বরকতময় উপরিউক্ত বিয়েতে তিন খলীফায়ে রাশেদের যারপরনাই প্রচেষ্টা ও ভূমিকার কথা ইতোপূর্বে বিবৃত হয়েছে। তাঁদের স্বাক্ষী হওয়া ও
দাওয়াতপ্রাপ্তির দালিলিক বর্ণনাও বিস্তারিত আকারে আলোচনা হয়েছে। এক্ষণে আমরা খাতুনে জান্নাতের স্বামীগৃহে যাত্রার আলোচনায় যাব । জানব উম্মুল মুমিনীন আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) ও উম্মে সালাম (রাঃ )এর এক্ষেত্রে সুচারু ব্যবস্হাপনার কতাও । আলোচনাটি শুরু হবে শীয়াা বন্ধুদের প্রামাণ্য গ্রন্হ থেকে । পরিশেষে থাকবে সুন্নীদের গ্রন্হ থেকে নির্মোহ আলোচনাও।
মানাকেবে খারযামীর ভাষ্যঃ
উম্মে আয়মান (রাঃ) বর্ণনা করেন, আমি নবী করীম (সা:) এর খেদমতে হযরত আলী (রাঃ ) কে
ডেকে পাঠালাম। তিনি তাশরীফ এনে বললেন -
"আমি যখন ঘরে প্রবেশ করলাম তখন -রাসূলুল্লাহ (সা:) হযরত আয়েশা (রা:) এর ঘরে প্রবেশ করছিলেন । (আমি আসায় ) উম্মৎ জননীগণ উঠে অন্য কামরায় চলে গেলেন। আমি রাসূলুল্লাহ (সা:) এর সামনে লজ্জায় কুকড়ে যাচ্ছিলাম। তিনি বললেন, 'আলী! তোমার স্ত্রীকে ঘরে তুলতে চাও কী? আমি বললাম, আমার বাবা -মা আপনার চরণে উৎসর্গিত হোক হে আল্লাহর রাসূল! সে আপনার মেহেরবাণী নবী করীম (সা:) বললেন, ইনশাআল্লাহ আজ কিংবা কালকের মধ্যেই আমি ওকে স্বামীগৃহে পাঠাব। রাসূলুল্লাহ (সা:) এর দরবার থেকে এই সদর অনুমতির আনন্দ নিয়ে আমি যখন ফিরছিলাম তখন তিনি
উম্মৎ জননীদের ডেকে বললেন , তোমরা ফাতেমাকে স্বাক্ষীগৃহে প্রেরণের ব্যবন্হা করো ।
উত্তম পোষাকে তাঁকে সজ্জিত করো । সুগন্ধি লাগাও তাঁর দেহে। ফাতেমার বাসরে ফুল বিছানা বিছিয়ে দাও। উম্মৎ জননীগণ নবী করীম (সা:) এর নির্দেশ মোতাবেক তাই করলেন।
বিশিষ্ট শীয়া ভাষ্যকার শায়খ আবূ জাফর তূসী তার 'আমালী' কিতাবে বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দেন। তার ভাষ্য -
অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সা:) উম্মৎ জননীদের প্রতি লক্ষ্য করে বললেন, কে কে এখানে আছে? উম্মে সালামাহ (রাঃ ) বলেন, জ্বী আমি উম্মে সালামাহ আর এ যয়নব। অমুক অর্থাৎ আয়েশা ও হাফসা (রাঃ) । তিনি বললেন, আমার মেয়ে ফাতেমা ও চাচাত ভাই আলীকে তোমরা বিয়ের সাজে সাজাও এবং তাদের বাসর তৈরী করো । উম্মে সালামাহ (রাঃ) বললেন, ওদেরকে কোন ঘরে দেব হে আল্লাহর রাসূল (সা:)। ইরশাদ হলো, কেন তোমার ঘরেই। পরে উম্মৎ জননীদের হুকুম দিলেন, বাসর ঘর সাজাও, অবশ্যই তা ওদের মর্যাদামাফিকই ।
এবার আসুন আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের কিতাবসমূহের প্রতি দৃষ্টি বুলিয়ে নেওয়া যাক। ইবনে মাজাহ শরীফের ওয়ালিমা অধ্যায়ের একটি
হাদীসে বর্ণিত আছে-
"ইমাম শাবী মাসরূক থেকে তিনি হযরত আয়েশা
(রাঃ) ও উম্মে সালামাহ (রাঃ ) থেকে বর্ণনা করেন যে, উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রাঃ) ও উম্মে সালামাহ (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) আমাদের
নির্দেশ করেন যে, তোমরা ফাতেমাকে আলীর ঘরে তুলে দেবার ব্যবস্হা করো। আমরা বাতহা উপত্যকা থেকে মাটি এনে বাসর ঘর লেপন করলাম । নিজ হাতে আমরা খেজুরের ছাল ভরে
দুটি গদিও বানালাম। খেজুর ও মুনাক্কা দ্বারা বিশেষ খাবারও প্রস্তত করলাম। ঘরের কোণে 'একটি কাঠ গেড়ে দেয়া হলো যাতে তাতে কাপড় ও মশক লটকে দেয়া যায়। হযরত আয়েশা (রাঃ )
ও উম্মে সালামাহ (রাঃ) বলেন, আমরা ফাতেমার
শাদীর মত উত্তম শাদী আর দেখিনি।
ইবনে মাজাহ শরীফের হাদীস পেশ করার পর আমরা পুনরায় বিশিষ্ট শীয়া ভাষ্যকার আবূ জাফর তূসীর 'একটি ভাষ্য তুুুলে ধরছি, যাতে একটি নতুন তথ্য পাওয়া যাবে। তথ্যটি সুন্নীদের ক্ছে অভিনব না হলেও শীয়া বন্ধুদের কাছে অতি
অবশ্যই অভিনব মনে হবে -
"হযরত ফাতেমা (রাঃ) এর স্বামীগৃহে আগমন হয় ওসমান (রাঃ) এর স্ত্রী নবী নন্দিনী রুকাইয়া (রাঃ)
এর মৃত্যুর ১৬ দিন পরে ঘটনাটি বদর যুদ্ধের ১৬ দিন পরের। (বদর যুদ্ধ ২য় হিজরীতে হয়েছিল ।
শায়খ আবূ জাফর তূসীর এই বর্ণনা দ্বারা জানা গেল, হযরত রুকাইয়া (রাঃ) যিনি হযরত নবী করীম (সা:) এর সাহেবযাদী ও ফাতেমা (রাঃ ) এর বোন । তিরি হযরত ওসামন (রাঃ) এর স্ত্রী ছিলেন। বদর যুদ্ধ শেষে তিনি ইন্তেকাল করেন।
সার -সংক্ষেপঃ
উপরিউক্ত শীয়া -সুন্নী কিতাবের সার -নির্যাস নিম্নরুপঃঃ
১। হযরত ফাতেমা (রাঃ) এর স্বামীগৃহে আগমন ও বধু -বিদায়ের পরামর্শটি হযরত আয়েশা (রাঃ) এর গৃহেই সম্পন্ন হয়েছিল।
২। নবী করীম (সা:) হযরত উম্মে সালামাহ (রাঃ) ও হযরত আয়েশা (রাঃ) কেই ব্যবস্হানার গুরুদায়িত্ব দিয়েছিলেন ।
৩। বধু -বিদায়ের ব্যবস্হাপনা যেমনঃ ঘরদোর পরিচ্ছন্নকরণ, লেপা, গদীওয়ালা বিছানা তৈরী করা, খাদ্য -খাবার তৈরী করা, খেজুর -মুনাক্কা প্রস্তুতি, মিঠাই -মন্ড বানানো, ঘরে আলনা লাগানের মত ইত্যকার সকল দায়িত্ব উম্মৎ জননী হযরত উম্মে সালামাহ (রাঃ) ও হযরত আয়েশা (রাঃ) এর স্কন্ধেই অর্পিত হয়েছিল। এর দ্বারা তাঁদের মধ্যকার অন্তরঙ্গতা ও সহমর্মিতা প্রকাশ করে নয় কী। তাই বেশ জোর গলায়ই বলা যায়, তাঁদের মাঝে কোন প্রকার মনোমালিন্য, হীনমন্যতা কিংবা কোন হিংসা -দ্বেষ ছিলনা। সুতরাং সাহাবায়ে কেরামের পারস্পরিক মতানৈক্যের যে উপাখ্যান বাজারে চাউর হয়ে আছে তা নিছক গাল -গল্প ছাড়া কিছু নয়।
No comments:
Post a Comment