ইতোপূর্বে আমরা হযরত আলী ও ফাতেমা (রাঃ ) এর বিয়েতে আবূ বকর (রাঃ) ও ওমর (রাঃ) এর অকুন্ঠ সহযোগিতা ও অকৃত্রিম সহমর্মিতার কথা জেনেছি। এবার দেখব এই মহতি বিয়ের খর্চা ও সাজ -সরঞ্জাম গোছাতে তাঁদের ভুমিকা কী ছিল ?
এ ক্ষেত্রে সিদ্দীকে আকবর (রাঃ) ও ওসমান গনী (রাঃ ) এর ভূমিকা ও অবদান প্রনিধানযোগ্য। এ প্রসংগে শীয়াদের সুবিখ্যাত পণ্ডিত আমালিয়ে শায়খ তুসী, মানাকেবে খারযামী, মানাকেবে ইবনে শাহর আশোব, কাশফুল গুম্মাহ, বেহারুল আনোয়ার, জালাউল য়ুউন প্রমুখের কিতাবের উদ্ধৃতি দেখা যেতে পারে। উপরিউক্ত কিতাবসমূহের মধ্যে 'আমালী' কিতাবখানি খুবই নির্ভরযোগ্য। এতে শায়খ তূসী হযরত আলী (রাঃ )-এর ভাষ্য এভাবেই তুলে ধরেছেন -- --
হযরত আলী (রাঃ) বলেন , রাসূল (সা.) আমাকে আদেশপূর্বক বললেন, 'আলী ? যাও, বিয়ের খরচাদি যোগানোর জন্য তোমার বর্মটি বেচে দাও । আমার বর্মটি বিক্রি করলাম এবং এর মূল্য প্রিয়নবী (সা.)-এর কাছে সোপর্দ করলাম। তিনি বেলাল (রাঃ ) -কে ডেকে মুঠ ভরে তাকে দিয়ে বললোন, যাও? ফাতেমার জন্য খোশবু ক্রয় করে নিয়ে এসো । আরেক মুঠ ভরে আবূ বকর (রাঃ) -কে দিয়ে বললেন, ফাতেমার জন্য (বিয়ের ) অন্যান্য সাজ সরঞ্জাম কিনে নাও । আম্মার ইবনে ইয়াসের (রাঃ) ও অন্যান্য সাথীসহ তিনি রওয়ানা হলেন । সকলে বাজারে গেলেন। তারা যে জিনিষটিই কিনতেন সর্বাগ্রে তা আবূ বকর (রাঃ )
এর সামনে পেশ করতেন। তিনি যুৎসই মনে করলে সঙ্গে সঙ্গে কিনে ফেলতেন। তাঁরা নিম্নেবর্ণিত জিনিষসমূহ ক্রয় করের,
সাত দিরহামে একটি কামিজ, চার দিরহামে একটি ওড়না ,একটি খয়বারী চাদর, একটি রেডিমেট টেবিল, দুটি বসার গদী, একটি গদিতে খেজুরে ভরা ছিল । অপর গদিটি ভেড়ার পশম দ্বারা পরিপূর্ণ। ইযখির ঘাসভর্তি একটি তোষকে ছিল। ছিল একটি পশমের বিছানার চাদর। চামড়ার একটি মশক, দুধ রাখার একটি কাষ্ঠপত্র । সবুজ রংয়ের একটি ঘড়া ও মাটির একটি কলসও ছিল । মাল -সামানা ক্রয় করার পর হযরত আবূ বকর (রাঃ ) নিজে কিছু বহন করেন। বাদবাকি গুলো অন্যান্য সঙ্গী -সাথীরা কাঁধে তুলে নেন ।এগুলো সবই রাসূল (সা.)- এর দরবারে পেশ করা হয় । তিনি এগুলো হাত দ্বারা ছুঁয়ে দোয়া করেন । বলেন, হে আল্লাহ ? আপনি আহলে বাইতের মাঝে বরকত দিন ।
শীয়াদের অন্যান্য কিতাবে এও আছে যে, হযরত আলী (রাঃ) বিয়ের খরচ মেটাতে তার প্রিয় বর্মটি হযরত ওসমান গণী (রাঃ ) এর কাছে বিক্রয় করে দেন। হযরত ওসসান গনী বর্মটি মূল্যশোধ করার
পর বর্মটি তাঁকে পুনরায় ফেরৎ দের। হযরত ওসমান (রাঃ ) এর এই অশ্রুতপূর্ব ত্যাগের দরুন রাসূল (সা.) তাঁর জন্য দু'আ করেন। এই রেওয়ায়েতটি শীয়াদের বিখ্যাত কিতাব 'আখতাবে খারজামী, কাশফুল গুম্মাহ -এ বিস্তারিত আকারে লিপিবদ্ধ আছে । বেহারাল আনোয়ারেও ঘটিনাটি বিবৃত ।
মানাকেবে খারযামীর ভাষ্য
হযরত আলী (রাঃ) বলেন, রাসূল (সা.) আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার বর্মটি বিক্রি করে এর মূল্য আমার নিকট সোপর্দ কর । তদ্দারা তোমার ও ফাতেমার বিয়ের সাজ -সরঞ্জাম খরিদ করব । আমি বর্মটি নিয়ে মদীনার বাজারে গেলাম। ৪০০ দিরহামে সেটি হযরত ওসমান (রাঃ ) এর কাছে বিক্রি করলাম। বর্মটি হস্তান্তর করার পর ওসমান (রাঃ) সেটি গ্রহণ করলেন আর আমি গ্রহণ করলাম এর মূল্য। ওসমান (রাঃ) বললেন , এই বর্মটির অধিকার একমাত্র আমারই তো নাকি। আমি বললাম , অবশ্যই । উসমান (রাঃ) বললেন , তাহলে নিন, এটি আপনাকে হাদিয়া দিলাম । হযরত আলী (রাঃ) বললেন, আমি বর্ম ও এর মূল্য উভয়টিই নিলাম এবং রাসূল (সা:) এর দরবারে পেশ করলাম । রাসূল (সা:) হযরত ওসমান (রাঃ ) এর জন্য দু 'আ করলেন। পরে হযরত আবু বকর (রাঃ ) কে ডেকে তাকে এক মুঠি দেরহাম দিয়ে বললেন, এ দিয়ে ফাতেমার ঘর -গৃহস্হলীর সামগ্রী খরিদ কর। হযরত সালমান ফারসি (রাঃ) ও বিলাল (রাঃ ) আবূ বকর (রাঃ ) এর সাথে গেলেন। উদ্দেশ্য, তাকে সাহায্য করা। হযরত আবূ বকর (রাঃ ) বলেন, রাসূল (সা:) আমাকে ৬৩ দিরহাম দিয়েছিলেন । বাজারে গিয়ে আমি একটি মিসরী বিছানা, একটি চামড়ার গদি, চামড়ার তোষক যার ভেতর খেজুরের ছাল দ্বারা পরিপূর্ণ, একটি খয়রী চাদর , পানির মশক, ঘড়া , কলস ও একটি ওযুর বদনা ক্রয় করি। পশমের একটি পাতলা কাপড়ও ছিল এর মাঝে। হযরত আবূ বকর (রাঃ ) বলেন, এই সামগ্রীসমূহের কিছু আমি আর কিছু হযরত সালমান ফারসী (রাঃ) আর কিছু বিলাল (রাঃ )বহন করেছিলেন।
এখানে কয়েকটি বিষয় লক্ষ্যনীয়
হযরত ফাতেমা (রাঃ) এর বিয়ের সামগ্রী হযরত ওসমান (রাঃ ) -ই দান করা । যা তিনি হাদিয়া ও তোহফা স্বরূপ দিয়েছিলেন। এই আত্মদানের অস্বীকৃতিস্বরূপ নবী করীম (সা:) তাঁকে দু 'আও করেছিলেন। তিনি বিয়ে বাজারের পুরো খরচের
যোগানদাতা। এর দ্বারা হযরত ওসমান (রাঃ) ও আলী (রাঃ) -এর মধ্যকার সখ্যতার দিকটি ফুটিয়ে তোলে নয় কি ? আর সিদ্দীকে আকবার (রাঃ) এর কেনাকাটা ও তা নিজে বহন করে নিয়ে আসার ব্যাপারটি তো বলাই বাহুল্য।
উপরিউক্ত বর্ণনাসমূহের সবই শীয়াদের মধ্যকার সর্বজনগ্রাহ্য বিজ্ঞ ওলামাদর। এদের প্রতি শীয়াদের অগাধ আস্হা ও শ্রদ্ধা। তাঁদেরই বর্ণনায়
কত সুন্দরভাবে উঠে এসেছে খোলাফায়ে রাশেদা ও নবী পরিবারের অকৃত্রিম ভালবাসার কাহিনী।
No comments:
Post a Comment