Monday, 27 May 2019

সিদ্দীকে খেলাফতে হযরত আলী (রা:) -এর অংশীদারিত্ব

এ অধ্যায়ে হযরত সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর সাথে হযরত আলী (রা:) এর মধ্যকার উত্তম সম্পর্ক ও চমৎকার বোঝাপড়ার বিষয়গুলো প্রামান্যপুস্তক থেকে নেওয়াহবে। আশাকরি সুধী পাঠকের এতে তৃষ্ণা মেটবে।
 ( এক )
প্রথমতঃ সিদ্দীকে খেলাফতে ফেকহী মাসয়ালা বয়ান করা ও ফতোয়া দানে হযরত আলী (রা:) এর চোখে পড়ার মত অংশীদারিত্ব।
 ( দুই )
দ্বিতীয়ত: যুদ্ধকার্যে, সৈন্যপ্রহরা সর্বোপরি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে তাঁর কার্যকারী অংশগ্রহণ।
  (  তিন )
সমকালীন খলীফা থেকে হাদীয়া গ্রহণ -প্রদানে হযরত আলী (রা:) এর অংশগ্রহণ ছিল অন্যান্য সাহাবাদের মত সমান্তরাল।
 ( চার )
খেলাফতে সিদ্দীকে ও খেলাফতে ফারুকীতে অন্যান্য সাহাবোদের মত ইসলামী দন্ডবিধান ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় কার্যে হযরত আলী (রা:) সমানে অংশগ্রহণ করেছেন।
   উপরিউক্ত চারটি বিষয় আল্লাহ পাক নেক বান্দাদের পারস্পারিক সম্পর্কের দিকটাকে প্রকটাকারে কী ফুটিয়ে তোলে নয় কি?
               ফতোয়া প্রদানে আলী (রা:)
 খেলাফতে সিদ্দীকিতে হযরত আলী (রা:) এর
অবস্হান ফতোয়া দানের ক্ষেত্রে অন্যান্য সাহাবাদের চেয়ে অগ্রগামীই ছিল। ঐতিহাসিক ইবনে সায়াদের ভাষ্য --
"আবদুর রহমান ইবনে কাসেম তার বাবা কাসেমের সূত্রে বর্ণনা করেন যে, আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) যখন বিদগ্ধজন ও চিন্তাশীল লোকদের থেকে পরমর্শের জরুরত মনে করতেন
তখন মুহাজির -আনসারদের মাঝে বিশেষ করে
হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা:) ,হযরত ওসমান গণী (রা:) , হযরত আলী (রা:) , হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা:) , হযরত মায়াজ ইবনে জাবাল (রা:) , হযরত উবাই ইবনে কায়াব (রা:) ও হযরত জায়েদ ইবনে ছাবেত (রা:) কে ডেকে পাঠাতেন। এরা খেলাফত যুগের সেরা মুফতি ছিলেন। ফতোয়াপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে জনগণ এদের কাছেই ধর্ণা দিতেন। আবূ বকর (রা:) এর খেলাফতের শেষ পর্যন্ত এ ধারা চালু ছিল। ওমর
(রা:) ও মশওয়ারার এ ধারাটি চালু রাখেন এবং সকলকে এ কাজে ডেকে পাঠাতেন।
এভাবে শীয়া ঐতিহাসিকদের গ্রন্হেও হযরত আলী (রা:) এর ফতোয়া দানের ক্ষেত্রে অগ্রগামিতার উল্লেখ বিদ্যমান --
"আবূ বকর (রা:) এর খেলাফতযুগে নিম্নোক্ত ব্যক্তিবর্গকে ফেকহী মাসায়েলে ডেকে পাঠানো হত। এরা যথাক্রমে -হযরত আলী ইবনে আবূ তালেব, ওমর ইবনে খাত্তাব, মুয়ায ইবনে জাবাল,
উবাই ইবনে কায়াব, যায়দ ইবনে ছাবিত ও  আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযিআল্লাহু আনহুম।
   সংক্ষিপ্তসার
  ১। গুরুত্বপূর্ন কাজে সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর
মাশওয়ারা করার অভ্যাস ছিল। খেলাফতকার্যে তিনি স্বেচ্ছাচারী ছিলেন না।
২। সিনিয়র মুহাজির ও আনসারীরা খলীফায়ে ইসলামের সাথে সদাচার করতেন।
৩। বিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞা মুহাজির আনসারীদের মাঝে
হযরত আলী (রা:) ছিলেন  অন্যতম।
 ৪। সিদ্দীকি ও ফারুকী খেলাফতে হযরত আলী (রা:) মজলিসে শুরার অন্যতম সদস্য ছিলেন।
উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা প্রতীয়মান হলো হযরত আবূ বকর (রা:) আলী মুরতাযা (রা:) এর প্রতি
নেহায়েত আস্হাবান ছিলেন। তাদের মাঝে চমৎকার বোঝাপড়া ছিল। ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক।
সিদ্দীকে খেলাফত যুদ্ধাবস্হতার সম্মুখীন হলে হযরত ইবূ বকর সিদ্দীক (রা:) বড় বড় সাহাবা নিয়ে পরামর্শ করতেন। এক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরাম আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) এর সঙ্গ দিতেন। বিশেষ করে হযরত আলী (রা:) সকল কাজে খলীফার সাহায্যে অগ্রজ থাকতেন। এ সম্পর্কে আমরা কিছু ঐতিহাসিক প্রমাণাদি তুলে ধরব, উপরিউক্ত দাবী আদায়ে যা আমাদের দাবীকে প্রমাণপুষ্ট করবে।

হাফজ মুহিবুদ্দিন আহমাদ ত্ববারী (মৃ: ৬৯৪ হি:)  তাঁর 'যাখাইরুল মুরতাযা ফী মানাকিবী যাবিল কুরবা' -এ কলেণ -
"হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) মুরতাদবিরোধী  অভিযানে অন্যান্য সাহাবাদের পরামর্শ নেওয়ার পরে হযরত আলী (রা:) এর কাছে প্রশ্ন করেন, হে আবূল হাসান! আলী (রা:) এর উপমান  আপনি এ বিষয়ে কী বলেন? হযরত আলী (রা:) বলেন, মুরতাদ ও যাকাত অস্বীকারকারীদের থেকে নবী
করীম (সা:) যা যা আদায় করতেন আপনি যদি এর অন্যথা করেন তাহলে আপনি রাসূল (সা:) এর বিরোধীতা করলেন। এ কথা শুনে সিদ্দীকে আকবার (রা:) বললেন,  আপনি যেহেতু এই পরামর্শ দিলেন সেহেতু যাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে যাকাতের উটতো দুরের কথা উটের রশিও আমি ছাড়ব না। বাদ সাধলে যুদ্ধ ঘোষণা করব।
           যুল কিচ্ছার ঘটনা
"হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা:) থেকে বর্ণিত, আমার বাবা হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) ভাঙ্গা তলোয়ার হাতে যিল কিসসায় যাচ্ছিলেন।
হযরত আলী (রা:) ও এ সময় তাঁর সাথে ছিলেন। তিনি খলীফার লাগাম হাতে নিয়ে বললেন,  রাসূলের খলীফা হে! কোথায় যাচ্ছেন আপনি? এক্ষণে আমি আপনাকে ওই কথাই বলব স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা:) উহুদ প্রান্তরে আপনাকে যা বলেছিলেন। আপনি তলোয়ার কোষবদ্ধ করুন।
আপনার সত্বা নিয়ে আমাকে উদ্বিগ্ন করে তুলবেন না। কসম খোদার! আপনার ওপর কোনও মুসিবত আপতিত হলে তাহলে আপনার পরে ইসলামের প্রশাসন একেবারেই ভেঙ্গে পড়বে। সিদ্দীকে আকবার এই পরামর্শ  কবুল করে ফিরে এলেন এবং চলমান সৈনিকদের রওয়ানা করিয়ে দিলেন। এক্ষণে শীয়া বন্ধুদের কিতাব থেকে দেখব যেখানে সিদ্দীকি খেলাফতে হযরত আলী মুরতাজা (রা:) এর অংশীদারিত্বের স্বীকৃতি বিদ্যমান। স্বয়ং হযরত আলীর নিজস্ব জবানবন্দি সে সব জায়গায় সবিস্তরে উল্লেখ আছে। যেমন :  ওই সময় আমরা একজোট হয়ে বিরুদ্ধবাদীদের রুখে দাঁড়িয়েছিলাম। যদ্দরুণ ইসলাম ভারসাম্যপূর্ণ হয়েছিল। দেশে শান্তি -স্হিতি কায়েম হয়েছিল। নাহজুল বালাগাহ' র ভাষ্য --
"হযরত আলী (রা:) বলেন,  রাসূলুল্লাহ (সা:) এর পর আরব্য মুরতাদেরা মাথা উচুঁ করে দাঁড়ালে তাদেরকে রুখে দাঁড়ানো হয়। এতে ফেৎনা খতম হয় এবং দ্বীন ইসলামে শান্তি ফিরে আসে। দ্বীন ছিল এ সময় বিক্ষিপ্ত ও দোদুল্যমান। এক সময় এই মারাত্মক অবস্হা কেটে যায়।
  সংক্ষিপ্ত সার :
হযরত আবূ বকর (রা:) এর খেলাফতে প্রকৃতিই হযরত আলী (রা:) একজন নিষ্ঠাবান সহকর্মী ছিলেন। আদৌ তিনি এ খেলাফতের বিরোধী ছিলেন না। যদি এই খেলাফত বিদ্রোহাত্মক ও জবরদখলকৃত হত তাহলে শেরে খোদা অতি অবশ্যই বাহুবলে তা পুনরুদ্ধার করতেন। যেভাবে
বাহুবলে তিনি এই খেলাফতের নাযুক মুহুর্তে হায়দারী হাঁক থেকে তাতে শান্তি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছিলেন। নাযুক ওই মুহুর্তে আলী হায়দারের তলোয়ার খলীফার পক্ষেই কাজ করেছিল সেদিন।
উপরোক্ত বিষয় দ্বারা আরো জানা গেল, খোলাফায়ে রাশেদীনের সাথে হযরত আলী (রা:) এর খুবই হৃদ্যতা ও আন্তরিক যোগােযগ ছিল। যদিও পরবর্তীতে লোকেরা তাদের মাঝে অনৈক্য ও শত্রুতার কল্পকাহিনী ফেঁদেছিল।
 এমনিভাবে শীয়া -সুন্নীদের কিতাবেই রোম ও সিরিয়া সম্পর্কিত সুসংবাদবাহী একটি ঘটনা বিদ্যমান। সুধী পাঠকের খেদমতে সেই ঘটনাটি উল্লেখ করা থেকে লোভ সামলাতে পারছি না।
ঐতিহাসিকগণ লিখেছন, হযরত আবদুল্লাহ ইবন আবি আওফা থেকে বর্ণিত, রোমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে গিয়ে হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) প্রবিন আনসার ও মুহাজির বিষেষ করে বদরী সাহাবীদের ডেকে পাঠালেন। তিনি যাঁদেরকে ডেকে পাঠালেন, তাদের মাঝে সর্বজনাব হযরত ওমর (রা:) ,হযরত ওসমান (রা:) ,হযরত আবদু রহমান ইবনে আওফ (রা:) ,হযরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা:),হযরত সাইদ ইবনে সায়েদ (রা:) ও হযরত আবূ ওবায়দা (রা:)। তাঁরা এলে তিনি তাদের কাছে পরামর্শ চাইলেন, তারা পরামর্শ দিলেন --
"হযরত আলী (রা:) ওই দলের মাঝে খামোশ হয়ে বসেছিলেন। সিদ্দীকে আকবার (রা:) এ সময় বললেন, আবূল হাসান! আপনার মতামত কী ? বলুন! হযরত আলী বললেন, বললেন, আপনি স্ব -সৈন্যেে রোম আক্রমণ করেন কিংবা আপনি ছাড়াই সৈন্য প্রেরীত হোক না কেন -উভয় অবস্হায়ই জয় আপনার পদচুম্বন করবেই। আবূ বকর (রা:) বললেন, আল্লাহপাক আপনার আশাকে সুসংবাদে রূপান্তরিত করুন। তা আপনার এই আশাবাদের উৎস কী? আলী (রা:) বললেন, আমি নবী করীম (সা:) থেকে শুনেই বলছি। তিনি ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি এই দ্বীনের সাথে প্রতিদ্বন্দিতায় নামবে তাদের ওপর এই দ্বীন বিজয়ী হবেই। এমনকি দ্বীনদারগণও বিজয়ী হবেন। পক্ষান্তরে যারা দ্বীনকে মিসমার করার ইচ্ছা করবে,  পরিনামে তারাই ধ্বংস হয়ে যাবে। দ্বীন স্বরূপে দৃঢ়পদ হবে। বিরোধিরা হবে পরাস্ত।
হযরত আলী (রা:) এর নবীজীর এই ফরমান শোনার পর সিদ্দীকে আকবার (রা:) বললেন, আলী! আপনি আমাকে খুশী করলেন। আল্লাহ পাক আপনাকে খোশ করেন।
শীয়া বন্ধুদের কিতাবেও আমরা উপরিউক্ত ঘটনার
শব্দচিত্র খুঁজে  পাই --
"আবূ বকর রোম আক্রমনের পরিকল্পনা করলে
সাহাবীদের নিয়ে পরামর্শে বসেন। হযরত আলী
(রা:) এর কাছে খলীফা আবূ বকর (রা:) মত চাইলে তিনি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অনুরোধ জানান। বলেন, আপনি এ কাজ করলে বিজয়ী
হবেন। হযরত আবূ বকর (রা:) বলেন, আপনি বডড একটি ভাল কথা বললেন। একটি সুসংবাদ দিলেন।
সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর যুগে একবার মদীনা মুনওয়ারায় শত্রুর আক্রমনের সম্ভাবনার কথা জানা গেল। নায়ক ওই মুহুর্তে মদীনা তাইয়েবার সুরক্ষায় সৈন্য প্রহরার জরুরী হয়ে পড়ল। হযরত
আলী (রা:) এ সময় সেনাদলে শামিল হয়ে প্রহরাকার্য চালিয়ে গেলেন। সিদ্দীকে আকবার (রা:) ই এসব পরিকল্পনার রূপকার ছিলেন। আলী (রা:) উৎসাহে এসব মহতি কাজে এগিয়ে এলেন।
ইবনে জারীর তাবারীর ভাষ্য --
"হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) মদীনা শরীফ
হেফাজতকল্পে এর রাস্তাসমূহের ওপর সেনাবাহিনী প্রেরণ করলেন। সেনাদলের পুরোভাগ হযরত আলী (রা:) ইবনে মাসউদ (রা:) ,যুবায়ের (রা:), তালহা (রা:) কে রাখলেন। বাদবাকী সকলকে মদীনার মসজিদে জমায়েত করে খলীফা আবূ বকর (রা:) বললেন, মুসলিম ভ্রাতাগণ! এলাকার
লোকজন ইসলাম ত্যাগ করা শুরুকরে দিয়েছে।
ওদের প্রতিনিধিরা দিন রাত্রীর যে কোনও সময়
তোমাদের ওপর আক্রমণ করে বসবে। ১২ -১৪ মাইল দূরে এই মুহুর্তে ওদের অবস্হান।
উপরোক্ত ঘটনাসমূহ দ্বারা প্রতীয়মান হচ্ছে,  খেলাফতে সিদ্দীকী যদি অবৈধ ও বাতিল হত তাহলে বিপক্ষের সাথে যোগ দিয়েই হযরত আলী
(রা:) এর প্রতিশোধ নিতেন। উল্টো তিনি মদীনা
রক্ষাসহ সকল অভিযানে খেলাফতের সঙ্গ দিলেন। শুধুই কী সঙ্গ! সবার আগে সিদ্দীক (রা:)
এর সাথে পুরোভাগে এ এক অন্য আলী (রা:)। এ এক সুখ-দুঃখের সাথী, সহকর্মী ও সহমর্মী।

No comments:

Post a Comment