শিরোনামের দাবীর প্রমাণে আমরা আলী মুত্তাকী
হিন্দীর 'কানযুল উম্মাল', আল্লামা সুয়ুতির 'তারীখুল খোলাফা' ও মুহিব বিহারীর 'রিয়াজুল নযরাহ ও হাদীস বিশ্লেষক দের থেকে নকল করা হবে।
সামান্য কিছু নমুনা এখানে বিবৃত হল --
"আবুয যানাদ বর্ণনা করেন, হযরত আলীর শাসনামলে এক ব্যক্তি তাঁকে বলল, আমীরুল মুমিনীন! মুহাজির ও আনসারেরা আপনার ওপর আবূ বকর (রা:) কে কী করে মর্যাদা দিলেন? অথচ বংশ মর্যাদায় আপনি তার চেয়ে অগ্রনী, ইসলামী সংস্কারে আপনি শীর্ষে এবং আমলের
দৃষ্টিকোণ থেকেও অগ্রজ। আলী মুর্তাজা (রা:) বলেন, তুমি কুরাইশী হলে আমার বিশ্বাস তুমি আলদা গোত্রের। সে বলল, হ্যাঁ! আল্লাহপাক যদি
মুমিন বান্দাদের অবৈধ কাজ থেকে না বাঁচাতেন তাহলে আমি তোমাকে হত্যা করে ফেলতাম। এরপরও তুমি যখন জীবিত থাকো তথাপিও আমার পক্ষ থেকে তোমার প্রতি এমন শংকা ভয়
থাকবে যা এই কূ -চিন্তা পরিহার করা ছাড়া দূর হবে না। তুমি জানো না, আবূ বকর চারটি বিষয়ে আমার চেয়ে অগ্রজ। প্রথমত: নামাযের ইমামতি যা তাকে কওমের নেতায় পরিণত করেছে। দ্বিতীয়ত: হিজরতে, তৃতীয়ত : নবীজীর গুহার সহযাত্রী, চতুর্থত: ইসলাম প্রকাশ ও প্রচারে। আল্লাহর বান্দা! তুমি কী জানো না, আল্লাহ তাআলা যেখানে সকল লোকদের নিন্দাবাদ করেছেন সেখানে এাত্র আবূ বকরের প্রসংসা করেছেন এই বলে, (হে মোমেনগণ!) তোমরা যদি তাঁকে ( এ কাজে) সাহায্য না করো তাহলে আল্লাহ তাআলাই তাঁকে সাহায্য করবেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে তখনো সাহায্য করেছিলেন যখন কাফেররা তাঁকে তাঁর ভিটে -মাটি থেকে বের করে দিয়েছিলো (বিশেষ করে) যখন সে (নবী) ছিল মাত্র দু'জনের
মধ্যে একজন, (তাও আবার) তারা দুজন ছিল (অন্ধকার এক) গুহার মধ্যে, সে (নবী) যখন তাঁর সাথীকে বলেছিল, কোনো দুশ্চিন্তা করো না, আল্লাহ তাআলা আমাদের সাথেই আছেন, অতঃপর আল্লাহ তাআলা তার ওপর প্রশান্তি নাযিল ( করে তাকে সাহায্য ) করলেন এবং এবং
অদৃশ্য এক বাহিনী দ্বারা তাকে শক্তি যোগালেন।
অনুরূপ আরেকটি ঘটনা যা তাবারানী আওসাতে
বর্ণিত হয়েছে। বর্ণনাটির কানযুল উম্মাল ও তারিখুল খোলাফাতেও নকল করা হয়েছে। বর্ণনাটি এমন --
"সিলাহ ইবনে নযর থেকে বর্ণিত, হযরত আলী (রা:) এর ওখানে যখন আবূ বকর (রা:) এর নামোল্লেখ হত তখন তিনি বলতেন, সবকাজের অগ্রজের নামোচ্চারণ হচ্ছে, সর্বকাজের অগ্রণীর
নামোল্লেখ হচ্ছে। কসম সেই সত্ত্বার যার কুদরতী কব্জায় আমার প্রাণ, কল্যাণধর্মী যে কাজেই আমরা অগ্রজ হতে চেয়েছি সে কাজে আবূ বকর আমাদের সকলকে ছাপিয়ে গেছেন।
তাছাড়া ইবনে আসাকিরের বরাতে আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ুতি (রহ:) বর্ণনা করেন, হযরত সিদ্দীকে আকবারের ইসলাম গ্রহণের কথাটি। আর সেটি অবশ্যই হযরত আলী (রা:) এর সূত্রে --
"ইবনে আসাকির হারেসের সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি হযরত আলী (রা:) বরাত টেনে বলেন, প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের মধ্যে সবার আগে ইসলাম গ্রহণ করেন হযরত আবূ বকর (রা:)
১। সব কাজের অগ্রজ আবূ বকর (রা:)।
২। বিশেষ করে উল্লেখিত চার কাজে তিনি অনন্য
৩। ইসলাম গ্রহণে সবার ওপরের তালিকায় তাঁর নামটি। প্রাক অগ্রজ (সাবেকীনে আওয়ালীন) এর নূরাণী তালিকায় শীর্ষে তাঁর নাম।
হিজরতের সফরে সিদ্দীকি সঙ্গ ও ফেরেশতার মদদ।
" হযরত আলী (রা:) বর্ণনা করেন,নবী করীম (সা:) জিবরীল (আ:) কে জিজ্ঞাসাা করেন, হিজরতে আমার সঙ্গী কে হবেন? তিনি উত্তরে বললেন, আবূ বকর হবেন, ইনি সিদ্দীক।
" আলী ইবনে আবূ তালেব (রা:) বলেন, রাসুলে খোদা (সা:) আমাকে ও আবূ বকরকে ইশারা করে
ইরশাদ করলেন, (যুদ্ধের মাঠে) তোমাদের একজনের সাথে জিবরীল থাকবেন অপরজনের সাথে থাকবেন মিকাঈল, আর ইসরাফীল এক বিশালে ফেরেশতা, যিনি রণাঙ্গনে উপস্হিত হয়ে জঙ্গি কাতারে ঢুকে পড়েন।
লক্ষ্যণীয়: সিদ্দীকে আকবারের প্রশংসায় বর্ণিত উপরিউক্ত সব বর্ণনাই হযরত আলী (রা:) এর।
তাঁর মাধ্যমেই এগুলো উম্মাতে মুসলিমার কাছে পৌঁছেছে। এগুলো সবই তাঁদের অকৃত্রিম বন্ধুত্বের ও সৌহার্দের নমূনা নয় কি? চক্ষুষ্মান মাত্রই একে
মূল্যায়ন করতে পারেন।
গোড়ার দিকে আবূ বকর (রা:) ই প্রথম কুরআনের সংকলক।
১ম ও ২য় বর্ণনার সংক্ষিপ্ত তরজমা এই যে,
আব্দে খায়ের বলেন, হযরত আলী মুর্তাজা (রা:) বলেন, আবূ বকরের প্রতি আল্লাহ দয়া পরবশ হোন, কেননা তিনিই প্রথম কুরআনকেএক মলাটের ভেতর নিয়ে আসার উদ্যোগ নিয়েছেন।
জান্নাতে বয়োজ্যেষ্ঠদের সর্দার আবূ বকর ও ওমর
এক্ষণে আলোকপাত হবে শায়খাইনের জান্নাতে বিশেষ মর্যাদার। আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম ছাড়া বাদবাকী বয়োজ্যেষ্ঠদের সর্দার হবেন হযরত
আবূ বকর ও ওমর (রা:)। এ মর্যাদা হযরত হাসান ও হুসাইন (রা:) যেভাবে জান্নাতী যুবকদের সর্দার ঠিক সেই মাফিক। শাইখাইনের এই মর্যাদা সর্বপ্রথম নবী করীম (সা:) পবিত্র যবান থেকে নিঃস্মৃত। পরে হযরত আলী (রা:) ও অন্যান্য সাহাবাদের বর্ণিত। নিম্নে এতদ্বিষয়ক হাদীসমুহ উল্লেখ করা হলো --
শেরে খোদা হযরত আলী মূর্তাজা (রা:) বলেন, আমি হযরত রাসূলে আকরাম (সা:) এর খিদমতে
হাযির ছিলাম ( এ সময় হযরত আবূ বকর ও ওমর (রা:) হাযির হলেন)। হুযূর (সা:) তাঁদের দিকে তাকিয়ে আমার উদ্দেশ্যে বললেন, নবী রাসূলগণ ছাড়া সকল জান্নাতী বয়োজ্যেষ্ঠদের সর্দার হবেন আবূ বকর ও ওমর (রা:)। আলী হে! তুমি বিষয়টি এখনই ওঁদের কাছে বলো না (যদি প্রয়োজন হয় আমিই পরে কোন এক সময় ওঁদেরকে বলে দেব)। রাসূল (সা:) এর ওসিয়ত
মোতাবেক হযরত আলী (রা:) শায়খাইনের এই ফযিলত ও মাহাত্ম্য তাঁদের ওফাতের পর জনগণের সামনে তুলে ধরেন।
ফায়দা:-
শায়খাইনের এ ফযিলত অন্যান্য সাহাবা থেকেও বর্ণিত। যেমন --
১) জামে তিরমিযী,বাবু মানাকিবী আবি বাকরিনিস সিদ্দীক, বর্ণনায় আনাস ইবনে মালিক
ও ইবনে আব্বাস (রা:)।
২) সুনানে ইবনে মাজা, বাবূ ফযলি আবি বকরিনিস সিদ্দীক। আবূ জুহায়দা (রা:) থেকে মরফুআন বর্ণিত।
৩) তারীখে জুরজান এ ইবনে ওমর (রা:) থেকে বর্ণিত আছে।
বিজ্ঞজনদের ইশারাই যথেষ্ট। যেহেতু আমাদের সামনে কেবল হযরত আলী (রা:) এর বর্ণনা উল্লেখ করা উদ্দেশ্য ছিল। এজন্য অন্যান্য রেওয়ায়েতে কতকটা ইচ্ছাপূর্বকই পরিহার করেছি।
হাদীসের বর্ণনা গ্রহণের মাসয়াল
এক্ষণে আমরা আলী (রা:) থেকে এমন কিছু বর্ণনা পেশ করব যাতে দেখা যাবে সিদ্দীকে আকবারের বর্ণনায় প্রতি তাঁর অবস্হা কত প্রবল ও প্রগাঢ়। এ জন্য যে সিদ্দীকে আকবারের বর্ণনা সরাসরি সত্যনির্ভর ছিল। আমরা সেই বর্ণনার দু' একটি ধারা উল্লেখ করছি।
হযরত আলী (রা:) বলতেন, যে বর্ণনা আমি সরাসরি রাসূল (সা:) থেকে না শুনতাম, সেটি
আমি কারো থেকে শুনলে আগেভাগে তাকে উদ্দেশ্য করে করে বলতাম, তুমি আদৌ এটি রাসুল (সা:) থেকে শুনেছ কি -না? তবে এ নিয়মটি আবূ বকর (রা:) এর বেলায় ব্যতিক্রম।
আমি নিশ্চিত ছিলাম আবূ বকর (রা:) মিথ্যা বলার মানুষ নন বরং তিনি মহান সত্যবাদী। আবূ বকর (রা:) আমার কাছে বর্ণনা করেন যে, তিনি
রাসূলুল্লাহ (সা:) কে বলতে শুনেছেন, যখন কোন মুসলিম থেকে গোনাহ হয়ে যায় অতঃপর সে উঠে উত্তমরূপে অযু করে দু'রাকাত নামায পড়ে এবং ইস্তেগফার করে আল্লাহ পাক তাকে মাফ করে দেন।
বর্ণনাটির উপকারিতা ও পরিণতি :
১) সাহাবারা পরস্পর থেকে জ্ঞানগত উপকার সাধন করতেন। যা তাঁদের পারস্পরিক নিষ্ঠা ও
আন্তরিকতার প্রকাশ্য দলিল।
২) সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর প্রতি হযরত আলী (রা:) এর দ্বীনদারী ও সততার প্রতি পূর্ণ আস্হা ছিল। আর সেটি এই পর্যায়ের যে, যত গুরুত্বপূর্ন মাসয়ালা হোক না কেন তাতে কোন প্রকার কসমের দরকার পড়তনা। শুধু বলতেই বা শুনতেই তিনি তা মনে প্রাণে কিশ্বাস করে নিতেন।
৩) উক্ত বর্ণনা দ্বারা এও জানা গেল যে, আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) এর বর্ণিত মাসয়ালা বনি হাশেমের নিকট অকাট্য ও সুনিশ্চিতরূপে প্রতীয়মান হত। কেবল ধারণা ও সম্ভাবনার পর্যায়ে ছিল না। অন্য কথায বলতে গেলে গোটা মানবজাতির মাঝে সত্যবাক হিসেবে আবূ বকর
(রা:) পরিচিত ছিলেন। যবানে নববী যাকে সেই উপাধিতেই ভূষিত করেছেন।
"আবূ য়াহয়া বলেন, আমি হযরত আলী (রা:) কে কসম করে বলতে শুনেছি, নিশ্চয় আবূ বকরের
'সিদ্দীক' উপাধিটি আল্লাহপাক আকাশ হতে অবতরণ করেছেন।
আবূ বকরের ইমামত ও প্রাধান্য: আস্হাআলীর
বক্ষ্যমান অনুচ্ছেদে আমরা শেরে খোদা হযরত আলী (রা:) এর এমন কিছু বর্ণনা সন্নিবেশ কবর যাতে সুধী পাঠক অনুধাবন করতে পারেন তাঁদের মধ্যকার সম্পর্কটি কত উদার মহৎ ও চমৎকার ছিল। নীচে এমন কিছু নমুনা পেশ করা হোক --
"আবূ বকর হুযালী হাসানের সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আলী মুর্তাজা (রা:) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) ইন্তিকাল করলে আমরা (দ্বীনি বিষয়ে) চিন্তা -ভাবনা করছিলাম। চিন্তা করে দেখলাম, রাসূলুল্লাহ (সা:) সিদ্দীকে আকবার (রা:) কে
নামাযের ইমামতি করিয়েছেন। কাজেই রাসূল (সা:) যাকে দ্বীনি কাজে (নামাযে) নেতা বানিয়েছেন তাঁকেই তো আমরা আমাদের রাষ্ট্রীয়
কাজের নেতা বানাতে পারি। আমরা আবূ বকরকে এই ভাবনা থেকেই নেতা বানালাম।
"নাযাল ইবনে সাবুরা হেলালী বর্ণনা করেন যে,
আমরা একবার হযরত আলী (রা:) এর সাথে হাসিখুশি প্রানোচ্ছল অবস্হায় সাক্ষাৎ করে বললাম, 'আমিরুল মুমিনীন! আপনার সঙ্গী-সাথী
সম্পর্কে আমাদেরকে কিছু বলুন।
তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) এর সব সঙ্গী-সাথীই আমার সঙ্গী ও বন্ধু। পরে আমরা আরজ
করলাম, তাঁদের সম্পর্কেই না হয় কিছু বলুন!
তিনি বললেন, আবূ বকর (রা:) এমন এক ব্যক্তিত্ব
জিবরাঈল ও রাসূলুল্লাহর ভাষায় আল্লাহপাক যাকে সিদ্দীক উপাধিতে ভূষিত করেছেন। তাঁকে
নামাযের ইমামতি দিয়ে আমাদের দ্বীনের কাজে
রাসূলের প্রতিনিধি করেছেন। যেহেতু তিনি ধর্মীয় কাজে একবার প্রতিনিধিত্ব করেছেন সেহেতু আমরা তাঁকে আমাদের পার্থিব কাজের প্রতিনিধিত্বের ওপর আস্হাশীল হলাম।
" হযরত হাসান বসরী (রা:) হযরত আলী (রা:) এর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা:) (নামাযের ইমামতিতে) আবূ বকর (সা:) কে অগ্রগামী করলেন, তিনি জানাযার নামায পড়ালেন অথচ আমি সেখানে উপস্হিত ছিলাম -- অনুপস্থিত ছিলাম না। ছিলাম সুস্হ সবল - অসুস্হ ছিলাম না। রাসূলুল্লাহ (সা:) যদি আমাকে
তাঁর স্হানে চাইতেন আগে বাড়াতে পারতেন। সুতরাং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যেখানে তাঁকে দ্বীনি
কাজে অগ্রগামী করলেন, প্রাধান্য দিলেন , সেখানে আমরা তাঁকে পার্থিব কাজে প্রাধান্য দানের ওপর জোর দিয়ে সন্তুষ্ট থাকলাম।
নাহজুল বালাগাহ'র ভাষ্য
উপরিউক্ত বর্ণনার শেষে আমরা শীয়া কিতাব থেকে একটি উদ্ধৃতি টানব। সেখানে হযরত আলী
মুর্তাজার একটি স্বীকৃতি রয়েছে যে, খেলাফতের সর্বাধিক অধিকারী ছিলেন হযরত আবূ বকর (রা:) 'গুহার বন্ধু' নবীজীর জীবদ্দশায় নামাযের ইমামতকারী হিসেবে তার নিয়োগ এক অনন্য নযীর। আবূ বকর জওহরীর বর্ণনা যা ইবনে আবিল হাদীদ তার শরহে নাহজুল বালাগাহ -এ বর্ণনা করেন। হযরত আলী (রা:) , যুবায়ের ইবনুল আওয়াম (রা:) সহ অনেকেই হযরত সিদ্দীকে আকবারের মাহাত্ম্য ও বড়ত্ব বর্ণনা করেন। বর্ণনাটি কাটছাট করে নিম্নে উদ্ধৃত হল --
"আলী ও যুবায়ের (রা:) বলেন, খেলাফতের ময়দানে আবূ বকরকেই আমরা সর্বাধিক যোগ্য বলে মনে করি। নিশ্চয়ই তিনি গুহার সাথী ছিলেন। তাঁর উপাধি 'দু'জনার একজন'। আমরা তাঁর মহত্ব ও বড়ত্বের অকুন্ঠ স্বীকৃতি দাতা। নবীজীর জীবদ্দশায় তিনি তাঁকে নামাযের আদেশ করেছিলেন।
বায়াতের আলোচনায় আমরা পূর্বে এ বিষয়ে বিশাদ আলোচনা করেছি সিদ্দীকি 'ফাযায়েলে,
এবার সরাসরি শীয়াদের গ্রন্হের উদ্ধৃতি ও স্বীকৃতি
পেলাম।
আবূ বকরের মৃত্যুতে আলীর শোক ও মহিমা -কীর্তনঃঃ
আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ুতী (রহ:) ঐতিহাসিক ইবনে আসাকিরের বরাতে নিম্নোক্ত বর্ণনাটি উল্লেখ করেন --
"আল্লামা ইবনে আসাকির (রহ:) হযরত আলী (রা:) এর উদ্ধৃতি টেনে বলেন, আবূ বকরের মৃত্যুর সময় চাদরাবৃত অবস্হায় হযরত আলী (রা:) তার ওখানে তাশরীফ নিয়ে আসেন।
"সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর ইন্তেকালের পর তাঁর চাদরাবৃত লাশে ঢাকা ঘরের দরোজায় এসে মৃতের উদ্দেশ্যে হযরত আলী (রা:) বললেন, কসম খোদার! দ্বীনের গোড়ার দিকের আপনি একজন নিবেদিত প্রাণ কর্মী ছিলেন। একাজে আপনি ঠিক তখনই সাড়া দিয়েছিলেন যখন এই দ্বীনের কান্ডারীর প্রতি অনেকেই বিরক্ত ছিল। শেষ বয়সেও এই ধর্মের আপনি গুরুজন। মানুষ যখন কাপুরুষ ও দুর্বল হতেছিল, দ্বীনের খাতিরে আপনি তখন ওই পাহাড়ের মত অটল ও মজবুত ছিলেন প্রচন্ড ঝঞ্জাবায়ু যাকে একটু টলাতে পারেনি। প্রচন্ড ভূমিকম্প যাকে সস্হান হতে একটু নড়াতেও পারেনি। (নবীজীর ইন্তেকালের পর বিভিন্ন ফেৎনা আপনি লৌহকঠিন সিদ্ধান্ত দ্বারা সামলেছেন)।
এখানে আমরা তৃতীয় একটি বর্ণনা আনব যা উসায়দ ইবনে সাফওয়ান কর্তৃক বর্ণিত । বর্ণনাটি দীর্ঘ। সেটি সংক্ষিপ্তকারে পেশ করছি --
"উসায়দ ইবনে সাফওয়ান নবী করীম (সা:) এর সাহাবী ছিলেন। তিনি বলেন, আবূ বকর (রা:) এর ইন্তেকাল হলে মদীনায় শোকের ছায়া নেমে এল। কান্নায় মদীনা কেঁপে ওঠল। নবীজীর ইন্তেতালের দিনের মত শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হল। এ সময় হযরত আলী কাঁদতে কাঁদতে দ্রুত 'ইন্নালিল্লাহ মুখে' পৌঁছুলেন। বলতে লাগলেন, আজ থেকে নববী খেলাফতের ছন্দ পতন ঘটল। এরপর তিনি
লাশঘরে গেলেন। অশ্রুসজল নয়নে বললেন, আল্লাহ তোমার প্রতি দয়াপরবশ হোন আবূ বকর! ইসলাম গ্রহণকারীদের নুরাণী তালিকার শীর্ষে তোমার নাম। ঈমানে নিষ্ঠ ও ইয়াকীনে অথৈ আস্হাবান তুমি।
"ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন, (ওফাতের পর হযরত ওমর (রা:) কে খাটিয়ার পর ওপর রাখা হল। লোকেরা তার চারপাশে জমায়েত হল। নানা
দু'আ -দরূদ পড়ছিল। এ সময় হযরত আলী মুর্তাজা (রা:) এলেন। ওমর (রা:) কে খেতাব করতে গিয়ে বললেন, আমার এই ধারণা ছিল যে, আল্লাহপাক আপনাকে আপনার দু'দোস্ত নবী কারীম (সা:) ও আবূ বকর (রা:) এর সহকর্মী বানাবেন। কেননা আমি রাসূলুল্লাহ (সা:) অসংখ্য বার বলতে শুনেছি। তিনি বলেছেন, আমি, আবূ বকর ও ওমর (অমুক কাজের জন্য) বেরোলাম। আমি, আবূ বকর ও ওমর (অমুক স্হানে) প্রবেশ করলাম এবং আমি, আবূ বকর ও ওমর (অমুক স্হান হতে) বিদায় নিলাম। এতে হে ওমর! আমি
অনুধাবন করেছি তাদের দু'জনার সাথে আপনার সঙ্গ ও সংসর্গ (সর্বদার) জন্য নসীব হবে।
উক্ত বর্ণনাটি যদিও হযরত ওমরসংশ্লিষ্ট তথাপিও এর মাঝে হযরত আবূ বকর (রা:) এর ফজিলত ও বড়ত্ব নাহিত।
সার সংক্ষেপ ঃ
১) সিদ্দীকে আকবারের ইন্তেকালের খবর পাওয়ামাত্রই হযরত আলী (রা:) সেখানে পৌঁছান।
২) শোক জানিয়ে তাঁর অতুল্য ফজিলত বর্ণনা করেন।
৩) তাছাড়া এই স্বাক্ষ্যটিও প্রনিধানযোগ্য যে, সিদ্দীকে আকবার সর্বপ্রাচীন, ঈমানে অগ্রজ, মুখলিছ ও প্রগাঢ় ইয়াকিনধারী।
৪) আবূ বকর সিদ্দীক ধর্মী (রা:) কোন লোক মুসলিম উম্মাহর মাঝে নেই।
৫) নানা বর্ণনা দ্বারা একথা জানা গেছে, হযরত আবূ বকর (রা:) এর কাফন -দাফনে হযরত আলী (রা:) শরীক হন। এ কথার কোনও প্রমান নেই যে,
তিনি জানাযার মুহুর্তে গায়েব ছিলেন! আগে পরে উপস্হিত ছিলেন !!
শায়খাইনের জীবনের সাথে নবীজীবনের সাযুজ্য
হযরত আলী (রা:) এর বর্ণনা দ্বারা জানা যায় সিদ্দীকে আকবার ও ফারুকে আযমের সীরাত ও আমল হুযুর (সা:) এর সীরাত ও আমলের সাথে সাযুজ্য রাখে। এ প্রসংগে শেরে খোদা হযরত আলী (রা:) এর বর্ণনা --
"আব্দে খায়ের বলেন, একবার হযরত আলী (রা:) মিম্বরে বসে বললেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) ইন্তেকাল করলেন। হযরত আবূ বকর (রা:) খলীফা নিযুক্ত হলেন। তিনি নবী করীম (সা:) কর্মপদ্ধতি মোতাবেক আমল করেন। হুযুর (সা:) এর সীরাত মোতাবেক কাজকর্ম করতে থাকেন। আমৃত্যু তিনি এর ওপর থেকেছেন। এরপর হযরত ওমর (রা:) খলীফা হন। তিনিও তার দু'পূর্বেসূরীর জীবনাচার মোতাবেক কাজকর্ম চালিয়ে যান। আমৃত্যু এর ওপর বহাল থাকেন।
পরবর্তীতে হযরত আলী (রা:) এর বর্ণনায় এও পাওয়া যায় যে, তিনি বলেন, সিদ্দীকে আকবারের বিরোধীতা করতে আমার শরম লাগে। যেহেতু সিদ্দীকের প্রতিটি রাষ্ট্রীয় কাজই নববী -রীতিমাফিক ছিল। সেহেতু তাঁর বিরোধীতা করতে হযরত আলীর লজ্জা করত। আবূ তালেব আশশারীর বর্ণনা --
"হযরত আলী মুর্তাজা (রা:) বলেন, হযরত আবূ বকর (রা:) এর বিরোধীতা করতে আমি লজ্জাবোধ করি।
উপরোক্ত কথার সমর্থন আমরা শীয়া বন্ধুদের কিতাবেও দেখি। ফাদাকের ঘটানায় হযরত আলী (রা:) যে মন্তব্যটি সিদ্দীকে আকবারের শানে করেছিলেন সেটি নিম্নোক্ত শব্দমালায় এভাবেই উঠে এসেছে --
"যেমন ( খেলাফতের বিষয়টি হযরত আলী পর্যন্ত পৌঁছাল, এ সময় ফাদাকের বিষয়টিও সামনে চলে এল) তখন হযরত আলী (রা:) বললেন, আমি আল্লাহর কাছে লজ্জানুভব করছি সেই বিষয়টি নিয়ে যা হযরত আবূ বকর (রা:) স্হগিত করে রেখেছেন, ওমর (রা:) ও তা বহাল করেছেন যে, উহা আমি ফেরৎ নেব এবং ফিরিয়ে দেব।
এরদ্বারা প্রতীয়মান হল, হযরত আলী (রা:) এর কাছে শায়খাইনের শীরাত পুতঃপবিত্র ছিল। এজন্য তিনি তাদের খেলাফত বিষয়ে কোন প্রকার বিরোধীতা করেননি। বরং কথা ও কাজে তাঁদের যথাসম্ভব সহযোগিতা করেছেন।
এছাড়া নিম্নোক্ত কিছু বর্ণনায় ও হযরত আলী (রা:) কে তাঁর খেলাফত কালে সিদ্দীকে আকবার (রা:) ও ফারুকে আযম (রা:) এর জীবনাচার ও কর্মকান্ডকে কুরআন -সুন্নাহ মোতাবেক স্বীকৃতি দিতে দেখা যায় --
নবীপাক (সা:) এর পরে মুসলমানেরা তাদের মধ্য হতে দু'জন আমীর নিযুক্ত করেন যারা নেককার ও পরহেযগার ছিলেন। তারা উভয়েই
কুরআন -সুন্নাহর ওপর আমল করতেন। উত্তম ছিল তাদের চরিত্র ও জীবনাচার। সুন্নাতে নববীর বাইরে তাঁরা কোনও কাজ করতেন না। এই চেতনা
নিয়েই তাঁরা মৃত্যুবরণ করেছেন। আল্লাহ পাক তাঁদের উভয়ের প্রতি সদয় হোন।
উপরোক্ত কথা হযরত আলী (রা:) লিখিত একটি পত্রের অংশবিশেষ। যা তিনি মিশরের জনৈক গভর্ণরের কাছে লিখেছিলেন --
"হামদ ছানার পর হযরত আলী (রা:) লিখলেন, আল্লাহপাক তাঁর নবীকে প্রেরণ করলেন। তাঁর দ্বারা মানুষের মধ্যকার ভ্রষ্ঠতা ও ধ্বংসলীলা অপনোদ করালেন। বিচ্ছিন্নতা থেকে তাদের একীভুত করলেন। পরে আল্লাহ তাআলা তাঁকে উঠিয়ে নিলেন। তিনি তাঁর জিম্মাদারী পুরা করলেন। লোকেরা আবূ বকর (রা:) কে খলীফা বানাল। পরে আবূ বকর (রা:) হযরত ওমর (রা:) খলীফা মনোনীত করলেন। তাঁরা দুজনাই উত্তম চরিত্রের আঁধার ছিলেন। উভয়েই ন্যায় বিচারের
প্রতিভু ছিলেন।
No comments:
Post a Comment