা। তার রক্তপণ ও
জামানত আদায় আমার যিম্মায়। সুতরাং আমি
আমার ন্যায্য হিস্যা দাবি করছি। হযরত যুবায়ের ইবনুল আওয়াম (রা:) বলেন,  সুফিয়া (রা:) আমার মা। সে আমার মায়ের খাদেম ছিল। কাজেই পুত্র হিসাবে আমি এই সম্পদের বৈধ ওয়ারিশ। ( উভয় পক্ষের জবানবন্দী শেষ) হযরত উমর (রা:) রায় শোনাতে গিয়ে বলেন, সুফিয়া -পুত্র যুবায়ের ইবনুল আওয়ামই প্রকৃত ওয়ারিশ,
হযরত আলী (রা:) নন। (এরপর থেকেই মীরাজের ক্ষেত্রে নিকটাত্মীয়দের হিস্যা সর্বাগ্রে বন্টনের নীতিটি চালু হয়)।
     ফায়দা :
১। জনমানুষের জন্য হযরত আলী (রা:) কাজী ও মুফতি হতেন। কিন্তু নিজস্ব বিষয়ে তিনি হযরত উমর (রা:) এর দ্বারস্হ হতেন। হযরত ওমর (রা:)
জনগণের বিচার -আচারের ভারটি হযরত আলী (রা:)এর কাঁধে সঁপেছিলেন।
২। হযরত ওমর (রা:) এর এজলাসটি বিলকুল ইনসাফভিত্তিক ছিল। তাইতো নিজস্ব বিচার কার্যগুলো হযরত আলী (রা:) তাঁর এজলাসে ওঠাতেন। নতুন কুরআন -সুন্নাহর জ্ঞানে আলী (রা:) কী কোনদিন দিয়ে কী ফারুকে আযমের চেয়ে কম ছিলেন? ফারূকে আযমের এজলাস যদি বাতিল ও জুলুমনির্ভর হত তাহলে শেরে খোদা কী সেখানে মামলা রুজু করতেন?
৩। ফারূকী আদালত যখন বিশুদ্ধ তখন তাঁর খেলাফতও বিশুদ্ধ। হযরত আলী (রা:) এর নিজস্ব সমস্যা এই আদালতে ওঠানোর দ্বারা তাঁর খেলাফত দিবালোকের ন্যায় বিশুদ্ধ বলেই পরিগণিত।
৪। উপরিউক্ত ঘটনা দ্বারা প্রতীয় মান হচ্ছে হযরত আলী ও ফারূকে আযম (রা:) এর সাথে সখ্য ছিল। তাদের মাঝে কোন প্রকার শক্রতা, দ্বেষ ছিল না। ছিল আন্তরিকতা, হৃদ্যতা।

Sunday, 23 June 2019

বিচার -আচার ও ফতোয়া সংক্রান্ত

রাষ্ট্রীয় কায় -কারবারে শ্রেণি বিন্যাস ও শাখা -প্রশাখা বন্টনের একটি ব্যাপার রয়েছে। রয়েছে মন্ত্রনালয় গঠনের। যেমন: শিক্ষা মন্ত্রণালয়, আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়। খোলাফায়ে রাশেদার যুগেও এসব মন্ত্রনালয় বিদ্যমান ছিল। সেই সব মন্ত্রনালয় অনেকের স্কন্ধে অর্পিতও ছিল। দায়িত্ব বন্টনের কথাগুলো বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায়। যেমন:--
সুনানে সাঈদ ইবনে মনসুর ও সুনানে কোবরায়ে বায়হাকী -এ হযরত উমর (রা:) এর একটি ভাষণের উদ্ধৃতি লক্ষ্য করা যায়।  জাবিয়া -এ তিনি ভাষণটি প্রদান করেছিলেন। তাঁর ভাষ্য -
"আমীরুল মুমিনীন উমর (রা:) ইবনুল খাত্তাব (রা:) সিরিয়ার জাবিয়ায় জনগনের উদ্দেশে ভাষণ -এ বলেন, যিনি কিরাতুল কোরআন বিষয়ে কিছু জানতে চান তিনি উবাই ইবনে কা'ব (রা:) এর কাছে যাবেন। যিনি হালাল -হারামের বিধান সম্পর্কে জানতে চান তিনি মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা:) এর কাছে যাবেন। যিনি ফারায়েজ (পরিত্যক্ত সম্পতি বন্টন নীতি)  সম্পর্কে জানতে চান তিনি যায়দ ইবনে ছাবিত (রা:) এর স্মরণান্ন হবেন। আর যিনি অর্থবিষয়ে কিছু জানতে চান তিনি আমার থেকে জেনে নেবেন। আল্লাহপাক অর্থবিষয়ে আমাকে অর্থমন্ত্রী করেছেন। প্রথমে
আমি নবীজী (সা:) এর প্রিয়তমা স্ত্রীদের পাওনা
আদায় করব। এরপর মুহাজিরদের অধিকার আদায় করব,  যাদেরকে তাদের ঘরদোর থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল। সবশেষে আনসারদের অধিকার আদায় করব। উপরিউক্ত বর্ণনায় শিক্ষার বিভিন্ন দিকের একটা নকশা পেশ করা হয়েছে। পাশাপাশি সরাসরি খলীফার হাতে অর্থ বিভাগটি রেখে দেওয়ার আলোচনাটিও উঠে এসেছে।
তাবাকাতে ইবনে সায়াদের একটি বর্ণনায় আইন ও বিচার বিভাগ সম্পর্কেও একটি বর্ণনা করা হয়েছে। বর্ণনাটি 'সিদ্দীকী অংশে ' বিস্তারিত আকারে বর্ণনা করা হয়েছে। বর্ণনাটির এক অংশ এমন --
"আবু বকর সিদ্দীক (রা:) এর পর হযরত ওমর (রা:) খলীফা হন এবং রাষ্ট্রের অভিভাবকত্ব গ্রহণ
করেন। আইন ও বিচার বিভাগ -এ হযরত ওসমান ইবনে আফফান, আলী ইবনে আবু তালেব, আব্দুর রহমান ইবনে আওফ, মুয়াজ ইবনে জাবাল,  উবাই ইবনে কায়াব ও যায়দ ইবনে ছাবেত রাযি আল্লাহু আনহুম কে ডেকে পাঠান।
বর্ণনাটির উদ্দেশ্য হচ্ছে, কোন কোন মুহাজির যেমন কাজী ও মুফতি ছিলেন তেমনি কোন কোনও আনসারীও এ পদে আসীন ছিলেন। উভয়
গ্রুপের মাঝে কোনও গ্রুপিং ছিল না। ছিলনা কারো ওপর কারে প্রধান্যও। একমত একপথ ও
একসাথে তারা কাজ করতেন।
ফারুকী খেলাফতে ও হযরত আলী (রা:) এর মর্যাদা ছিল সর্বোচ্ছ। ইবনে কাছীরের ভাষ্য --
"১২ হিজরীর জুমাদাল উখরার ৮ দিন বাকী থাকতে মঙ্গলবার হযরত উমর (রা:) খলীফা হন। মদীনাবাসী হিসাবে তিনি হযরত আলী (রা:) কে নিয়োগ দেন। আর সিরিয়ায় তার নায়েব হিসাবে
হযরত আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা:) কে নিযুক্ত করেন।
এরদ্বারা জানা গেল হযরত আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর ফারুক (রা:) এর সাথে হযরত আলী (রা:) এর সুসম্পর্ক ছিল। তাঁদের দু'জনার মাঝে কোন প্রকার শক্রতা, হিংসা,  দ্বেষ  কিংবা মনোমালিন্য ছিলনা। থাকলে তা অজানা থাকত না। থাকলে তিনি হযরত আলী (রা:) কে মদীনার কাজী বানাতেন না।

উমর ও ইবনে উমরের মুখে আলী -কীর্তন

হযরত উমর (রা:) এর পুত্র ইবনে উমর (রা:) এর কাছে এসে জনৈক ব্যক্তি হযরত আলী (রা:) এর বিরুদ্ধে কুৎসা ও নিন্দামন্দ গাইতে লাগলে হযরত ইবনে উমর (রা:) নিম্নোক্ত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন -
" ইবনে উমর (রা:) এর কাছে এসে নাফে ইবনে আযরাক বলতে লাগল, আমি হযরত আলী (রা:) বিদ্বেষী। তাঁকে আমি ঘৃণা করি।  কথাটি শুনে হযরত ইবনে উমর (রা:) বললেন,  আল্লাহ তোমাকে ঘৃণা করুক। তোমার প্রতি বিদ্বেষী হোক, তুমি এমন এক ব্যক্তির প্রতি বিদ্বেষী যার ইসলামের গোড়ার দিকের করা একটি নেকী দুনিয়া ও তৎমধ্যস্হিত সবকিছুর চেয়েও সেরা।
"হযরত উমর (রা:) এর সামনে হযরত আলী (রা:)
এর নামোল্লেখ করা হলে তিনি বলেন,  আলী (রা:) রাসূলুল্লাহ (সা:) এর জামাতা। হযরত জিবরীল (আ:) আল্লাহর পক্ষ থেকে নবীজীর কাছে ফরমান এনেছিলেন, তিনি যন হযরত আলী (রা:)
এর সাথে ফাতেমাকে বিয়ে দেন।
"ইমাম যাইনুল আবিদীন তাঁর পিতা হযরত হুসাইন (রা:) এর থেকে বর্ণনা করেন, হযরত ওমর (রা:)
বলেছেন, বনি হাশেম (নবী বংশ) এর সেবা করা সুন্নত আর তাদের সাক্ষাৎ করা উত্তম কাজ।
 শায়খ সদূক তার আমালী কিতাবে ওমর (রা:) এর মুখে আলী বন্দনার কথা তুলে ধরেন এভাবে -
  "হুযুর (সা:) হযরত আলী (রা:) হাত ধরে বললেন, মুমিনদের বিষয়ে আমি কী অধিক হকদার নই? সাহাবায়ে কেরাম বললেন, কেন নয়? পরে তিনি বললেন,  আমি যার বন্ধু তার বন্ধু আলী (রা:) ও।  নবুওয়াতি এই ফরমান শুনে হযরত ওমর (রা:) বললেন,  শাবাস। আপনি আমার ও সকল মুসলমানের প্রিয়পাত্র সাব্যস্ত হলেন।
এবার এমন কিছু কর্ণনা যা শীয়া -সুন্নী সকলের কিতাবে সমন্তরাল সন্নিবেশিত আছে। এর  কিছু নমুনা --
  "একবার হযরত ওমর (রা:) এর উপস্হিতিতে
এক লোক হযরত আলী সম্পর্কে খারাপ মন্তব্য করছিল।  এ সময় ওমর (রা:) বললেন, তুমি এই
কবরের বাসিন্দাকে চেন?  ইনি মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ (সা:)। ইনি আব্দুল মোত্তালেবে নাতি।
হযরত আলী (রা:) ও তার নাতি। তাই আলী (রা:)
কে নিয়ে ভাল বিনে খারাপ কোনও মন্তব্য করো না। তুমি আলী (রা:) কে কষ্ট দিলে কেমন যেন
কবরবাসী মুহাম্মাদ (সা:) কেই কষ্ট দিলে ।

Saturday, 22 June 2019

আবু বকর (রা:) ও উমর (রা:) জগৎসেরা মানব

আমীরে মুয়াবিয়া (রা:) এর পক্ষ থেকে আলী (রা:) এর নামে হযরত আবু মুসলিম খাওলানী (রা:) যে পত্র কুফায় নিয়ে আসেন তাতে হযরত আলী (রা:) প্রথম খলীফা হযরত আবূ বকর (রা:) ও দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর ফারুক (রা:) এর বড়ত্ব ও মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন --
"মুয়াবিয়া! যেমনটা আপনি বর্ণনা করেছেন ইসলামে সবচেয়ে সেরা ও আল্লাহ -রাসূলের প্রতি সর্বাধিক ন্যায় নিষ্ঠ খলীফা ছিলেন হযরত আবূ বকর (রা:)। এরপর দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর ফারুক (রা:)। আমর জীবনের কসম করে বলি, ইসলামে তাঁদের দু'জনার মর্যাদা বিশাল। তাঁদের হারিয়ে ইসলাম অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন। আল্লাহ তাআলা তাঁদের প্রতি দয়া পরবশ হোন। তাঁদেরই আমলের দারুন আল্লাহ তাঁদের উত্তম
প্রতিদান দিন।
             খলীফা উমর (রা:) ফিৎনাবিদূরক
 শেরে খোদা হযরত আলী (রা:) ওই খুৎবা যা নাহজুল বালাগায় বিবৃত হয়েছে -বার বার পঠনযোগ্য। খুৎবার প্রতিটি হরফে হযরত উমর
(রা:) এর গুনগান ফুটে উঠেছে --
 "হযরত আলী (রা:) বলেন, অমুক ব্যক্তির শহরে আল্লাহপাক বরকত দিন। তাকে নিরাপদ রাখুন যিনি বক্রতাকে বন্ধুত্বে রূপ দিয়েছেন। রুগ্নকে করেছেন সুস্হ। সুন্নাহ চালু করেছেন। ফেৎনা করেছেন বিদূরিত। তাঁর দরুনই এই বিশ্ব শুচিশুদ্ধ
হয়েছে। সামান্য দোষত্রুটি নিয়েই তিনি পরলোক গমন করেছেন। খেলাফতের স্বর্ণালী যুগ দর্শন করেছেন তিনি। খেলাফত কলুষিত হবার পূর্বেই জগৎ -মায়া ত্যাগ করেছেন। আল্লাহর নিরষ্কুশ
আনুগত্য করেছেন তিনি। খেলাফতের পরতে পরতে আল্লাহর অধিকার পতিষ্ঠিত তরেছেন। নাহজুল বালাগাহর ব্যাখ্যা গ্রন্হে ইবনে আবীল হাদীদ বলেন, একজন ইনসাফগার মানুষ গভীরভাবে ভেবে চিন্তে আপনার মনে কোন কুধারণা না রাখলে দেখবে উপরিক্ত গুণাবলী দ্বারা
হযরত আলী (রা:) দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর (রা:) কেই বুঝিয়েছেন।
 এদিকে হযরত আলী (রা:) তাঁর নানা খুৎবা ও বক্তব্য ও বাণীতে হযরত উমর (রা:) সম্পর্কে যা যা বলেছেন এর সার -নির্যাস নিম্নরূপ --
  ১। রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে হযরত উমর (রা:) সঠিক ও
তড়িৎ কার্যকরি সিদ্ধান্তদাতা।
 ২ । তিনি কূ -রিপুর যুৎসই চিকিৎসা করেছিলেন।
 ৩ । যাবতীয় কাজে সুন্নাহকে প্রাধান্য দিতেন।
 ৪ । অনিন্দ সুন্দর পরিকল্পনায় যে কোন ফেৎনা গজিয়ে ওঠার পূর্বেই তা মূলোৎপাটিত করতেন। 
 ৫ । ভর্ৎসনা পষ্কিলতা থেকে মুক্ত ছিলেন তিনি।
যা তাঁর চরিত্রের পবিত্রতা ও সততার অনবদ্য দিক।
 ৬ । দোষ -ক্রুটির মাঝে খুব কমই লিপ্ত দেখা গেছে তাঁকে।
 ৭ । খেলাফতের মসনদে থাকাকালীন তিনি কল্যাণ ও ইনসাফের প্রতিভূ ছিলেন।
৮ । আল্লাহ তাআলার যথাযথ আনুগত্য করতেন।
৯ । আল্লাহর ধর -পাকড়ের পতি তটস্হ থাকতেন। ১০।  জন মানুষকে একটি ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্মে দাঁড়  করিয়ে তবেই তিনি আখিরাতমুখো হয়েছিলেন।।

হযরত আলী (রা:) এর মুখে উমর -বন্দনা

হযরত উমর (রা:) সম্পর্কে বিভিন্ন হাদীসের কিতাবের মানাকেব (গুনাবলী) অধ্যায়ে বলা হয়েছে যে, সত্য ও সাধকত্বের স্পিরিটি আল্লাহপাক হযরত উমর (রা:) অতি উত্তমরূপে দান করেছেন। সত্য কথা বলা, সত্যকে গুরুত্ব দেওয়া হযরত উমর (রা:) এর প্রকৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এ প্রসংগে নবী করিম (সা:) এর ভাষ্য:
 "আল্লাহ তাআলা উমর (রা:) মুখ ও অন্তরে সত্য ও সঠিকত্ব সেঁটে দিয়েছেন।
প্রিয়নবী (সা:) এর এই বাণী -বন্ধনী বর্ণনার পর আমরা তাঁরই জামাতা ও চাচাত ভাই নবী পরিবারের প্রধানতম সদস্য হযরত আলী (রা:) এর বক্তব্য শুনব যাতে তিনি ফারুকে আযম (রা:) এর অকৃত্রিম র্কীতন গেয়েছেন ও আন্তরিক বন্দনা করেছেন। আলী (রা:) বলেন, আমরা এতে কোন সন্দেহ পোষণ করতাম না যে,  (কুদরতের পক্ষ থেকে) হযরত উমর (রা:) এর যবানে প্রশান্তি নাযিল হয়। এবং তাঁর অন্তরে (গায়বের পক্ষ থেকে) সান্ত্বনা বদ্ধমূল  হয়। এজন্য তাঁর প্রতিটি বিষয়ে কেমন যেন কুদরতের পক্ষ থেকে সঠিকত্বের ফায়সালা আসে। নিম্নবর্ণিত স্হানে হযরত আলী (রা:) থেকে বিদগ্ধ ওলামায়ে কেরাম উমর (রা:) কীর্তন ও বন্দনা নকল করেন --
      উপরিউক্ত রেওয়ায়েতসমূহের সার -সংক্ষেপঃ
হযরত আলী (রা:) বলেন, সৎকর্মশীল লোকদের নামোল্লেখ করা হলে সেখানে হযরত উমর (রা:) এর নামোল্লেখ করতেই হয়। নবীজীর সাহাবার মনে করতেন হযরত উমর (রা:) এর জিভে প্রশান্তি নাযিল হয় (অর্থাৎ এমন জিনিষ নাযিল হয় যাতে মন-মুকুড়ে প্রশান্তি ও হৃদয়ে স্বস্তি আসে।)  আর
কুদরতের পক্ষ থেকে তার জিভ সত্য কথার জন্যই সৃজিত।
এছাড়া নবী করিম (সা:) থেকে হযরত আলী (রা:) বর্ণিত নিম্নোক্ত হাদীস খানাও প্রনিধানযোগ্য --
 "উমর (রা:) এর প্রতি আল্লাহ দয়া পরবশ হোন মানুষে তিক্ত হলেও তিনি সত্য কথাটিই বলে যান। সত্য কথনের এই খাসলতের দরুন দুনিয়াতে তার কোন বন্ধু ছিল না।
  উপরোক্ত বর্ণনাসমূহের সার -নির্যাষ
  ১. হযরত উমর (রা:) এর সততা ও সঠিকতার স্বাক্ষ্য নবুওয়াতি জিভ ও তাঁর নেতৃত্বের অপার গুনাবলীই দিয়েছে।
২ . হযরত আলীসহ সকল সাহাবা (রা:) ই হযরত উমর (রা:) এর এই সত্য ও ন্যায় নিষ্ঠার অনুন্ঠ স্বাক্ষ্য দিয়েছে।
             অষ্টম অনুচ্ছেদ
শীয়াদের কিতাবে আলী (রা:) এর মুখে উমর (রা:) এর গুণ -কীর্তন  ইতোপূর্বে আমরা হযরত আলী (রা:) এর মুখে হযরত উমর (রা:) এর গুণাবলী সুন্নী কিতাবের আলোকে বর্ণনা করেছি। এক্ষণে আমরা শীয়াদের রচিত এই বিষয়ের পাতাগুলোর প্রতি নজর বুলাব। উমর (রা:) এর কীর্তন গাঁথা তাদের কিতাবে থাকলে সেটা বোধকরি বিপক্ষ বন্ধুদের মনে স্বস্তিই দেবে। আসুন দেখা যাক একে একে।
"নাহজুল বালাগাহ' - এ আলী (রা:) এর ফরমান এভাবে লেখা হয়েছে --
"হযরত উমর (রা:) মুসলমানদের খলীফা হলেন। সুতরাং তিনি দ্বীন কায়েম করলেন এবং নিজেই সেই দ্বীনের ওপর সুপ্রতিষ্ঠ রইলেন। উট যেভাবে (আরামের জন্য) জমিনে গর্দান রেখে বসে পড়ে দ্বীন ঠিক সেভাবেই সুপ্রতিষ্ঠ  হল।

উমর (রা:) সঠিক সিদ্ধান্তদাতা: মন্তব্য আলী (রা:) এর

হযরত আলী (রা:) এর বিবেচনায় হযরত উমর (রা:) একজন সঠিক সিদ্ধান্তদাতা ছিলেন। 'তারীখুল কাবীরে ইমাম বুখারীর ভাষ্য:
 "আব্দে খায়র বলেন, আমি হযরত আলী (রা:) থেকে শুনেছি, হযরত উমর (রা:) উত্তম কাজের অবকাশ দেওয়া হয়েছে। খেলাফতবিষয়ে তিনি সঠিক ও তড়িৎ সিদ্ধান্তদাতা ছিলেন। হযরত উমর (রা:) এর মিমাংসিত সিদ্ধান্ত গুলোয় আমি কোন প্রকার পরিবর্তন আনবনা।
একবার নাজরানের একদল খ্রিস্টান প্রতিনিধি হযরত আলী (রা:) এর খেদমতে হাযির হল। হযরত আলী (রা:) এ সময় কথা প্রসংগে হযরত উমর (রা:) কে সঠিক সিদ্ধান্তদাতা ও প্রত্যুৎপন্নমনা বলেন।
"নাজরানে বসবাসরত খ্রীস্টানদের সংখ্যা ৪০ হাজারের কাছাকাছি ছিল। তাদের মাঝে আত্মকলহ, হিংসা -দ্বেষ ও মতানৈক্য সৃষ্টি হয়েছিল। তারা হযরত উমর (রা:) এর দরবারে এসে আরজ করলেন, আমাদেরকে এই এলাকা থেকে স্হানান্তরিত করে দেওয়া হোক। মুসলমানদের শান্তি নিরাপত্তার স্বার্থে এদেরকে হুমকী মনে করতেন হযরত উমর (রা:)। ( তারা অনেক ঘোড়া ও অস্ত্র -সস্ত্র জমা করেছিল) আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর (রা:) এদের আবদারকে সুবর্ণ সুযোগ করেন করে তৎক্ষণাৎ দেশান্তর করে দিলেন। (অর্থাৎ ইয়ামানী নাজরানীদের ইরাকী নাজরানী বানিয়ে দিলেন। ইয়ামান থেকে ইরাকে স্হানান্তর করলেন) । কিন্তু
পরবর্তীতে এই দেশান্তর তাদের মর্মপীড়ার কারণ হল। তারা এই আত্মঘাতি বোকামিমূলক সিদ্ধান্তে অনুতপ্ত হল। কাজেই তারা হযরত উমর (রা:) এর
কাছে পূর্ব সিদ্ধান্ত বদলাবার জন্য আবদার জানাল, হযরত উমর সরাসরি এই আবদার প্রত্যাখ্যান করে দিলেন। পরে হযরত আলী (রা:) খলীফা হলে নাজরান প্রতিনিধি এসে সাবেক খলীফার সিদ্ধান্ত বদলাতে আবেদন রাখল। বলল, আমরা কসমপূর্বক বলছি এই চুক্তি আপনার হাতে দিয়েই নবীজী (সা:) লেখিয়েছিলেন। এতে আপনার সুপারিশও ছিল। এক্ষণে সেই চুক্তির আবার পুনঃবাস্তবায়ন হোক। অর্থাৎ আমাদের স্বদেশে ফিরে আসার সুযোগ করে দেওয়া হোক। হযরত আলী (রা:) এদের উত্তরে বললেন, উমর ইবনুল খাত্তাব সঠিক ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত দিতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। আমি তাঁর বিরুদ্ধে যেতে পারব না। তাঁর দেওয়া সিদ্ধান্তই বলবৎ থাকবে। বর্ণনাকার সালেম ইবনে আবুল জা'দ বলেন, হযরত আলী (রা:) এর চরিত্র যদি হযরত উমর (রা:) এর ভর্ৎসনা ও নিন্দামন্দে আগ্রহী হত তাহলে নাজরানী খ্রীস্টানদের উপরিউক্ত ব্যাপারে অতি অবশ্যই তাঁর জন্য উত্তম সুযোগ ছিল। কিন্তু নবী পরিবারের এই সদস্য এখানে এতটুকু সুযোগ নিলেন না। উল্টো তাঁকে সমর্থনই করে গেলেন।
              হযরত আলী (রা:) এর কুফা আগমন
উপরোক্ত অনুচ্ছেদের আওতায় হযরত আলী (রা:) এর কুফা আগমনের একটি ঘটনা উল্লেখ করা যায়। যা জনৈক শীয়া আলেম 'আখবারুক তিওয়াল' -এ উল্লখ করেছেন। ঘটনাটি এমর --
  "হযরত আলী (রা:) ২৬ হিজরীর ১২ রজব আগমন করেন। লোকেরা আরজ করল, আমীরুল মুমিনীন! আপনি রাজ প্রাসাদে অবস্হান করবেন কী? বললেন, আমার ওখানে অবস্হান করার জরুরত নেই। কেনান হযরত উমর  (রা:) এ ধরনের প্রাসাদে বসবাসে অনীহা ছিলেন। তারচেয়ে আমি একটি সাধারণ ঝুপড়িতে থাকব। পরে তিনি জামে মসজিদে তাশরীফ নেন। ওখানে দু'রাকাত নামায আদায় করেন। অবশেষে তিনি ঝুপড়িতে যান।

Thursday, 20 June 2019

জনদরদী উমর (রা:)

আল্লামা ইবনুল কায়্যিম জওযী (রহ:) 'সীরাতে উমর ইবনুল খাত্তাব' (রা:) শীর্ষক পুম্তকে হযরত উমর (রা:) এর খোদাভীতির একটি ঘটনা বর্ণনা করেন, যাতে হযরত আলী (রা:) এর মূত্রে বর্ণিত
ঘটনাটি নিম্নরুপ  --
 "আমীরুল মুমিনীন আলী (রা:) বর্ণনা করেন, হযরত উমর (রা:) এর খেলাফতকালে তাঁকে একবার আমী ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে কোথাও যেতে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় যাচ্ছেন আমীরুল মুমিনীন! জবাবে হযরত উমর (রা:) বললেন, বায়তুল মালের সদাকার একটি উট হারিয়ে গেছে, সেটির সন্ধানে যাচ্ছি। হযরত আলী
(রা:) উত্তর শুনে বললেন, আপনি পরবর্তী খোলাফা ও স্হলাবর্তীদের অপদস্হতা ও কষ্টে ফেলে যাচ্ছেন। হযরত উমর (রা:) বললেন,  না আবুল হাসান, তুমি ভর্ৎসনা করনা। ব্যাপারটি তিরস্কৃত হবার মত নয়। কসম সেই সত্ত্বার যিনি মুহাম্মাদ (সা:) কে নবী করে প্রেরণ করেছেন -যদি একটি বকরী -শাবকও ফুরাতের তীরে গিয়ে হারিয়ে যায় তাহলে এর জন্য শীয়ামত দিবসে উমরকে জবাবদিহি হতে হবে।
                            প্রাসঙ্গিক আলোচনা
হযরত আলী (রা:) পবিত্র মুখের বর্ণনা দ্বারা অনুধাবন করা গেল বায়তুল মালের সদকার পশুগুলোর খোজ -খবরও মাঝেমধ্যে হযরত উমর (রা:) রাখতেন এবং এতে তিনি বিন্দুমাত্র অলসতা
করতেন না।
   দ্বিতীয়ত: হযরত উমর (রা:) অশ্রুতপূর্ব দীনদারীর আলোচনা বেশ গৌরব করেই জাতির সামনে পেশ করছেন হযরত আলী (রা:)।
  তৃতীয়ত: শীয়ামতের হিসাব -নিকাশ নিয়ে হযরত উমর (রা:) এর খোদাভীতি ও এর দ্বারা আচঁ করা গেল।
চতুর্থত: রেওয়াতটি আমাদের বলে দিচ্ছে, হযরত উমর ও নবী পরিবারের সদস্য হযরত আলী (রা:)
এর মধ্যে চমৎকার বোঝাপড়া ও বন্ধুত্ব ছিল।

Wednesday, 19 June 2019

উমার ইবন খাত্তাব (রা:) এর সম্পর্কে স্বীয় খেলাফতকালে হযরত আলী (রা:) এর ভাষ্য :

পূর্ববর্তী দু'বর্ণনায় হযরত আবূ বকর (রা:) এর অন্তিমলগ্নে আমরা হযরত আলী (রা:) এর স্বীয় মতামত জেনেছি।  এক্ষণে খোদ তাঁর নিজ খেলাফতকালীন এতদ্বিষয়ক মন্তব্য জানব। দুটি
বর্ণনা দু'জন মহান সুন্নী ইমামের অপর একটি ঘটনা জনৈক শীয়া  ইমামের। যার প্রতি শীয়া ভাইদের যথেষ্ট অনুরাগ, যার কিতাবের প্রতি তাদের প্রচুর ভরসা।
মুহাদ্দিস ইসহাক ইবনে রাহওয়াই (মৃ: ২৩৮) এর বর্ণনা :
'কানযুল উম্মাল' প্রণেতা 'ফিতান অধ্যায়ে ' উষ্ট্রের যুদ্ধ' শিরোনামের অধীনে বর্ণনাটি এনেছেন। ইতোপূর্বেও রেওয়ায়েতটি উল্লেখ করা হয়েছে। বর্ণনাটি জনৈক আব্দুল্লাহ ইবনুল কাতয়াও ইবনেআব্বাদ -এর প্রশ্নের জবাবে হযরত আলীর ভাষ্যসম্বলিত। হযরত আলী (রা:) বলেন --
"হযরত আলী (রা:) বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সা:) ইন্তেকাল করলে মুসলমানেরা খেলাফত প্রসংগে ভাবনায় পড়লেন। মুসলমানেরা চিন্তা করে দেখলেন রাসূলুল্লাহ (সা:) যেখানে দ্বীনি বিষয়ে (নামাযে) হযরত আবূ বকর (রা:) কে ইমাম বানিয়েছেন সেখানে দুনিয়াবী (রাষ্ট্রীয়) বিষয়েও তাঁকে ইমাম (খলীফা) বানানো উচিত সুতরাং মুসলমানেরা তাঁর হাতে বায়াত নিলে আমিও তাঁর হাতে বায়াত নিলাম। তিনি আমাকে যে যে জিহাদে প্রেরণ করেছেন আমি তার আদেশকে শিরোধার্য করে সে সে জিহাদে অংশগ্রহণ করেছি। তিনি আমাকে যে দান -দক্ষিণা দিয়েছেন সানন্দে তা গ্রহণ করেছি। এই আবূ বকর (রা:) তাঁর অন্তিম লগ্নে হযরত উমর ইবনে খাত্তাব (রা:) এর ব্যাপারে খেলাফত বিষয়ে ইশারা করেন এবং এ বিষয়ে তিনি বিন্দুমাত্র কুন্ঠাবোধ করেননি।
মুসলমানেরা তাঁকে খলীফা নিযুক্ত করলে আমিও
তাঁদের সাথে তাঁর খলীফা নিযুক্তিমূলক বায়াত নিই। (পরে হযরত উমার (রা:) এর নিযুক্ত ছয় সদস্যবিশিষ্ট কমিটি যাতে আমিও ছিলাম সেক্ষেত্রে হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা:) ওসমান ইবন আফফান (রা:) এর হাতে বায়াত নেন। এ সময় আমি ভাবনায় পড়ে যাই, আমার  অঙ্গীকার আমার বায়াত থেকে অগ্রগামী। সুতরাং আমি হযরত ওসমান (রা:) এর হাতে বায়াত নিই এবং খেলাফত প্রসঙ্গটিকে সানন্দে তাঁর কাঁধে তুলে দিই। সুতরাং যে কোনও জিহাদী
জরুরতে তিনি আমাকে ডেকে পাঠালে আমি তাতে সাড়া দিয়ে এসেছি। পক্ষান্তরে যুদ্ধলব্ধ মালের তিনি আমাকে যতটুকু যা দিয়েছেন (সন্তুষ্টচিত্তে) তাই গ্রহণ করেছি।
           হাদীস বিশারদ আবূ আওয়ানার ভাষ্য
আবূ তালিব আল -আশারী "ফাযাইলু আবি বাকরিনিস সিদ্দীক" অধ্যায়ে নিজস্ব সনদে বিখ্যাত মুহাদ্দিস আবূ আওয়ানার সূত্রে এই রেওয়ায়েত করেন --
"আবদুর রহমান ইবন আবূ বাকরাহ বলেন,  আমার সেবা করতে একবার হযরত আলী (রা:) এলেন, (ওই সময় খেলাফত প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা চলছিল) তিনি বললেন, 'রাসূলুল্লাহ (সা:) ইন্তিকাল করলে লোকেরা হযরত আবূ বকর (রা:) এর হাতে বায়াত নিল। আমিও  সন্তুষ্টচিত্তে বায়াত হই। পরে আবূ বকর (রা:) তাঁর জীবদ্দশায় হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রা:) কে খলীফা নিযুক্ত করলে আমিও  সন্তুষ্ট চিত্তে তাঁর হাতে বায়াত হই। এদিকে হযরত উমার (রা:) ইন্তেতালের পূর্বে একটি 'মজলিশে  শুা' বানিয়ে দেন। ওই শুরা হযরত উসমান (রা:) কে খলীফা সাব্যস্ত করলে আমিও সন্তুষ্ট চিত্তে তাঁকে খলীফা মেনে নিই।
পাঠকবৃন্দের আত্মিক প্রশান্তির জন্য এটুকু বলা যায় যে, হযরত ফারূকে আযম (রা:) ইন্তিকালের পূর্বে যে,  মজলিসে শুরা গঠন করেছিলেন তাতে
প্রথম নম্বরে হযরত আলীর নামোল্লেখ করেছিলেন। সিংহভাগ মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিক ঘটনাটি এভাবেই উদ্ধৃত করেছেন। মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক খ: ৫ পৃ:  ৪৭৭ -৮০ এও ঘটনাটি উল্লেখ আছে যা এই বইয়ের 'ওসমান অধ্যায়ে' উল্লেখ করা হবে ইনশাআল্লাহ।
উপরোল্লিখিত বর্ণনাসমূহের পর এবার আমরা শীয়া বন্ধুদের প্রিয় লেখনী যা আমাদের এই প্রসংগের সত্যায়ন কারী উল্লেখ করব। আশাকরি
এ বর্ণনার পর আর কোনও বর্ণনার প্রয়োজন পড়বে না।
        "'আমালীয়ে শায়খ" তুসীর বর্ণনা
 বর্ণনাটির সময় ও স্হান হল 'জংগে জামাল'। এই যুদ্ধে পরাজিত অংশটি হযরত আলী (রা:) সম্মুখে নীত হয়ে ওযর পেশ করলে তিনি তাদের থামিয়ে নিজ ভাষণ শুরু করেন, তাতে তিনি বলেন --
  "আমার থেকে বিমুখ হয়ে তোমরা আবূ বকর (রা:) এর হাতে বায়াত নিলে। আমিও  সেমতাবস্হায় বায়াত নিলাম। পরে তোমরা যেভাবে উমার ইবন খাত্তাব (রা:) এর হাতে বায়াত নিয়ে আমিও  সেভাবে নিলাম এবং সে বায়াতের অধিকারও পুরোপুরি বাস্তবায়ন করেছিলাম। পরে হযরত উমার (রা:) এর প্রতি নৃশংস হামলা হলে তিনি ৬ সদস্যবিশিষ্ট একটি সাব -কমিটি করে দিয়েছিলেন এবং তাকে আমাকেও অন্তর্ভূক্ত করেছিলেন। পরে তোমরা উসমান ইবনে আফফান (রা:) এর হাতে বায়াত নিলে আমিও নিয়েছিলাম।

ফারূকে আযম (রা:) এর হাতে আলী (রা:) এর বায়াত

হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) এর প্রতি যেভাবে হযরত আলী (রা:) দ্রুত বায়াত নেয়ার ঘটনা ইতোপূর্বে দলিলসহ বিবৃত হয়েছে,  এখানেও সেভাবে হযরত আলী (রা:) এর হযরত ফারূকে আযম (রা:) কে খলীফা  মেনে নেয়ার বায়াত প্রসংগত আলোচনা হবে ইনশাআল্লাহ।
সিদ্দীকে আকবারের ইন্তেকালপূর্ববর্তী  অবস্হা সিদ্দীকে আকবার (রা:) তাঁর অন্তিমলগ্নে যেখানে আত্মীয় বন্ধু -বান্ধব নানা অসিয়ত -নসিহত করেছেন সেখানে বিশেষ করে মুসলমানদের খেলাফত বিষয়ের প্রতিও বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। ইসলাম ও মুসলমানদের কল্যাণ কামনায় তিনি তাঁর স্হলাভিষিক্ত হিসেবে হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা:) কে নির্বাচিত করত: হযরত ওসমান (রা:) এর হাতে মুসলমানদের নামে একটি ফরমান লিখেন। তাকে লেখা ছিল,  যে লোককে আপনাদের আমীর নাযুক্ত করা হচ্ছে -তাঁকে আপনারা মেনে নিবেন কী?  এই ফরমান শুনে সকল মুসলমানেরা সমস্বরে হ্যাঁ সূচক জবাব দিয়েছিলেন। হযরত আলী (রা:) ওই সময় বলেছিলেন,  হযরত ওমর (রা:) কে খলীফা নিযুক্তির কথা হলে ভাল। নয়ত অন্য কাউকে খলীফা বানানো হলে আমি মেনে নেব না। সুতরাং ওই সময় সকলের সামনে হযরত ওমর (রা:) এর খলীফা নির্বাচনের বিষয়টি জানিয়ে দেওয়া হল। সকল মুসলমান স্বতঃস্ফুর্তচিক্তে হযরত ওমর (রা:) কে খলীফা মেনে নিলেন। তন্মধ্যে হযরত আলী (রা:) ও ছিলেন।
এই ঘটনাটি সকল ওলামাই উল্লেখ করেছেন। 'তারাকাতে ইবন সা'দ' --এ ঘটনাটি মোটামুটি সংক্ষেপে বর্ণনা করা হয়েছে। অন্যান্য ঐতিহাসিকগণও ঘটনাটির অথেনটিক বর্ণনা দিয়েছেন। সুধী পাঠককুলকে আমরা এক্ষণে সেই উদ্ধৃতিগুলোর দিকেই নিয়ে যেতে চাই।
ঐতিহাসিক ইবন সা'দ তাঁর 'তাবাকাত' গ্রন্হে বলেন --
 "সংক্ষিপ্তসার এই যে, সিদ্দীকে আকবরের হুকুমে হযরত ওসমান (রা:) মোহরাঙ্কিত একটি পত্র সিদ্দীক (রা:) এর দৌলতখানা থেকে। প্রকাশ করেন। উমার ইবনুল খাত্তাব (রা:) এবং উসায়দ আল -কুরাযী তাঁর সাথে ছিলেন। হযরত ওসমান (রা:) সিদ্দীকে আকবর (রা:) এর পক্ষ থেকে জনগণকে একথা  বলেন যে, তোমরা এই প্রস্তাবিত ব্যক্তির বায়াত নিতে রাযী আছে কী? সকল লোকেরা বলেছিল, অতি অবশ্যই আমরা তাঁকে মেনে নেব এবং বায়াত হব। তন্মধ্যে কেউ কেউ (বলে হয় হযরত আলী (রা:) ও তন্মধ্যে অন্যতম) এ কথা বলেছিলেন,  সেই ব্যক্তিকে আমরা চিনি ও জানি,  তিনি হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রা:)। সকলে হযরত উমার (রা:) কে মেনে নিলেন এবং তাঁর বায়াতে সন্তোষ প্রকাশ করলেন। ঠিক এই ধরনের বিবরণ পেশ করছেন নিম্নোক্ত ঐতিহাসিকবৃন্দও।
ঐতিহাসিকদের ভাষ্য এই যে, "হযরত আবূ বকর (রা:) এর ইন্তেকালের সময় ঘনিয়ে এলে তিনি ঘরের বেলকনি থেকে মানুষের উদ্দেশে কিছু বলার জন্য ঝুকলেন। বললেন, (খেলাফত প্রসংগে) আমি একটি পরিকল্পনা করেছি, তোমরা কী এর প্রতি অকুন্ঠ সন্তুষ্ট? লোকেরা উত্তর দানপূর্বক বলল,হে আল্লাহর রাসূলের খলীফা! আমরা এ কথার প্রতি অকুন্ঠ ও সন্তুষ্ট। হযরত আলী (রা:) এ সময় বললেন, ( খেলাফত প্রসংগে) আমি হযরত উমার ইবন খাত্তাব (রা:) ছাড়া আর কাউকে মেনে নিতে প্রস্তুত নই।

Tuesday, 18 June 2019

আলী (রা:) এর খান্দানে আয়েশা (রা:) এর নাম

আলাবী খান্দানে খোলাফায়ে রাশেদার নামে নাম রাখা বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনার ইতি টানব হযরত আয়েশা (রা:) এর নামে এই বংশে নাম রাখা নিয়ে। আলী (রা:) অধ:স্তন পুরুষানুক্রমে আয়েশা নামটি রাখতে দেখা যায়। এরই কিছু নমুনা নিচে প্রদত্ত হল।
শায়খ মুফীদ তাঁর 'ইরশাদ' গ্রন্হে লিখেন ইমাম মুসা কাযেম (আ:) এর ১৯ ছেলে ও ১৮ মেয়ে ছিল।  ১৫ নম্বর মেয়ের নাম ছিল আয়েশা বিনতে মুসা  কাযেম (আ:)।
এভাবে শীয়া ভাষ্যকার আরবিলী মুসা কাযেম (আ:) এর ১৯ জন মেয়ের নামোল্লেখ করেন। তিনি ১৬ নম্বর মেয়ের নাম 'আয়েশা' বলে উল্লেখ করেন।  উক্ত আরবিলী ইমাম আলী রেযা (আ:) এরও সন্তানদের নামোল্লেখ করেন। তিনি বলেন,  তার মোট ৫ টি ছেলে ও একটি মাত্র মেয়ে ছিল। মেয়ের নাম আয়েশা বিনতে আলী রেযা (আ:)। তাঁর ভাষ্য --
"তাঁর (ইমাম আলী রেযা)  মোট ৬টি সন্তান। ৫ টি ছেলে ও ১ টি মাত্র মেয়ে। এঁরা যথাক্রমে, মুহাম্মাদ আল -কানে, হাসান, জাফর, ইব্রাহীম, হুসাইন ও আয়েশা।।

ইমাম হুসাইন (রা:) এর সন্তানদের মাঝে আবূ বকর এর নাম

বিশিষ্ট শীয়া ভাষ্যকার ঐতিহাসিক মাসউদী ( মৃ: ৩৪৫ হি:) তার 'আততাম্বীহ ওয়াল আশরাফ' গ্রন্হে লেখেন,  ইমাম হুসাইন (রা:) এর ছেলে সন্তানদের মাঝে ৩ জন কারবালা প্রান্তরে মর্মান্তিকভাবে শাহাদত বরণ করেন।  তারা হলেন -আলী আকবার, আব্দুল্লাহ ও আবূ বকর (রা:) তাছাড়া ইমাম যাইনুল আবিদীনেরও এক সন্তানের নাম ওমর। সবশেষে ইমাম মুসা কাযেম (আ:) এর নাম না নিলেই নয়। তার ২০ জন ছেলে ও ১৮ জন মেয়ে ছিল। এদের ২০ তম ছেলের নাম 'আবূ বকর' বলে ঈসা আরবিলী উলেখ করেছেন।

ওমর (রা:) এর স্ত্রীত্বে ফাতেমা (রা:) এর মেয়ে

আব্দুর রহমান ইবনে আব্দে রাব্বিহি বলেন, মদীনায় এক ব্যক্তিকে ইমাম বাকেরের মজলিসে বলতে শোনলাম,  আপনি আবূ বকর (রা:) ও ওমর (রা:) এর প্রতি কী ধারণা পোষণ করেন? ইমাম বললেন,  আল্লাহপাক আবূ বকর (রা:) ও ওমর  (রা:) দু'জনার প্রতিই রহমত নাযিল করেন।
আমি বললাম, লোকেরা বলে,  আপনি নাকি তাদের দু'জনার প্রতি বিরাগভাজন! তিনি বললেন,  আল্লাহ মাফ করুন,  রব্বে কাবার কসম, এটি যে বলেছে সে মিথ্যাই বলেছে। তুমি কী জাননা আলী মুরতাযা (রা:) ফাতেমার গর্বভজাত সন্তান উম্মে কুলসুমকে।
হযরত ওমর (রা:) এর সাথে বিয়ে দিয়েছেন? উম্মে কুলসুমের মা হযরত ফাতেমা (রা:) , নানী হযরত খাদীজা (রা:) , নানা সরওয়ারে আলম (সা:) , পিতা শেরে খোদা হযরত আলী (রা:)। তিনি সকল গুণের আধাঁর। যদি ওমর  (রা:) সৎ ও মহৎ পাত্র না হতেন তাহলে উম্মে কুলসুম (রা:) কে কিছুতেই তাঁর বিবাহে দেওয়া হত না।
অবশেষে আমরা সিদ্দীক বন্দনায় শীয়াদের বিশিষ্ট আলেম ইবনে বাবুয়ার উদ্ধৃত একটি হাদীস নকল করছি যা ইমাম জাফর সাদেক (রহ:) এর সূত্রে বর্ণিত। বর্ণনাটি এমন --
 "ইমাম হাসান (রা:) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা:)
ইরশাদ করেন,  আবূ বকর (রা:) আমার কর্ণের সমতুল্য, ওমর (রা:) চোখের সমতুল্য আর ওসমান (রা:) হৃদয় সমতুল্য।
 উপরোক্ত হাদিসখানি সুন্নী নয় শীয়াদের বার ইমামের একজনের। সুতরাং এই সম্মান -স্বীকৃতির
পরও কী সিদ্দীকে আকবারের আর কোন মাহাত্ম্য বর্ণনার দরকার পড়ে ?

Monday, 17 June 2019

হযরত হাসান (রা:) ও তাঁর সন্তান প্রসংগে সিদ্দীক (রা:) এর মন্তব্য

হযরত আবূ বকর (রা:) এর খেলাফত কালে সিদ্দীকে আকবার নবী পরিবারের সদস্য হযরত হাসান (রা:) সম্পর্কে মন্তব্য করেন --
  "উকবা বলেন, আমি দেখেছি হযরত আবূ বকর (রা:) হযরত হাসান (রা:) কে কাঁধে তুলে নিয়ে বললেন, ছেলেটা তো দেখছি অবয়ব -আকৃতিতে নবীসাদৃশ -আলী (রা:) এর মত নয়। আলী মুর্তজা (রা:) এ কথা শুনে কেবল হাঁসলেন।
হযরত হাসান (রা:) কে নবীর অবয়বের সাথে তুলনা করার এই কথা আমরা শীয়াদের কিতাবেও দেখি। ঐতিহাসিক ইয়াকুবী তার 'তারীখে ইয়াকূবী শীর্ষক পুস্তকে লিখেছেন --
 "হযরত আবূ বকর (রা:) তাকে বলেছেন, মদীনার কোনও গলিতে দেখে, এ ছেলে তো দেখছি নবীজীর অবয়ব -আকৃতির, আলী (রা:) এর আকৃতির নয়।
এ ঘটনা নবীজীর ইন্তেকালের পরপরই ঘটেছিল। তাদের মধ্যে যদি শত্রুতা কিংবা কলহ থাকত তাহলে তারা এমন হৃদয়গ্রাগী মর্যাদার কথা বলতেন কী! কী অপূর্ব সুস্পর্ক ছিল এ মহান বুযুর্গদের মাঝে। এরপরও তাদের মধ্য শত্রুতা ও দ্বেষ খুঁজে বেড়ানো উদ্ভট ও বানোয়াট নয় কী?
 ৫০ হিজরীতে হযরত হাসান (রা:) মদীনায় ইন্তেকাল করেন। ইন্তেতালের পূর্বে তিনি নবীজীর রওজার পাশে দাফন হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। ইচ্ছা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে তিনি হযরত হুসাইন (রা:) কে উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা:) এর কাছে প্রেরণ করেন। হযরত আয়েশা (রা:) সোৎসাহে দাফন হবার অনুমতি দিলেন। 'সাহাবাদের জীবনী' লেখকদের বইতে ঘটনাটি উল্লেখ আছে। এমনকি শীয়া ঐতিহাসিকবৃন্দও তাদের কিতাবে উক্ত অনুমতির ঘটিনাটি বিবৃত করেছেন --
  "হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা:) হযরত হাসান (রা:)কে তাঁর গৃহে নবীজীর পাশটিতে সানন্দে দাফন হবার সদয় অনুতমি প্রদান করেছিলেন। এই ইচ্ছা তিনি মুমূর্ষ অবস্হায় ব্যক্ত করেছিলেন।
অপর এক রেওয়ায়েতে আছে যে, হযরত হুসাইন (রা:) তাঁর ভায়ের দাফনের জন্য রওজা শরীফের জায়গা চাইলে তিনি সানন্দে অনুমতি দিয়েছিলেন। হযরত হাসান (রা:) এর ইন্তেতালের পর হযরত আয়েশা (রা:) রওজা শরীফে তাকে দাফন হতে দেননি বলে যে সব উদ্ভট বানোয়াট কুৎসা ও অপবাদ তাঁকে দেওয়া হয় -এর ভিত্তি যে কতটুকু তা উপরিক্ত স্পষ্ট বর্ণনা দ্বারা প্রতীয়মান  হয়।
হযরত হাসান (রা:) এর আব্দুল্লাহ ইবনে হাসান নামে একজন সন্তান ছিলেন। হযরত আবূ বকর (রা:) ও ওমর (রা:) সম্পর্কে জিজ্ঞাসাা করা হলে তিনি বলেন --
 "আল্লাহ এই বুযুর্গদ্বয়ের ওপর রহমত ও শান্তি বর্ষণ করেন। পক্ষান্তরে যারা তাদের ওপর দয়া, মহব্বত ও শ্রদ্ধাস্পদ কথা না বলবে আল্লাহ যেন তাদের প্রতি দয়াপরবশ না হন।
  এমনিভাবে হযরত হাসান (রা:) পৌত্র হযরত মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে হাসানকে শায়খাইন (আবূ বকর ও ওমর (রা:) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন --
 "হযরত মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে হাসানের কাছে কুফার একটি গোত্র এসে হযরত আবূ বকর (রা:) ও ওমর (রা:) মর্যাদা সম্পর্কে কিছু জানতে চাইলে তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার শহরের লোকজনকে দেখো? আমি তো আবূ বকর (রা:) ও ওমর (রা:) কে আলী (রা:) এর চেয়ে সেরা মনে করি অথচ ওই দু'বুযুর্গ সম্পর্কে ওরা আমার কাছে জানতে চাচ্ছে।

কম খরচে বাড়ি নির্মান করুন

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিজের বাড়ি বা এপার্টমেন্ট তৈরী করা নিয়ে অনেকেই চিন্তিত। বিশেষত অভিজ্ঞতা না থাকা বা নির্মান কাজে ধারনা না থাকা একটি বড় সমস্যা। তার উপর এর পিছনে সময় দেয়াটাও অনেকের জন্য বেশ কষ্টকর। আবার এমনও হয় যে, সময় দিলাম ঠিক আছে কিন্তু কোন সামগ্রী ঠিক কত টাকায়  ক্রয় করলে ন্যয্য হবে তা বুঝা কিন্তু মুশকিল। নির্মান সংক্রান্ত যাবতীয় সমস্যা ও টেনশন দূর করতে অপটিমাম গ্রুপ একটি সুন্দর উদ্যোগ নিয়েছে। রাজধানীর হাতিরঝিল,বাড্ডা, বনশ্রী  এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে বেশ কয়েকটি প্রজেক্ট ইতিমধ্যে শুরু করেছে। আপনার জমি, আপনার টাকা। আমরা শুধু কাজ করে দিব, আপনি নির্ধারিত সময় শেষে চাবি বুঝে নিয়ে নিজের বাড়িতে প্রবেশ করবেন। বাড়তি কোন ঝামেলা, শ্রমিকদের সাথে বোঝাপড়া,  কেনাকাটার পরিশ্রম কিছুই করতে হবে না। তার উপর আপনি যে দামে নির্মান,  সামগ্রী ক্রয় করবেন, আমরা কর্পোরেট রেট এ তার চেয়ে অনেক কম টাকায় কিনতে পারবো। ফলে নির্মান খরচও কম পড়বে। অপটিমাম কার্যালয় ১৮০ বিজয় নগর এ যোগাযোগ করুন।

Wednesday, 12 June 2019

সবকাজে অগ্রনী ভূমিকায় আবূ বকর সিদ্দীক (রা:)

শিরোনামের দাবীর প্রমাণে আমরা আলী মুত্তাকী
হিন্দীর 'কানযুল উম্মাল', আল্লামা সুয়ুতির 'তারীখুল খোলাফা' ও মুহিব বিহারীর 'রিয়াজুল নযরাহ ও হাদীস বিশ্লেষক দের  থেকে নকল করা হবে।
সামান্য কিছু নমুনা এখানে বিবৃত হল --

"আবুয যানাদ বর্ণনা করেন, হযরত আলীর শাসনামলে এক ব্যক্তি তাঁকে বলল, আমীরুল মুমিনীন! মুহাজির ও আনসারেরা আপনার ওপর আবূ বকর (রা:) কে কী করে মর্যাদা দিলেন? অথচ বংশ মর্যাদায় আপনি তার চেয়ে অগ্রনী, ইসলামী সংস্কারে আপনি শীর্ষে এবং আমলের
দৃষ্টিকোণ থেকেও অগ্রজ। আলী মুর্তাজা (রা:) বলেন, তুমি কুরাইশী হলে আমার বিশ্বাস তুমি আলদা গোত্রের। সে বলল, হ্যাঁ! আল্লাহপাক যদি
মুমিন বান্দাদের অবৈধ কাজ থেকে না বাঁচাতেন তাহলে আমি তোমাকে হত্যা করে ফেলতাম। এরপরও তুমি যখন জীবিত থাকো তথাপিও আমার পক্ষ থেকে তোমার প্রতি এমন শংকা ভয়
থাকবে যা এই কূ -চিন্তা পরিহার করা ছাড়া দূর হবে না। তুমি জানো না, আবূ বকর চারটি বিষয়ে আমার চেয়ে অগ্রজ। প্রথমত: নামাযের ইমামতি  যা তাকে কওমের নেতায় পরিণত করেছে। দ্বিতীয়ত: হিজরতে, তৃতীয়ত : নবীজীর গুহার সহযাত্রী, চতুর্থত: ইসলাম প্রকাশ ও প্রচারে। আল্লাহর বান্দা! তুমি কী জানো না, আল্লাহ তাআলা যেখানে সকল লোকদের নিন্দাবাদ করেছেন সেখানে এাত্র আবূ বকরের প্রসংসা করেছেন এই বলে, (হে মোমেনগণ!)  তোমরা যদি তাঁকে ( এ কাজে) সাহায্য না করো তাহলে আল্লাহ তাআলাই তাঁকে সাহায্য করবেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে তখনো সাহায্য করেছিলেন যখন কাফেররা তাঁকে তাঁর ভিটে -মাটি থেকে বের করে দিয়েছিলো (বিশেষ করে) যখন সে (নবী) ছিল  মাত্র দু'জনের
মধ্যে একজন, (তাও আবার) তারা দুজন ছিল (অন্ধকার এক) গুহার মধ্যে, সে (নবী) যখন তাঁর সাথীকে বলেছিল, কোনো দুশ্চিন্তা করো না,  আল্লাহ তাআলা আমাদের সাথেই আছেন, অতঃপর আল্লাহ তাআলা তার ওপর প্রশান্তি নাযিল ( করে তাকে সাহায্য )  করলেন এবং এবং
অদৃশ্য এক বাহিনী দ্বারা তাকে শক্তি যোগালেন।
অনুরূপ আরেকটি ঘটনা যা তাবারানী আওসাতে
বর্ণিত হয়েছে। বর্ণনাটির কানযুল উম্মাল ও তারিখুল খোলাফাতেও নকল করা হয়েছে। বর্ণনাটি এমন --
"সিলাহ ইবনে নযর থেকে বর্ণিত, হযরত আলী (রা:) এর ওখানে যখন আবূ বকর (রা:) এর নামোল্লেখ হত তখন তিনি বলতেন, সবকাজের অগ্রজের নামোচ্চারণ হচ্ছে, সর্বকাজের অগ্রণীর
নামোল্লেখ হচ্ছে। কসম সেই সত্ত্বার যার কুদরতী কব্জায় আমার প্রাণ, কল্যাণধর্মী যে কাজেই আমরা অগ্রজ হতে চেয়েছি সে কাজে আবূ বকর আমাদের সকলকে ছাপিয়ে গেছেন।
তাছাড়া ইবনে আসাকিরের বরাতে আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ুতি (রহ:) বর্ণনা করেন, হযরত সিদ্দীকে আকবারের ইসলাম গ্রহণের কথাটি। আর সেটি অবশ্যই হযরত আলী (রা:) এর সূত্রে --
"ইবনে আসাকির হারেসের সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি হযরত আলী (রা:) বরাত টেনে বলেন, প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের মধ্যে সবার আগে ইসলাম গ্রহণ করেন হযরত আবূ বকর (রা:)
 ১। সব কাজের অগ্রজ আবূ বকর (রা:)।
 ২। বিশেষ করে উল্লেখিত চার কাজে তিনি অনন্য
 ৩। ইসলাম গ্রহণে সবার ওপরের তালিকায় তাঁর নামটি। প্রাক অগ্রজ (সাবেকীনে আওয়ালীন) এর নূরাণী তালিকায় শীর্ষে তাঁর নাম।
হিজরতের সফরে সিদ্দীকি সঙ্গ ও ফেরেশতার মদদ।
" হযরত আলী (রা:) বর্ণনা করেন,নবী করীম (সা:) জিবরীল (আ:) কে জিজ্ঞাসাা করেন, হিজরতে আমার সঙ্গী কে হবেন?  তিনি উত্তরে বললেন, আবূ বকর হবেন, ইনি সিদ্দীক।
" আলী ইবনে আবূ তালেব (রা:) বলেন, রাসুলে খোদা (সা:) আমাকে ও আবূ বকরকে ইশারা করে
ইরশাদ করলেন, (যুদ্ধের মাঠে) তোমাদের একজনের সাথে জিবরীল থাকবেন অপরজনের সাথে থাকবেন মিকাঈল, আর ইসরাফীল এক বিশালে ফেরেশতা, যিনি রণাঙ্গনে উপস্হিত হয়ে জঙ্গি কাতারে ঢুকে পড়েন।
 লক্ষ্যণীয়: সিদ্দীকে আকবারের প্রশংসায় বর্ণিত উপরিউক্ত সব বর্ণনাই হযরত আলী (রা:) এর।
তাঁর মাধ্যমেই এগুলো উম্মাতে মুসলিমার কাছে পৌঁছেছে। এগুলো সবই তাঁদের অকৃত্রিম বন্ধুত্বের ও সৌহার্দের নমূনা নয় কি?  চক্ষুষ্মান মাত্রই একে
মূল্যায়ন করতে পারেন।
     গোড়ার দিকে আবূ বকর (রা:) ই প্রথম কুরআনের সংকলক।
১ম ও ২য় বর্ণনার সংক্ষিপ্ত তরজমা এই যে,
আব্দে খায়ের বলেন, হযরত আলী মুর্তাজা (রা:) বলেন, আবূ বকরের প্রতি আল্লাহ দয়া পরবশ হোন, কেননা তিনিই প্রথম কুরআনকেএক মলাটের ভেতর নিয়ে আসার উদ্যোগ নিয়েছেন।
জান্নাতে বয়োজ্যেষ্ঠদের সর্দার আবূ বকর ও ওমর
এক্ষণে আলোকপাত হবে শায়খাইনের জান্নাতে বিশেষ মর্যাদার। আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম ছাড়া বাদবাকী বয়োজ্যেষ্ঠদের সর্দার হবেন হযরত
আবূ বকর ও ওমর (রা:)। এ মর্যাদা হযরত হাসান ও হুসাইন (রা:) যেভাবে জান্নাতী  যুবকদের সর্দার ঠিক সেই মাফিক। শাইখাইনের এই মর্যাদা সর্বপ্রথম নবী করীম (সা:) পবিত্র যবান থেকে নিঃস্মৃত। পরে হযরত আলী (রা:) ও অন্যান্য সাহাবাদের বর্ণিত। নিম্নে এতদ্বিষয়ক হাদীসমুহ উল্লেখ করা হলো --
শেরে খোদা হযরত আলী মূর্তাজা (রা:) বলেন, আমি হযরত রাসূলে আকরাম (সা:) এর খিদমতে
হাযির ছিলাম ( এ সময় হযরত আবূ বকর ও ওমর (রা:) হাযির হলেন)। হুযূর (সা:) তাঁদের দিকে তাকিয়ে আমার উদ্দেশ্যে বললেন, নবী রাসূলগণ ছাড়া সকল জান্নাতী বয়োজ্যেষ্ঠদের সর্দার হবেন আবূ বকর ও ওমর (রা:)। আলী হে! তুমি বিষয়টি এখনই ওঁদের কাছে বলো না (যদি প্রয়োজন হয় আমিই পরে কোন এক সময় ওঁদেরকে বলে দেব)।  রাসূল (সা:) এর ওসিয়ত
মোতাবেক হযরত আলী (রা:) শায়খাইনের এই ফযিলত ও মাহাত্ম্য তাঁদের ওফাতের পর জনগণের সামনে তুলে ধরেন।
ফায়দা:-
          শায়খাইনের এ ফযিলত অন্যান্য সাহাবা থেকেও বর্ণিত। যেমন --
 ১) জামে তিরমিযী,বাবু মানাকিবী আবি বাকরিনিস সিদ্দীক, বর্ণনায় আনাস ইবনে মালিক
ও ইবনে আব্বাস (রা:)।
২) সুনানে ইবনে মাজা, বাবূ ফযলি আবি বকরিনিস সিদ্দীক। আবূ জুহায়দা (রা:) থেকে মরফুআন বর্ণিত।
৩)  তারীখে জুরজান এ ইবনে ওমর (রা:) থেকে বর্ণিত আছে।
বিজ্ঞজনদের ইশারাই যথেষ্ট। যেহেতু আমাদের সামনে কেবল হযরত আলী (রা:) এর বর্ণনা উল্লেখ করা উদ্দেশ্য ছিল।  এজন্য অন্যান্য রেওয়ায়েতে কতকটা ইচ্ছাপূর্বকই পরিহার করেছি।
                   হাদীসের বর্ণনা গ্রহণের মাসয়াল
এক্ষণে আমরা আলী (রা:) থেকে এমন কিছু বর্ণনা পেশ করব যাতে দেখা যাবে সিদ্দীকে আকবারের বর্ণনায় প্রতি তাঁর অবস্হা কত প্রবল ও প্রগাঢ়। এ জন্য যে সিদ্দীকে আকবারের বর্ণনা সরাসরি সত্যনির্ভর ছিল। আমরা সেই বর্ণনার দু' একটি ধারা উল্লেখ করছি।
হযরত আলী (রা:) বলতেন, যে বর্ণনা আমি সরাসরি রাসূল (সা:) থেকে না শুনতাম,  সেটি
আমি কারো থেকে শুনলে আগেভাগে তাকে উদ্দেশ্য করে করে বলতাম, তুমি আদৌ এটি রাসুল (সা:) থেকে শুনেছ কি -না?  তবে এ নিয়মটি আবূ বকর (রা:) এর বেলায় ব্যতিক্রম।
আমি নিশ্চিত ছিলাম আবূ বকর (রা:) মিথ্যা বলার মানুষ নন বরং তিনি মহান সত্যবাদী। আবূ বকর (রা:) আমার কাছে বর্ণনা করেন যে,  তিনি
রাসূলুল্লাহ (সা:) কে বলতে শুনেছেন, যখন কোন মুসলিম থেকে গোনাহ হয়ে যায় অতঃপর  সে উঠে উত্তমরূপে অযু করে দু'রাকাত নামায পড়ে এবং ইস্তেগফার করে আল্লাহ পাক তাকে মাফ করে দেন।
বর্ণনাটির উপকারিতা ও পরিণতি :
১)  সাহাবারা পরস্পর থেকে জ্ঞানগত উপকার সাধন করতেন। যা তাঁদের পারস্পরিক নিষ্ঠা ও
আন্তরিকতার প্রকাশ্য দলিল।
২) সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর প্রতি হযরত আলী (রা:) এর দ্বীনদারী ও সততার প্রতি পূর্ণ আস্হা ছিল। আর সেটি এই পর্যায়ের যে, যত গুরুত্বপূর্ন মাসয়ালা হোক না কেন তাতে কোন প্রকার কসমের দরকার পড়তনা। শুধু বলতেই বা শুনতেই তিনি তা মনে প্রাণে কিশ্বাস করে নিতেন।
৩)  উক্ত বর্ণনা দ্বারা এও জানা গেল যে, আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) এর বর্ণিত মাসয়ালা বনি হাশেমের নিকট অকাট্য ও সুনিশ্চিতরূপে প্রতীয়মান হত। কেবল ধারণা ও সম্ভাবনার পর্যায়ে ছিল না। অন্য কথায বলতে গেলে গোটা মানবজাতির মাঝে সত্যবাক হিসেবে আবূ বকর
(রা:) পরিচিত ছিলেন। যবানে নববী যাকে সেই উপাধিতেই ভূষিত করেছেন।
"আবূ য়াহয়া বলেন, আমি হযরত আলী (রা:) কে কসম করে বলতে শুনেছি, নিশ্চয় আবূ বকরের
'সিদ্দীক' উপাধিটি আল্লাহপাক আকাশ হতে অবতরণ করেছেন।
    আবূ বকরের ইমামত ও প্রাধান্য: আস্হাআলীর
বক্ষ্যমান অনুচ্ছেদে আমরা শেরে খোদা হযরত আলী (রা:) এর এমন কিছু বর্ণনা সন্নিবেশ কবর যাতে সুধী পাঠক অনুধাবন করতে পারেন তাঁদের মধ্যকার সম্পর্কটি কত উদার মহৎ ও চমৎকার ছিল। নীচে এমন কিছু নমুনা পেশ করা হোক --
"আবূ বকর হুযালী হাসানের সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আলী মুর্তাজা (রা:) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) ইন্তিকাল করলে আমরা (দ্বীনি বিষয়ে) চিন্তা -ভাবনা করছিলাম। চিন্তা করে দেখলাম, রাসূলুল্লাহ (সা:) সিদ্দীকে আকবার (রা:) কে
নামাযের ইমামতি করিয়েছেন। কাজেই রাসূল (সা:) যাকে দ্বীনি কাজে (নামাযে) নেতা বানিয়েছেন তাঁকেই তো আমরা আমাদের রাষ্ট্রীয়
কাজের নেতা বানাতে পারি। আমরা আবূ বকরকে এই ভাবনা থেকেই নেতা বানালাম।
  "নাযাল ইবনে সাবুরা হেলালী বর্ণনা করেন যে,
আমরা একবার হযরত আলী (রা:) এর সাথে হাসিখুশি প্রানোচ্ছল অবস্হায় সাক্ষাৎ করে বললাম, 'আমিরুল মুমিনীন! আপনার সঙ্গী-সাথী
সম্পর্কে আমাদেরকে কিছু বলুন।
তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) এর সব সঙ্গী-সাথীই আমার সঙ্গী ও বন্ধু। পরে আমরা আরজ
করলাম, তাঁদের সম্পর্কেই না হয় কিছু বলুন!
তিনি বললেন, আবূ বকর (রা:) এমন এক ব্যক্তিত্ব
জিবরাঈল ও রাসূলুল্লাহর ভাষায়  আল্লাহপাক যাকে সিদ্দীক উপাধিতে ভূষিত করেছেন। তাঁকে
নামাযের ইমামতি দিয়ে আমাদের দ্বীনের কাজে
রাসূলের প্রতিনিধি করেছেন। যেহেতু তিনি ধর্মীয় কাজে একবার প্রতিনিধিত্ব করেছেন সেহেতু আমরা তাঁকে আমাদের পার্থিব কাজের প্রতিনিধিত্বের ওপর আস্হাশীল হলাম।
" হযরত হাসান বসরী (রা:) হযরত আলী (রা:) এর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা:) (নামাযের ইমামতিতে) আবূ বকর (সা:) কে অগ্রগামী করলেন,  তিনি জানাযার নামায পড়ালেন অথচ আমি সেখানে উপস্হিত ছিলাম -- অনুপস্থিত ছিলাম না। ছিলাম সুস্হ সবল - অসুস্হ ছিলাম না। রাসূলুল্লাহ (সা:) যদি আমাকে
তাঁর স্হানে চাইতেন আগে বাড়াতে পারতেন। সুতরাং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যেখানে তাঁকে দ্বীনি
কাজে অগ্রগামী করলেন, প্রাধান্য দিলেন , সেখানে আমরা তাঁকে পার্থিব কাজে প্রাধান্য দানের ওপর জোর দিয়ে সন্তুষ্ট থাকলাম।
         নাহজুল বালাগাহ'র ভাষ্য
উপরিউক্ত বর্ণনার শেষে আমরা শীয়া কিতাব থেকে একটি উদ্ধৃতি টানব। সেখানে হযরত আলী
মুর্তাজার একটি স্বীকৃতি রয়েছে যে, খেলাফতের সর্বাধিক অধিকারী ছিলেন হযরত আবূ বকর (রা:) 'গুহার বন্ধু' নবীজীর জীবদ্দশায় নামাযের ইমামতকারী হিসেবে তার নিয়োগ এক অনন্য নযীর। আবূ বকর জওহরীর বর্ণনা যা ইবনে আবিল হাদীদ তার শরহে নাহজুল বালাগাহ -এ বর্ণনা করেন। হযরত আলী (রা:) , যুবায়ের ইবনুল আওয়াম (রা:) সহ অনেকেই হযরত সিদ্দীকে আকবারের মাহাত্ম্য ও বড়ত্ব বর্ণনা করেন। বর্ণনাটি কাটছাট করে নিম্নে উদ্ধৃত হল --
 "আলী ও যুবায়ের (রা:) বলেন, খেলাফতের ময়দানে আবূ বকরকেই আমরা সর্বাধিক যোগ্য বলে মনে করি। নিশ্চয়ই তিনি গুহার সাথী ছিলেন। তাঁর উপাধি 'দু'জনার  একজন'। আমরা তাঁর মহত্ব ও বড়ত্বের অকুন্ঠ স্বীকৃতি দাতা। নবীজীর জীবদ্দশায় তিনি তাঁকে নামাযের আদেশ করেছিলেন।
বায়াতের আলোচনায় আমরা পূর্বে এ বিষয়ে বিশাদ আলোচনা করেছি সিদ্দীকি 'ফাযায়েলে,
এবার সরাসরি শীয়াদের গ্রন্হের উদ্ধৃতি ও স্বীকৃতি
পেলাম।
  আবূ বকরের মৃত্যুতে আলীর শোক ও মহিমা -কীর্তনঃঃ
  আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ুতী (রহ:) ঐতিহাসিক ইবনে আসাকিরের বরাতে নিম্নোক্ত বর্ণনাটি উল্লেখ করেন --
  "আল্লামা ইবনে আসাকির (রহ:) হযরত আলী (রা:) এর উদ্ধৃতি টেনে বলেন,  আবূ বকরের মৃত্যুর সময় চাদরাবৃত অবস্হায় হযরত আলী (রা:) তার ওখানে তাশরীফ নিয়ে আসেন।
 "সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর ইন্তেকালের পর তাঁর চাদরাবৃত লাশে ঢাকা ঘরের দরোজায় এসে মৃতের উদ্দেশ্যে হযরত আলী (রা:) বললেন, কসম খোদার! দ্বীনের গোড়ার দিকের আপনি একজন নিবেদিত প্রাণ কর্মী ছিলেন। একাজে আপনি ঠিক তখনই সাড়া দিয়েছিলেন যখন এই দ্বীনের কান্ডারীর প্রতি অনেকেই বিরক্ত ছিল। শেষ বয়সেও এই ধর্মের আপনি গুরুজন। মানুষ যখন কাপুরুষ ও দুর্বল হতেছিল, দ্বীনের খাতিরে আপনি তখন ওই পাহাড়ের মত অটল ও মজবুত ছিলেন প্রচন্ড ঝঞ্জাবায়ু যাকে একটু টলাতে পারেনি। প্রচন্ড ভূমিকম্প যাকে সস্হান হতে একটু নড়াতেও পারেনি। (নবীজীর ইন্তেকালের পর বিভিন্ন ফেৎনা আপনি লৌহকঠিন সিদ্ধান্ত দ্বারা সামলেছেন)।
এখানে আমরা তৃতীয় একটি বর্ণনা আনব যা উসায়দ ইবনে সাফওয়ান কর্তৃক বর্ণিত । বর্ণনাটি দীর্ঘ। সেটি সংক্ষিপ্তকারে পেশ করছি --
  "উসায়দ ইবনে সাফওয়ান নবী করীম (সা:) এর সাহাবী ছিলেন। তিনি বলেন,  আবূ বকর (রা:) এর ইন্তেকাল হলে মদীনায় শোকের ছায়া নেমে এল। কান্নায় মদীনা কেঁপে ওঠল। নবীজীর ইন্তেতালের দিনের মত শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হল। এ সময় হযরত আলী কাঁদতে কাঁদতে দ্রুত 'ইন্নালিল্লাহ মুখে' পৌঁছুলেন। বলতে লাগলেন, আজ থেকে নববী খেলাফতের ছন্দ পতন ঘটল। এরপর তিনি
লাশঘরে গেলেন। অশ্রুসজল নয়নে বললেন, আল্লাহ তোমার প্রতি দয়াপরবশ হোন আবূ বকর! ইসলাম গ্রহণকারীদের নুরাণী তালিকার শীর্ষে তোমার নাম। ঈমানে নিষ্ঠ ও ইয়াকীনে অথৈ আস্হাবান তুমি।
  "ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন, (ওফাতের পর হযরত ওমর (রা:) কে খাটিয়ার পর ওপর রাখা হল। লোকেরা তার চারপাশে জমায়েত হল। নানা
দু'আ -দরূদ পড়ছিল। এ সময় হযরত আলী মুর্তাজা (রা:) এলেন। ওমর (রা:) কে খেতাব করতে গিয়ে বললেন, আমার এই ধারণা ছিল যে, আল্লাহপাক আপনাকে আপনার দু'দোস্ত নবী কারীম (সা:) ও আবূ বকর (রা:) এর সহকর্মী বানাবেন। কেননা আমি রাসূলুল্লাহ (সা:) অসংখ্য বার বলতে শুনেছি। তিনি বলেছেন, আমি, আবূ বকর ও ওমর (অমুক কাজের জন্য) বেরোলাম। আমি, আবূ বকর ও ওমর (অমুক স্হানে) প্রবেশ করলাম এবং আমি, আবূ বকর ও ওমর (অমুক স্হান হতে) বিদায় নিলাম। এতে হে ওমর! আমি
অনুধাবন করেছি তাদের দু'জনার সাথে আপনার সঙ্গ ও সংসর্গ (সর্বদার)  জন্য নসীব হবে।
উক্ত বর্ণনাটি যদিও  হযরত ওমরসংশ্লিষ্ট তথাপিও এর মাঝে হযরত আবূ বকর (রা:) এর ফজিলত ও বড়ত্ব নাহিত।
    সার সংক্ষেপ ঃ
১)  সিদ্দীকে আকবারের ইন্তেকালের খবর পাওয়ামাত্রই হযরত আলী (রা:) সেখানে পৌঁছান।
২)  শোক জানিয়ে তাঁর অতুল্য ফজিলত বর্ণনা করেন।
৩)  তাছাড়া এই স্বাক্ষ্যটিও প্রনিধানযোগ্য যে, সিদ্দীকে আকবার সর্বপ্রাচীন, ঈমানে অগ্রজ, মুখলিছ ও প্রগাঢ় ইয়াকিনধারী।
৪)  আবূ বকর সিদ্দীক ধর্মী (রা:) কোন লোক মুসলিম উম্মাহর মাঝে নেই।
৫)  নানা বর্ণনা দ্বারা একথা জানা গেছে, হযরত আবূ বকর (রা:) এর কাফন -দাফনে হযরত আলী (রা:) শরীক হন। এ কথার কোনও প্রমান নেই যে,
তিনি জানাযার মুহুর্তে গায়েব ছিলেন! আগে পরে উপস্হিত ছিলেন !!
 শায়খাইনের জীবনের সাথে নবীজীবনের সাযুজ্য
     হযরত আলী (রা:) এর বর্ণনা দ্বারা জানা যায় সিদ্দীকে আকবার ও ফারুকে আযমের সীরাত ও আমল হুযুর (সা:) এর সীরাত ও আমলের সাথে সাযুজ্য রাখে। এ প্রসংগে শেরে খোদা হযরত আলী (রা:) এর বর্ণনা --
  "আব্দে খায়ের বলেন, একবার হযরত আলী (রা:) মিম্বরে বসে বললেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) ইন্তেকাল করলেন। হযরত আবূ বকর (রা:) খলীফা নিযুক্ত হলেন। তিনি নবী করীম (সা:) কর্মপদ্ধতি মোতাবেক আমল করেন। হুযুর (সা:) এর সীরাত মোতাবেক কাজকর্ম করতে থাকেন। আমৃত্যু তিনি এর ওপর থেকেছেন। এরপর হযরত ওমর (রা:) খলীফা হন। তিনিও তার দু'পূর্বেসূরীর জীবনাচার মোতাবেক কাজকর্ম চালিয়ে যান। আমৃত্যু এর ওপর বহাল থাকেন।
পরবর্তীতে হযরত আলী (রা:) এর বর্ণনায় এও পাওয়া যায় যে, তিনি বলেন, সিদ্দীকে আকবারের বিরোধীতা করতে আমার শরম লাগে। যেহেতু সিদ্দীকের প্রতিটি রাষ্ট্রীয় কাজই নববী -রীতিমাফিক ছিল। সেহেতু তাঁর বিরোধীতা করতে হযরত আলীর লজ্জা করত। আবূ তালেব আশশারীর বর্ণনা --
   "হযরত আলী মুর্তাজা (রা:) বলেন,  হযরত আবূ বকর (রা:) এর বিরোধীতা করতে আমি লজ্জাবোধ করি।
উপরোক্ত কথার সমর্থন আমরা শীয়া বন্ধুদের কিতাবেও দেখি। ফাদাকের ঘটানায় হযরত আলী (রা:) যে মন্তব্যটি সিদ্দীকে আকবারের শানে করেছিলেন সেটি নিম্নোক্ত শব্দমালায় এভাবেই উঠে এসেছে --
  "যেমন ( খেলাফতের বিষয়টি হযরত আলী পর্যন্ত পৌঁছাল, এ সময় ফাদাকের বিষয়টিও সামনে চলে এল) তখন হযরত আলী (রা:) বললেন, আমি আল্লাহর কাছে লজ্জানুভব করছি সেই বিষয়টি নিয়ে যা হযরত আবূ বকর (রা:) স্হগিত করে রেখেছেন, ওমর (রা:)  ও তা বহাল  করেছেন যে, উহা আমি  ফেরৎ নেব এবং ফিরিয়ে দেব।
এরদ্বারা প্রতীয়মান হল, হযরত আলী (রা:) এর কাছে শায়খাইনের শীরাত পুতঃপবিত্র ছিল। এজন্য তিনি তাদের খেলাফত বিষয়ে কোন প্রকার বিরোধীতা করেননি। বরং কথা ও কাজে তাঁদের যথাসম্ভব সহযোগিতা করেছেন।
এছাড়া নিম্নোক্ত কিছু বর্ণনায় ও হযরত আলী (রা:) কে তাঁর খেলাফত কালে সিদ্দীকে আকবার (রা:) ও ফারুকে আযম (রা:) এর জীবনাচার ও কর্মকান্ডকে কুরআন -সুন্নাহ মোতাবেক স্বীকৃতি দিতে দেখা যায় --
   নবীপাক (সা:) এর পরে মুসলমানেরা তাদের মধ্য হতে দু'জন আমীর নিযুক্ত করেন যারা নেককার ও পরহেযগার ছিলেন। তারা উভয়েই
কুরআন -সুন্নাহর ওপর আমল করতেন। উত্তম ছিল তাদের চরিত্র ও জীবনাচার। সুন্নাতে নববীর বাইরে তাঁরা কোনও কাজ করতেন না। এই চেতনা
নিয়েই তাঁরা মৃত্যুবরণ করেছেন। আল্লাহ পাক তাঁদের উভয়ের প্রতি সদয় হোন।
উপরোক্ত কথা হযরত আলী (রা:) লিখিত একটি পত্রের অংশবিশেষ। যা তিনি মিশরের জনৈক গভর্ণরের কাছে লিখেছিলেন --
  "হামদ ছানার পর হযরত আলী (রা:) লিখলেন, আল্লাহপাক তাঁর নবীকে প্রেরণ করলেন। তাঁর দ্বারা মানুষের মধ্যকার ভ্রষ্ঠতা ও ধ্বংসলীলা অপনোদ করালেন। বিচ্ছিন্নতা থেকে তাদের একীভুত করলেন। পরে আল্লাহ তাআলা তাঁকে উঠিয়ে নিলেন। তিনি তাঁর জিম্মাদারী পুরা করলেন। লোকেরা আবূ বকর (রা:) কে খলীফা বানাল। পরে আবূ বকর (রা:) হযরত ওমর (রা:) খলীফা মনোনীত করলেন। তাঁরা দুজনাই উত্তম চরিত্রের আঁধার ছিলেন। উভয়েই ন্যায় বিচারের
প্রতিভু ছিলেন।




আলীর মুখে আবূ বকর ও ওমর -বন্দনা

৪র্থ অধ্যায়ে আমরা শায়খাইন হযরত আবূ বকর (রা:) ও হযরত ওমর (রা:) এর ওইসব গুন -কীর্তন আলোকপাত করব যেগুলো হযরত আলী (রা:) এর মুখনিঃসৃত। বরাত টানব সুন্নী কিতাবের পাশাপাশি যথারীতি শীয়া উদ্ধৃতিগুলোরও। যদ্দারা স্বতঃই প্রমাণিত হবে যে, তাঁদের মধ্যকার সম্পর্ক কতই চমৎকার ছিল।
শায়খাইনের মহিমা কীর্তনে কিছু মরফু ও গায়রে মরফু বর্ণনা
১, ইবনে সায়াদ হযরত আলী (রা:) এর সূত্রে বর্ণনা করেন --
"আবূ সারিহা বলেন, হযরত আলী (রা:) কে মিম্বারে বসা অবস্হায় বলতে শুনেছি, হে লোকেরা! আবূ বকর দয়ার্দ্র, নম্রদিল ও আল্লাহর শানে সোপার্জিত ছিলেন। আর শোনো হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা:) ছিলেন দ্বীনের কল্যাণকামী। কাজেই আল্লাহ ও তাঁর কল্যাণকামী।
২, ইবনে সায়াদের আরেকটি ভাষ্য --
"হযরত আলী(রা:) এর কাছে আবূ বকর ও ওমর ((রা:) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, তাঁরা দু'জনই মুসলিম উম্মাহর জন্য হেদায়েতের
ইমাম ও দিশারী ছিলেন। তাঁরা কওমের সংস্কারক ছিলেন। কল্যাণধর্মী কাজ সফল ও কর্মনিষ্ঠ ছিলেন। দুনিয়া থেকে বুভুক্ষ ও মোটা কাপড় পরিহিতাবস্হায় প্রস্হান করেছেন। ( তাঁদের কোন লোভ -লালসা ছিল না)।
৩, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ:) আব্দুল্লাহ ইবনে মালীলের সূত্র ধরে বর্ণনা করেন --
"আব্দুল্লাহ বলেন,আমি হযরত আলী (রা:) কে বলতে শুনেছি, নবী মাত্রই তাঁর উম্মতের মাঝে ৭ জন নজীব অর্থাৎ ভদ্র, মার্জিত ও নিষ্ঠাবান লোক দেওয়ার রেওয়াজ আছে। পক্ষান্তরে নবী কারিম
(সা:) এর উম্মতের মাঝে ১৪ জন ওই শ্রেণীর নজীব দেওয়া হয়েছে। তন্মধ্যে আবূ বকর ও ওমর অন্যতম।
৪, আল্লামা ইবনুল আসীর (রহ:) শায়খাইনের কীর্তন প্রসংগে হযরত আলীর ভাষ্য এভাবে বর্ণনা করেন --
"আব্দে খায়র বলেন, হযরত আলী (রা:) বলেন,  কিয়ামত পর্যন্ত আগত গভর্ণর ও শাসকদের জন্য
হযরত আবূ বকর (রা:) ও ওমর (রা:)কে আল্লাহ
তায়ালা আদর্শ সাব্যস্ত করেছেন। কসম খোদার! এঁরা সত্যিই সকলের ওপর প্রাধান্যশীল হয়েছেন। তাঁদের পরবর্তীতে এ বিষয়ে বহু কষ্ট ক্লেষে পড়ে গেছেন।
৫ , আল্লামা জালালুদ্দীন সূয়তী (রহ:) মুসনাদে বাযযার ও ইবনে আসাকিরের বায়াতে সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর ফযিলত আলী (রা:) এর সূত্রে বর্ণনা করেন। শীয়া মুফাসসিরগণও তাদের স্ব -স্ব তাফসীরে বিষয়টি আলোকপাত করেছেন --
"সাহাবী উসায়দ ইবনে সাফওয়ান (রা:) বলেন, হযরত আলী (রা:) আয়াতের তাফসীর এভাবে করেন যে, সত্য (দ্বীন) আনায়নকারী মুহাম্মাদ (সা:) আর একে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানকারী ও সত্যয়নকারী হযরত আবূ বকর (রা:)।
৬ , কানযুল উম্মাল প্রণেতা আল্লামা আলী মুত্তাকী নানা মুহাদ্দিস থেকে নকলপূর্বক লেখেন --
"আবূল মুতামির বলেন, আবূ বকর ও ওমর (রা:)
সম্পর্কে হযরত আলী মুর্তাজা (রা:) ওর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেনর, এরা দু'জনা
সেই ৭০ জনের প্রতিনিধিত্বকারীদের অন্তর্ভূক্ত যারা রোজ কিয়ামতে নবী করীম (সা:) এর সাথে আল্লাহ তাআলার দরবারে হাজির হবেন এবং এই
দু'বুযুর্গকে (রূহের জগতে) হযরত মুসা (আ:) তাঁর
সাহাবী হওয়ার দরখাস্ত করেছিলেন কিন্তু আল্লাহ
পাক তাঁদের দু'জনাকে বিশ্ব নবীর সাহাবী করেন।
৭ , কতিপয় মুহাদ্দিস হযরত আলী (রা:) এর সূত্রে সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর এক অদ্ভুৎ ফজিলত বর্ণনা করেন এভাবে --
"হযরত আলী (রা:) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা:)
কে বলতে শুনেছি যে, তিনি আবূ বকর (রা:) কে বলছিলেন, হে আবূ বকর! আদম (আ:) থেকে কিয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ দুনিয়াতে আমার প্রতি ঈমান আনবে তাদের সকলের ছওয়াব আল্লাহপাক আমাকে দান করেছেন। আর আমার থেকে কিয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ দুনিয়াতে ঈমান
আনবে এদের সকলের ছওয়াব আল্লাহপাক তোমাকে দান করবেন।
৮ , কিতাবুল কুনা ওয়ালা আসমা' প্রণেতা আল্লামা দোলাবী এবং শাহওয়ালী উল্লাহ মোহাদ্দেসে দেহলবী (রহ:) আলী (রা:) এর সূত্রে ইযালাতুল খাফা'য় লেখেন, শায়খাইন ( আবূ বকর ও ওমর (রা:) সমগ্র উম্মতের মাঝে সবার আগে ভাগে জান্নাতে প্রবেশ করবেন।
"শেরে খোদা হযরত আলী (রা:) বলেন, এই উম্মতের মাঝে সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশ করবেন হযরত আবূ বকর ও ওমর (রা:)। জনৈক ব্যক্তি বলল, আমীরুল মুমিনীন! আপনারও পূর্বে এরা দু'জনা জান্নাতে প্রবেশ করবে?
     সংক্ষিপ্তসার
হযরত আবূ বকর (রা:) ও ওমর  (রা:) এর গুণকীর্তনে হযরত আলীর ভাষ্য নিম্নে সংক্ষেপে
আলোকপাত করা হলো --
ক ) তাঁরা সহানুভূতিপরায়ণ, দয়ার্দ্র ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কল্যাণকামী।
খ ) জাতির স্বীকৃত দিশারী, পথপ্রদর্শক ও কওমের অগ্রপথিক, সর্বোপরি সংস্কারক।
গ ) উম্মতে মুহাম্মাদীর মাঝে উঁচুস্তরের ভদ্র, মার্জিত ও সুশীল।
ঘ ) আল্লাহর দ্বীনের আদর্শপুরুষ ও মহান।
ঙ ) সম্মান ও মর্যাদাসহকারে আল্লাহর দরবারে উপনীত ব্যক্তিত্ব।
চ ) নেক আমল তাঁদের অনিঃশেষ ও অফুরন্ত।
ছ ) আল্লাহর মর্জিঅর্জন শেষে তাঁরা জান্নাতুল ফেরদৌসের দাবীদার।