Sunday, 26 May 2019

দ্রুত বায়াত প্রসঙ্গে তাবেয়ীদের অভিমত

হযরত আবূ বকর (রা:) এর হাতে হযরত আলী (রা:) এর সসন্তুষ্টিতে দ্রুত বায়াত প্রসঙ্গে ইতোপূর্বে বিশদ আলোচনা হয়েছে। বক্ষ্যমান পরিচ্ছেদ পেছনের বর্ণনাসমূহকে আরো প্রমাণপুষ্ট ও শক্তিধর করবে। প্রতীয়মান হবে, হযরত আলীর বায়াতটি ছিল চাপমুক্ত, স্বতঃস্ফুর্ত সর্বোপরি দ্রুত। ১. সাঈদ ইইবনুল মুসাইয়িব (রা:) এর ভাষ্য
"হযরত আলী (রা:) সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর হাতে বায়াত নিতে ঘর থেকে বেরোলেন। পথিমধ্যে কতিপয় আনসারী থেকে বায়াত প্রসংগে কিছু কথা শুনে বললেন, যে ব্যক্তিকে স্বয়ং নবী করীম (সা:) অগ্রজ করেছেন তাকে অনুজ করবে কে?  সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব বলেন, হযরত আলী (রা:) এমন একটা ভারী (সারগর্ব)  কথা বললেন, আর কোন লোক এমন কথা বলতে পারে নি।
 ২. হাসান বসরী (রা:) এর ভাষ্য
দ্রুত বায়াত প্রসংগে কায়েস ইবনে উবাদাহর সূত্রে হাসান বসরী (রহ:) বর্ণনা করেন --
"কায়েস বলেন, হযরত আলী (রা:) আমাকে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) তাঁর জীবনের  শেষ দিনগুলোতে অসুস্হ ছিলেন। সে সময় তিনি বলেছিলেন,  আবূ বকর (রা:) কে সামায পড়াতে বল। (সুতরাং অন্তিম মুহুর্তে তিনিই নামায পড়িয়েছিলেন,  তিনি ইন্তেকাল করার পর আমি একটি বিষয়ে ভেবে দেখেছি যে, 'নামায ইসলামের প্রতীক এবং দ্বীন প্রতিষ্ঠার মাধ্যম। সুতরাং দ্বীনের গুরুত্বপূর্ন কাজে আল্লাহর রাসূল (সা:) যাকে নির্বাচিত করেছেন, পার্থিব কাজে আমরাও তাঁকে নির্বাচিত করতে পারি। পরে আমরা হযরত আবূ বকর (রা:) এর হাতে বায়াত হই।
 ৩. তাবেয়ী আবু জুহাফ (রা:) এর ভাষ্য
আবূ জুহাফ (রহ:) এর একটি ভাষ্য এখানে প্রনিধানযোগ্য। তিনি বলেন --
"আবূূ জুহাফ (রহ:) বলেন, হযরত আবূূ বকর (রা:) খলীফা নিযুক্ত হলে জনগণের সামনে তিনবার আওয়াজ দিয়ে বলেন, উপস্হিত জনতা আমি তোমাদের বায়াত ফিরিয়ে দিচ্ছি (তোমরা অন্য কাউকে খলীফা নাযুক্ত কর)  ওই সময় হযরত আলী (রা:) বলেন, আমরা নিজেরা না এই বায়াত ফিরিয়ে নেব, না আপনাকে ফেরৎ দিতে দেব। রাসূলুল্লাহ (সা:)আপনাকে নামায পড়াতে আদেশ করেছিলেন। এক্ষণে কে আপনাকে ওই পদমর্যাদা থেকে সড়াবে?
  ৪.  ইমাম যায়দ ইবনে আলী (রহ:) এর ভাষ্য
দ্রুত বায়াত প্রসংগে যায়দ ইবনে আলী (রহ:) বলেন --
"ইমাম যায়দ ইবনে আলী (রা:) তাঁর বাপ -দাদাদের সূত্রে বলেন, একদা হযরত আবূ বকর (রা:) মসজিদে নববীর মিম্বারে দাঁড়িয়ে বলেন, কেউ যদি আমার খেলাফতকে অপছন্দ করেন তাহলে আমি এই খেলাফতকে ফিরিয়ে দিতে প্রস্তুত আছি।  কথাটি তিনি তিনবার উচ্চারণ করলেন। কথাটির জবাবে হযরত আলী (রা:) বললেন, কসম আল্লাহর! আমরা যেমন আমাদের বায়াত ফেরৎ নেব না তেমনি আপনাকে বলব না ফেরৎ দিতেও। আল্লাহর রাসূল (সা:) আপনাকে অগ্রজ করেছেন -- একে পশ্চাতে ফেলতে পারে কে?
৫.আবদুর রহমান ইবনে আবূ বকরাহ (রা:) এর ভাষ্য
আবূ তালেব আশারী তার 'ফাযায়েলে গ্রন্হে সনদসহ বর্ণনা করেন --
"আবদুর রহমান ইবনে আবূ বকরাহ (রহ:) বর্ণনা করেন, আলী (রা:) একদা আমার অসুস্হকালীন খোঁজ খবর নিতে এলেন। ওইসময় তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) ইন্তেকাল করলে হযরত আবূ বকরকে জনগণ  খলীফা করে নেয়ায় আমিও তাঁর হাতে বায়াত হই এবং তাঁর প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করি। আবূ বকর (রা:) ইন্তেকাল করলে হযরত উমর (রা:) খলীফা নিযুক্ত হন। আমি তাকে খলীফা মেনে নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করি। পরে হযরত উমর (রা:) ইন্তেকাল করার পূর্বে একটি মজলিসে শুরা কায়েম করে যান। এ সময় মানুষেরা হযরত ওসমান (রা:) এর হাতে বায়াত নেন। আমিও  সকলের দেখাদেখি তাঁকে খলীফা সাব্যস্ত করে তাঁর প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করি।
"কায়েস ইবনে আব্বাদ বলেন, হযরত আলী (রা:) বলেন,যিনি শস্য -দানা ও প্রাণ পয়দা করেছেন সেই সত্তার কসম!  যদি সরওয়ায়ে কায়েনাত (সা:) খেলাফত বিষয়ে আমার ব্যাপারে কোনও সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকতেন তাহলে আমি সেই শক্তিবলে দণ্ডায়মান থাকতাম এবং আবূ বকর (রা:) কে মেম্বারে নববীর কোনও সিড়িতে চড়তে দিতাম না।
উপরোক্ত বর্ণনাসমূহের পর আরো বিস্তারিত জানার জন্য জঙ্গে জামালকালীন বর্ণনাসমূহও দেখা যেতে পারে।  যেমন --
 ৬ . "হযরত আলী (রা:) থেকে বর্ণিত জঙ্গে জামালের দিনে তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) তাকে ক্ষমতা ও খেলাফত বিষয়ে কোনও অসিয়ত করেননি। নেননি আমাদের থেকে কোনও প্রতিশ্রুতিও। তবে আমাদের মনে গাওয়া দিত খেলাফতের অধিকারী আমরা। যদি এই ব্যাপারটি যথার্থ হত তাহলে আল্লাহ পাক তা করিয়ে দেখাতেন। যাহোক আবূ বকর (রা:) খলীফা হলেন। তাঁর প্রতি আল্লাহ পাক দয়াপরবশ হোন। তিনি ধর্মের গতিপথ সঠিক রেখেছেন এবং নিজেই ধর্মের ওপর ইস্পাত কঠিন থেকেছেন। তারপরে হযরত উমর (রা:) খলীফা হলেন। আল্লাহপাক তাঁর প্রতি দয়াপরবশ হোন। তিনি ধর্মকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং নিজেও ধর্মের প্রতি অটল থেকেছেন।
 ৭ . বিশিষ্ট তাবেয়ী হযরত সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব (রহ:) এর আরেকটি ভাষ্য:
" হযরত আলী (রা:) খলীফা নিযুক্ত হলে জনৈক ব্যক্তি তাঁকে বলেছিল, মুহাজির -আনসারীরা আপনাকে বাদ দিয়ে আবূ বকর (রা:) কে খলীফা করতে গেল কেন? অথচ ইযযত সম্মানে আপনি সবার চেয়ে সেরা। ইসলাম গ্রহণের দিক দিয়েও আপনি সর্বপ্রাচীন। তিনি বললেন, যদি আমীরুল মুমিনীনের হাত থেকে আল্লাহ তোমাকে না বাঁচাতেন তাহলে এতক্ষণে তুমি মারা পড়তে। আর যদি তুমি জীবিতই থাকো তাহলে আমার ভয় সর্বদা তোমাকে তাড়া করে ফিরবে। (যা তোমাকে এই বিপথগামী  চিন্তা থেকে বাঁচাবে) তুমি কি জানোনা হযরত আবূ বকর (রা:) চারটি বিষয়ে আমার চেয়ে সেরা। যা আমি না করতে পারব, না এর বিনিময়ে আমি কিছু করেছি। ১.গাছে ছৌরে হিজরতকালীন তাঁর সঙ্গদান। ২. হিজরতে অগ্রগামিতা। ৩. আমার শৈশবে ইসলাম গ্রহণ আর তাঁর বার্ধক্যে। ৪. স্হলাভিষিক্ত হিসেবে নবীজীর স্হানে নামাযে ইমামতি।
৮. ইমাম হাসান (রা:) এর ভাষ্য --
"ইমাম হাসান (রা:) থেকে বর্ণিত, হযরত তালহা ও তার দলবলের ব্যাপারে হযরত আলী (রা:) বসরা আগমন করলে আব্দুল্লাহ কাওয়া ও ইবনে আব্বাদ তার খেদমতে হাজির হন। তারা বলেন, আমীরুল মুমিনীন! আপনি এই সফর সম্পর্কে বলুন! নবী করীম (সা:) কী আপনাকে এই সফর সম্পর্কে কিছু বলেছিলেন? কোন ওয়াদা-অঙ্গীকার নিয়েছিলেন? কিংবা আপনার অভিমত কী?  এখন উম্মতের মাঝে বিক্ষিপ্ততা ও হতাশা ছড়িয়ে পড়ছে। ঐক্য ও সংহতিতে ফাটল ধরছে। হযরত আলী (রা:) বলেন, আমি রাসূল (সা:) সম্পর্কে কোন মিথ্যাচার করব না। কসম আল্লাহর! সরওয়ারে কায়েনাত (সা:) এর মৃত্যু আচমকাই হয়নি। কেউ তাঁকে শহীদও করেনি। রাসূল (সা:)
রোগভোগে পড়েছিলেন। মোয়াজ্জিন এসে তাকে নামাযের সংবাদ দিলে তিনি বললেন, আবূ বকরকে বলো নামায পড়িয়ে দিতে। তিনি আমাকে ছেড়ে আবূ বকরকেই এই মহৎ কাজটি করতে বললেন। অথচ আমার পদমর্যাদা তোমাদের অজানা নয়। সত্যিই তিনি যদি আমাকে নিয়ে কোনও ওয়াদা -অঙ্গীকার করতেন তাহলে অতি অবশ্যই আমি তা পূরণ করতে দাঁড়াতাম।
রাসূলুল্লাহ (সা:) ইন্তেকাল করলে মুসলমানেরা তাদের ভূত -ভবিষ্যত নিয়ে ভাবল। তিনি তাদের ভবিষ্যৎটি আবূ বকর (রা:) এর ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। ধর্মীয় ব্যাপারে আবূ বকর (রা:) কেই মুতাওয়াল্লী বানালেন। মুসলমানরাও তার হাতে বায়াত নিয়েছিল। তিনি জেহাদের জন্য তৈরী হলে আমিও তার সাথে জেহাদে শরীক হতাম। তিনি আমাকে কোন হাদীয়া দিলে তা গ্রহণ করতাম। হযরত আবূ বকর (রা:) শরয়ী কোনও দন্ডবিধান কায়েম করলে আমাকে এতে শরীক করতেন। পরে তিনি ইন্তেকাল করলে তাঁর সন্তানেরা যে কোনও কাজে আমাকে তাদের সঙ্গে রাখতেন। কিন্তু খলীফা হিসেবে তিনি মৃত্যুর আগে হযরত উমর (রা:) এরই নাম ঘোষনা করে যান। এ কাজে হযরত আবূ বকর (রা:) বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করেননি। মুসলমানেরা হযরত উমর (রা:) এর হাতে বায়াত হয়েছিল। আমিও তাদের দেখাদেখি তার হাতে বায়াত হয়েছিলাম। তিনি আমাকে জেহাদে উৎসাহিত করলে আমি তাতে সাড়া দিয়েছিলাম। তিনি আমাকে হাদীয়া -তোহফা দিলে তা সানন্দে গ্রহণ করতাম। কোনো দন্ডবিধান কায়েম করলে তাতেও তার সাথে থাকতাম।
পরবর্তিতে হযরত ওমর ইচ্ছা করলে যে কাউকে তার বংশ হতে খলীফা করে যেতে পারতেন কিন্তু তিনি তা করেননি। বরং মৃত্যুকালে তিনি ৬ সদস্যের একটি অন্তবর্তী সাব -কমিটি নির্বাচন করে যান। আমও ওই ৬সদস্যের এক সদস্য ছিলাম। এই কমিটি মনোনয়নের উদ্দেশ্য ছিল উম্মতের মধ্য হতে একজনকে খলীফা নিযুক্ত করা। এই ৬ জন হতে আমরা আবদুর রহমান ইবনে আওফকে আমীর নিযুক্ত করি। তিনি হযরত ওসমান (রা:) এর হাতে হাত রেখে বায়াত হন। ওই সময় আমি ভেবে দেখলাম আমি যে ওয়াদা ওই কমিটির কাছে করেছি তাতে এখনি আমাকে ওসমনের হাতে বায়াত নিতে হয়। কাল বিলম্ব না করে আমি বায়াত নিয়ে ফেলি। পরবর্তীতে তিনি
আমাকে যখন যে জিহাদে প্রেরণ করেন আমি স্বেচ্ছায় সেখানে প্রেরীত হই। তিনি যখন যেমন আমাকে হাদিয়া দেন তখন তা আমি সানন্দে গ্রহণ করে যেতে থাকি। ইসলামী দন্ড বিধান কার্যকারিতার প্রতিটিতে আমি তার সাথে অংশগ্রহণ করি। হযরত ওসমান (রা:) ও শহীদ হলে আমি খেলাফতবিষয়ে চিন্তা ভাবনা করতে থাকি। ভেবে দেখেছি আবূ বকর ও উমর (রা:) কে নিয়ে আমি যে ওয়াদা -অঙ্গীকার করেছি তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি। ওসমান (রা:) কে নিয়ে যে অঙ্গীকার করেছিলাম তাও পুরা করেছি (কাজেই খেলাফত বিষয়ে এক্ষণে আমিও যথোপুুক্ত)

No comments:

Post a Comment