Sunday, 14 July 2019

হযরত আলী (রা:) ও তদীয় পুত্রগণের প্রতিরোধ প্রচেষ্টা

হযরত উসমান (রা:) এর কাবাগৃহ অবরোধকালে
সাহাবায়ে কেরামগণ বেশ কয়েকবার বিদ্রোহীদদের হটিয়ে দিতে সচেষ্ট হন। বিশেষত হযরত আলী (রা:) ও তাঁর পুত্রদের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। কিন্তু উসমান (রা:) কাউকে ফিতনাবাজদের প্রতিরোধের অনুমতি দেননি।
  "আবদুল্লাহ ইবনে রাবাহ -হযরত হাসান বিন আলী (রা:) এর প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করতে গিয়ে  বললেন, হাসান বিন আলী (রা:) এর সাথে আমার সাক্ষাত হয়েছিল। তিনি অবরোধকালে উসমান (রা:) এর কাছে গিয়েছিলেন। (যাহোক)  আমরা তাদের কথাবার্তা জানার জন্য তাঁর সাথে ফিরে এলাম। হাসান বিন আলী (রা:) হযরত উসমান (রা:) কে বলেছিলেন,  হে আমিরুল মুমিনীন! আপনি যে আদেশ দেন তা পালন করব। উসমান (রা:) বললেন,  ভ্রাতুষ্পুত্র হে! নিজের জায়গায় বসে থাক। আল্লাহর অমোঘ বিধান বাস্তবায়িত হোক। দুনিয়ার প্রতি আমার কোনো চাহিদা নেই। অথবা তিনি বলেছিলেন,  আমার যুদ্ধ -বিগ্রহের কোনো দরকার নেই।
আবদুল্লাহ বিন উমর (রা:) এর ক্রীতদাস ও শিষ্য নাফে এ ঘটনা উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন --
উসমান (রা:) এর শাহাদাতের দিন হযরত হাসান
(রা:) ও আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা:) বলেছিলেন, হযরত উসমান (রা:) আমাদের আদেশ দিল আমরা লড়তাম, কিন্তু বললেন, তোমরা সবাই শান্ত হও। (আমার জন্য কেউ যুদ্ধ করো না।
শায়খ সায়্যিদ আলী লাহোরী তদীয় গ্রন্হ 'কাশফুল মাহজুব' -এ হযরত হাসান (রা:) এর পূর্বোক্ত প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করে লিখেছেন, "হযরত হাসান বিন আলী (রা:) খলীফা গৃহে প্রবেশ করে
সালাম দিলেন এবং আসন্ন বিপদ সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন, হে মুমিনগণের নেতা! আমি আপনার নির্দেশ ব্যতিরেকে তরবারী কোষমুক্ত করতে পারি না। আপনি ন্যায়সঙ্গত শাসক ও খলিফা। অনুমতি দিন সমস্যার সমাধান
করে ফেলি। উসমান (রা:) বললেন, ভ্রাতুষ্পুত্র হে!
তুমি বাড়ি ফিরে যাও। আল্লাহর আদেশ বিধিমতো বাস্তবায়িত হোক! মুসলমানদের রক্ত ঝরানোর কোনো প্রয়োজন নেই ।।
বিখ্যাত ঐতিহাসিক খলিফা ইবনে খয়্যাত সূত্রসমেত ইবনে সীরীন থেকে বর্ণনা করেন --
 "মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন বলেন, হযরত হাসান (রা:) , হুসাইন (রা:) , আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা:) , আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা:) এবং মারওয়ান সকলে অস্ত্র সজ্জিত হয়ে উসমান (রা:) এর বাড়িতে পৌঁছুলেন। উসমান (রা:) তাদেরকে বললেন, আমি তোমাদের দোহাই দিয়ে বলছি,
তোমরা বাড়ি ফিরে যাও এবং অস্ত্র সংবরণ কর।
নিজেদের ঘরে গিয়ে বসে থাক।
             # আল্লামা ইবনে কাসীরের মন্তব্য --
উসমান (রা:) হযরত হাসান (রা:) ও হুসাইন (রা:)
কে শ্রদ্ধা করতেন এবং ভালবাসতেন।
    তিনি আরো লিখেছেন  ,
 "হযরত উসমান (রা:) যখন অবরুদ্ধ ছিলেন তখন হাসান বিন আলী (রা:) সর্বক্ষণ তাঁর প্রহরায় নিয়োজিত ছিলেন। গলায় তলোয়ার ঝুলিয়ে বিদ্রোহীদের মোকাবেলায় ঢাল হয়ে কাজ করে যাচ্ছিলেন। উসমান (রা:) এর মনে আশংকা দেখা
দিল, বিদ্রোহীদের সঙ্গে মোকাবেলার দরুণ হাসানের (রা:) অমঙ্গল হতে পারে। তাই তিনি তাকে দোহাই দিয়ে বললেন, তিনি যেন অবশ্যই বাড়ি ফিরে যান। মূলত হযরত আলীর (রা:) মন শান্ত করার জন্য এবং আশংষ্কা দূর করার জন্য তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।।
ইবনে কাসীর ঘটনাটি আরো বিস্তারিত আকারে উল্লেখ করেছেন, যুকাদাহ -এর শেষের দিকে থেকে নিয়ে ১৮ যিলহজ্জ (৩৫ হি:) শুক্রবার পর্যাপ্ত এ অবরোধ বহাল ছিল। আনসার ও মুহাজিরগণ এ সময়ে উসমান (রা:) নিরাপত্তা রক্ষায় তাঁর বাড়িতে অবস্হান করছিলেন। এ সময় মহাত্মাগণের মাঝে আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা:) ,
আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা:) , হাসান বিন আলী (রা:) , হুসাইন বিন আলী (রা:) , মারওয়ান ,আবু হুরাইরা (রা:) এবং তাদের সেবক ও ক্রীতদানগণ উল্লেখযোগ্য। যদি উসমান (রা:) এদেরকে বাঁধা না দিতেন তবে বিদ্রোহীদের প্রতিহত করতে সক্ষম হতেন। কিন্তু উসমান (রা:) তাদেরকে দোহাই দিয়ে বললেন, যার উপরে আমার হক আছে সে যেন হস্তসংবরণ করে বাড়ি ফিরে যায়। তখন পর্যন্ত তার বাড়িতে মনীষী সাহাবাগণের পুত্রদের একটি বিরাট অবস্হান ছিল। হযরত উসমান (রা:) তাঁর ক্রীতদাসদের আদেশ দিলেন, যে তলোয়ার কোষবদ্ধ করেছে সে মুক্ত ।।
              অবরোধকালীন আরো কিছু ঘটনা
হযরত উসমান (রা:) সকল সাহাবাকে তাঁর নিরাপত্তা রক্ষায় সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে নিষেধ করেন। পূর্বে যেমনটি বিবৃত হয়েছে। তথাপিও দীর্ঘ সময় তারা বিদ্রোহীদের প্রতিহত করতে সব ধরনের প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। অবরোধ সংঘর্ষ হয়। হযরত আলী (রা:) ও কয়েকবার এতে অংশ নিয়েছিলেন। এসব লড়াইয়ে হাশেমীগণ আহত হন। একবার পানিরর সংকট দেখা দিলে আলী (রা:) যথাশক্তি প্রয়োগ করে উসমান (রা:) এর বাড়িতে পানি পৌঁছানোর ব্যবস্হা করেন। অবশ্য এতে হাশেমীয়গণের পরিচারকের আহত হয়েছিল। বিদ্রোহীরা অবশেষে যখন উসমান (রা:) কে শহীদ করে দিল তখন এই মর্মন্তুদ সংবাদ আলী (রা:) অন্যান্য সাহাবা সমেত আফসোস করতে করতে উসমান (রা:) এর বাড়িতে পৌঁছুলেন। উসমান রা, এর বাড়ির সামনে যাদেরকে প্রহরায় নিযুক্ত করা হয়েছিল তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে তাদেরকে কঠোর ভর্ৎসনা করলেন এবং গভীর বেদনাহত হলেন।
এ ঘটনাকে একনজরে দেখে নেয়ার জন্য আহলে সুন্নাত ও শীয়া  উভয় মতের  গ্রন্হাকারদের গ্রন্হিসমূহ হতে উদ্ধৃতি দেওয়া হচ্ছে। এতে হযরত উসমান (রা:) ও আলী (রা:) এর মাঝে বিদ্যমান হিতাকাঙ্খিতা ও সুসম্পর্কের একটি চিত্র আমাদের সামনে ফুটে উঠবে --
  "হযরত আলী (রা:) স্বীয় পুত্রদ্বয়কে বরলেন, তোমরা তলোয়ার নিয়ে হযরত উসমান (রা:) এর
বাড়ির প্রবেশপথ অবস্হান নাও,  যাতে কেউ ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে। এরূপে হযরত যুবাইর (রা:) তাঁর পুত্র আবদুল্লাহকে, তালহা (রা:)
তাঁর পুত্রকে উসমান (রা:) এর হেফাজতের উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দিলেন। এছাড়া আরো বহু সংখ্যক সাহাবা (রা:) স্বীয় পুত্রগণকে উসমান রা,
এর নিরাপত্তা বিধানে নিয়োজিত করেন।
"সাহাবায়ে কেরামগণের পুত্রদের একটি দল তাঁদের পিতার নির্দেশে উসমান (রা:) এর বাড়িতে
পৌঁছেন। এদের মধ্যে হযরত হাসান, হুসাইন, আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা:) বিদ্রোহীরা বাড়ি আক্রমণে উদ্যত হলে তাদের মোকাবেলা করে হটিয়ে দিতেন।।


No comments:

Post a Comment