Tuesday, 3 September 2019

এইচপিএসএম বিনিয়োগে অবকাশকালীন ভাড়া আদায়

বিষয় -৫৩ : বর্তমানে এইচপিএসএম বিনিয়োগে অবকাশকাল বা জেস্টেশন পিরিয়ড (gestation period)  এর জন্য ভাড়া আদায় করা হয় না। তবে অবকাশকাল অতিক্রান্ত হওয়ার পর উক্ত
সময়ের জন্য সংশ্লিষ্ট সম্পদের ওপর মূল্যসংযোজন বা ভ্যালু অ্যাডিশন (value addition) করা হয়। এ ক্ষেত্রে এইচপিএসএম বিনিয়োগ হিসাব বিকলন করে উল্লিখিত বর্ধিত
মূল্যকে 'অনার্জিত আয় বা আন -আরনড় (unearned income)  হিসাব' শিরোনামে স্হানান্তর করা হয় এবং বিভিন্ন কিস্তিতে তা আদায় করে ব্যাংকের বিনিয়োগ আয় (investment income) হিসাবে স্হানান্তর করা
হয়। এর ফলে এক বছরের আয় পরবর্তী কয়েক বছর ধরে আদায় করা হয়ে থাকে। এ কারণে নিম্নেরূপ জটিলতার সৃষ্টি হয়।
 ক. এইচপিএসএম সম্পদের বৃদ্ধিপ্রাপ্ত মূল্য বা 'অনার্জিত আয়কে সংশ্লিষ্ট আর্থিক বছরের আয় হিসেবে গণ্য না করায় তা ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড অ্যাকাউন্টিং সিস্টেম (Intenational standard Accounting system) ও বাংলাদেশ অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড (Bangladesh Accounting Standard)  এর পরিপন্হী হয়।
খ . 'অনার্জিত আয় আদায়ের বর্তমান পদ্ধতিতে জমাকারী ও শেয়ারহোল্ডারগণ সংশ্লিষ্ট বছরের
তুলনামূলক মুনাফা থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকেন। বিশেষ করে যে সমস্ত জমাকারী হিসাব বন্ধ করেন এবং শেয়ারহোল্ডার শেয়ার বিক্রয় করেন তারা এ রকম হিসাব পদ্ধতির কারণে সংশ্লিষ্ট বছরের মুনাফা থেকে বঞ্চিত হন।
পক্ষান্তরে বাই'মুরাবাহা বা বাই'মুয়াজ্জালের মুনাফা গ্রাহকের  কাছ থেকে নগদে আদায় না হলেও তা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই অ্যাক্রুয়াল সিস্টেম (accrual system) অনুসারে আদায় করা হয়।  এমতাবস্হায় এইচপিএসএম সম্পদের
বৃদ্ধিপ্রাপ্ত মূল্য বা 'অনার্জিত আয়কে বাই'মুরাবাহা বা বাই'মুয়াজ্জালের মুনাফার অনুরূপ সরাসরি বিনিয়োগ আয় হিসেবে গণ্য করা শরী'আহসম্মত হবে কি না ?
সিদ্ধান্ত : এইচপিএসএম বিনিয়োগের অনার্জিত আয় (unearned income) ভাড়া (rent) নয়, বরং সম্পদ ( asset)  এর বৃদ্ধিপ্রাপ্ত মূল্য। আর সম্দদের মালিকানা গ্রাহকের কাছে হস্তান্তরের পরই কেবল ব্যাংক সম্পদের উক্ত বৃদ্ধিপ্রাপ্ত মূল্য বা অনার্জিত আয়ের হকদার হবে। এ জন্য বর্তমান পদ্ধতিতে কিস্তি পরিশোধের সাথে সাথে যখন সম্পদের আংশিক মালিকানা গ্রাহকের কাছে হস্তান্তরিত হয় তখন ব্যাংক তা আদায় করতে পারে। উল্লেখ্য, অবকাশকালে সম্পদ গ্রাহকের কাছে হস্তান্তর করা তো দূরের কথা, তখন সম্পদ
তৈরিই হয় না। তাই সে সময় সম্পদের ওপর ভাড়া
আরোপ করে তা আয় হিসেবে গণ্য করা শরী'আহর দৃষ্টিতে বৈধ নয়। অন্য দিকে সম্পদটির মালিকানা গ্রাহকের কাছে হস্তান্তরিত হয়েছে ধরা
হলে অন্যের অর্থাৎ গ্রাহকের মালিকানাধীন
সম্পদের ভাড়া ব্যাংক নিতে পারে না। অতএব,
অবকাশকালে সংশ্লিষ্ট সম্পদের বর্ধিত মূল্য বা
অনার্জিত আয়কে বাই'মুরাবাহা বা বাই'মুয়াজ্জালের মুনাফার মতো সরাসরি বিনিয়োগ আয় হিসেবে গণ্য করা শরী'আহসম্মত
হবে না।
 ক. বাই'মুরাবাহা ও বাই'মুয়াজ্জাল পদ্ধতিতে অ্যাক্রুয়াল ভিত্তিতে মুনাফা ধার্য/আদায় করার সাথে অবকাশকালের ভাড়াকে কিয়াস করা ফিক্বহের দৃষ্টিতে কিয়াস মা'আল ফারিক অর্থাৎ
,ভিন্ন প্রকৃতির বিষয়ের সাথে তুলনা। কেননা, বাই'মুরাবাহা / বাই'মুয়াজ্জালের ক্ষেত্রে সম্পদটি গ্রাহকের কাছে সম্পপূর্ণ বিক্রয় করে তার মালিকানা হস্তান্তর করা হয় এবং গ্রাহক উক্ত সম্পদ ব্যয়/ব্যবহার করতে পারে। এজন্য ব্যাংক উক্ত বিক্রয়লব্ধ মুনাফার হকদার হয়ে যায়। তাই
সে ক্ষেত্রে মুনাফাকে অ্যাক্রুয়াল ভিত্তিতে আয় হিসেবে গণ্য করতে শরী'আহ বিশেষজ্ঞগণ অনুমতি দিয়েছেন। কিন্তু এইচপিএসএম -এর
সম্পদের বর্ধিত আংশকি মূল্যের ওপর ব্যাংকের
হক প্রতিষ্ঠিত হয় না। এ জন্য এটি অ্যাক্রুয়াল ভিত্তিতে আদায় করা বৈধ হবে না।
খ. এইচপিএসএম সম্পদের বৃদ্ধিপ্রাপ্ত মূল্য বা
অনার্জিত আয়কে একটি নির্দিষ্ট আর্থিক বছরের আয় হিসেবে গণ্য করার বিষয়টি ইন্টারন্যাশনাল
স্ট্যান্ডার্ড অ্যাকাউন্টিং সিস্টেম ও বাংলাদেশ অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ডের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হওয়াটা
জরুরি নয়। কারণ,তারা সুদভিত্তিক হিসাবপদ্ধতি
অনুসরণ করে থাকে। তাই শরী'আহর নীতি লঙ্গঘন করে তাদের হুবহু অনুসরণ করা ইসলামী ব্যাংকের জন্য সমীচীন হবে না।
গ. ডিপোজিটর ও শেয়ারহোল্ডারগণ বঞ্চিত হওয়ার বিষয়টি এখানে প্রযোজ্য নয়। কারণ, ডিপোজিটর ও শেয়ারহোল্ডারগণ শরী'আহসম্মত
হালাল আয়ের উদ্দেশ্যেই ইসলামী ব্যাংকে মুদারাবা পদ্ধতিতে বিনিয়োগ করেছেন ও অর্থ জমা রেখেছেন। এ জন্যই সন্দেহজনক আয় তাদেরকে না দিয়ে জনকল্যাণে ব্যয় করা হয়। এখানে তাদের বঞ্চিত হওয়ার বিষয়টি যেমন প্রযোজ্য নয় তেমনি অনার্জিত আয়ের বেলায়ও প্রযোজ্য নয়। কারণ, শরী'আহর দৃষ্টিতে অনার্জিত আয়ের  ওপর কারো অধীকার বা হক প্রতিষ্ঠিত হয় না। অতএব, মুদারাবা জমাকারীদের অর্থ এইচপিএসএম পদ্ধতিতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সম্পদ তৈরি হওয়ার আগে তার কোনো ভাড়া বা বর্ধিত মূল্যের হকদার তারা হতে পারেন না। তবে পরবর্তী বছরগুলোতে তাদের বিনিয়োগকৃত অর্থের মুনাফা তারা যথারীতি পাবেন। কিন্তু কেউ
হিসাব বন্ধ করলে বা শেয়ার বিক্রয় করে ফেললে
তিতি স্বাভাবিক নিয়মেই সে লাভের অধিকারী হবেন না। তা ছাড়া ব্যাংকের হিসাব পদ্ধতিতে হিসাবধারীদের মুনাফাকে সামগ্রিকভাবে হিসাব করা হয়। শরী'আহসম্মতভাবে সংশ্লিষ্ট বছরের আয় যতটুকু হয়েছে তারা সেটুকুরই হকদার হবেন। উল্লেখ্য, এ কারণেই বছরের শেষে কেউ হিসাব খুললেও তাকে শুধু সংশ্লিষ্ট মাসের লাভের হার দেয়া হয় না, বরং সে যখন ছিল না সে সময়ের অর্থাৎ পুরো বছরের ব্যবসার লাভের হারেই তাকে লাভ দেয়া হয়। ব্যাংকের মতো একটি
বিশাল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য এভাবে হিসাব করাটাই স্বাভাবিক। বস্তুত এ ক্ষেত্রে এক বছরের আয়কে পরবর্তী বছরের আয় স্হানান্তর করার বিষয়টি শরী'আহ পরিপন্হী নয়। কেননা, ক্ষেত্রবিশেষে একজনের সম্পদ আরেকজনের সম্পদের সাথে মিশ্রিত হলে একজনের কিছু
সম্পদ আরেকজনের মধ্যে চলে যাওয়াটা প্রচলিত নিয়মেও গ্রহণযোগ্য।
(সূত্র: ১৪ মার্চ ২০০৭ সালে অনুষ্ঠিত শরী'আহ কাউন্সলের ১৪০তম অধিবেশনের কার্যবিবরণী)
বিষয় -৫৪  :এইচপিএসএম বিনিয়োগের নিশ্চয়তাস্বরূপ বিনিয়োগ গ্রাহকের কোনো সম্পদ জামানত হিসেবে গ্রহণ করা ইসলামী বাংকের জন্য বৈধ হবে কি ?
সিদ্ধান্ত  : এইচপিএসএম বিনিয়োগ আদায়ের নিশ্চয়তাস্বরূপ ব্যাংক গ্রাহকের যেকোনো সম্পদ জামানত হিসেবে নিতে পারে এবং চুু্ক্তিতে উল্লেখ
থাকলে ব্যাংক উক্ত জামানত বিক্রয় করে বিনিয়োগের অর্থ সমন্বয় করে নিতে পারে ।
(সূত্র: ১২ এপ্রিল ১৯৮৪ সালে অনুষ্ঠিত শরী'আহ
কাউন্সলের ৪র্থ অধিবেশনের কার্যবিবরণী)
অস্তিত্বহীন ও হস্তান্তর অযোগ্য পণ্য বা সম্পদে বিনিয়োগ
বিষয় -৫৫ : অস্তিত্বহীন ও হস্তান্তর অযোগ্য পণ্য বা সম্পদের ওপর বাই'মুরাবাহা, বাই'মুয়াজ্জাল  ও এইচপিএসএম  বিনিয়োগ করা শরী'আহসম্মত হবে কি  না ?
সিদ্ধান্ত  : অস্তিত্বহীন, কল্পিত, হস্তান্তর অযোগ্য ও নামসর্বস্ব কোনো পণ্য বা সম্পদের ওপর বাই'মুরাবাহা, বাই'মুয়াজ্জাল, হায়ার পার্চেজ আন্ডার শিরকাতুল মিলক ইত্যাদি কোনো বিনিয়োগ পদ্ধতির অনুশীলনই শরী'আহসম্মত নয় এবং এ বিনিয়োগের ওপর ধার্যকৃত মুনাফা সুদ বলে পরিগণিত হবে।
( সূত্র: ৪ নভেম্বর ১৯৯১ সালো অনুষ্ঠিত শরী'আহ
কাউন্সলের ৩২শ অধিবেশনের কার্যবিবরণী)
বিষয় -৫৬  : এইচপিএসএম বিনিয়োগের মাধ্যমে
নির্মিত আবাসিক ভবনকে বাণিজ্যিক ভবনে রূপান্তরের অতিরিক্ত ব্যয় নির্বাহের জন্য ইসলামী ব্যাংক পুনরায় বিনিয়োগ দিতে পারবে কি না?
সিদ্ধান্ত  : আবাসিক ভবনকে বাণিজ্যিক ভবনে রূপান্তর করতে এইচপিএসএম পদ্ধতিতে বিনিয়োগ প্রদান করা শরী'আহসম্মত হবে। কেননা,আবাসিক ভবনকে বাণিজ্যিক ভবনে রূপান্তরের মাধ্যমে উক্ত সম্পদের মূল্য বাড়বে।
ব্যাংক কর্তৃক উক্ত সম্পদে এইচপিএসএম পদ্ধতিতে বিনিয়োগ করলে ভবনে ব্যাংকের মালিকানার অনুপাত বাড়বে এবং মালিকানায় অনুপাত বাড়ায় ব্যাংকের ভাড়ার পরিমাণও বাড়বে।
(সূত্র: ২২ নভেম্বর ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত শরী'আহ
সুপারভাইজরি কমিটির ২০৫তম অধিবেশনের কার্যবিবরণী) ।
           লিজ ও সাব -লিজ
বিষয় -৫৭ : ইসলামী ব্যাংকের কোনো কোনো বিনিয়োগের ক্ষেত্রে গ্রাহকগণ অগ্রিম টাকা প্রদান করে জমির মালিকের কাছ থেকে জমি ভাড়া নিয়ে চাষাবাদ করে থাকেন। এ ক্ষেত্রে শরী'আহসম্মত ও সহজে অনুশীলনযোগ্য কোনো বিনিয়োগপদ্ধতি আছে কি?
সিদ্ধান্ত  : এ ক্ষেত্রে ইসলামী বাংক লিজ (lease)  ও সাব -লিজ (sub lease) পদ্ধতি অনুশীলন করতে পারে। জমি ভাড়া গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যাংক প্রথমে বিনিয়োগ গ্রাহক কর্তৃক নির্ধারিত জমির মালিককে নির্দিষ্ট পরিমাণ নগদ অর্থ প্রদান করে সংশ্লিষ্ট জমি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য রিজ নেবে। এরপর ব্যাংক উক্ত জমি অতিরিক্ত ভাড়ায় গ্রাহকের কাছে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য সাব লিজে প্রদান করবে। বিনিয়োগ গ্রাহক শর্ত মোতাবেক ব্যাংকের ভাড়া কিস্তিতে বা এককালীন পরিশোধ করবে।
( ১৮ মার্চ ২০১০ সালে অনুষ্ঠিত শরী'আহ সুপারভাইজরি কমিটির ১৫৭তম অধিবেশনের
কার্যবিবরণী )।
            ইজারা মাওছুফা ফিয -যিম্মাহ
 বিষয় -৫৮ :অনুষ্ঠান ব্যবস্হাপনা (Event Management) ,চিকিৎসা ,বিদেশ ভ্রমণ, ভ্রমণের টিকিট ক্রয়, হজ্ব ও উমরাহ,উচ্চশিক্ষা ইত্যাদি খাতে বিনিয়োগের জন্য বিনিয়োগ পদ্ধতি হিসেবে 'ইজারা মাওছুফা ফিয -যিম্মাহ' বা 'ফরওয়ার্ড ইজারা'র অনুশীলন শরী'আহসম্মত কি  না ?
সিদ্ধান্ত  : অনুষ্ঠান ব্যবস্হাপনা (Event Management) , বিদেশ ভ্রমণ, ভ্রমণের টিকেট ক্রয়,হজ্ব ও উমরাহ, চিকিৎসা , উচ্চশিক্ষা ইত্যাদি
খাতে বিনিয়োগের জন্য শরী'আহসম্মত বিনিয়োগ
পদ্ধতি হিসেবে 'ইজারা মাওছুফা ফিয -যিম্মাহ' বা 'ফরওয়ার্ড ইজারা' প্রবর্তন করা যেতে পারে।
'ইজারা মাওছুফা ফিয -যিম্মাহ' বা forward Ijarah
' ইজারা মাওছুফা ফিয -যিম্মাহ' এমন একটি
ক্রয় -বিক্রয় যাতে ভবিষ্যতে সেবা লাভের জন্য বর্তমানে মূল্য পরিশোধ করা হয়। কুয়েতের বিখ্যাত ফিকহ বিশ্বকোষ  'আল -মাওসুআহ আল -ফিকহিয়্যা আল কুয়েতিয়্যাহ' এর ইজারাতুয
যিম্মাহ অধ্যায়ে বলা হয়েছে, ভাড়া প্রদানকারীর সাথে চুক্তিকৃত সেবা গ্রহণের অধিকার লাভের জন্য যে ধরনের ইজারা সংঘটিত হয় তাকে ইজারা ওয়ারিদ আলায যিম্মাহ বা ইজারা মাওছুফা ফিয -যিম্মাহ বলা হয়। যেমন কেউ আরোহণের জন্য
অথবা কোনো বস্তু বহন করার জন্য কোনো বাহন
ভাড়া করে বলল যে,  'আপনার কাছ থেকে অমুক
বাহনটি অমুক জায়গায় পৌঁছানোর জন্য আমি
ভাড়া করলাম' অথবা 'আমি এ জামাটি সেলাই করার জন্য অথবা এ দেয়ালটি এভাবে নির্মাণ করার জন্য আপনাকে দায়িত্ব প্রদান করলাম।


No comments:

Post a Comment