* পর্বত তাঁবুর কীলক বা পেরেকের মত
ভূতত্ত্ব বিজ্ঞানে ভাঁজকরণ প্রতিভাস অধুনা আবিস্কৃত সত্য। ভাঁজকরণ প্রক্রিয়া পর্বতমালা বা শ্রেণি গঠনের জন্য দায়ি । ভূপৃষ্ঠের কঠিন আবরণটি ( Lithosphere ) যার উপরে আমরা বাস করি, সেটা একটি কঠিন খোসার মত, পক্ষান্তরে এর গভীর স্তরগুলো গরম এবং গ্যাসীয় ও তরল ( fluid ) এবং তাই এগুলো যে কোন রকম জীবের জীবন ধারণের জন্য অনোপযোগী। এটাও আমরা জানি যে , পর্বতের দৃঢ় ও সুস্হিত অবস্হা ভাঁজকরণ ঘটনার সাথে গভীরভাবে জড়িত। কারণ ভূপৃষ্ঠে যে ভাঁজগুলো ছিল, সেই ভাঁজগুলোই স্তরসমূহকে যোগান দিয়েছিল মজবুত ভিত্তি । আর এই স্তরসমূহ গবর্ত গঠনে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে ।
ভূতত্ত্ববিদগণ আমাদেরকে বলেন যে, পৃথিবীর ব্যাসার্ধও প্রায় ৩৭৫০ মাইল বা ৬,০৩৫ কিলোমিটার এবং পৃথিবীর উপরিভাগের কঠিন আবরণ যার উপর আমরা বাস করি এটা খুবই পাতলা এর পুরুত্ব ১ থেকে ৩০ মাইল এর মধ্যে।
যেহেতু কঠিন আবরণটি পাতলা, তাই এর কম্পনের সম্ভাবনাটা বেশি । পবর্তগুলো পেরেক বা তাঁবুর কীলকের মত কাজ করে ও ভূপৃষ্ঠের এই কছিন আবরণটিককে ধরে রাখে এবং তাকে দেয় সুস্হিতি । কুরআনে হুবহু এরূপ বর্ণনাই রয়েছে ।
"আমি কি পৃথিবীকে বিস্তীর্ণ বিছানাস্বরূপ এবং পবর্তসমূহকে কীলক স্বরূপ সৃষ্ট করিনি ?" (আল কুরআন ৭৮:৬ -৭ )
'আওতাদ' শব্দটি অর্থ খুঁটি বা কীলক (ঐগুলোর মত যা ব্যবহার করা হয় তাঁবু খাটাতে ) এগুলো হল ভূতাত্বিক ভাঁজসমূহের (Geologecal folds)-
এর গভীর ভিত্তি।
'পৃথিবী' (Earth ) নামক একটি বই বিশ্বের অনেক -বিশ্ববিদ্যালয়ের বুনিয়দি (reference) পাঠ্য পুস্তক হিসেবে বিবেচনা করা হয় । পুস্তিকাটির অন্যতম লেখক ছিলেন ড. ফ্রাম্কপ্রেস (Dr.Frank press ) , যিনি ছিলেন ১২ বছর ধরে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞান একাডেমীর প্রেসিডেন্ট এবং ছিলেন আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ( jimmy Carter) -এর বিজ্ঞান উপদেষ্টা। এই পুস্তকে তিনি চিত্র ও উপমা সহকারে বর্ণনা করেছেন যে, পর্বত
কীলকাকৃতির ,
(১. স্তরীভূত শিরার ঊর্ধ্বমুখী বা নিম্নমুখী গমণের ফলে সৃষ্ট অবস্হাকে ভাঁজ বলে । এই ভাঁজ পাললিক শিলায় অধিক হলেও আগ্নেয় শিলা বা রূপান্তরিত শিরার অনেক ভাঁজ পৃথিবীতে দেখা যায় । আকৃতিতে ভাঁজ কয়েক মিলিমিটার থেকে কয়েক শত কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। ( অনুবাদক)
পর্বত নিজেই পুরোটার একটি ক্ষুদ্র অংশ যার মূল মাটির গভীরে সুদৃঢ়ভাবে প্রোথিত। ড. প্রেসের মতে পর্বত সমূহ ভূপৃষ্ঠের কঠিন আবরণটিকে স্হিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে ।
'পৃথিবীর কম্পন রোধে পবর্তসমূহের কার্যক্রমে সম্পর্কে আল -কুরআন সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে ।
আমি পৃথিবীতে সৃষ্ট করেছি সুদৃঢ় পর্বতমালা যাতে 'পৃথিবী তাদেরকে নিয়ে এদিক ওদিক ঢলে না যায়। (আল -কুরআন ২১:৩১ )
অনুরূপ বর্ণনা কুরআনের ১৬:১৫ ও ৩১:১০ স্হানে আছে তাই দেখা যায় পর্বতসমূহের প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে মহিমান্বিত কুরআনে যেসব বর্ণনা রয়েছে ভূতত্ত্ব বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক আবিষ্কারের সাথে পুরাপুরিই সামন্জ্ঞস্যপূর্ণ ।
* পর্বতসমূহ সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত
ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগ বহু শক্ত স্তর মজবুত প্লেট বা পাতে (plates) বিভক্ত যেগুলোর পুরুত্ব হল প্রায় ১০০ কিল্রমিটার। এই পাত বা প্লেটগুলো আংশকি গলিত অঞ্চলে ভাসমান অবস্হায় থাকে । এই আংশকি গলিত অঞ্চলকে এসথেনোস্ফিয়ার (Aesthenosphere ) বলে । পর্বত গড়া শুরু হয় পাত বা প্লেটগুলোর প্রান্তসীমায়। পৃথিবীর কঠিন আবরণ (ভূত্বক) ৫ কিলোমিটার মোটা বা পুরু মহাসাগরের নিচে, প্রায় ৩৫ কিলোমিটার মোটা সমতল মহাদেশীয় পৃষ্ঠাদশগুলোর নিচে প্রাই ৮০ কিলোমিটার মোটা বিশাল পবর্তমালা নিচে । এগুলো হল মজবুত ভিত্তি যার উপর পবর্তগুলো দাঁড়িয়ে আচে কুরআনেও পবর্তসমূহের ভিত্তি সম্পর্ক বলে ।
"আর তিনি পবর্তগুলো সুদৃঢ়ভাবে স্হাপন করেছেন" । (আল -কুরআন ৭৯:৩২ )
অনুরূপ বক্তব্য কুরআনের ১৬: ১৫, ৩১: ১০ ও ৮৮: ১৬৯ স্হানে উল্লেখ আছে।
১. 'Earth, Press and siever, p. 435,Also See science, Trsbuck and luthens: p.157.
২ -৩. পৃথিবীর শক্ত বিহরাবরণকে অশ্বমন্ডল । ( Lithosphers ) বলে। এর অংশ হচ্ছে প্লেট। অশ্বমন্ডলের নিচের স্তরকে অ্যাসথেনোসফিয়ার
( Aesthenosphere) বলে। এই স্তরের গভীরতা
১৫০ কিলোমিটার অতিরিক্ত তাপ ও চাপে এই স্তর কঠিন নয় বরং নমনীয়রূপে বিরাজমান। হয়ে থাকে । মোহনাসমূহে যা মিঠা বা সুপেয় পানিকে লবনাক্ত পানি হতে পৃথক করে সেটা আবিস্কৃত হয়েছে । সেটা হল Pycnocline zone বা অঞ্চল
যার চিহ্নিত ঘনত্ব ধারাবাহিকহীনভাবে দু'টি স্তরকে পৃথক করে থাকে। এই পর্দা বা অন্তরালটির (বিভাজন অঞ্চলের) রয়েছে এমন লবনাক্ততা যা সুপেয় পানি ও লবনাক্ত পানি এই উবয় প্রকার পানির লবনাক্ততা হতে আলাদা । নীল -নদ প্রবাহিত হয়ে ভূমধ্যসাগরের যেখানে পড়েছেে মিশরের সেই স্হানসহ অন্যান্য অনেক স্হানে এই বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে থাকে ।
(ঘ) মহাসাগরের গভীরে অন্ধকার
সামুদ্রিক ভূতত্ববিদ্যায় বিশ্ব বিখ্যাত বিশেষজ্ঞ ও জেদ্দার বাদশাহ আবদুল আজীজ -বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দুর্গরাওকে কুরআনের
নিম্নলিখিত আয়াতের উপর তাঁর মতামত জানতে চাওয়া হয় --
"অথবা (অবিশ্বাসীদের অবস্হা) এর উপমা এমন, যেমন এক বিশাল গভীর সমুদ্রের তলের অন্ধকার, উপরে একটি তরঙ্গ ছেয়ে আছে তার উপর আরও একটি তরঙ্গ এবং এর উপরে ঘনকালো মেঘমালা। অন্ধকারের উপর অন্ধকার ছেয়ে আছে এমনকি কেউ যদি তার হাত বের করে তবে সে তা আদ্যে দেখতে পাবে না। আল্লাহ যাকে আলো দেন না তাঁর জন্য আর কোন আলো নেই" (আল -কুরআন ২৪: ৪০ )
অধ্যাপক রাও বলেন যে, বিজ্ঞানীগণ কেবলমাত্র বর্তমানে আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে মহাসাগরের গভীরের যে অন্ধকার বিরাজ করছে এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। কোনরূপ সাহায্য ছাড়া মানুষ পানির নিচে ২০ হতে ৩০ মিটার অধিক গভীরের ডুব দিতে সক্ষম নয় এবং মহাসাগরীয় অঞ্চলের ২০০ মিটার অধিক গভীরে মানুষ বেঁচে থাকতে পারে না কুরআনের এই আয়াত সকল সাগরে কথা উল্লেখ করে না । কারণ প্রতিটি সাগর অন্ধকার স্তরে স্তরে পু্ঞ্জিভূত
করে রাখে না । এ আয়াত বিশেষভাবে গভীর সাগর বা গভীর মহাসাগরের কথাই উল্লেখ করেছে । যেহেতু কুরআন বলে বিশাল গভীর মহাসাগরের মধ্যে অন্ধকার। গভীর মহাসাগরের এই স্তরে স্তরে অন্ধকার সৃষ্ট ২টি কারণে হয়ে থাকে।
(১) আলোক রশ্মি ৭টি রং এর সমন্বয়ে গঠিত। এ সাতটি রং হল বেগুনি, নীল,আসমানী,সবুজ,হলুদ, কমলা ও লাল (বেনীআসহকলা)। আলোক রশ্মি যখন পানিতে আপতিত হয় তখন প্রতিসরণ সংঘটিত হয়ে থাকে। পানির উপরিভাগের ১০ হতে ১৫ মিটার গভীরে পানি লাল রংকে শোষণ করে। তাই একজন ডুবরী ২৫ মিটার গভীরে যদি যান এবং আঘাতপ্রাপ্ত হন তাহলে তিনি তার রক্তের লাল রং দেখতে সক্ষম হবে না । কারণ লাল রংটি এই গভীরতায় পৌঁছতে পারে না । অনুরূপভাবে কমলা রং ৩০ হতে ৫০ সিটার, হলুদ ৫০ হতে ১০০ মিটার, সবুজ ১০০ হতে ২০০ মিটারের অধিক গভীর পানিতে শোষিত হয় । এক স্তরের পর অন্য স্তরে ক্রমাগতভাবে রং সমূহের অন্তর্ধান মহাসাগর
ক্রমবর্ধমান হারে অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে থাকে
অর্থাৎ আলোর স্তরে স্তরে অন্ধকার সৃষ্ট হতে থাকে । ১০০০ মিটার গভীর নিচে পরিপূর্ণ অন্ধকার বিরাজ করে।
(২) সূর্যের রশ্মি মেঘমালার দ্বারা শোষিত হয় যাতে আলোকে রশ্মিগুলো বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে । ফলে মেঘমালায় নিচে সৃষ্ট হয় এক অন্ধকার স্তর ।
এটাই হল অন্ধকারের প্রথম স্তর । আবার যকন আলোকত রশ্মিসমূহ মহাসাগরের পৃষ্ঠদেশে পৌঁছায় তখন এগুলো ঢেউ এর উপরিতল কর্তৃক প্রতিফলিত হয়, ফলে ঢেউ এর উপরিতল দীপ্তিময় চক চকে হয়ে উঠে। সুতরাং তরঙ্গগুলোই আলোককে প্রতিফলিত করে এবং অন্ধকার সৃষ্ট
করে । অপ্রতিফলিত রশ্মিগুলো পানি ভেদ করে সমুদ্রের গভীরে পৌঁছায় । সুতরাং মহাসাগর দু'টি অংশে বিভক্ত হয়ে যায় । অন্যটি গভীর অঞ্চল যা চিহ্নিত করা যায় অন্ধকার দ্বারা। পৃষ্ঠদেশ বা উপরিভাগ আবার মহাসাগরের গভীর অঞ্চল হতে পৃথক হয়েছে তরঙ্গমালা দ্বারা সাগর ও মহাসাগরের গভীর অঞ্চলে পানিকে ঢেকে রেখেছে আভ্যন্তরীণ তরঙ্গমালা। কারণ গভীর অংশের পানির ঘনত্ব তার উপরিভাগের পানির ঘনত্ব হতে অধিক। আভ্যন্তরীণ তরঙ্গমালার নিম্ন হতেই অন্ধকার শুরু ঞয় । এমনকি মাছেরাও সাগর মহাসাগরের গভীর অঞ্চলে দেখতে পায় না। তাদের একমাত্র আলোর উৎস হল তাদের নিজেদের দেহের আলো।
আল কুরআনের এটা যথার্থভাবে বর্ণনা করেছে --
"এক বিশাল গভীর সমুদ্রের মধ্যে অন্ধকার ,উপরে একটি তরঙ্গ ছেয়ে আছে তার উপর আরও একটি তরঙ্গ অন্য কথায়, এই তরঙ্গমালার উপরে রয়েছে বিভিন্ন প্রকার তরঙ্গ অর্থাৎ ঐ তরঙ্গগুলো যা দেকা যায় মহাসাগরের পৃষ্ঠদেশে বা উপরিভাগে।
কুরআনের আয়াতটি আরও বলে : শীর্ষদেশে রয়েছে ঘন কালো মেঘমালা, একের ইপর এক গভীর অন্ধকার ।
যেমন বর্ণনা করা হয়েছে এই মেঘমালা একটার উপর আর একটা আড়াল বা পর্দা হিসেবে রয়েছে এবং বিভিন্ন স্তরে আলোর রং শোষণ করে অতিরিক্ত অন্ধকার সৃষ্ট করে । অধ্যাপক দুর্গারাও তার বক্তব্যের পরিসমাপ্তি টানেন এ কথা বলে : ১৪০০ বছর পূর্বে একজন স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে এসব বিস্ময়কর ঘটনাসমূহের এরূপ সুবিস্তারিত বর্ণনা দেয়া কোনভাবেই সম্ভব নয় । সুতরাং এ সফল তথ্য অবশ্যই কোন অতিপ্রাকৃতিক উৎস হতেই এসেছে ।
No comments:
Post a Comment