হাশেমীগণ নবী বংশের লোক। নবী করীম (সা:) হাশেমী গোত্রের সন্তান । আমরা এক্ষণে সেই নবী বংশের এমন কিছু বুযুর্গের জানাযার কথা তুলে
ধরব সমকালীন খলীফারা যাদের নামাযে জানাযায় ইমামত করেছিলেন ।
প্রথম জানাযাঃঃ
হাশেমী বুযুর্গদের মাঝে নওফেল ইবনে হারেস ইবনে আবদুল মোতালেব (রা:) ১৫ হিজরীতে মদীনায় মৃত্যুবরণ করেন। হযরত ওমর (রা:) তখন মুসলিম বিশ্বের খলীফা । তিনি তাঁর জানাযা
পড়ান। জান্নাতুল বাকীতে তাঁকে দাফন করা হয় -
"হযরত ওমর (রা:) খলীফা হবার ১বছর ৩মাসের
মাথায় নওফেল (রা:) ইন্তেকাল করেন। হযরত ওমর (রা:) তাঁর নামাযে জানাযায় ইমামত করেন।
পরে বাকীতে (মদীনার গোরস্হান ) তাঁর খাটিয়া বহন করে নিয়ে যান এবং ওখানেই তাঁকে দাফন করা হয় "।
দ্বিতীয় জানাযাঃঃ
অন্যতম হাশেমী বুযুর্গ হযরত আবূ সুফিয়ান ইবনে হারেস ইবনে আবদুল মোতালেব। এদিকে সুফিয়ান (রা:) রাসূলুল্লাহ (সা:) এর দুধভাই ছিলেন । হালিমা সাদিয়া (রা:) তাদের দু'জনার দুধমাতা ছিলেন। তার সম্পর্কে বর্ণিত আছে --
"আবূ সুফিয়ান (রা:) ২০ হিজরীতে মদীনায় ইন্তেকাল করলে দ্বিতীয় খলীফা ওমর (রা:) তাঁর জানাযায় ইমামতি করেন । বলা হয় তাঁর ভাই নওফেলের চার মাস পরে তিনি ইন্তেকাল করেন।
তৃতীয় জানাযাঃঃ তৃতীয় জানাযাটি রাসূলুল্লাহ (সা:) এর আপন চাচা হযরত আব্বাস (রা:) এর।
এতদসম্পর্কে ওলামায়ে কেরামের ভাষ্য -
"রাসূলুল্লাহ (সা:) এর চাচা হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মোত্তালেবের মৃত্যু ৩২ হিজরীতে মদীনায় হয়েছিল। দিনটি ছিল শুক্রবার । তাঁর মৃত্যুটি হযরত ওসমান (রা:) এর শাহাদতের দু'বছর পূর্বে হয়েছিল। সমকালীন খলীফা হযরত ওসমান ইবনে আফফান (রা:) তাঁর জানাযা পড়িয়েছিলেন ।ব বাকীতে তাঁঁকে দাফন করা হয়েছিল । ওই সময় তার বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর "।
সতর্কীকরণঃঃ উপরিউক্ত তিনটি জানাযাই মদীনায় হযরত আলী (রা:) উপস্হিতিতেই সংঘটিত হয়েছিল । আর তিনটি জানাযাই তদানিন্তন মুসলিম বিশ্বের খলীফাই আদায় করেছিলেন।
চতুর্থ জানাযাঃঃ
এবার আমরা খলীফদের জানাযা পড়ানো সম্পর্কে হযরত হাসান (রা:) এর জানাযা প্রসংগ দেখব । তাঁর ইন্তেকালও মদীনায় হয়েছিল। কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে তিনি ৫০ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন। ওই সময় মুসলিম বিশ্বের খলীফা ছিলেন হযরত আমীরে মুয়াবিয়া (রা:)।
তাঁর রাজধানী ছিল সিরিয়ায় । তৎকালে মদীনার
গভর্ণর ছিলেন হযরত সাঈদ ইবনুল আস (রা:) স্বয়ং হুসাইন (রা:) ও ওইসময় মদীনায় উপস্হিত ছিলেন। তিনি জানাযার সময় মদীনার গভর্ণরকে সামনে আগাতে গিয়ে বলেছিলেন, সুন্নত (নিয়ম )
না হলে আপনাকে আগে বাড়াতাম না ।
অর্থাৎ ইমাম হুসাইন (রা:) ইমাম হাসান (রা:) এর জানাযার সময়ে তদানিন্তন মদীনার গভর্ণরকে বলেন , আগে বাড়ুন, জানাযা পড়ান, এটি ইসলারে আদর্শ না হলে আপনাকে আগে বাড়তে বলতাম না ।
নোট: শীয়া আলেমগণই শহীদে কারবালা ইমাম হুসাইন (রা:) এর এই কথা নকল করেছেন । কথাটি তাঁর ভায়ের জানাযাকালীন। আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের কিতাবেও এই কথাটি বিদ্যমান।
আমরা এখানে স্রেফ রেফারেন্স দেয়াকেই যথেষ্ট মনে করছি। কথাটি এভাবে এসেছে যে,
"যদি সুন্নত না হত তাহলে আপনাকে আগে বাড়তে বলতাম না"।
এখানে সিরাজুল হিন্দ হযরত শাহ আবদুল আযীয (রহ:) এর একটি বিশ্বেষণধর্মী কথা প্রনিধানযোগ্য --
"সুতরাং জানা গেল হযরত ফাতেমা (রা:) হযরত আবূ বকর (রা:) কে দিয়ে তাঁর জানাযা না পড়ানোর কোনও অসিয়ত করেননি। নতুবা ইমাম হুসাইন (রা:) তাঁর মায়ের অসিয়তের বিপরীত কাজটি কীভাবে আঞ্জাম দিলেন ? আর এ কথা
স্বতঃসিদ্ধ যে, জানাযা পড়ানোর যোগ্যতায় সাঈদ
ইবনুল আস (রা:) আবূ বকর (রা:) এর তুলনায় হাজার গুনে নিম্নতর "।
পঞ্চম জানাযাঃঃ
আবদুল্লাহ ইবনে জাফর (রা:) এর জানাযা -
"সিংহভাগ ঐতিহাসিকের মত এই যে, ৮০ হিজরীতে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জাফর (রা:) মারা যান । হযনত ওসমান (রা:) এর পুত্র হযরত আবান (রহ:) তাঁর জানাযা পড়ান । ঘটনাটি বন্যার বছরের "।
শীয়া ওলামাগণও জানাযাটির মন্তব্য করছেন এভাবে --
ষষ্ঠ জানাযাঃ
আলীপুত্র মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়ার জানাযা
হযরত আলী (রা:) এর পুত্র মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়া (রা:) ৮১ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন। তাঁর জানাযা কালে মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়া (রহ:) এর পুত্রগণ তদানিন্তন খলীফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের পক্ষ থেকে মদীনার গভর্ণর আবার ইবনে ওসসান (রা:) কে লক্ষ্য করে বলেছিলেন --
"আমরা জানি, সমকালীন খলীফাই জানাযার ইমামতিতে সর্বাধিক যোগ্য বক্তি । এমনটি না জানলে আপনাকে আগে বাড়াতাম না । তিনি আগে বাড়েন এবং জানাযা পড়ান"।
সপ্তম জানাযাঃঃ
আলীকন্যা উম্মে কুলছুম (রা:) এর জানাযা
এখানে আরেকটি জানাযা উল্লেখ করতে চাই । বিশিষ্ট শীয়া আলেম আবূ আলী মুহাম্মাদ ইবনে আসআছ আল -কুফী বর্ণনা করেন এভাবে --
"ইমাম জাফর সাদেক (রহ:) ইমাম মোহাম্মাদ বাকের (রহ:) এর সূত্রে বর্ণনা করেন, হযরত আলী
মোরতাযা (রা:) এর কন্যা হযরত উম্মে কুলসুম (রহ:) ইন্তেকাল কালে মারওয়ান ইবনুল হাকাম মদীনার গভর্ণর ছিলেন । গভর্ণর জানাযার উদ্দেশ্যে বেরোলে হযরত হুসাইন (রা:) বলেন, যদি সুন্নত না হত তাহলে আমি মারওয়ানকে নামায পড়ানোর অনুমতি দিতাম না "।
উপরিউক্ত বর্ণনাসমূহ সবই শীয়া বুযুর্গগণের । আর জানাযা সমূহও হাশেমী বুযুর্গগণের। এসব
জানাযায় দেখা যাচ্ছে সমকালীন খলীফাগণই জানাযা পড়িয়েছিলেন । এবার আমরা হযরত ফাতেমা (রা:) এর জানাযাটি দেখব। ওখানেও ইমামুল মুসলিমীন হযরত আবূ বকর (রা:) উপস্হিত ছিলেন । যিনি তদানান্তন মসজিদে নববীর ইমামও বটে । সুতরাং সর্বদিক দিয়ে তিনি এ জানাযার যোগ্য ইমম ছিলেন।
একটি প্রশ্ন ও উত্তর
বিভিন্ন হাদীসের কিতাবের একটি বর্ণনা উপরোক্ত রেওয়ায়েত সমূূূহের সাথে সাংঘর্ষিক। বর্ণনাটি এমন --
"ফাতেমাকে তাঁর স্বামী আঁধার রাতেই দাফন করেন। হযরত আবূ বকর (রা:) কে জানাযার খবর পর্যন্ত জানানো হয়নি । হযরত আলী (রা:) ই
তাঁর জানাযা পড়িয়েছিলেন "।
উপরোক্ত বর্ণনায় তিনটি দিক ফুটে ওঠে --
ক. আঁধার রাতে ফাতেমার দাফন।
খ. হযরত আলী (রা:) এর এই মহাশোক খলীফার কাছে গোপন।
গ. ফাতেমা (রা:) এর জানাযায় আলী (রা:) এর ইমামতি।
উপরোক্ত রেওয়ায়েত নিয়ে কিছু কথা --
১. ইবনে শিহাব যুহরীর একক বর্ণনা ও সংযোজন
আমরা যেখানে এই রেওয়ায়েত পেয়েছি তার সব স্হানেই দেখেছি সবগুলোর বর্ণনাসূত্রেই যুহরী (রহ:) বিদ্যমান। যুহরী (রহ:) ছাড়া একটা রেওয়ায়েত পাওয়া যাবে না যাতে কোন প্রকার সংঘর্ষ কিংবা স্ব বিরোধ পাওয়া যাবে। ইতোপূর্বে
ফাদাকের মাসয়ালায় আমরা ইমাম যুহরী প্রসঙ্গে
আলোচনা করেছি ।
২. বর্ণনাটির নির্মোহ বিশ্লেষনঃঃ
বর্ণনাটিতে তিনটি দিক ফুটে উঠেছে । এ প্রতঙ্গে আমরা সুবিখ্যাত মুহাদ্দিস শায়খুল ইসলাম ইবনে হাজার আসকালানীর বিশ্লেষন দেখব ফাতহুল
বারীতে তিনি লেখেন -
হযরত ফাতেমা (রা:) হিজাব ও পর্দাব্রতের জন্য রাতে দাফন করে দেওয়ার অসিয়ত করেছিলেন। আর হযরত আলী হযরত আবূ বকর (রা:) খুব সম্ভব এ জন্য খবরটি দেননি । শোকাবহ এ সংবাদটি তার অজানা নেই । উপরিউক্ত রেওয়ায়েত এমন কথা উল্লেক নেই যে , হযরত ফাতেমা (রা:)এর ওফাতের খবর হযরত আবূ বকর (রা:) জানতে পারেননি এবং তিনি নামাযে জানাযাও আদায় করেননি "।
সতর্কীকরণ:
অন্যভাবে বলা যায়, হযরত আবূ বকর (রা:) কে এই শোকাবহ খবর হযরত আলী (রা:) এর দেওয়ার দরকার হয়নি। কেননা ফাতেমা (রা:)এর
সেবায়রত তাঁর স্ত্রী হযরত আসমা বিনতে উমাইস
(রা:) এর মাধ্যমেই তিনি এ খবর পেয়ে থাকবেন।
তাছাড়া হযরত আলী (রা:) এর জানাযা পড়ানোর পথে সিদ্দীকে আকবার (রা:) বাধাদানকারী হতে পারেন না । সুতরাং জানাযা পড়ানো আর না পড়ানো নিয়ে যে সব রেওয়ায়েত বিদ্যমান তাতে
কোন স্ববিরোধ থাকার কথা নয় । থাকতেও পারে না।
এই অধ্যায়ের সর্বশেষ নিবেদন ছিল হযরত ফাতেমা (রা:)এর জানাযা প্রসঙ্গ। আলহামদুলিল্লাহ, এবিষয়ে আমরা বিস্তারিত জেনেছি ।
No comments:
Post a Comment