বিষয় -৫৯ : ফলের বাগান লিজ দেয়া -নেয়ার ক্ষেত্রে শরী'আহসম্মত বিনিয়োগ পদ্ধতি কি ??
সিদ্ধান্ত : ফলের বাগান লিজ দেয়া/নেয়ার বিষয়টি উমর রাঃ কর্তৃক অনুসৃত এবং সালাফে সালেহীনের মধ্যে লাইস ইবনে সা'দ, হারব কিরমানী ও আবুল ওয়াফা বিন আকিলের মতে বৈধ। তা ছাড়া ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ, ইবনুল কাইয়্যিম ও সৌদি আরবের শীর্ষ উলামা বোর্ডের সাবেক সদস্য শাইখ মুহাম্মাদ সালিহ ইবনে মুহাম্মাদ আল -উছাইমিন র. এর মতেও ফলের গাছ লিজ নেয়া বা দেয়া জায়েয। কোনো কোনো বর্ণনা মতে এটি ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল র. এরও একটি মত (আহকাম আহলিযযিম্মাহ, খ. ১, পৃ. ১০৯) । যদিও হানাফি, শাফেঈ,মালিকী ও হাম্বলী মাযহাবের অধিকাংশ ফকিহর মতে ফলের গাছ লিজ দেয়া জায়েয নেই।
জায়েয হওয়ার পক্ষে দলিল ও যুক্তি
ক. সহিহ সনদে বর্ণিত হয়েছে, উসাইদ বিন হুদাইর রা. যখন মৃত্যুবরণ করেন তখন তার ছয় হাজার দিনার ঋণ অনাদায়ী ছিল। এমতাবস্হায় উমর রা. পাওনাদারদের ডাকেন এবং তিনি তাদেরকে উসাইদ রা. -এর একটি জমি কয়েক বছরের জন্য
দিয়ে দেন যে জমিতে খেজুর গাছ ও অন্যান্য গাছপালা বিদ্যমান ছিল। এখানে উমর রা. কার্যত দিরহামের বিনিময়ে জমি ও বাগান কয়েক বছরের জন্য পাওনাদারদের কাছে লিজ দিয়ে উক্ত সাহাবিকে মৃত্যুর পর ঋণমুক্ত করার ব্যবস্হা করেছিলেন। এ ব্যাপারে কোনো সাহাবি উমর রা. এর এ সিদ্ধান্তেন বিরোধিতা করেছেন বলে বর্ণনা পাওয়া যায় না (যাদুল মা'আদ, খ. ৫, পৃ.৮২৫) ।
খ. বাগান ইজারা দেয়ার বিষয়টি জমি ইজারা দেয়ার সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। অর্থাৎ, জমি তাকেই
ইজারা দেয়া হয়, যিনি তা চাষাবাদ করবেন, একইভাবে বাগানও ইজারা দেয়া যেতে পারে। জমি লিজগ্রহীতা চাষাবাদ করেন শস্য/ফসল লাভের উদ্দেশ্যে আর বাগান লিজগ্রহীতা পরিচর্যা
করেন ফল/ ফসল লাভ করার উদ্দেশ্যে।
গ. জমি ইজারা নেয়া এবং ফল বাগান ইজারা নেয়ার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। এ প্রসঙ্গে শাইখ মুহাম্মাদ ইবনে সালিহ ইবনে মুহাম্মাদ আল উছাইমিন বলেন, বাগানে উৎপন্ন ফলের একাংশ প্রদানের বিনিময়ে পরিচর্যাকারীর সাথে মুসাক্বাত চুক্তি জায়েয হলেও এক্ষেত্রে উৎপন্ন ফল ভাগ করার সময় উভয়ের মধ্যে কখনো কখনো বিবাদদেখা দিতে পারে। পক্ষান্তরে, ইজারার ক্ষেত্রে ভাড়া পূর্বনির্ধারিত। বাগানের মালিক তার
নির্ধারিত ভাড়া পেয়ে যাবেন এবং লিজগ্রহীতা জেনে যাবেন, উৎপন্ন সব ফল/ফসলই হবে তার, এর মধ্যে কেউ তার সাথে বিবাদ করতে আসবে না, সব ফল সেই ভোগ -ব্যবহার করবে। (আশ শরহুমুমতি আলা যাদিল মুসতানকি,মুহাম্মাদ ইবনে সালিহ ইবনে মুহাম্মাদ আল উছাইমিন, প্রকাশক : দারু ইবনিল জাওযি, ১৪২২ হি, খ.৬,পৃ.৮৪)
এ ছাড়া শরী'আহসম্মত বিনিয়োগ পদ্ধতির অভাবে বিভিন্ন অঞ্চলের বাগান লিজ গ্রহীতাগণ
বিভিন্ন মহাজন ও সুদী প্রতিষ্ঠান থেকে চড়া সুদে
দাদন বা ঋণ গ্রহণ করতে বাধ্য হন। এমতাবস্হায় শরী'আহসম্মত বিনিয়োগ পদ্ধতি চালু করা গেলে একদিকে যেমন গ্রাহকরা সুদের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবেন অন্যদিকে ব্যাংকের বিনিয়োগের ক্ষেত্রও হবে সম্প্রসারিত।
জায়েয না হওয়ার পক্ষে দলিল
ক. রাসূলুল্লাহ (সা:) গাছের ফল ব্যবহারের উপযুক্ত হওয়ার পূর্বে তা কেনাবেচা করতে নিষেধ করেছেন।। ( সহিহ মুসলিম) ।
খ. রাসূলুল্লাহ (সা: ) কয়েক বছরের জন্য কেনাবেচা করতে নিষেধ করেছেন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সংঘটিত ক্ষয় -ক্ষতিকে ছাড় দিয়েছেস। (আবু দাউদ )।
গ. রাসূলুল্লাহ (সা:) বাই'মু'আওয়ামাহ বা কয়েক বছরের জন্য কেনাবেচা করতে নিষেধ করেছেন। (মুসলিম)।
উল্লেখ্য, বাই' আস -সিনীন ও বাই' আল -মু' আওয়ামাহ বলতে লাগাতার দুই,তিন বা ততোধিক বছরের ফল বা ফসল অগ্রিম বিক্রি করাকে বুঝায়।
ঘ.'গারার আছে এমন কেনাবেচা করতে রাসূলুল্লাহ ( সা:) নিষেধ করেছেন '। (তিরমিযী) ।
যারা বাগান ইজারাকে নাজায়েজ মনে করেন
তাদের বক্তব্য হলো, উক্ত হাদীসগুলোতে গাছের
ফল/ফসল পরিপক্ক হওয়ার আগে ও ভবিষ্যতে কয়েক বছরের সম্ভাব্য উৎপন্ন ফল/ফসল অগ্রিম বিক্রি করতে নিষেধ করা হয়েছে। আর বাগান ইজারা দেয়ার অর্থ হচ্ছে উপকারিতা বিক্রি করা যা উল্লিখিত হাদীসসমূহের নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে। তাছাড়া হাদীসে গারার (অস্পষ্টতা/অনিশ্চয়তা) আছে এমন কেনাবেচা করতে নিষেধ করা হয়েছে। তারা মনে করেন, গাছ/বাগান ইজারা দেয়ার ক্ষেত্রে গারারও রয়েছে। কেননা বাগানের
গাছ অনেক বেশি ফল/ফসল দিতে পারে আবার সামান্য ফল/ফসলও দিতে পারে। এমনকি কখনো বিপর্যয় / দুর্যোগের কারণে উৎপন্ন ফল/ফসল নষ্টও হয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ যদি কোনো কারণে ফল/ফসল না হয় বা নষ্ট হয়ে যায় সেক্ষেত্রে লিজগ্রহীতা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং লিজদাতা একতরফাভাবে লাভবান হবেন, এটা ঠিক নয়।
নিষেধাজ্ঞা -সংক্রান্ত উক্ত হাদীসসমূহে বাগান লিজ দেয়াকে নিষেধ করা হয়নি। কারণ -
ক. হাদীসে নিষেধ করা হয়েছে গাছে ফল আসার পর অপরিপক্ব সেে ফল ক্রয় -বিক্রয় করার বিষয়ে, আর প্রস্তাবিত ইজারা হচ্ছে গাছে ফল /ফসল আসার পূর্বের বিষয়। অর্থাৎ, নিষেধাজ্ঞার
হাদীসটি কেনাবেচার সাথে সংশ্লিষ্ট, ইজারা দেয়ার
সাথে নয়। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সা:) গাছে ফল ব্যবহারের উপযুক্ত হওয়ার পূর্বে তা কেনাবেচা করতে নিষেধ করেছেন , কিন্তু শুরু থেকে গাছ ইজারা দেয়াকে নিষেধ করেননি। আর দ্বিতীয়
সংশয়ের ব্যাপারে শাইখ উসাইমিন র. বলেছেন,
বাগানের গাছ ইজারা নেয়ার বিষয়টি বাগানের জমি ইজারা নেয়ার অনুরূপ। যেমন আপনি যদি এই জমিটি তার মালিক থেকে ইজারা নেন এবং
তাতে ফসল বপন করেন,এক্ষেত্রে আপনার উৎপন্ন ফসল নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি হতে পারে আবার তা নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কমও হতে পারে। খেজুর গাছের বিষয়টিও একই রকম। এক্ষেত্রে খেজুর গাছ 'আসল' (ইজারায় প্রদত্ত মূল সস্পদ) হিসাবে গণ্য হবে। যেমন ফসল বপনের ক্ষেত্রে জমি আসল (ইজারায় প্রদত্ত মূল) সম্পদ বলে গণ্য হবে। (আশ -শরহুল মুমতি ' আলা যাদিল মুসতানকি, মুহাম্মাদ ইবনে সালিহ ইবনে মুহাম্মাদ আল উছাইমিন, প্রকাশক : দারু ইবনিল জাওযি, ১৪২২ হি, খ.৬,পৃ.৮৩) ।
আর প্রস্তাবিত বাগান লিজ গ্রহণের প্রচলিত পদ্ধতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশম্কা কম। কেননা, চাষীরা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত যাতে না হয় সেজন্য বাগান সাধারণত এক বছরের জন্য লিজ
নেয় না। বরং ৩/৪ বা তার চেয়ে অধিক বছরের জন্য লিজ নেয়। ফলে গাছ/বাগান লিজগ্রহীতা চাষীরা কোনো এক বছরে কিছু কম লাভ করলে এবং ক্ষতির সম্মুখীন হলেও গড়ে তারা লাভবান হবেন ।
খ. বিক্রি ও ইজারা/ভাড়া স্বতন্ত্র বিষয়। ফল অপরিপক্ব অবস্হায় বিক্রির ক্ষেত্রে বাগানের পরিচর্যার দায়িত্ব থেকে বাগান মালিকের ওপর। পক্ষান্তরে ইজারার ক্ষেত্রে বাগান পরিচর্যার দায়িত্ব থাকে ইজারাগ্রাহীতার ওপর।
গ. ফসল চাষের ক্ষেত্রে অর্থের বিনিময়ে জমি কেরায়া (লিজ) গ্রহণ/প্রদান কিংবা উৎপাদিত ফসল ভাগাভাগির শর্তে মুযারা'আ চুক্তি করা যেমন বৈধ তেমনি বাগানের ক্ষেত্রে অর্থের বিনিময়ে বাগান লিজ গ্রহণ/প্রদান কিংবা উৎপাদিত ফল/ফসল ভাগাভাগি করার শর্তে মুসাক্বাত চুক্তি করাও বৈধ।
ঘ. উপরন্তু লিজগ্রহীতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি জমি লিজ নেয়ার ক্ষেত্রেও বিদ্যমান। অর্থাৎ জমি লিজ নেয়ার পর ফসল চাষ করার পরে কোনো কারণে ফসল উৎপন্ন হতে পারে আবার নাও হতে পারে। তখন লিজগ্রহীতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে ও লিজ -দাতা একতরফাভাবে লাভবান হবে। আমরা জানি যে, রাসূলুল্লাহ (সা:) নগদ অর্থের বিনিময়ে জমি লিজ দেয়া বৈধ করেছেন। নিম্নোক্ত হাদীসটি এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য :
রাফে' ইবনে খাদীজ রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, আমরা আনসাররা অধিকাংশই কৃষিকাজ করতাম। আমরা জমি লিজ দিতাম এ শর্তে যে, লিজ -দাতা জমির একটি নির্দিষ্ট অংশের ফসল নেবে ও লিজগ্রহীতা অপর অংশের ফসল নেবে।
এরূপ চুক্তির পর বাস্তবে কখনো এক অংশে ফসল উৎপাদিত হতো ও অপর অংশে কিছুই উৎপাদিত হতো না (এরূপ হলে একজন লাভবান হতো ও অন্যজন ক্ষতিগ্রস্ত হতো) । এরূপ করতে রাসূলুল্লাহ (সা:) আমাদেরকে নিষেধ করেছেন। অথচ নগদ অর্থের বিনিময়ে লিজ দিতে তিনি আমাদের নিষেধ করেননি (সহীহ মুসলিম)। অর্থাৎ, ফসল উৎপাদনের জন্য জমি ইজারা নেয়ার ক্ষেত্রেও ফসল কম -বেশি হাওয়া বা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এতদসত্বেও নগদ অর্থের
বিনিময়ে ইজারা নেয়া বা দেয়াকে রাসূলুল্লাহ (সা:)
অনুমতি দিয়েছেন। পরিশেষে সভায় উপস্হিত
দলিলসমূহের সার্বিক দিক বিশ্লেষণ করে উমর রা. - এর আমল (কাজ) ও তার প্রতি সাহাবীদের মৌন সমর্থন, সালাফে সালেহীনদের মধ্যে লাইস ইবনে সা'দ,হারব কিরমানী ও আবুল ওয়াফা বিন আকিল -এর অভিমত, ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ,
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম র. -এর অভিমত এবং মুতাআখখিরীন ফকিহগণের মধ্যে শাইখ মুহাম্মাদ ইবনে সালিহ ইবনে মুহাম্মাদ আল উছাইমিন র. -এর মতো ফকিহগণের অভিমতের সাথে ঐকমত্য পোষণ করে আম বাগানসহ বিভিন্ন বাগানে অর্থায়নের ক্ষেত্রে লিজ অ্যান্ড সাব - লিজ (Lease and Sub Lease) বিনিয়োগ পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে বলে অভিমত ব্যক্ত করা হয়। তবে,
ক. গ্রাহকের অবহেলা, চুক্তিভঙ্গ, দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা ও বাগান পরিচর্যায় শিথিলতা বা ত্রুটিজনিত কারণ ছাড়া অর্থাৎ, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সংশ্লিষ্ট বাগানের অধিকাংশ / উল্লেখযোগ্য অংশ ধ্বংস/ক্ষতিগ্রস্ত হলে ব্যাংক পরবর্তী সময়ের জন্য আনুপাতিক হারে কম ভাড়া গ্রহণ করবে।
খ. সাধারণ ইজারার ক্ষেত্রে পালনীয় শর'ঈ শর্তাবলিও এক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
উল্লিখিত বিনিয়োগ পদ্ধতিতে ইসলামী ব্যাংক প্রথমে বাগানের মালিকের কাছ থেকে সমুদয় বাগান বা আংশিক (গ্রাহকের ইক্যুইটি/নিজস্ব তহবিল থেকে লিজ নেয়া অংশটুকু বাদ দিয়ে যতটুকু অবশিষ্ট থাকে সেটুকু) লিজ নেবে এবং গ্রাহকের কাছে অপেক্ষাকৃত বেশি ভাড়ায় লিজ দেবে। মূল মালিককে ভাড়া প্রদানের পরিমাণ ও গ্রাহক থেকে কিস্তিতে ভাড়া আদায়ের পরিমাণের মধ্যে ব্যবধানটুকু ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগ আয় বলে বিবেচিত হবে।
(সূত্র: ২৬ জানুয়ারী ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত শরী'আহ সুপারভাইজরি কমিটির ১৯৬তম অধিবেশনের কার্যবিবরণী) ।
No comments:
Post a Comment