বিষয় -১০৯ : ইসলামী ব্যাংকের কোন কোন সম্পদ বা তহবিলের ওপর যাকাত প্রদান করতে হবে ?
সিদ্ধান্ত : জর্দান ইসলামী ব্যাংক,বাহরাইন ইসলামী ব্যাংক ও কুয়েত ফিন্যান্স হাউজসহ দেশি -বিদেশি বিভিন্ন ইসলামী ব্যাংক অনুসৃত কর্মপন্হা পর্যালোচনা করে ব্যাংকের শরী'আহ কাউন্সল নিম্নোক্ত তহবিল ও মুনাফার ওপর যাকাত প্রদানের সিদ্ধান্ত দেয়:
ক . বিধিবদ্ধ সঞ্চিতি (statutory Reserve)
খ . বিনিয়োগ ক্ষতি সমন্বয় তহবিল (Investment Loss Off -setting Reserve)
গ . শেয়ার প্রিমিয়াম (Share Premium)।
ঘ . সাধারণ সঞ্চিতি ( General Reserve)।
ঙ . বিনিময় সমতাকরণ হিসাব (Exchange Equalization A/C)।
শেয়ারহোল্ডারগণকে তাদের শেয়ারের মূল্য ও
লভ্যাংশের ওপর যাকাত দিতে হবে। উক্ত যাকাতের টাকা ব্যাংকের সাদাকাহ তহবিল দান করার জন্য শেয়ারহোল্ডারগণের কাছে আবেদন করা যেতে পারে। অনুরূপভাবে জমাকারীগণের কাছেও আবেদন করা যেতে পারে।
(সূত্র : ১০ এপ্রিল ১৯৮৫ সালে অনুষ্ঠিত শরী'আহ
কাউন্সলের ৯ম অধিবেশনের কার্যবিবরণী )
বিষয় -১১০ : আইনগত সত্তা (Iegal entity) হিসেবে ইসলামী ব্যাংক,কোনো কোম্পানি,সংস্হা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের ওপরও যাকাত প্রদান বাধ্যতামূলক কি না ?
সিদ্ধান্ত : ব্যাংকের কাছে রক্ষিত বিভিন্ন প্রকার রিজার্ভ ও প্রভিশন যদি 'নিসাব' পরিমাণ হয়, তাহলে প্রতি চান্দ্রবর্ষের ওপর ২.৫০% হারে যাকাত প্রদান করা বাধ্যতামূলক। তবে শর্ত হলো
'মুছাহিমুন' বা শেয়ারহোল্ডারগণ, যারা প্রকৃতপক্ষে এসব সম্পদের মালিক, তাদের কাছ থেকে ব্যাংক বা সংল্শিষ্ট প্রতিষ্ঠান সম্পদের যাকাত প্রদানের অনুমতি নিয়ে রাখবে।
১৯৮৪ সালের ৩০ এপ্রিলে অনুষ্ঠিত 'যাকাত' -বিষয়ক প্রথম কনফারেন্স সকল পাবলিক, প্রাইভেট লিমিটেড ও যৌথ মূলধনী বৃহদায়তন কারবার প্রতিষ্ঠান বা তোম্পানিকে সর্বসম্মতিক্রমে আইনগত সত্তা ( Isgal entity) -রূপে চিহ্নিত করা হয় এবং এসব প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন রিজার্ভ ও প্রভিশনের ওপর যাকাত প্রদান করতে হবে বলে ঐকমত্য পোষণ করা হয়। সাধারণত 'মুকাল্লাফ বিয -যাকাত' বা যাকাতের হুকুম যার ওপর প্রযোজ্য এমন ব্যক্তির সম্পদের 'যাকাত দেয়া ওয়াজিব'। অনুরূপভাবে ক্ষেত্রবিশেষে 'গায়রে 'মুকাল্লাফ বিয -যাকাত বা যাকাতের হুকুম যার ওপর প্রযোজ্য নয় এমন প্রতিশ্ঠান, সংস্হা বা কোম্পানির নিজস্ব তহবিলের ওপর আইনগত সত্তা হিসেবে শরী'আহ মোতাবেক অলি বা অভিভাবকরূপ প্রতিষ্ঠানের মালিকগণের পক্ষ থেকে যাকাত প্রদান করা বাধ্যতামূলক।
নিম্নে বর্ণিত অবস্হা পাওয়া গেলে লিমিটেড কোম্পানিগুলো কৃত্রিম ব্যক্তিরূপে গণ্য হবে এবং
যথানিয়মে যাকাত প্রদান করতে হবে :
ক . যাকাত প্রদানের জন্য বাধ্যতামূলক আইনগত বিধান থাকলে।
খ . প্রতিষ্ঠানের মূল গঠনতন্ত্রে ( মেমোরেন্ডাম ও আর্টিক্যালস অব অ্যাসোসিয়েশন) যাকাত প্রদানের আইনগত কোনো ধারার উল্লেখ থাকলে।
গ . বার্ষিক সাধারণ সভায় এ মর্মে কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে।
ঘ . মুছাহিমুন বা শেয়ারহোল্ডারগণ ব্যক্তিগতভাবে এ ব্যাপারে সম্মতি দিলে।
সুতর্ং কোনো ইসলামী ব্যাংকের মেমোরেন্ডাম অব অ্যাসোসিয়েশনে যাকাত প্রদান সংক্রান্ত কোনো ধারা বিদ্যমান থকলে সে ইসলামী ব্যাংককে আইনগত সত্তা হিসেবে অবশ্যই যাকাত
প্রদান করতে হবে।
(সূত্র : ২৬ জুন ১৯৯৫ সালে অনুষ্ঠিত শরী'আহ
কাউন্সলের ৪৯তম অধিবেশনের কার্যবিবরণী )
বিষয় -১১১ : যাকাত হিসাবের ক্ষেত্রে সম্পদের প্রারম্ভিক স্হিতি (opening balance) ,সমাপনী স্হিতি (closing balance) ও গড় স্হিতি (average balance) -এর মধ্যে কোনটি ধর্তব্য হবে?
সিদ্ধান্ত : যাকাত সমাপনী স্হিতির (closing balance) ওপরই নির্ধারণ করতে হবে।
( সূত্র: ২৯ ফেব্রুয়ারী ১৯৮৮ সালে অনুষ্ঠিত শরী'আহ কাউন্সলের ২০শ অধিবেশনের কার্যবিবরণী )
বিষয় -১১২ : ইসলামী ব্যাংকের যাকাত বাবদ আদায়কৃত অর্থ এবং অনিচ্ছাকৃতভাবে এসে যাওয়া অন্যান্য সংশয়পূর্ণ আয় কোন কোন খাতে ব্যয় -ব্যবহার করা যাবে?
সিদ্ধান্ত : আল্লাহ তা'আলা যাকাত ব্যয়ের ৮টি খাত সুনির্দিষ্টভাবে মহাগ্রন্হ আল কুরআনে বর্ণনা করেছেন। এগুলো হচ্ছে : ১. ফকির ২
মিসকিন ৩. যাকাতবিষয়ক কাজে নিয়োজিত কর্মচারী ৪ .যাদের মন সন্তুষ্ট করা প্রয়োজন ৫ . ফির -রিকাব (দাস মুক্তি) ৬ . আল গারিমিন (ঋণগ্রস্ত লোকজন) ৭ . ফি সাবিলিল্লাহ ( আল্লাহর পথে) ৮ . ইবনুস সাবিল (নিঃস্ব পথিক)।
পক্ষান্তরে সংশয়পূর্ণ অর্থ ব্যয়ের ব্যাপারে শরী'আহর নীতিগত দৃষ্ঠিভঙ্গি হচ্ছে আলোচ্য
সন্দেহজনক অর্থ যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক/সরকারি কোষাগার থেকে পাওয়া যায় এবং কোনো বাধ্যতামূলক উপায়ে সংল্শিষ্ট উৎসকে তা ফেরত দেয়া সম্ভব হয়, তবে তা সংল্শিষ্ট আয়ের বিপরীতে ইনকাম ট্যাক্স কিংবা সিভিল ট্যাক্স ইত্যাদি বাবদ পুনরায় উক্ত তহবিলে পৌঁছে দেয়াই বাঞ্ছনীয়। যাতে যেখানকার অর্থ সেখানে আবার চলে যেথে পারে। ট্যাক্স পরিশোধের পরও যদি কিছু অর্থ অবশিষ্ট থেকে যায় তবে তা চক্ষুশিবির খোলা, দাতব্য চিকিৎসালয় স্হাপন, বন্যাদুর্গতদের সাহায্য প্রদান, সড়ক কিংবা পুল নির্মাণ, সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা অথবা এমন দালান নির্মাণের কাজে লাগানো যা সর্বসাধারণের ব্যবহারোপযোগী করে দেয়া হয় ইত্যাদি কাজে লাগানো যেতে পারে।
সংশয়পূর্ণ অর্থ ব্যাংকের হাতে পড়লে কেবল দায়িত্ব মুক্তির প্রত্যাশায় সাধারণ জনকল্যাণমূলক কাজে যেমন গণশৌচাগার নির্মাণ, ফকির, মিসকিন,ইয়াতিম ও অসাহায় -অনাথদের বিবাহ ও চিকিৎসার খরচ, নদীভাঙা, বাস্তুহারা, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য ও পুনর্বাসন ইত্যাদি কাজে ব্যয় ও ব্যবহার করা যেতে পারে।
(সূত্র : ২৪ ডিসেম্বর ১৯৯২ সালে অনুষ্ঠিত শরী'আহ কাউন্সলের ৩৫শ অধিবেশনের কার্যবিবরণী )
বিষয় - ১১৩ : নিম্নোক্ত খাতে যাকাতের অর্থ ব্যয় করা শরী'আহসম্মত কি না?
ক . আয়বর্ধনমূলক কার্যক্ররমের আওতায় দরিদ্র লোকদের স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য ক্ষুদ্র ব্যবসা, গাভী পালন, হাঁস -মুরগী পালন, সেলাই মেশিন প্রদান, রিকশা প্রদান ইত্যাদি ।
খ . শিক্ষাকার্যক্রমের আওতায় আদর্শ ফোরকানিয়া মক্তব, মডেল মাদরাসা, দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্র -ছাত্রীদের জস্য শিক্ষাবৃত্তি ও এককালীন আর্থিক সহায়তা দান ইত্যাদি।
গ . মহিলাদেরকে শিক্ষিত করে তোলার লক্ষ্যে মহিলা মাদরাসা কার্যক্রম পরিচালনা।
ঘ . গরিব ছাত্র -ছাত্রীদেরকে যাকাতের অর্থ দিয়ে
শিক্ষাবৃত্তি প্রদান করা।
ঙ . আর্দশ ফোরকানিয়া মক্তব পরিচালনা।
চ . কুরআনিক ল্যাঙ্গুয়েজ ইনস্টিটিউট -এর মাধ্যমে মানুষকে সহিহভাবে অর্থসহ কুরআন বুঝতে সহায়তা করা।
ছ . নার্সিং ইনস্টিটিউট -এর মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের কে নার্সিং পেশার মতো একটি মানব সেবামূলক কাজে সম্পৃক্ত করে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করা।
জ . মহিলা পুনর্বাসন কেন্দ্রের মাধ্যমে বিধবা, তালাকপ্রাপ্তা, এতিম ও অসহায় মহিলাদের পুনর্বাসন , সেলাই প্রশিক্ষণ, ফাস্টফুড তৈরি প্রশিক্ষণ ইত্যাদি কাজের মাধ্যমে তাদেরকে স্বাবলম্বী করে তোলা।
ঝ . বস্তিবাসী শিশু ও বয়স্কদের শিক্ষা ও স্বাস্হ্যেন্নয়নে বস্তির উন্নয়ন প্রকল্প পরিচালনা করা।
ঞ . দাতব্য চিকিৎসালয়ের মাধ্যমে গরিব ও অসহায় রোগীদের চিকিৎসাসেবা ও বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ করা।
ট . হোমিওপ্যাথি ক্লিনিক পরিচালনার মাধ্যমে গরিব ও অসহায় রোগীদের স্বল্পখরচে চিকিৎসাসেবা প্রদান করা।
ঠ . কম খরচে চক্ষু চিকিৎসা প্রকল্পের মাধ্যমে
দরিদ্র রোগীদের স্বল্পখরচে/বিনাখরচে চিকিৎসাসেবা প্রদান করা।
ড . দরিদ্র পরিবারের ছেলেদের কে খরচে রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের মাধ্যমে খাতনা করানো।
ঢ . গ্রামের দরিদ্র মহিলাদেরকে ধাত্রীবিদ্যা প্রশিক্ষণ কোর্সের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করা এবং প্রসূতি মায়েদের নিরাপদ সেবা প্রদানের লক্ষ্যে যাকাতের অর্থ ব্যয় করা।
ণ . দাওয়াহ কাজের সহায়ক জাতীয় ও ইসলামী সংস্কৃতির উন্নয়ন ও বিকাশে যাকাতের অর্থ ব্যয় করা ।
সিদ্ধান্ত : উক্ত কার্যক্রমসমূহ পবিত্র কুরআনের
সূরা আত তাওবার ৬০ নং আয়াতে বর্ণিত ৮টি খাত (যথা : ১। ফকির, ২। মিসকিন,৩। যাকাত আদায়ে নিয়োজিত কর্মচারী, ৪। মুয়াল্লাফাতুল কুলুব, ৫। দাসমুক্তি,৬। ঋণগ্রস্ত, ৭। ফি সাবিলিল্লাহ ও ৮। মুসাফির) এর মধ্য হতে নিম্নোক্ত তিনটি খাতের আওতাভুক্ত :
ক . ফকির
খ. মিসকিন এবং
গ . ফি সাবিলিল্লাহ ( আল্লাহর পথে) ।
উপরিউক্ত কার্যক্রমসসমূহ পবিত্র কুরআনে উল্লিখিত ৩টি খাত ( ফকির, মিসকিন ও ফি সাবিলিল্লাহ) এর আওতাভুক্ত হওয়ার ব্যাপারে
বিশ্বের বরেণ্য উলামায়ে কেরাম, ফকিহ, আন্তর্জাতিক ইসলামী ফিকহ ও গবেষণা সংস্হার
মতামত রয়েছে।
(সূত্র : ২৭ জানুয়ারী ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত শরী'আহ সুপারভাইজরি কমিটির ১৬০তম
অঅধিবেশনের কার্যবিবরণী )
বিষয় -১১৪ : যাকাত সংগ্রহ ও ব্যবস্হাপনায়
নিয়োজিত কোনো প্রতিষ্ঠান সংগৃহীত যাকাত তহবিল থেকে কাউকে ধার বা বিনিয়োগ দিতে পারবে কি?
সিদ্ধান্ত : যাকাত সংগ্রহ ও ব্যবস্হাপনায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানের গ্যারান্টি দেয়ার শর্তে
যাকাতের অর্থ শুধু ( যাকাতের হকদারদেরকেই
ক্বরদ বা বিনিয়োগ সুবিধা হিসেবে প্রদান করা যাবে। তবে এক বৎসরের বেশি সময়ের জন্য যাকাতের অর্থ ক্বরদ প্রদান বা বিনিয়োগ করা বাঞ্ছনীয় নয়। কিন্তু গ্যারান্টি প্রদান না করলে যাকাতের অর্থের ক্বরদ প্রদান বা বিনিয়োগ করা
যাবে না।
( সূত্র : ২৮ মে ১৯৯৮ সালে অনুষ্ঠিত শরী'আহ কাউন্সলের ৬৪তম অধিবেশনের কার্যবিবরণী )
বিষয় -১১৫ : কোনো ওয়াকফ প্রতিষ্ঠানের শরী'আহ অনুমোদিত শেয়ার থেকে অর্জিত লভ্যাংশ বা ডিভিডেন্ড বাবদ প্রাপ্ত আয়ের ওপর যাকাত প্রদান করতে হবে কি না?
সিদ্ধান্ত : কোনো ওয়াকফ প্রতিষ্ঠানের ডিভিডেন্ড আয় ওয়াকফ সম্পদের অন্তর্ভূক্ত যা ব্যক্তি বা কোম্পানির মালিকানার আওতাবহির্ভূত,
সেহেতু উক্ত ডিভিডেন্ড আয়ের ওপর কোনো যাকাত দিতেহবে না। কেননা শরী'আহর দৃষ্টিতে ওয়াকফকৃত সম্পদ যাকাতযোগ্য নয়।
(সূত্র : ৩১ জুলাই ২০০২ সালে অনুষ্ঠিত শরী'আহ
কাউন্সলের ১০৫তম অধিবেশনের কার্যবিবরণী)
বিষয় -১১৬ : চান্দ্রবর্ষের চেয়ে সৌরবর্ষ ১১ -১২ দিন বেশি হয়ে থাকে। ইসলামী শরী'আহর নিয়মানুযায়ী যাকাত চান্দ্রবর্ষ অনুযায়ী আদায় করার বিধান থাকলেও কোথাও কোথাও ব্যাংকিং
কার্যক্রম সৌরবর্ষ অনুযায়ী পরিচালিত হয়ে থাকে। এমতাবস্হায় ইসলামী ব্যাংক সৌরবর্ষ নাকি চান্দ্রবর্ষের ভিক্তিতে যাকাত হিসাব করবে ?
সিদ্ধান্ত : আল -কুরআনের সূরা আল -বাক্বারার ১৮৯,সূরা ইয়াসিন এর ৩৯ ও সূরা ইউনুস এর ৫ নং আয়াত বিশ্লেষণপূর্বক এবং আল্লামা ইবনে তাইমিয়ার 'রিসালাতুল হিলাল' গ্রন্হে প্রদত্ত শর'ঈ বিধান ও আধুনিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পর্কিত ফাতাওয়া গ্রন্হ যেমন -আল -ফাতওয়া আশ -শারী'আহ, 'ফাতহুয যাকাত' এবং 'আল -ইকতিসাদুল ইসলামীতে '
যাকাতবর্ষ সম্পর্কিত প্রদত্ত ফতওয়া ও দেশ -বিদেশের বিভিন্ন ফকিহ ও শরী'আহ বিশেষজ্ঞদের মতামত বিস্তারিত আলোচনান্তে উক্ত বিষয়ে নিম্নেরূপ মতামত ব্যক্ত করা হয় :
ক . সকল প্রকার দলিল -প্রমাণের ভিত্তিতে যাকাতের হিসাব বর্ণরূপে চান্দ্রবর্ষই ধর্তব্য হবে।
খ . ইসলামী ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাকাল হতে চান্দ্রবছর হিসেবে যাকাত প্রদেয় হবে।
গ . ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ যেহেতু সৌরবর্ষ অনুযায়ী আর্থিক প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে, সেহেতু অতিরিক্ত ১১/১২ দিন চান্দ্রবর্ষের সাথে যোগ করে ২.৫৮% (প্রায়) হারে যাতাত প্রদান করতে হবে।
ঘ . যাকাতযোগ্য বিভিন্ন রিজার্ভ খাতসমূহের অর্থ যদি বিনিয়োগ হিসাবে দেখানো হয় এবং বিনিয়োগলব্ধ আয়সমূহ সংল্শিষ্ট রিজার্ভ ফান্ডের আয় হিসাবে প্রদর্শিত হয়, তাহলে উক্ত আয়কে যাকাতযোগ্য খাতসমূহের আনুষঙ্গিক আয় হিসেবে বিবেচনায় এনে রিজার্ভের অর্থের সাথে উক্ত আয়সমূহেরও যাকাত প্রদান করতে হবে।
ঙ . লভ্যাংশ সমতাকরণ রিজার্ভ যেহেতু স্হায়ী পদ্ধতির ও প্রতিষ্ঠানের মালিকানার অন্তর্ভূক্ত রিজার্ভ, সেহেতু উক্ত রিজার্ভের ওপর যাকাত প্রদান করতে হবে।
ইসলামী ব্যাংকের জমাকারীগণ যারা বিভিন্ন হিসেবে টাকা জমা রাখেন তাদের কেউ কেউ মনে করেন যে, ইসলামী ব্যাংক নিজ দায়িত্বে তাদের হিসাবে জমাকৃত অর্থের ওপর তাদের পক্ষ থেকে যাকাত আদায় করে থাকে। অথচ প্রকৃতপক্ষে জমাকারীদের পক্ষ থেকে ব্যাংক কোনো প্রকার যাকাত আদায় করে না। এরূপ সন্দেহ নিরসনকল্পে হিসাব খোলার ফরমে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে জমাকারীগণ কর্তৃক জমাকৃত অর্থ যাকাতের নিসাব পরিমান হলেও ব্যাংক তার যাকাত পরিশোধ করে না, বরং জমাকারীকেই উক্ত অর্থের যাকাত পরিশোধ করতে হবে।
(সূত্র : ১৫ ডিসেম্বর ২০০৩ সালে অনুষ্ঠিত শরী'আহ কাউন্সলের ১১৫তম অধিবেশনের
কার্যবিবরণী )
বিষয় -১১৭ : ইসলামী ব্যাংকের জনৈক শেয়ারহোল্ডার ব্যাংক বরাবর প্রেরিত এক পত্রে
ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার ডিপোজিটরদের কাছ থেকে তাদের যাকাতের প্রদেয় অর্থ কেটে রেখে একটি তহবিল গড়ে তুলে তা থেকে খেলাপি গ্রাহকদের ঋণ পরিশোধের ব্যবস্হা করার প্রস্তাব করেন। পত্রে তিনি ঋণগ্রস্ত বিনিয়োগ গ্রহীতাদের
ঋণ পরিশোধের স্বার্থে নিম্নোক্ত প্রস্তাব পেশ করেন :
ক . শেয়ারের লভ্যাংশ ১৫%-২০%-২৫% হারে ঘোষণা না করে ১৭.৫%-২২.৫%-২৭.৫% হারে ঘোষণা করা এরং প্রতি বছর প্রতি শেয়ারের বিপরীতে যাকাত বাবদ ২.৫% হারে লভ্যাংশ থেকে কেটে রাখা।
খ . ডিপোজিটরগণের জন্য পৃথক 'মুদারাবা যাকাত জমা হিসাব' খোলা। অন্যান্য হিসাব থেকে ২.৫% লাভ অতিরিক্ত প্রদান করে লভ্যাংশ থেকে ২.৫% যাকাত আদায় পূর্বক উক্ত হিসাবে স্হানান্তর করা।
গ . ঋণগ্রস্তদের ঋণ পরিশোধের জন্য নীতিমালা প্রনয়ন করা।
উল্লিখিত প্রস্তাবিত বিষয়গুলো শরী'আহসম্মত কিি না?
সিদ্ধান্ত : উল্লিখিত শেয়ারহোল্ডারের প্রস্তাবগুলো নিম্নলিখিত কারণে গ্রহণযোগ্য নয় :
ক . শেয়ারহোল্ডারগণের জন্য ডিভিডেন্ড ঘোষণা করে সেখান থেকেে যাকাতের টাকা কেটে রাখা বৈধ হবে না। কারণ, যাকাত প্রত্যেক শেয়ারহোল্ডারের নিজস্ব সম্পদের হিসাবের ওপর নির্ভর করে। যে শেয়ারহোল্ডার থেকে যাকাত কেটে রাখা হবে তার অন্যান্য সম্পদ ও ঋণ হিসাব
করলে হতে পারে তার নিসাব পরিমাণ সম্পদ হবে না। এমতাবস্হায়, যাকাত ফরয না হওয়া সত্ত্বেও তার থেকে যাকাত কেটে নিলে তার ওপর জুলুম হবে। অধিকন্তু তার থেকে যাকাত কেটে তা দিয়ে
খেলাপি গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের ব্যবস্হা করা হলে অনেক ক্ষেত্রে যাকাতের মূলনীতির পরিপন্হী কাজ সংঘটিত হবে। অর্থাৎ কারো ক্ষেত্রে এমনও হতে পারে যে, যার নিসাব পরিমাণ সম্পদ নেই তার শেয়ার থেকে যাকাত কেটে নিয়ে তা কোনো নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক ধনী খেলাপি গ্রাহককে দেয়া হবে। এটা হবে বড় ধরনের জুলুম। আবার একজন গরিব বক্তি থেকে যাকাতের নামে তার অর্থ দিয়ে অন্য ঋণগ্রস্ত গরিবকে প্রদান করা হলেও তা সঠিক হবে না ।
খ . মুদারাবা ডিপোজিটরদের ক্ষেত্রে তাদের অনুমতি ব্যতিরেকে যাকাত কেটে রাখা ঠিক হবে না। অ্যাকাউন্টে টাকা থাকলেই যে সংল্শিষ্ট ডিপোজিটরের ওপর যাকাত ফরয হবে তা বলা যায় না ।
গ . তবে কোনো শেয়ারহোল্ডার বা ডিপোজিটর যদি ব্যাংককে তার পক্ষে যাকাত প্রদানের জন্য প্রতিনিধি নিয়োগ করে তাহলে ব্যাংক তা করতে পারে। সে ক্ষেত্রে সংল্শিষ্ট শেয়ারহোল্ডার বা ডিপোজিটর তার যাকাত হিসাব করার সময় ব্যাংকের শেয়ার ও ডিপোজিট স্বভাবতই তার হিসাবের বাইরে রাখবেন। শেয়ারহোল্ডার ও ডিপোজিটরদের অনুমতিসাপেক্ষে তাদের থেকে আদায়কৃত যাকাতের মাধ্যমে আলাদা তহবিল গঠন করা যেতে পারে তবে তা যাকাতের সকল খাতে ব্যয় করার সুযোগ থাকতে হবে।
ঘ . উক্ত তহবিল গঠন করে খেলাপি গ্রাহকদের ঋণ পরিশোধের ব্যবস্হা করলে সমাজের অনেক নিঃস্ব ও অসহায় ব্যক্তি যারা যাকাত প্রাপ্তিতে অগ্রাধিকার পান তাদের পরিবর্তে তুলনামূলক সচ্ছল ব্যক্তিরাও ক্ষেত্রবিশেষে যাকাতের সুবিধা পাবেন।
ঙ . এ ধরনের তহবিল গঠন করে খেলাপি ঋণ পরিশোধের ধারা চালু করা হলে ব্যাংকের খেলাপি গ্রাহকের সংখ্যা বেড়ে যেতে পারে যা ব্যাংকের জন্য কল্যাণকর নয়।
চ . অধিকন্তু, শেয়ারহোল্ডার ও ডিপোজিটরদের কাছ থেকে যাকাত বাবদ টাকা কেটে নিয়ে তা দিয়ে খেলাপি গ্রাহকদের ঋণ মুক্ত করা ইসলামী ব্যাংকের দায়িত্ব ও ইখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না।
সর্বোপরি, ব্যবসায়ে প্রকৃতই ক্ষতি হওয়ার কারণে খেলাপি হয়েছে এমন গ্রাহকদের সময় বাড়িয়ে দেয়া ও ক্ষেত্রবিশেষে ঋণ মওকুফ করার নীতি ব্যাংকে কার্যকর থাকে বিধায় এ উদ্দেশ্যে আলাদা যাকাত তহবিল গঠন করার প্রয়োজন নেই।
(সূত্র: ১৪ মার্চ ২০০৭ সালে অনুষ্ঠিত শরী'আহ কাউন্সলের ১৪০তম অধিবেশনের কার্যবিবরণী )।
No comments:
Post a Comment