Saturday, 29 June 2019

ফারূকে আযম (রা:) এর শাহাদতকালীন কিছু ঘটনা

     স্বপ্নযোগে ফারুকে আযমের ইন্তেকাল প্রসংগ
ইমাম হুসাইন ও ইমাম আহমাদ তাঁদের স্ব -স্ব মুসনাদে একটা ঘটনা উল্লেখ করেন, ঘটনাটি হযরত উমর (রা:) এর একটি স্বপ্নের। ফারূকে আযমের ওই স্বপ্নের ব্যাখ্যা করেন হযরত আলী
(রা:) এর স্ত্রী হযরত আসমা বিনতে উমাইস (রা:)
। ব্যাখ্যায় বলা হয়,  এই স্বপ্ন খলীফা উমরের মৃত্যুর, এই মৃত্যু একজন বিদেশি গোলামের ন্যাক্কারজনক হামলার মাধ্যমে হবে --
   "একবার হযরত উমর (রা:) জুমুআর দিনে মিম্বারে দাঁড়িয়ে খুৎবা দিচ্ছিলেন। হামদ ও ছানার পরে তিনি শ্রদ্ধার সাথে নবী করিম (সা:) এর কথা ও আবু বকর (রা:) এর নামোচ্চারণ করেন, পরে
বলেন, আমি এক অদ্ভুৎ স্বপ্ন দেখেছি। এর দ্বারা বুঝেছি আমার সময় ফুরিয়ে এসেছে। একটি লাল মোরগ আমার পেটে দু'তিন বার তার ঠোঁট দ্বারা ঠুকরেছে।একটি লাল মোরগ আমার পেটে দু'তিন বার তার ঠোঁট দ্বারা ঠুকরেছে। এই স্বপ্ন আমি আসমা বিনতে উমাইসের (হযরত আলীর স্ত্রী) কাছে বললে তিনি বলেন, জনৈক অনারব আপনাকে হত্যা করবে। বর্ণনাকার বলেন, এই খুৎবা তিনি যে শুক্রবার দেন তার পরের বুধবার তিনি আঘাতপ্রাপ্ত হন।
ফারূকে আযমের হিজরত, খেলাফত ও দ্বীনদারীর বিষয়ে হযরত আলী ও ইবনে আব্বাসের স্বাক্ষ্য
    ২৩ হিজরীর জিলহজ্জের শেষের দিকে হযরত ওমর (রা:) ফজরের নামায পড়ানো অবস্হায় পারসিক গোলাম আবু লুলু ফিরোজ তাঁর ওপর নৃশংস হামলা চালায়। খলীফাকে মসজিদ থেকে তার বাস ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনদিন পর তিনি ইন্তেকাল করেন। ওদিনটি ২৪ হিজরীর ১লা মুহাররম।
ওইসময় সাহাবায়ে কেরাম খলীফার সাথে সাক্ষাৎ করেন। একবার হযরত আলী (রা:) ও ইবনে আব্বাস (রা:) তাঁর খেদমতে আসেন। খলীফা উমর (রা:) এ সময় আখেরাতের চিন্তায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ইবনে আব্বাস (রা:) তাকে সান্ত্বনা
দেন ও সন্তোষজননক কিছু কথা বলেন, হযরত আলী (রা:) তাঁকে সত্যায়ন করেন ও সঠিক বলে মতদেন। ইবনে আব্বাস (রা:) এর ভাষ্য --
  "আব্দুল্লাহর ইবনে আব্বাস (রা:) খলীফা উমর (রা:) এর খেদমতে হাযির হলেন। তিনি ওইসময় মারাত্মকভাবে আহত। তিনি বললেন, কসম আল্লাহর! আপনার ইসলাম গ্রহণ মুসলমানদের জন্য ইযযতের উপলক্ষ্য হয়েছিল। আপনার হিজরত বিজয়ের উপক্ষ্য হয়েছিল। আপনার খেলাফত ইনসাফের প্রতীক ছিল। আপনি নবীজীর সাহচর্য পেয়েছেন তিনি মৃত্যুকালে আপনার প্রতি সন্তুষ্টি ছিলেন। পরে আবু বকরেরও সাহচর্য পেয়েছিলেন,  তিনিও মৃত্যুকালে আপনার প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন। আপনার খেলাফত নিয়ে মতপার্থক্য করেছে -এমন দু'জন মানুষও খুঁজে পাওয়া যাবে না। একথা শুনে হযরত ওমর (রা:) বলেন, আপনি এর স্বাক্ষ্য দিচ্ছেন কী?  ইবনে আব্বাস স্বাক্ষ্যবিষয়ে বিব্রতবোধ করলে হযরত আলী (রা:) বললেন, আমরা এই বাস্তবতার স্বীকৃতি দিই। (ইবনে আব্বাস যথার্থই বলেছেন) ।
ইবনে আব্বাস (রা:) এর হযরত উমর (রা:) কে জান্নাতের সুসংবাদের বিষয়টি শীয়া আলেমগনও স্বীকার করেন।
  নৃশংস হামলার পর ফারূকে আযমের প্রতি আলী (রা:)এর পরিপূর্ণ সহমর্মিতা
 "ইমাম জাফর সাদেক তার বাবা মোহাম্মদ বাকের থেকে বর্ণনা করেন যে, নববী মেম্বর ও পবিত্র রওজা শরীফের মাঝে বদরী সাহাবারা জমায়েত হতেন। ওমর (রা:) এর প্রতি হামলা হলে তিনি ওখানকার সাহাবাদের কসম দিয়ে বলতে বলেন,
তোমরা কেউ খলীফার প্রতি এ ধরনের হামলায় সন্তুষ্ট কি -না? নাকি তোমাদের কারো ইন্ধনে এই জঘন্য কাজ হয়েছে? ওখানকার সাহাবারা একথা
শুনে হু হু করে কেঁদে ওঠলেন। এ সময় হযরত আলী (রা:) উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, কখনোই নয়। আমরা তার প্রতি বন্ধুপ্রতীম। প্রয়োজনে আমাদের কারো জীবনের বিনিময়েও যদি উমরের জীবন দীর্ঘ হয় তাতেও আমরা রাযী।
      ওমর জান্নাতী: সুসংবাদ আলীর
স্বীকৃতি ও শক্ত সমর্থন হাসান (রা:) এরও
  "আবু মাতর বলেন, আমি হযরত আলী (রা:)কে
বলতে শুনেছি,  পারসিক গোলাম আবু লুলু হযরত উমর (রা:) এর হামলা করেছিল। এ সময় আমি হযরত উমর (রা:) এর কাছে এলাম।
হযরত উমর (রা:) কাঁদছিলেন। বললাম,  আমিরুল মুমিনীন। কাঁদছেন কেন? হযরত উমর
(রা:) বললেন, আমার ব্যাপারে আসমানী ফয়সালা কী? তা না জানার দরুন কাঁদছি। জান্নাতে নাকি জাহান্নামে যাব? আমি বললাম, আপনি জান্নাতের সুসংবাদ নিতে পারেন। আমি
নবীজীকে বলতে শুনেছি পূর্ণপ্রাপ্ত বয়স্ক লোকদের মাঝে আবু বকর ও উমর জান্নাতী। ওঁরা বেশ উত্তম সর্দার। হযরত উমর (রা:) বললেন, আলী!
আপনার এই সুসংবাদের কোন স্বাক্ষী থাকবেন তো? আমি বললাম, আমি কেন, আমার পুত্র হাসানও এই বিষয়ের স্বাক্ষী দেবে যে, নববী ফরমান মোতাবেক উমর (রা:) জান্নাতী।
              মজলিসে শুরা: ভূক্তিআলী (রা:) এর
ফারুকে আযম (রা:) অন্মি সময় ঘনিয়ে এল।
জীবনের প্রতি তিনি আস্তে আস্তে নিরাশ হয়ে এলেন। এ সময় তিনি কিছু ওসিয়ত করলেন। ওসিয়ত গুলো নিকটাত্মীয় ও বন্ধুমহলকে লক্ষ্য করে। এই ওসিয়তগুলো শীয়া সুন্নি সকলের কিতাবে বর্ণিত আছে। তিনি এ সময় ৬ জন মানুষের নাম নিলেন। এরা যথাক্রমে হযরত ওসমান গণী (রা:) হযরত আলী ইবনে আবু তালেব (রা:) , হযরত যুবায়ের (রা:) হযরত তালহা (রা:) ,হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রা:) ,
হযরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা:)। বললেন,
এ ৬ জনই পরবর্তী খলীফা নির্বাচন করবেন। তিন
দিনের মধ্যেই নির্বাচন সমাধা করতে হবে। এই ৬
হনকে নির্বাচনের কারণটিও খলীফা উমর (রা:)
বলে গেলেন যে এদের প্রতি সন্তুষ্ট অবস্হায় নবী করিম (সা:) ইন্তেকাল করেছেন। উক্ত ৬ জনের
মধ্যে আলী (রা:) এর নাম ভুক্তি ছিল। মুসনাদে হুমায়দীর ভাষ্য --
 "খেলাফতের বিষয়টি আমার পরে ৬ জনের প্রতি সোপর্দ থাকবে। এরা তাঁরা যাদের প্রতি সন্তুষ্ট থেকেই মহানবী (সা:) ইন্তেকাল করেছেন। যার পক্ষে রায় আসবে সেই পরবর্তী খলীফা। এরা যথাক্রমে, ওসমান (রা:) ,আলী (রা:) ,তালহা (রা:) ,যুবায়ের (রা:) , আব্দুর রহমান (রা:) ও সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা:)।
হযরত আলী (রা:) কে বিশেষ অসিয়ত: ব্যবস্হাপনা নামাযের
তাবাকাতে ইবনে সায়াদে 'নসীহতে উমর' পরিচ্ছেদে আছে --
"এরপর তিনি হযরত আলী (রা:) কে ডেকে বিশেষ অসিয়ত করেন এবং (খলীফা নির্বাচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত)  সুহায়ব রূমী (রা:) কে নামায পড়াতে বলেন। কোন রেওয়ায়েত এমনও আছে যে, হযরত উমর (রা:) উক্ত ৬ বুযুর্গকে কসম দিয়ে তাকওয়া ও ইনসাফ করার প্রতি জোর দেন (বালাযুরী) ।
    আলীর মুখে ফারূকী বন্দনা
 "আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন, ফারূকে আযমের ইন্তেকালের সময় আমি জনগনের মাঝেই ছিলাম। হযরত উমর (রা:) এর তিরোধানে
জনতা শোকতাপ করছিল। তাঁদের তরফে আল্লাহর মাগফেরাত কামনা করছিল। উমর (রা:) কে খাটিয়ায় রাখা হলো। এ সময় আমার পেছন থেকে আমার কাধে দু'হাত রেখে হযরত আলী (রা:) বলতে লাগলেন, আল্লাহ আপনার প্রতি দয়াপরবশ হোন হে উমর। আমার যতদূর বিশ্বাস! আপনার অপর দু'বন্ধুর মত খোদা তাআলা আপনাকেও তার সান্নিধ্যে ঠাঁই দেবেন এবং তাদের দু'জনার সাথে আপনাকেও মিলিয়ে দেবেন। আমি নবী করিম (সা:) কে বলতে শুনেছি, আমি, আবু বকর ও উমর এভাবে কাজ করেছি,  আমি আবু বকর ও উমর এতে প্রবেশ করেছি,  আমি, আবু বকর ও উমর বের হয়েছি আমি আবু বকর ও উমর চলেছি।
ফারূকে আযম (রা:) কে গোসল দেয়া হল। তাকে কাফন পড়ানো হল। নামাযের জানাযার জন্য জনতার সামনে খাটিয়া আনা হলো। এ সময় মুসলিম বিশ্বের সামনে হযরত আলী (রা:) তাঁর যে প্রশংসা ও স্তুতিগান বর্ণনা করলেন - এক কথায় তা বিরল ও নজিরবিহীন। কোনও সাহাবীর থেকে এমনটা শোনা যায়নি, বিবৃত হয়নি। হযরত আলী (রা:) এর এই বর্ণনা 'মুসাজ্জাধর্মী' বর্ণনা বলে খ্যাত। শীয়া -সুন্নী সকলের নিকট এই বর্ণনাটি বিখ্যাত। প্রথমেই আমরা ইমাম আবু ইউসূফ (রহ:) এর উদ্ধৃতি টানব --
 "ইমাম আবূ ইউসুফ তার ওস্তাদ ইমাম আবূ হানীফাহ (রহ:) থেকে বর্ণনা করেন। ইমাম আবূ হানীফাহ ইমাম মুহাম্মাদ বাকের (রহ:) থেকে বর্ণনা করেন যে, হযরত আলী (রা:) হযরত উমর (রা:) এর জানাযায় শরীক হয়ে বললেন ,এউ কাফনপরিহিতের চেয়ে উত্তম কেউ নেই আমার কাছে (এই মুহুর্তে)।  আমিও আল্লাহর কাছে হাজির হব, যেমন তার আমলনামা আমার আমল নামাতে ওমন হোক।  ইমাম মোহাম্মাদ (রহ:) থেকেও এমন একটি বর্ণনা বিদ্যমান।
             ইমাম বাকের (রহ:) এর ভাষ্য
কারী আবু মুয়াইয়িদ মুহাম্মাদ ইবনে মাহমূদ আল -খারযামী তার জামেউ মাসানিদিল ইমাম আযম পুুস্তকে হযরত আলী (রা:) এর উপরিউক্ত কথিকা স্বপ্রমাণ বর্ণনা করেন --
 "ইমাম আবূ হানীফা (রহ:) বলেন,আমি ইমাম মুহাম্মাদ বাকেরের খেদমতে পৌঁছে তাকে সালাম করলাম। বসে কথাবার্তা বললাম, আরজ করলাম ফারূকে আযমের জানাযায় হযরত আলী (রা:) উপস্তিত ছিলেন কী? তিনি বিস্ময় প্রকাশপূর্বক বললেন, সোবহানাল্লাহ! উপস্হিত না থাকলে এ কথা বলল কে যে, এই কাফন জড়ানো ব্যক্তির চেয়ে অতি উত্তম কেউ নেই আমার কাছে, তাঁর মত আমালনামা নিয়ে আমি আল্লাহর সমীপে উপস্হিত হবার আশাবাদী। পরে ইমাম বাকের বলেন, আলী মুর্তাজা (রা:) তাঁর প্রিয়কন্যাকে হযরত ফারুকে আযমের কাছে বিয়ে দেন। তিনি তাঁকে যোগ্য মনে না করলে এই বিয়ে হত না। এই
শাহজাদী সমকালীন শ্রেষ্ঠ ও অভিজাত ছিলেন। কেননা তাঁর নানাজী স্বয়ং রাসূলে খোদা (সা:) ,পিতা অপরগুণের আঁধার শেরে খোদা আলী (রা:) , তাঁর মাতা ফাতেমা যাহরা (রা:) ,আর তার ভাই যথাক্রমে হাসান ও হুসাইন  (রা:)। জান্নাতী যুবককুলের সর্দার। আর তার নানী খাদীজাতুল কোবরা (রা:)।
মুসনাদে আহমাদেও 'কাফন জড়ানো'ধর্মী অন্তত দুটি রেওয়ায়েত বিদ্যমান। তাছাড়া তাবাকাতে ইবনে সায়াদ ও মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বায়ও
হাদীস রয়েছে এ বিষয়ে।।

No comments:

Post a Comment