Saturday, 18 May 2019

হযরত আলী (রা:) এর বায়াত

রাসূলুল্লাহ (সা:) এর ইন্তেতালের পরপরই হযরত
আলী (রা:) হযরত আবূ বকর (রা:) এর হাতে বায়াত নিয়েছিলেন। তিনদিনের মধ্যেই এই বায়াতটি সংঘটিত হয়েছিল। অতএব নিম্নেবর্ণিত
কথাগুলো সত্য নয় --
১। হযরত আলী (রা:) হযরত আবূ বকর (রা:)এর
বায়াত হননি।
২। বায়াত হয়েছেন তবে ছ'মাস পরে। হযরত ফাতেমা (রা:) এর জীবদ্দশায় তো নয়ই।
৩। লোকদের চাপাচাপি ও পীড়াপীড়িতে কতকটা বাধ্যহয়ে বায়াত হলেও তাতে আন্তরিকতা ছিলনা।
  উপরিউক্ত তিনটি কথাই অসত্য ও বাস্তবতাবিবর্জিত। এগুলো সবই বর্ণনাকারদের
অঅন্তঃসারশূন্য কথা । এবার আমরা হাদীস ও ইসলামী ইতিহাসের প্রামাণ্য গ্রন্হিগুলো দেখব যা
বিজ্ঞাজন দলিলস্ববরূপ পেশ করে থাকেন । হাফেজ ইবনে কাছীর (রহ:) তার ভূবনবিখ্যাত
কিতাব 'বেদায়াহ নেকহায়াহ ' গ্রন্হের ৫ম ও ৬ষ্ঠ খন্ডের বিভিন্ন স্হানে বর্ণনা করেন । দেখা যাক তাঁর বর্ণনা --
"রাসূলুল্লাহ (সা:) এর ইন্তেতালের পর হযরত আলী (রা:) ও হযরত যুবায়ের (রা:) ঐকমত্য পোষণ করলেন ।এ দাবির প্রমাণে আমরা নিম্নবির্ণত প্রমাণ ও সুস্পষ্টরূপে পেশ করছি।
১। ইমাম বায়হাকী (রহ:) স্ব-সনদে হযরত আকূ সাঈদ খুদরী (রা:) এর সূত্রে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা:) এর ইন্তেকালের পর সকল সাহাবী হযরত সায়াদ ইবনে উবাদাহ (রা:) (সকীফায়ে বনী সায়েদাহ ) এর বাড়ীতে সমবেত হন । এদের মাঝে হযরত আবূ বকর ও ওমর (রা:)
ও ছিলেন । আনসারীদের মাঝে হযরত জনৈক বক্তা (হযরত যায়েদ ইবনে ছাবেত (রা:) দাঁড়ালেন । বললেন, তোমাদের অজানা নয় যে, রাসূলুল্লাহ
(সা:) মুহাজির ছিলেন আর আমরা সর্বদা রাসূলুল্লাহ (সা:) এর আনসার অর্থাৎ সাহায্যকারী
ছিলাম। এক্ষণে যিনি খলীফা হবেন আমরাও তাঁর
আনসার বা সাহায্যকারী থাকব যেভাবে আমরা রাসূলুল্লাহ (সা:) এর সাহায্যকারী ছিলাম । এরপর হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা:) উঠে দাঁড়ালেন ।
বললেন, তোমাদের ভাষ্যকারের অনুভূতি যথার্থ।
তাঁর বর্ণিত প্রস্তাব ছাড়া এ মুহূর্তে বিকল্প কিছু ভাববার সুযোগ নেই খুব একটা । পরে হযরত আবূ বকর (রা:) এর হাত ধরে হযরত ওমর (রা:) বললেন,  উপস্হিত জনমন্ডলী! সকলে তার হাতে
বায়াত হও।  হযরত ওমর (রা:) সহ উপস্হিত মুহাজির -আনসারগণ তাঁর হাতে বায়াত হলেন। এ সময় হযরত আবূ বকর (রা:) মসজিদে নববীর মেম্বারের ওপর ভাষণ দেয়ার উদ্দেশ্যে দাঁড়ালেন।
হামদ ছানা শেষে সমবেত শ্রোতাদের দিকে তাকালেন। তাঁর দৃষ্টি যুুবায়ের ইবনুল আওয়াম (রা:) কে খুঁজে ফিরছিল । তাকে না পেয়ে ডেকে পাঠালেন। তিনি উপস্হিত হলে বললেন, প্রিয়নবী (সা:) এর ফুপাত ভাই এবং তাঁর একান্ত সঙ্গী, আপনি মুসলিম ঐক্যে চিড় ধরাতে চান বুঝি?
যুবায়ের (রা:) প্রতি উত্তরে বললেন, 'আল্লাহর রাসূলের খলীফা হে! আমার প্রতি এলজাম কিংবা ভর্ৎসনা দেবেন না। আমি আপনাকে খলীফা করার ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করছি। তিনি তৎক্ষনাৎই সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর হাতে বায়াত নিলেন। এবার সিদ্দীকে আকবারের দৃষ্টি
আরেক জনকে খুঁজে ফিরল। তিনি হযরত আলী (রা:)। তাকে না পেয়ে ডেকে পাঠালেন। তিনি এলে বললেন, আপনি নবী করীম (সা:) এর চাচাত ভাই এবং তাঁর মেয়ের জামাতা। আপনিও মুসলিম ঐক্যে চিড় ও ফাটল ধরাতে চান বুঝি?  হযরত আলী (রা:) জবাবে বললেন, খলীফা নামদার? আমার প্রতি বিন্দুমাত্র কুধারণাপ্রসূত অভিযোগ করবেন না। অতঃপর হযরত আলী (রা:) সিদ্দীকে
আকবার (রা:) এর হাতে বায়াত হলেন।
দুই:
 "হাফেজ আবূ আলী নিশাপুরী বলেন, আমি ইবনে খুযায়মা (রহ:) কে বলতে শুনেছি। একদা
ইমাম মুসলিম আমার কাছে এসে বললেন, আমাকে (সাবেক রেওয়ায়েতের) সনদটি লিখে দাও। আমি আবূ সাঈদ খুদরী (রা:) এই বর্ণনাটি তাকে একটি কাগজে লিখে শুনিয়ে দিলাম। তিনি (সানন্দে) বললেন, বর্ণনাটি (কুরবাণীর উট -গরুর মত) মূল্যবান। আমি বললাম, তা কেন বরং উহা
এক হাজার স্বর্ণমুদ্রাভর্তি থলের চেয়েও উত্তম "।
তিনঃ
নিম্নোক্ত বর্ণনায় হযরত আলী (রা:) এর বায়াত প্রসংগটি আরো পরিস্কার ভাবে ফুঠেছে। বর্ণনাটি
ইবনে কাছীরের -
"মাহামিলির এই সনদখানা সহীহ ও মাহফুয। আবূ নাযরাহ হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা:) এর সুত্রে বর্ণনা করেন। এ সনদে বড় গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়
পাওয়া গেছে। হযরত আলী (রা:) নবীজীর ইন্তিকালের একদিন অথবা দুদিনের মাঝেই সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর হাতে বায়াত নিয়েছেন। এটিই সর্বাধিক বিশুদ্ধ ও যথার্থ।  হযরত আলী (রা:) কখনোই সিদ্দীকে আকবার (রা:) থেকে পৃথক থাকেননি। কোন এক ওয়াক্ত নামাযও তাঁর ইমামত ছাড়া পড়েননি। মুরতাদবিরোধী অভিযানে বেরোলে খোলা তরবারী হাতে তিনি সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর সহকর্মী ও সহযাত্রী ছিলেন। বিস্তারিত বর্ণনা সামনে আসছে "।
চারঃ
অর্থঃ হাফেজ ইবনে কাছীর (রহ:) বর্ণনা করেন, মূসা ইবনে ওকবা তার 'যুদ্ধপর্বে সহীহ সনদে আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা:) এর সূত্রে বায়াত প্রসংগে বর্ণনা করেন, তিনি ও মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাহ (রা:) হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা:) এর সাথে ছিলেন। মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা
(ফেৎনা ছড়িয়ে না পড়ে এ ভয়ে যুবায়ের (রা:) থেকে তলোয়ার নিয়ে ভেঙ্গে ফেললেন। পরে হযরত আবূ বকর (রা:) জনতার উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। ওজর পেশপূর্বক বলেন, 'কসম খোদার! খেফাফতের মসনদ দখল করার লোভ দিনে -রাতে, প্রকাশ্যে -অপ্রকাশ্যে কখনোই হয়নি আমার। মুহাজিরগণ তার এই মন্তব্যে সাধুবাদ জানান, যথার্থ সাব্যস্ত করেন। হযরত আলী (রা:) ও যুবায়ের (রা:) (নিজস্ব মত প্রকাশ করতে গিয়ে চলেন) আমাদের (সাময়িক)  টানাপোড়েন ও (ক্ষণিকের)  উষ্মা স্রেফ এজন্য যে, আমরা ঘটনার শুরু দিকের পরামর্শে উপস্হিত ছিলাম না। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, খেলাফতের মসনদে আবূ বকর সিদ্দীক (রা:) কেই আমরা সর্বাধিক যোগ্য ব্যক্তি বলে মনে করি। নিঃসন্দেহে তিনি তাঁর হিজরতকালীন গুনার সাথী। কুরআন তাঁকে উপাধি দিয়েছে "দু'জনার দ্বিতীয়  জন"। তাঁর মর্যাদা ও পূণ্যত্বের স্বীকৃতি দিই আমরা। সমগ্র সাহাবাদের মাঝে নবীজীর জীবদ্দশায় একমাত্র তিনিই নামাযের ইমাম নির্বাচিত হয়েছিলেন। বর্ণনাসূত্রটি উত্তম।
আল্লামা ইবনে কাছীর এরপর হযরত আলী (রা:) এর কিছু কর্মনীতি উল্লেখ করেন। হযরত আলী (রা:) এর মত ব্যক্তিত্বের জন্য যা মানানসইও -
১। হযরত আলী (রা:) সিদ্দীকে আকবরের করা ইমামতের প্রতিটি নামাযেই হাজির থাকতেন।
২। নবীজীর ইন্তেতালের পর মুরতাদবিরোধী অভিযানে সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর সফরসঙ্গী হিসাবে তিনি মদীনার বাইরে বেরিয়েছিলেন।
৩। সিদ্দীকে আকবার (রা:) এর প্রতিটি কাজেই তিনি হিতাকাংখী ও কল্যাণকামি ছিলেন।
 পাঁচঃ
উপরিউক্ত রেওয়ায়েতসমূহের পর আল্লামা বালাযুরী (রহ:)এর 'একটি বর্ণনা দেখব। হযরত আলী (রা:) এর দ্রুত বায়াতসম্বলিত ঘটনার যা একটি প্রকৃষ্ট দলিলও বটে।
"জনতা যখন হযরত আবূ বকর (রা:)এর হাতে বায়াত নিচ্ছিল তখন  হযরত আলী (রা:) ও যুবায়ের (রা:) বায়াতকর্ম থেকে দূরত্বে অবস্হান করছিলেন। হযরত আবূ বকর (রা:) তাঁদের দু'জনাকে দেখতে না পেয়ে হযরত ওমর (রা:) ও যায়দ ইবনে ছাবেত (রা:) কে তাঁদের দ্বারা ডেকে পাঠালেন। এরা হযরত আলী (রা:) এর দরোজার কড়া নাড়লেন। হযরত যুবায়ের (রা:) দরোজার ওপাশ থেকে দৃষ্টি ফেলে এদের দেখে হযরত আলী (রা:) এর কাছে গিয়ে বললেন, তাঁরা দু'জনা জান্নাতী বুযুর্গ। তাঁদের সাথে আমাদের ঝগড়া বচসা চলে না। হযরত আলী (রা:) এর অনুমতিক্রমে তিনি দরোজা খুলে দিলের। বাইরে এসে তাদেরকে সাদর অভ্যর্থনা জানালেন। তাঁরা সকলে এক সময়ে খলীফা আবূ বকর (রা:) এর দরবারে এলেন। সিদ্দীকে আকবার (রা:) হযরত আলী (রা:) কে লক্ষ্য করে বললেন, আলী (রা:)! আপনি আল্লাহর রাসূল (সা:) এর চাচাত ভাই এবং তাঁর জামাতাও। আপনি খেলাফতবিষয়ে নিজেকে অধিক যোগ্য মনে করেন বলে শুনেছি অথচ আপনার অজানা নয় আমিও এ পদের সর্বাধিক যোগ্য। হযরত আলী (রা:) বললেন, খলীফায়ে রাসূল হে! আমার প্রতি বিরাগভাজন হবেন না। হাত বাড়ান আমি বায়াত নিচ্ছি। সিদ্দীকে আকবার (রা:) হাত বাড়ালেন,  হযরত আলী বায়াত হলেন।
এবার সিদ্দীকে আকবার (রা:) হযরত যুবায়ের (রা:) কে লক্ষ্য করে বললেন, 'যোবায়ের! আপনি হুযুর (সা:) এর ফুফাত ভাই এবং রাসূলুল্লাহ (সা:) এর সহকর্মী (হাওয়ারী)। তাছাড়া আপনি ইসলামের এক শাহ সওয়ারও। আপনি খেলাফতবিষয়ে নিজকে অধিকযোগ্য মনে করেন অথচ খেলাফতের মসনদে আপনার অপেক্ষা আমিই অধিকযোগ্য। হযরত যুবায়ের ইবনুল আওয়াম (রা:) বলেন, আল্লাহর রাসূলের খলীফা!
খোদারদিকে চেয়ে আমাকে ভর্ৎসনা করবেন না। আপনার হাত বাড়ান। তিনি হাত বাড়ালে হযরত যুবায়ের (রা:) তার হাতে বায়াত হন।
উপরোক্ত বর্ণনাসমূহ  দ্বারা প্রতীয়মান হচ্ছে, হযরত আলী (রা:) কোনরূপ কালক্ষেপণ না করে দ্রুতই সিদ্দীকে আকবারের হাতে বায়াত নিয়েছিলেন। ৬ মাস দেরীতে বায়াত নেয়ার ব্যাপারটি একান্তই বর্ণনাকারদের ধারনাপ্রসূত ও বাস্তবতাবিবর্জিত। দ্রুত বায়াত হওয়া বর্ণনাসমূহের
সূত্রে ইবনে শিহাব যুহরী (রহ:) নেই। দেরীতে বায়াত হওয়া বর্ণনাসমূহের সবগুলোতেই যুহরী বিদ্যমান। ব্যাপারটি আসলে কী তা বোধকরি সুধী পাঠকদের সম্মুখে এতক্ষণে পরিস্কার হয়ে গেছে।
আরো বিস্তারিত সামনে আসছে। বোদ্ধা পাঠকদের সুবিধার্থে এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা থেকে লোভ সামলাতে পারছিনা যে, মূসা ইবনে ওকবার (রা:) 'যুদ্ধপর্বে' বর্ণিত রেওয়ায়েতটি শীয়া
ওলামারাও তাদের কিতাবে উল্লেখ করেছেন। এর ওপর তারা কোনপ্রকার সমালোচনাও করেন নি।
প্রখ্যাত শীয়া ভাষ্যকার ইবনে আবিল হাদীদ তার
'শরহে নাহজুল বালাগাহ ' -এ যা বর্ণনা করেন তা নিম্নোক্ত শব্দচিত্রে প্রকাশ পেয়েছে --
"হযরত আলী (রা:) ও যুবায়ের (রা:) উভয়েই বর্ণনা করেন,  আমাদের এই সাময়িক দুঃখ -বেদনা ও টানাপড়েনন নিছক পরামর্শে শামিল না হবার দরুনই হয়েছিল। নচেত আমরা খুব ভাল করেই জানতাম খেলাফতের মসনদে আবূ বকর বকর (রা:) ই সর্বাধিক যোগ্য ব্যক্তি। হিজরতকালীন রাসূলের সাথে গুহায় অবস্হানের
মহা ফজিলতটিতো একমাত্র তাঁরই। আমরা তাঁর বুযুর্গীর অকৃপণ স্বীকৃতি দিই। নবীজী (সা:) তাঁকে জীবদ্দশায় মুসলমানদের জামাতে নামায পড়ার আদেশ করেছিলেন।
   এক্ষণে সকল বর্ণনা আসার পর বেশ জোর গলায়ই বলা যাচ্ছে,  নবীজীর ইন্তেতালের এক/দু'দিনের মধ্যেই হযরত আলী (রা:) হযরত আবূূ বকর (রা:)এর হাতে বায়াত হয়েছিলেন। শুধু কী তাই। সিদ্দীকে আকবারের সর্বজনস্বীকৃত ফজিলত ও মর্যাদার স্বীকৃতিও দিয়েছিলেন।
এখানে ৬ মাসে বিলম্বে বায়াতের ব্যাপারটি আদৌ ঘটেনি।

No comments:

Post a Comment